আমাদের অফিসের এক সহকর্মী ছিলেন কংগ্রেস সমর্থক। বামেরা যখন রাজ্যে পাকাপাকিভাবে ক্ষমতায় এলেন, তখন সহকর্মীটি রাতারাতি হয়ে গেলেন বাম সমর্থক। তারপর কংগ্রেস ও অন্যান্য ‘শ্রেণিশত্রুদের’ বিরুদ্ধে শুরু হল তাঁর সাংঘাতিক বিষোদগার। তাঁর বাক্যবাণে প্রকৃত বামপন্থীরা ঘাবড়ে ঘোড়া হয়ে গেলেন। বলতে লাগলেন, ‘আরে বাবা, এই কংগ্রেসী মালটা যে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বামপন্থী।’ আমাদের ‘বস’ অরবিন্দবাবু ছিলেন রসিক মানুষ। তিনি বললেন, ‘এই তো নিয়ম। নতুন কাকের গু খাইসে। বেশি করে বলতে তো হবেই, প্রমাণ করতে হবে নতুন দলের প্রতি তার আনুগত্য।’ বামেদের এক বড় নেতার সঙ্গে আমার আলাপ ছিল। তিনি আমাদের অফিসে সভা করতে এলে আমি তাঁকে সেই ধর্মান্তরিত সহকর্মীর কথা বললাম। তিনি হেসে বললেন, ‘আমরা তাঁকে ব্যবহার করব। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলব। তাকে খেলতে দিয়েছি। খেলুক খেলুক।’
রাজ্যের বর্তমান বিরোধী নেতার কথা ভাবতে গিয়ে অফিসের সহকর্মীটির কথা মনে পড়ল। বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তুলনা চলে রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের। দুজনেই অভিনব, একমেবাদ্বিতীয়ম। দুজনেই রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে লাগাতার জেহাদ ঘোষণা করেছেন। বেশ মিল ছিল দুজনের মধ্যে। শুভেন্দু কখনও একা, কখনও বা দলবল সমেত ছুটে যেতেন রাজভবনে। শাসক দলের কাজের প্রতিবাদ জানাতেন। আর তাঁদের অভিযোগ শুনে টুইট করতেন বাবু জগদীপ। ছিলেন বটে টুইট মাস্টার। সকালে ঘুম থেকে উঠে টুইট, দুপুরে ভাতঘুমের পরে টুইট, সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে পা দোলাতে দোলাতে টুইট, মধ্যরাতে জেগে উঠে টুইট। মিল থাকলেও দুজনের পার্থক্য আছে। জগদীপবাবু রাজ্যপাল হওয়ার আগে থেকেই বিজেপির রাজনীতিতে হাত পাকিয়েছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। শুভেন্দুবাবু এসেছেন তৃণমূল থেকে। মাত্র বছর দুই আগে।
২০০৬ সালে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে বাবু শুভেন্দু দক্ষিণ কাঁথি বিধানসভা থেকে নির্বাচিত হন। ২০০৯ ও ২০১৪ সালে পর পর দুবার তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন তমলুক লোকসভা থেকে। ২০১৬ সালে তিনি তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন নন্দীগ্রাম বিধানসভা থেকে। তারপর মন্ত্রী হন। তারপর নানা পদে শোভিত হন। শুধু তিনি নন, তাঁর পরিবারের নানা জন ক্ষমতার বৃত্তে ঘুরতে থাকেন বন বন করে। বাবু শুভেন্দুর মন উচাটন শুরু হয় কবে থেকে যেন? সারদা কেলেঙ্কারি ব্যাপারে সিবিআই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ২০১৪ সালে। তখন থেকেই মন উচাটন? তিনি তো নিজেই বলেছেন বিজেপির প্রধান সেনাপতি অমিত শাহজির সঙ্গে তাঁর অনেক দিনের যোগাযোগ। এখন তো তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ।
২০২১-এর বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগেই ধর্মান্তরিত হলেন বাবু শুভেন্দু। আরও অনেকের মতো। শাহজিকে বললেন, বড় আশা করে এসেছি গো কোলে তুলে নাও, ফিরায়ো না। একটা রব উঠেছিল তখন যে, ক্ষমতায় আসছে বিজেপি। স্বঘোষিত নির্বাচন বিশেষজ্ঞ শাহজি বলে বেড়াচ্ছেন, ‘মার হাব্বা, আমরা ২০০-র বেশি আসন পাচ্ছি’। এক একটা ফেজে নির্বাচন হচ্ছে, আর শাহজি বলে দিচ্ছেন তাঁরা কত পাচ্ছেন। গণৎকার বটে! সেই হিসেব কষেই বাবু শুভেন্দুরা গৈরিক পতাকা কাঁধে নিয়েছিলেন। নির্বাচনের ফল বেরোতে সুড় সুড় করে পুরানো দলে ফিরলেন অনেকে। বাবু শুভেন্দুর ফেরা হল না। কারণ জায়ান্ট কিলার হিসেবে তাঁর প্রাপ্তিযোগ আছে যে!
জায়ান্ট কিলার! হ্যাঁ, তিনি নন্দীগ্রামে খোদ মমতা ব্যানার্জীকে হারিয়ে দিয়েছেন যে! নন্দীগ্রামে নির্বাচনের ফল ঘোষণা পৃথিবীর সেরা রহস্যগুলির একটি। যার সমাধান আদৌ কোনদিন হবে কি না কে জানে! সন্ধ্যের দিকে ঘোষণা শুনলাম নন্দীগ্রামে মমতা জয়ী হয়েছেন। তারপর অখণ্ড নীরবতা। কেন নীরবতা জানো সাধু যে বুঝ সন্ধান। তারপর প্রায় মধ্যরাতে জানা গেল শুভেন্দু জয়ী হয়েছেন ১৯৫৬ ভোটে; যদিও তিনি শাহজির মতো ভবিষ্যদ্বাণী করতে ভোলেন নি। কি বলেছিলেন যেন? বলেছিলেন ৫০ হাজার ভোটে তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে না হারাতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। হয়তো ২০১৬ সালের নির্বাচনের কথা মনে ছিল তাঁর। সে বার তৃণমূল প্রার্থী শুভেন্দু সিপিআই প্রার্থী আবদুল করিমকে ৮০ হাজার ভোটে হারিয়ে দিয়েছিলেন।
বাবু শুভেন্দুকে তোল্লাই দিতে শুরু করলেন বিজেপর কেন্দ্রীয় নেতারা। ভাবখানা এমন যেন, আমরা সত্তরে আটকে যেতে পারি, কিন্তু প্রতিপক্ষের সুপ্রিমোকে আটকে দিয়েছি যে! অতএব পুরস্কার দিতে হবে জায়ান্ট কিলারকে। বিরোধী দলনেতার পদ দেওয়া হল। আর সেই পদ লাভ করে সাপের পাঁচ পা দেখলেন জায়ান্ট কিলার। রাজ্য সভাপতিকে থাড়াই কেয়ার করলেন। তুলোধোনা করতে লাগলেন শাসকদলকে। চোখা চোখা বিশেষণ, বিদ্রুপের বন্যা, খেউড়ের তরঙ্গ। নিশ্চয়ই ঘোষমশায়ের মতো আদি বিজেপি নেতারা মনে মনে বলেছেন, ‘আরে বাবা, এই তৃণমূল থেকে আসা লোকটা যে আমাদের চেয়ে কট্টর বিজেপি’। শাসকদলের কে কবে গ্রেপ্তার হবেন, কে কত ঘুষ খেয়েছেন, ডিসেম্বরের কোন তারিখে সরকারের পতন হবে, সব তিনি বলে দিতে লাগলেন। কপালে তিলক কাটলেন, খোল বাজালেন, হরিবোল আর জয় শ্রীরাম বলতে লাগলেন। তাঁর সাগরেদরা বলতে লাগলেন, লাগ ভেলকি লাগ।
দল বদলে মাত্র দু-বছরে অসাধ্য সাধন করা যায় কি? লাখ টাকার প্রশ্ন। কি করতে পেরেছেন বাবু শুভেন্দু? ২০২১-এর নির্বাচনে সাফল্য আনতে পারেন নি। সাফল্য আনতে পারেন নি উপনির্বাচন আর পৌরসভার নির্বাচনে। অধিকারী গড় বলে পরিচিত কাঁথির পৌরসভাতেও পড়েছেন মুখ থুবড়ে। তাঁর ‘ডিসেম্বর ধামাকা’ হাসির খোরাক হয়েছে। তবু তিনি হম্বিতম্বি করে চলেছেন। বাবু যত বলে পারিষদদলে বলে তার শতগুণ। মোদিজি, শাহজি তাঁকে খেলতে দিয়েছেন। খেলবেন তিনি আরও দু-তিনটে বছর। সে খেলার সেমি ফাইন্যাল আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচন, ফাইন্যাল আগামী লোকসভা নির্বাচন। তারপরে আমার কথাটি ফুরালো, নটে গাছটি মুড়ালো।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক