জানলার ধারে বসে কখন থেকে পেন কামড়ে যাচ্ছে কাকুলি। দিদিমণির দেওয়া হোমওয়ার্কের এক লাইন রচনাও সে লিখতে পারল না।
হ্যাঁ কাকুলিই। সবাই তাকে এই নামেই ডাকে। সেও বইয়ের, খাতার প্রথম পাতায় আগে বড় বড় করে লিখত কাকুলি দাস। ইংরিজিতে কে,এ, কে, ইউ, এল, আই।
বাংলার চিন্ময়ী দিদিমণি তাকে একবার বলেছিল, কাকুলি লিখিস কেন রে? ওটা ভুল। তোর নাম তো কাকলি। এর অর্থ পাখির ডাক।
কাকুলি মিনমিন করে বলেছিল, সবাই তাই ডাকে ম্যাম।
— না, এবার থেকে আর ‘ক’য়ের তলায় হ্রস্ব ‘উ’ লিখবি না। মেয়েরা শোন, ওকে আর কেউ কাকুলি না, কাকলি বলে ডাকবি।
দিদিমণির নির্দেশে কাকুলির হ্রস্ব ‘উ’ টা ছেঁটে গেল শুধু লিখিত অক্ষরে। বন্ধুদের কাছে অবশ্য তখনো সে অর্থহীন এক নাম! এই নাম শুদ্ধিকরণের ঘটনায় আটান্ন বছরের রাগী দিদিমণি চিন্ময়ী সরকার কোথাও একটা জায়গা করে নিল ভীরু ছাত্রীটির মনে।
চিন্ময়ীর ক্লাস এইটের এই ছাত্রীটি বাংলাটা বেশ ঝরঝরে লেখে। মোটা কাঁচের চশমার আড়ালে কাকলি অবশ্য কোনো তারিফ খুঁজে পায় না দিদিমণির চোখে। শুধু তার খাতায় দিদিমণির লাল কালির খরচ একেবারেই নেই। লেখার শেষে একটা বড় রাইট পেলেই খুশি হয়ে যায় কাকলি।
দিদিমণি যা যা পড়ায়, কাকলি মুগ্ধ হয়ে শোনে। দিদিমণির মুখে কবিতা শুনতেও খুব ভালো লাগে কাকলির। গত সপ্তাহে দিদিমণি পড়িয়েছেন, নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে। কাকলি বৈশাখের এই তপ্ত দিনেও বর্ষার আকাশের সেই ছবিটা চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। বাড়িতে গিয়ে আর তাকে মুখস্থ করতে হয় নি। কবিতাটা মনের মধ্যে গেঁথে গেছে। লুকিয়ে লুকিয়ে সে আজকাল নিজেও কবিতা লেখে। কাউকে দেখায় না। তার ডাইরির পাতাও ভরে থাকে মনের কথায়। সেখানে চিন্ময়ী দিদিমণিও অনেকটা জায়গা জুড়ে আছেন।
গতকাল বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তির কথা পড়াতে পড়াতে কি দিদিমণির গলাটা একটু ধরা ধরা লাগছিল! কে জানে কাকলির মনের ভুল ও হতে পারে। সেই বর্ষার অন্ধকার রাত। দামোদরের উত্তাল স্রোত। বিদ্যাসাগর সব বাধা অতিক্রম করে সাঁতরে পার হচ্ছেন। মনের মধ্যে তীব্র জেদ। মায়ের কাছে তাঁকে যেভাবেই হোক পৌঁছতেই হবে। এই গল্প শুনতে শুনতে কাকলির গায়ে কাঁটা দিল। মায়ের জন্যে কতটা ভালোবাসা থাকলে এমনটি হতে পারে! ভগবতী দেবীও নিশ্চয়ই খুব খুব ভালো বাসতেন ছেলেকে! কাকলির একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। গোটা ক্লাস চুপটি করে শুনছিল সেই মাতৃভক্তির কথা। গল্প শেষ হলে বই বন্ধ করে ম্যাডাম একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, মাতৃভক্তির গল্পতো শুনলি। কাল মাদার্স ডে না? সব্বাই শুভ মাতৃদিবস রচনা লিখে আনবি।
— কি লিখব ম্যাম। প্রিয়াঙ্কা জিজ্ঞেস করল।
— এটাও বলে দিতে হবে? নিজের মায়ের কথা, তার স্নেহ, সংসারের জন্যে তার সারাদিনের পরিশ্রম, চিন্তা…. এই সব লিখবি। মহাপুরুষদের মাতৃভক্তির উদাহরণও দিতে পারিস, যেমন আজ শুনলি। এই তালিকায় বিবেকানন্দ, গান্ধিজী, শিবাজী কত মহাপুরুষ আছেন। এটাই তোদের হোম ওয়ার্ক রইল।
কাকলির কবিতা লেখার মত তার চিন্ময়ী দিদিমণিরও কিছু গোপন কার্যকলাপ আছে। এই যেমন, ক্লাস এইট বি’র খাতা চেক করতে গিয়ে তিনি প্রথমেই কাকলির খাতাটাই খুঁজে বা’র করেন। মনোযোগ দিয়ে তার লেখা পড়েন। যদিও প্রকাশ্যে প্রশংসা করেন না। তাঁর তিরিশ বছরের কর্মজীবনে পক্ষপাতিত্ব ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে নি। অবিবাহিতা, রাশভারী দিদিমণিটি তাঁর সমস্ত আবেগ চিরদিনই বড় নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই বান্ডিলে কাকলির খাতা তিনি পেলেন না। অথচ ক্লাসে তো আজ সে ছিল। বাধ্য, বিনয়ী মেয়েটিতো কখনো এরকম করে না। কে জানে, খাতাটা হারিয়ে গেল নাকি? কাল ক্লাসে একবার জিজ্ঞেস করতে হবে।
ছুটির ঘন্টা বাজল। চিন্ময়ী ধীরে ধীরে ব্যাগ গুছিয়ে, শাড়ি ঠিক করে কমনরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। স্কুলের গেট থেকে বেরিয়েই ডান দিকে একটা প্রকান্ড বটগাছ ডালপালা মেলে ছড়িয়ে আছে। শিকড়গুলো গেঁথে গেছে মাটিতে। কত পশুপাখিকে আশ্রয় দিয়েছে গাছটা। কতদিনের পুরনো গাছ কেউ সে কথা জানে না!
মেয়েদের কলকলানিতে বটগাছতলাটা মুখর হয়ে আছে! পাঁচছঘন্টা একটানা এই গরমে ইস্কুলে বন্দি থাকার পর স্বভাবতই মেয়েরা মুক্ত হাওয়ায় যেন পাখা মেলেছে। ইউনিফর্ম পরা মেয়েদের হৈ হৈ আর ভীড়ে আলাদা করে কাউকে চিনে নেওয়া যায় না। চিন্ময়ীর চোখ কাকলিকে খুঁজছিল। ডাকব কি ডাকব না ভাবতে ভাবতে কাকলিকে ডেকেই ফেললেন।
— এদিকে একবার আয় কাকলি। কি হল, তুই আজ হোমওয়ার্কের খাতা জমা দিস নি।
— না ম্যাডাম।
— কেন, আমি তো কাল বলে দিলাম যে।
— আমি কি লিখব, বুঝতে পারছিলাম না ম্যাডাম।
— মানে, তোর মায়ের কথা লিখবি। একথা বলেই চিন্ময়ীর কেমন খটকা লাগল। মেয়েটা বয়স আন্দাজে বড় চুপচাপ। কিশোরীর চাঞ্চল্য, উচ্ছ্বাস সবই প্রায় অনুপস্থিত ওর মধ্যে। কিছু ব্যাপার আছে কি? রাশভারী চিন্ময়ী ম্যাডাম একটু যেন নরম হলেন,
— কেন তোর মা নেই?
কাকলির মুখ নিচু। কন্ঠস্বর প্রায় শোনাই যাচ্ছে না।
— আছে। আমি দেখিনি। আমার মনে নেই।
— সে আবার কি?
— মা আবার বিয়ে করেছে। নতুন বাবা আমাকে নেয় নি।
— আর তোর নিজের বাবা?
— জানি না। বাবাও আমার খোঁজ নেয় না।
— সে কি, তুই তবে কোথায় থাকিস? কে বড় করল তোকে?
— মামারবাড়িতে থাকি ম্যাম। দীদা খুব ভালোবাসত আমায়। দীদাও আর নেই। দু-বছর হল মারা গেছে।
কান্নায় ভেঙে পড়ল কাকলি।
আহারে এত কষ্ট, এত অবহেলা নিয়ে বড় হচ্ছে মেয়েটা! আমরা এদের মনের কোনো খবর রাখি না! এমন শুষ্ক, কঠিন দিদিমণি হয়ে কি করলাম সারাটা জীবন! এই শিক্ষার সঙ্গে জীবনের তো কোনো যোগ নেই!
সরলাদেবী বালিকা বিদ্যালয়ের দিদিমণিরা, ছাত্রীরা দেখল বটগাছের তলায় রাশভারী চিন্ময়ী দিদিমণি কাকলি বলে রোগা মত মেয়েটাকে কে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। তারা অবাক হল। দিদিমণি কেন কাঁদছেন কিছুই বুঝতে পারল না।
বৈশাখের সূর্য সারাদিন ধরে আগুন ঝরিয়ে বিকেলের দিকে এখন একটু নরম হয়েছে। বটগাছের ঘন ডালপালা,পাতার ফাঁক দিয়ে সেই নরম আলো এসে পড়েছে চিন্ময়ী দিদিমণি আর কাকলির মুখে। সে আলোয় দুজনের মুখ কি উদ্ভাসিত, উজ্জ্বল!
আহা রে কাকলি। তবু ওর মনের খবর রাগী চিন্ময়ী দিদিমণির কাছে প্রকাশ পেল। সুন্দর গল্প।