শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য কর্ণাটক রাজ্যের বেঙ্গালুরুর এক নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অফ স্কলার্স ‘থেকে ২০২১ সালের ‘বেস্ট টিচার অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন জঙ্গলমহলের শিক্ষক সুব্রত মহাপাত্র। সুব্রতবাবু ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুর দু-নম্বর ব্লকের বেলিয়াবেড়া কৃষ্ণচন্দ্র স্মৃতি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক। প্রতিবছর ‘ইনস্টিটিউট অফ স্কলার্স’ শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৪ সাল থেকে বেস্ট টিচার অ্যাওয়ার্ড এই সম্মাননা চালু করেছে। ২০২১ সালে ঝাড়গ্রাম জেলা থেকে এই প্রথম কোনও এক শিক্ষক এই সম্মাননা পেলেন। কিছুদিন আগে সুব্রতবাবু ওই নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডাকযোগে চিঠি পান। ওই চিঠিতে জানতে পারেন তিনি এই সম্মাননা পেতে চলেছেন। চিঠি পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে সুব্রতবাবুর কাছে পৌঁছায় একটি মানপত্র, সুদৃশ্য মেমেন্টো এবং একটি ফোল্ডার।
সারা ভারতবর্ষ জুড়ে বাছাই করা প্রায় ১০০ জন শিক্ষককে এই সম্মাননা প্রদান করে বেঙ্গালুরুর ওই নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জঙ্গলমহলে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে সুব্রতবাবুর অবদানকে কুর্নিশ জানিয়ে ‘বেস্ট টিচার অ্যাওয়ার্ড ২০২১’ প্রদান করা হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে’ উৎকর্ষতার’ জন্য এই এই সম্মাননা প্রদান করে থাকে। এ বছর কোভিড পরিস্থিতির জন্য ভার্চুয়াল সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে মূলত তিনটি অবদানের জন্য সুব্রতবাবু কে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়— ১) বাল্য বিবাহ রোধে পঞ্চম ও একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির সময় মেয়েদের অভিবাবকদের ‘মুচলেকা বা অঙ্গীকার পত্র’ বাধ্যতামূলক প্রদান। ‘১৮ বছরের আগে আমার কন্যার বিবাহ দেবো না এবং তাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ প্রদান করিব’ -এই ছিল মুচলেকার সারমর্ম। এই উদ্যোগ ছিল সম্পূর্ণ সুব্রত বাবুর মস্তিষ্ক প্রসূত। উনি ২০১৭ সাল থেকে উনার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চালু করেছেন এই অভিনব উদ্যোগ। ঝাড়গ্রাম জেলায় তিনি সর্বপ্রথম বাল্য বিবাহ রোধে এই ব্যবস্থা নিয়েছেন যা সরকারী স্তরে বহুল প্রশংসিত হয়েছে এবং রোল মডেল হিসেবে জেলার সমস্ত স্কুলে চালু করার জন্য জেলা শিক্ষা দফতর ভাবনা চিন্তা করেছেন।

২) গোপীবল্লভপুর-২ নম্বর ব্লকে সরকারী ডিগ্রি কলেজ স্থাপনের অন্যতম উদ্যোক্তা সুব্রতবাবু। আদিবাসী অধ্যুষিত ব্লকের অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীর পড়াশুনো স্কুলের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল কারণ ওই ব্লকে কোনও ডিগ্রি কলেজ ছিল না। প্রায় ২০/২৫ কিমি দূরে গিয়ে কলেজে পড়াশুনোর জন্য খরচ জোগানোর অবস্থা পড়ুয়াদের অভিবাবকদের ছিল না। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকার কারণে অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। এই অকালে ঝরে যাওয়া স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেন একক লড়াই। ২০১২ তে উচ্চ শিক্ষার জন্য যে লড়াই শুরু করেছিলেন তার জয় এল ২০১৪ তে। সরকার ঘোষণা করলেন বেলিয়াবেড়াতেই সরকারী ডিগ্রি কলেজ স্থাপনের কথা। সুব্রতবাবুর এই প্রচেষ্টা কে ওই ব্লকের আপামর জনসাধারণ কুর্ণিশ জানিয়েছেন।
এছাড়া ও তিন তিনটে নাবালিকার বিয়ে আটকে (পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে) পুনরায় স্কুলের আঙিনায় ফিরিয়ে আনতে পেরে ছিলেন এই মাষ্টারমশাই।
জঙ্গলমহলের এক পিছিয়ে পড়া ব্লকের শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে সুব্রতবাবুর এই প্রচেষ্টা কে কুর্ণিশ জানিয়েছেন ‘ইনস্টিটিউট অফ স্কলার্স।’ গতবছর সুব্রতবাবু ‘ইন্ডিয়ান সলিডারিটি কাউন্সিল’ (দিল্লি) থেকে ভারতরত্ন ড. এ .পি .জে. আবদুল কালাম নামাঙ্কিত ‘টিচিং এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিলেন।
পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতিতে শ্রদ্ধেয় মাষ্টারমশাই জানান— যে কোন সম্মাননা-ই গর্বের। এই সম্মাননা আমাকে আরো নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।