১৯০০ খ্রিস্টাব্দ।। ২৫ ফেব্রুয়ারি। ভোরবেলা সূর্য ফুটতে না ফুটতে ঘোষ বাড়িতে শাঁখ বেজে উঠল। শিশুকন্যার জন্ম দিয়েছেন মাধবীলতা দেবী। পাঁচ-পাঁচটি পুত্রসন্তানের পর এই কন্যার আগমনে সবাই খুশি। আদর করে মাধবীলতার কন্যার নাম দেওয়া হল তরুলতা। পাঁচ দাদার পর এই বোন বাড়ির সবার অতি প্রিয়। তরুর মুখেভাত, তরুর প্রথম হাঁটা, তরুর প্রথম কথা বলা, আধো আধো কণ্ঠে ‘দা…দা…’ প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়িতে উৎসবের আবহাওয়া। পাঁচ দাদা তরুকে কোলে-পিঠে করেই মানুষ করতে থাকে। পাঁচ বছর পর্যন্ত তরু দাদাদের সুপারিশ ও তালিমে নানারকম খেলায়, গাছে চড়ায়, গুলতি নিয়ে খেলায় পারদর্শী হয়ে উঠতে থাকে। মাধবীলতা আবার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ায় তরু যেন আরও বারমুখী হয়ে পড়ে। কোথায় বাড়িতে বসে পুতুল খেলবে, রান্নাবাটি নিয়ে নাড়াচাড়া করবে, তা নয় সারাদিনই দাদাদের সঙ্গে বাইরে বাইরে ঘোরা। গ্রামের মাতব্বর, অভিজ্ঞ মানুষেরা প্রায়ই তরুর বাবাকে পরামর্শ দিতেন ওর বিয়ে দিয়ে দেওয়ার। সে সময় রেওয়াজই ছিল গৌরীদান করে বিয়ে দেওয়ার। কিন্তু বড়োদা শিবদাসের তাতে আপত্তি। কিছুতেই সে মানতে রাজি নয় ছোট্ট বোনের বিয়ে হয়ে যাবে। তরুর যখন ছয় বছর বয়স সে সময় ১৬ বছরের শিবদাসের বিয়ে দিয়ে দিলেন ওর বাবা বছর সাতেকের উমার সঙ্গে। নদীর ওপারের গাঁয়ের মেয়ে উমা। বিয়ের পর উমা ওপারেই রয়ে গেল বাপের বাড়িতে। সপ্তাহে দু-দিন সে আসত শ্বশুরবাড়ি। তরুর সঙ্গে খেলতে। কিন্তু ছোট্ট তরুর উমার রান্নাবাটিতে মন নেই, সে তো তার উপরের দুই দাদা কালীদাস ও দুর্গাদাসের ন্যাওটা। তাদের সঙ্গেই খেলে চলেছে। এবার আর অপেক্ষা করতে নারাজ শশধরবাবু, তরুর বাবা। নদীর ওপারের গাঁয়ের মিত্তিরদের বাড়ির ছেলে ১৩ বছরের কুলদারঞ্জনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল তরুর। তরু তখন মাত্র সাত। শিবদাস আপত্তি করতে অপারগ। কিন্তু বিয়ের পর পর শিবদাসের কথায় তরুও থেকে গেল বাপের বাড়িতে। উল্টে যেমন উমা আসত এ পারে, কুলদাও সপ্তাহে দু-তিন দিন চলে আসত তরুর বাড়ি নদী পার হয়ে। বছর তেরোর কুলদার সঙ্গে ১৪ বছরের শালা শ্যামদাসের ভাবের অন্ত নেই। আর এদিকে তরু খেলছে কালী ও দুর্গা, দুই দাদার সঙ্গে। মাঝে মাঝে সবাই মিলে আম, পেয়ারা পাড়তেও বেরিয়ে যেত। ছোটো তরুর আবার মাঝেমধ্যে কুলদার কোলেও ঘুরতে হতো। জীবনটা ভালোই চলছিল। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতে কুলদাকেও পাঠানো হলো শহরে। এদিকে তরুকে মা ও জেঠি ধরেবেঁধে বাড়ির কাজ, আলপনা দেওয়া, ঘর নিকোনো, পুজোর ঘরের কাজ শেখাতে শুরু করেন। তরুর বয়ঃসন্ধির সময় এসে গেলেই, ডাক এলো নদীর ওপারে শ্বশুরবাড়ি থেকে। মাত্র ১২ বছরের তরু চলে গেল শ্বশুরবাড়ি, কুলদার ঘর করতে। বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেই তরুর কোল আলো করে এলো তাঁর কন্যাসন্তান যূথিকা। যূথিকার পর বছর দুয়েকের মধ্যেই তরুর কোলে এলো অজয়। তার বছর খানেকের মধ্যেই কুলদা চাকরি পেলো শিলং-এ। সরকারি চাকরি। চলে গেলো সেখানে। সেখানে একা থাকতে গিয়ে তাঁর ত্রাহি ত্রাহি রব। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর ষোড়শী তরু তাঁর দুই সন্তানসহ চলে গেল কুলদার কর্মক্ষেত্র শিলং-এ। তরু ততদিনে কাজেকর্মে, বিশেষত ঘরোয়া কাজে পটু হয়ে উঠেছে। যেহেতু ছোটো বয়স থেকেই বাইরে বাইরে দাদাদের সঙ্গে খেলা ও নানাভাবে তাদের কাছেই মানুষ হয়েছিল সে, তাই অল্প বর্ণপরিচয় তার ছিলই। শিলং নতুন শহর। একেবারে বাংলার শস্যশ্যামলা গ্রাম থেকে নৈসর্গিক শিলং। ঠান্ডা আবহাওয়া, ভাষা, পরিবেশ সব আলাদা। কিন্তু তরু তারই মধ্যে খুঁজে পায় এক ব্রাহ্ম মহিলাকে যিনি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের শিক্ষিত করার প্রয়াস চালাচ্ছেন সুদুর শিলঙে। মহিলা সমিতিতে যোগ দেয় তরু। বাচ্চা নিয়েই চলে যেত দুপুর বেলা, আরও ২০-২৫ জনের সঙ্গে বসে বাংলা, ইংরেজি অক্ষরজ্ঞান বৃদ্ধি থেকে শুরু করে গান, সেলাই, রান্না, সন্তানপালন সব কিছু নিয়ে চলতো আলোচনা। এই সমিতির মেয়েরাই হয়ে ওঠে একে অপরের সহায়ক। প্রায় বিশ বছর শিলঙে কাটান তরু। এরই মধ্যে জন্ম দেন আরও দশটি সন্তানের।
প্রথমা কন্যা বেলার তখন ১৪ বছর বয়স। বেলা সবেমাত্র ম্যাট্রিক পাশ দিয়েছে। কারণ তরু নিজে ইস্কুলে না পড়লেও ওঁর প্রতিটি সন্তান, পুত্র-কন্যা নির্বিশেষে সবাই হয়ে ওঠে শিক্ষিত। বেলা শুধু পড়াশোনায়ই পারদর্শী নয়, ওর গানের গলাও অসাধারণ। এই সময় শান্তিনিকেতন থেকে সদ্য পাশ করা এক ব্রাহ্ম যুবক শচীন শিলং-এ আসেন ছেলেদের ইস্কুলে পড়াতে। খুবই উচ্চশিক্ষিত ছিলেন শচীন, কিন্তু বড়ো কোনও তেমন চাকরি পাননি। শচীন তবলাও যেমন বাজাতেন, গানের গলাও ভালো। রবিঠাকুরের গান শুধু নয়, দ্বিজেন্দ্রগীতি, রজনীকান্তর গান বা অন্যান্য ব্রহ্মসংগিতে অসম্ভব পটু। দেখতেও সুপুরুষ। গানবাজনার অনুশীলনের মধ্যেই বেলা ও শচীনের আলাপ। শচীন তখন ২৬, বেলা ১৪। এই সময় জন্ম হয় তরুর অষ্টম সন্তানের। ম্যাট্রিকে ভালো ফল করে নাম করে বেলা। ও আরও পড়তে চায়। কিন্তু কুলদা মেয়ের বিয়ে দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন। ইতিমধ্যে শচীন ও বেলার মধ্যে মন দেওয়া-নেওয়ার পালা শুরু হয়ে গেছে। শচীনের অপেক্ষা কলকাতায় বা কোনও বড়ো শহরে একটি ভালো চাকরির। ওঁর বাবা নেই, দুই বোন-সমেত মায়ের দায়িত্ব ওঁর। শচীনের বোনেরা কলকাতায় পড়েন। একজন ১৮, অন্যজনের বয়স ২০। বড়ো বোনের বিয়ের কথা চলছে। যেহেতু ওঁরা ব্রাহ্ম, তাই সমাজের সাহায্যেই মেয়েদের পাত্রস্থ করার চেষ্টা চলে। শচীনকে ভালোবেসে ফেলে বেলা। কিন্তু শচীনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধায় নানা বিপত্তি। এক, শচীনের চাকরি নেই তেমন। দুই, শচীনের বাবা নেই। তিন, শচীন ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত ও বেলা হিন্দু। কুলদাবাবু মেয়ের জন্য পাত্র দেখতে চলে গেলেন কলকাতা। এই সময় শচীনেরও একটি ভালো চাকরির খবর এলো। ময়মনসিংহে একটি কটন ফ্যাক্টরিতে। ময়মনসিংহ যাওয়ার আগে কলকাতায় যাবে শচীন কারণ বড়ো বোনের বিয়েও ঠিক হয়েছে। বেলা কী করবে? ঠিক যেদিন শচীন চলে যাবে, তার আগের দিন অনুষ্ঠিত হলো বিলেতি কায়দায় ‘ফেয়ারওয়েল’ পার্টি। তাতে সবাই গান গাইল। বেলাও গাইল। আর গানের মধ্যেই রইল তার আকুতি…’আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা/আমি যে পথ চিনি না/আজ হতে তুমি হৃদয়ের রাজা/তোমাকে আমি করিব পূজা…’।
পরদিন সকাল থেকেই বেলা নিখোঁজ। সেই যে শচীনের হাত ধরে ১৫ বছরের বেলা পালিয়ে যায়, তাই ওর বাবা-মা আর ওর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতে নারাজ। যে সময় এই ঘটনা ঘটছে, তখন ভারত পরাধীন, তাও কিছু কিছু আইন হয়েছে। যেমন বিয়ে রেজিস্ট্রি আবশ্যক। তাই শচীন ও বেলার ব্রাহ্মমতে বিয়েও রেজিস্ট্রি হয়। এদিকে বেলা ভর্তি হয় আই.এ. ক্লাসে। দু-বছর পর আই.এ. পাশ করে যখন, তখন তার বয়স ১৮ ছুঁই ছুঁই। বাবা-মা-র সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর বেলার যোগাযোগ ছিল ওর বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে। সেই বড়ো ভাই অজয়ই জানায়, ও পালিয়ে যাওয়ার পর বাবাকে গ্রামের আত্মীয়স্বজন বার বার বলেছিলেন তাঁর অন্য মেয়েদের না পড়াতে ও দশের কোঠায় বিয়ে দিয়ে দিতে। কিন্তু মা ও তাঁর মহিলা সমিতি এটা মানতে নারাজ ছিল। বরং উল্টে মা মেজো বোনকে বি.এ. পড়াবেন ঠিক করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর অন্যান্য সন্তানও হয়ে ওঠে উচ্চশিক্ষিত।
বেলার বিবাহিত জীবন শুরু হয় নানাবিধ বিপত্তির মধ্যে, কিন্তু যেহেতু ও নিজে শিক্ষিত এবং ওর স্বামীও ছিলেন শিক্ষিত, দুজনে সংসার শুরু করে সুষ্ঠুভাবে। শচীন অপেক্ষা করেছিলেন বেলার আই.এ. পাশ পর্যন্ত। এরপরই বেলার গর্ভে সন্তান আসে। বেলা মা হয় যখন তার বয়স ১৮। কন্যাসন্তান, তার নাম রাখা হয় শ্রী। সুন্দর ফুটফুটে শ্রী বাবা-মা, ঠাকুমার আদরে বড়ো হতে থাকে। একেবারে ছোটো থেকেই বেলা নানারকম ছড়া বলে, গান গেয়ে মেয়েকে ঘুম পাড়াতেন, স্নান করাতেন, খাওয়াতেন। শ্রী-র বছর তিনেক বয়সে জন্মায় ওর ভাই শোভন। সেই শোভনকে মা যখন ঘুম পাড়াতেন, শ্রী-ও আধো আধো গলায় গান গাইত। ভাইকে ছড়া শোনাতো শ্রী। সে সময় শচীনের কর্মসূত্রে তারা রয়েছে ময়মনসিংহে। শ্রী-র পাঁচ বছর বয়সে সে স্কুলে ভর্তি হয়। দু-বছর স্কুলে পড়ার পরই বাবার চাকরি সূত্রে তাদের চলে যেতে হয় উত্তর ভারতে। স্কুলে ছেদ পড়ে। কানপুর শহরে পৌঁছে ইস্কুল খুঁজে পেতেই কেটে যায় মাস দুয়েক। কিন্তু শ্রী-র পড়াশোনা বন্ধ থাকে না। মা বেলা তাকে বাড়িতেই পড়াতে থাকেন। আর মাস দুয়েক পরে শ্রী যখন স্কুলে ভর্তি হয়, ওকে দুই ক্লাস উঁচুতে নেওয়া হয়। এরপর শাজাহানপুর, লখনউ, আবার বেহালা, খড়দহ, শাজাহানপুর ঘোরে বেলা ও তাঁর পরিবার। শেষমেষ মাত্র ১৩ বছর বয়সে শ্রী ম্যাট্রিক উত্তীর্ণ হয়, প্রায় ১০টি আলাদা স্কুলে পড়ে। কোথাও এক বছর, কোথাও-বা দু-তিন মাস। ম্যাট্রিক-এ ভালো ফলের মূলে ছিল তার মা ও বাবার কৃতিত্ব। তাঁরা বাড়িতেও শ্রীকে সাহায্য করেন। ম্যাট্রিক পাশের পর শ্রী ঠিক করে কলকাতায় পড়বে। ভর্তি হয় স্কটিশ চার্চ কলেজে। এমনকী হস্টেলেও জায়গা পেয়ে যায় শ্রী । শচীনের শত আর্থিক সমস্যা সত্ত্বেও তিনি মেয়ের শিক্ষার জন্য কার্পণ্য করেন না। এমনকী মা বেলাও অস্থায়ী কাজ শুরু করেন পোস্ট অফিসে। তখন সবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ। দেশ তখন উত্তাল। স্বাধীনতার জন্য সবাই ব্যাকুল। শ্রী-র বাবা-মা-ভাই তখন কানপুরে। শ্রী কলকাতায়। ওর পিসতুতো দিদির সঙ্গে একদিন শ্রী পৌঁছে যায় তার মামাবাড়ি। যাঁরা কলকাতায় এখন স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেছেন। বছর পাঁচেক হলো শিলং ছেড়ে কুলদা ও পরিবার কলকাতা নিবাসী। জীবনে প্রথম মামাবাড়ি এলো ফুটফুটে শ্রী। তার বাক্পটুতা ও ঔজ্জ্বল্য মুগ্ধ করল মামা, মাসি, দাদু-দিদাকে। মায়ের সঙ্গে তাঁর বাপের বাড়ির পুনর্মিলন ঘটালো বছর চোদ্দোর শ্রী। আই.এ. পাশ দিয়ে বি.এস.সি. পড়ল সে। মেজোমামার সাহায্যে নিল ফিজিক্স অনার্স। আর এই সময় মেজোমামার এক ব্রাহ্ম বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হলো শ্রী-র। শ্রী-র বি.এস.সি. অনার্স পরীক্ষার ফাইনাল হয়ে গেল। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর আগেই মেজোমামার বন্ধু ইন্দুশেখর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলো শ্রীকে। বড়োলোকের ছেলে ইন্দুশেখরের বাড়িতে আপত্তি থাকলেও, ইন্দু বিয়ে করলো অষ্টাদশী শ্রীকে, শচীন ও বেলার মত নিয়েই। শ্রী চলে এলো কলকাতার সাহেব পাড়ার শ্বশুরবাড়িতে। এই প্রথম সে এসে ঢুকল এমন বাড়িতে যেখানে বাঙালি ভাই-বোনেরা, বন্ধু-বান্ধবেরা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলে। বি.এস.সি. পাশ হলেও, ইংরেজি ভাষা লিখতে-পড়তে জানলেও, বিদেশি ভাষায় ততটা বাক্পটু ছিল না শ্রী। কিন্তু যেহেতু শিক্ষার আলো সে দেখেছে, তাই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই শ্রী-ও ইংরিজিতে অনর্গল কথা বলে চলে। শ্রী-র প্রথম সন্তান লীনা জন্মায় যখন তাঁর বয়স ২১। পরের জন জন্মায় বছর সাতেক বাদে। কন্যাসন্তান সুপ্রিয়া। তার বছর দুয়েক পর আসে সুবীর। তিন সন্তান নিয়ে শ্রী-র জীবন। প্রত্যেকেই লেখাপড়া, খেলাধুলো, ডিবেট, কবিতা সবেতেই পটু। আর শ্রী নিজে চাকরি না করলেও তাঁর তিন সন্তানকে নিজে পড়ান। তারা টিউশন নেয় কেবলমাত্র উচ্চ-মাধ্যমিকের আগে। নয়তো মার কাছেই তিন সন্তানের লেখাপড়ার তালিম চলে।
শ্রী-র তিন সন্তানের মধ্যে দুই কন্যারই বিয়ে হয় ২১ বছর বয়সের পর, তাঁদেরও সন্তান হয়। তাঁরা বড়ো হয়, পড়াশোনা চলে। দুই কন্যাও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন স্ব-স্ব ক্ষেত্রে। আর আজ সেই শ্রী-র নাতনির বিয়ে। তিনি এখন আইটি প্রফেশনাল। ভালো মাইনে পান, নিজের পায়ে প্রতিষ্ঠিত। বাড়ি, গাড়ি সব নিজেই কিনেছেন।
এই যা লিখলাম এতক্ষণ, এটা সত্য ঘটনা। নিছক কল্পনাপ্রসূত গল্প নয়। বাল্যবিবাহ বা অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়াটা আমাদের সমাজে একসময় চলত। কিন্তু শিক্ষার আলো পড়ায় ও আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বাল্যবিবাহ কোনও মেয়ে বা ছেলের পক্ষে কাম্য নয়। উপরোক্ত কাহিনিটি একটি সামাজিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের দলিল। কন্যাসন্তানকে শিক্ষিত করা ও তাকে ঠিক সময়মতো স্বেচ্ছায় বিয়ে দিলে সামাজিক উন্নয়নই হয়। যে কোনও নারী বা পুরুষ উভয়েরই প্রয়োজন সঠিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশ। বিয়ের আগে নিজেকে সুগঠিত করা খুবই প্রয়োজন। বাল্যবিবাহ রোধে এই শিক্ষার প্রসারই সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার। আজ ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মেয়ে নিজের সামাজিক মূল্যায়ন করতে সক্ষম। শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে নয়, সমাজ গঠনেও তারা আগুয়ান হয়েছে। এবং এভাবেই আমরা একদিন নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ও বাল্যবিবাহ রোধে কামিয়াব হবোই। কারণ একজন পুরুষকে শিক্ষিত করা মানে ‘একজন মানুষ শিক্ষিত হওয়া’, কিন্তু একজন নারীকে শিক্ষিত করা মানে ‘একটি পরিবার শিক্ষিত হওয়া’। আর সেই পরিবারই সমাজকে উন্নত করতে সাহায্য করবে।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৮ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত