উপনির্বাচনে চারটি বিধানসভার ফলাফলে স্পষ্ট হল ত্রিপুরায় ২০২৩ বিধানসভার নির্বাচনের ছক। চার আসনের মধ্যে একটি, ছয় আগরতলায় সুদীপ রায় বর্মনের জয়ে কম্পিত বিজেপির রাজনীতি। তিন আসন জিতলেও বিজেপির শীর্ষ মহলকে হতাশা ঘিরে ধরেছে। কারন ২০১৮-এর তুলনায় ভোট কমেছে শাসক দলের। চার কেন্দ্রের একটিতে হাজার ভোট বাড়লেও বাকি তিনটিতে ভোট কমেছে ২২ হাজারের বেশি। শাসনের ৫২ মাসের এই অধোগতিতে দলের সর্বস্তরে হতাশা তৈরি হয়েছে। ২০২৩ বিধানসভার এই সেমি ফাইনালে দেখা গেল দ্বিতীয় শক্তি সিপিএম কী ভাবে তৃতীয় শক্তি বনে গেল দলের আভ্যন্তরীন কলহে। যুবরাজনগরে দলের অপ্রত্যাশিত এই শোচনীয় পরিনতি ২০২৩ সালে দলকে ব্যাকফুটে রাখবে লড়াইয়ের ময়দানে। আর ভোটভাগের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস যে হাতে পেন্সিল নিয়ে ফিরবে তা আগেই টের পাওয়া গিয়েছিল। তীব্র সন্ত্রাসের মধ্যেও পুর নিগম নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এই রাজ্যে ২২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এই ভোটে সব আসনেই তাঁদের জামানত গেছে, সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে যুবরাজনগর কেন্দ্রে, ১৪৪০ খানা।
সুদীপ রায় বর্মন বিজেপি ছেড়ে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই এই রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রয়োজনীয়তা যে অনেকটা ফুরিয়ে যাবে তা বোঝা যায়। কারন পুর, নগর নির্বাচনের সময়ে সুদীপের অনুগামীরাই বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূল সেজে বিজেপিকে বোকা বানানোর চেষ্টা করেছিল। সুদীপ বর্মন বিজেপি ছেড়ে আসার পর তাঁর অনুগামীদেরও তৃণমূল সেজে থাকা অর্থহীন তা বলাই বাহুল্য। সেই দিক থেকে আগরতলা কেন্দ্রে বিজেপির বিরুদ্ধে সুদীপ রায় বর্মনের জয় প্রথম থেকেই স্পষ্ট হচ্ছিল। ফলাফলে দেখা গেল আগরতলা কেন্দ্রে ২০১৮ সালের বিজেপি প্রার্থী সুদীপ রায় বর্মনের তুলনায় কংগ্রেসের প্রার্থী সুদীপ রায় বর্মনের বিরুদ্ধে বিজেপির ডা. অশোক সিনহা প্রায় ১১ হাজার ভোট কম পেলেন। রাজনৈতিক ভাবে এই উপনির্বাচনে সুদীপ রায় বর্মনের অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক ইমেজ আবার স্পষ্ট হল।
রাজনৈতিক জীবনে খাদের কিনারায় চলে আসা সুদীপ রায় বর্মনের রাজনৈতিক ইনিংস এখানেই শেষ হল বলে অনেক রাজনৈতিক পন্ডিত পুর্বাভাস দিয়েছিলেন ভোটের আগে। সুদীপ বোঝালেন তিনি সবাইকে ভুল প্রতিপন্ন করাতে জানেন। দীর্ঘ ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক জীবনে যাদের ভক্ত, অনুগামী বলে কাছে টেনে এনেছিলেন সুদীপ রায় বর্মন, আজ তারা কেউ পাশে নেই। সবাই-ই প্রতিপক্ষে। প্রধান অনুগামী রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য সুশান্ত চৌধুরীর উপস্থিতিতেই তাঁকে আক্রান্ত হতে হয় সরব প্রচার শেষ হবার এক দিন আগে। ভোটের ফলাফলে বুঝা গেল আগরতলা কেন্দ্রের মানুষ সুদীপের ওপর আক্রমনের মোক্ষম জবাব দিলেন। বিজেপি এই ঘটনাকে অবশ্য সিপিএমের ভোট ট্রান্সফার বা নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গের সামিল বলেছে। নিজের ইমেজ বা পরিচিতি সামনে রেখে দল নির্বিশেষে সব অংশের মানুষের ভোট পায় যারা, রাজনীতিতে কি তাদেরই জননেতা বলে?
এই ভোটে ভিন্ন সুদীপ বর্মনকে দেখলেন ত্রিপুরার মানুষ। আর তাঁর মধ্যেই দেখতে পাচ্ছেন কংগ্রেসের পুনুরুত্থান। ২০১৮ সালে সুদীপ বর্মনদের হাত ধরেই উজাড় হয়েছিল কংগ্রেসের ৩০, ৩২ শতাংশ ভোট। সবই গেছে বিজেপিতে। বিধানসভায় কংগ্রেস হয়েছিল বিধায়কহীন। আবার এই পাঁচ বছরের মেয়াদেই কংগ্রেস সুদীপকে বিধানসভায় একমাত্র বিধায়ক পেল। রাজনীতির এই ভবিতব্যে রাজ্যের মানুষ দেখলেন আর এক অবাক কান্ড। সিপিআইএম-এর অন্তর্দ্বন্দে সিপিআইএম-এর গড় বলে পরিচিত যুবরাজনগর গেল বিজেপির হাতে। সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক বা সম্পাদক মন্ডলী এতোটাই হতভম্ব যে গননা শেষে তারা সাংবাদিক সম্মেলন করলেন না। যুবরাজনগরের পরাজয়ের পর্যালোচনা করছে সিপিআইএম। ঝোলা থেকে বেড়িয়ে আসছে বিড়াল। তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ দল। বাদ যাচ্ছেন না মানিক সরকার নিজেও। বলা হচ্ছে দলের সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত জিতেন্দ্র চৌধুরী যেহেতু দলে মানিক সরকারের প্রতিপক্ষ তাই তাঁকে সাইজ করে ২০২৩-এ আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের রাশ নিজের হাতে রাখতে চেয়ে যুবরাজনগরে দলের প্রার্থীপদ প্রত্যাশী সুকেশ দেবনাথকে কাজে লাগিয়েছে দলীয় প্রার্থীকে হারানোর জন্য।
এই ঘটনার সত্যাসত্য প্রশ্নাতীত নয়। তবে নিজেদের শক্ত ঘাটিতে দলের শোচনীয় পরাজয়ে দলীয় কর্মীদের মনোবল অনেকটাই কমে গেল বিধানসভা নির্বাচনের মুখে তা বলাই বাহুল্য। দলের মধ্যেই বলাবলি শুরু হয়েছে ত্রিপুরা সিপিআইএমও কি তাহলে পশ্চিমবঙ্গ সিপিআইএম-এর মতোই পশ্চিমাকাশে অস্তাচলে? তাহলে সিপিআইএম কি এবার সুদীপ বাবুদের কংগ্রেসের হাতই ধরবে আগামী বিধানসভার ভোটে? ভোটে জিতে প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে সুদীপ বাবু শাসক দলের সন্ত্রাসী বিজয়োল্লাস নিয়ে কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, এইভাবে চলতে পারে না। ফ্যাসিজম মানবো না। গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে কী কী করনীয় এই সম্পর্কে পন্থা পদ্ধতি বের করতে বিরোধী সব দলের বৈঠক চাইবেন তিনি। দলীয় পর্যায়ে না হলে বিধায়ক হিসাবেও চাইতে পারেন।
এই ধরনের বৈঠককে নির্বাচনী জোট গড়ার বৈঠক এখনই বলা যাবে না হয়তো। সুদীপ বাবুও তাই বললেন। তবে শাসক বিজেপিকে প্রতিহত করতে কংগ্রেস সিপিআইএম যে এখন অনেকটাই কাছাকাছি তা তাঁদের কথাবার্তা, চলন বলনে স্পষ্ট। তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় কংগ্রেস সিপিআইএম-এ জোট অবশ্যম্ভাবী? প্রকাশ্যে না হলেও অপ্রকাশ্যে কিন্তু সম্ভব। বিজেপির রাজ্য নেতারা, এমনকি রাজ্য সম্পাদক তথা মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহাও দুই দলের গোপন বোঝাবুঝি বোঝাতে গিয়ে ‘মিতালি’ শব্দের ব্যবহার করলেন বারবার। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ফ্যাক্টর হবে তিপ্রা মথা। পাহাড়ের ২০টি উপজাতি সংরক্ষিত আসনের বাইরে মথা সাধারন আসনেও প্রার্থী দেওয়ার ঘোষনা দিলে তপশিল জাতি সংরক্ষিত সুরমা আসনে মথার প্রার্থীকে সরাসরি সমর্থন দিয়ে দেয় কংগ্রেস। ধরে নেওয়া গিয়েছিল ২৪ শতাংশ উপজাতি ভোটের এই আসনে মথা জিতে যাবে। সে রকম কৌশল ছিল। তারা একজন ঝাড়খন্ডি চা শ্রমিককে প্রার্থী করে এই আসনে, যাদের যাতায়াত উপজাতি বাঙ্গালী সবার মধ্যেই সমান।
কিন্তু ভোট যত এগিয়ে আসে মথাকে নিস্তেজ হতে দেখা গেল। দলের নেতা বুবাগ্রা প্রদ্যুত কিশোর এলাকায় প্রচারে গেলেও এর পর তাঁকে আর পাওয়া যায় নি। অসুস্থতার কারনে শিলং-এর বাড়িতে যেতে হল চিকিৎসায়। জানা যায় ছন্নছাড়া মথা কোনও ভোট কৌশল নিতে পারে নি। বুবাগ্রাও দেন নি বা কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যান নি। ফলে স্থানীয় কর্মীরা ভোটের মাত্র চার দিন আগে বুথ কমিটি বানায়। এর পরও তাঁদের যে তৎপরতা তা সীমাবদ্ধ রাখে উপজাতি অধ্যুষিত বুথ এবং মিশ্র বসতিতে। ফলে বাঙ্গালী এবং চা বাগান অধ্যুষিত এলাকা গুলিতে বাড়তি সুযোগ নেয় বিজেপি। ফলাফলে মথা দ্বিতীয় আর সিপিএম তৃতীয়। অর্থাৎ বিজেপির প্রাপ্ত ভোট সাড়ে ষোল হাজার আর মথা, সিপিএমের মিলিত ভোট কুড়ি হাজারের বেশি। ত্রিপুরায় বিজেপি উৎখাতের যে স্বপ্নের কথা ফেরি করছেন সুদীপ বাবু, জিতেন্দ্র চৌধুরীরা তা বাস্তবে দেখতে হলে শুধু সিপিআইএম, কংগ্রেসের নয়, বোঝাপড়া থাকতে হবে মথার সঙ্গেও।