ভয়ংকর এবং বিপজ্জনক অসহিষ্ণুতার কালো মেঘ পুঞ্জীভূত হচ্ছে ভারতের আকাশে। এই অসহিষ্ণুতায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ। ব্যক্তিমানুষের আত্মপরিচয় চাপা পড়ছে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ে। মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতা জনজীবনের একাংশে অনুপ্রবেশ করছে এবং গভীর উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং আশঙ্কা নষ্ট করছে প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে। এই তো কয়েকমাস আগে গোরক্ষকদের ছোঁড়া ঢিলে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লেন পুলিশ আধিকারিক সুবোধকুমার সিংহ। বাবা ছেলেকে শৈশবে শেখাতেন ‘ধর্মের নামে কখনও হিংসা কোরো না।’ এই ছেলের বাবা ধর্মান্ধ মানুষের ইটের ঘায়ে মৃত্যুবরণ করলেন। গভীর বেদনায় দিশেহারা সন্তানের প্রশ্ন নাড়া দিয়েছে গোটা দেশকে। তার ছোট্ট মর্মবিদারক প্রশ্ন ‘এবার কার বাবার পালা?’ অগ্রজ হারানোর ব্যথায় মূহ্যমান ভাইয়ের প্রশ্ন, ‘গরু না হয় মা, ভাই করল কেন?’ এসব প্রশ্ন হৃদয়বিদারী। উত্তর দিতে হবে রাষ্ট্র নেতা-সহ আমাদের সকলকে।
দেশজুড়ে অসহিষ্ণুতার আবহ নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন বিশিষ্ট জনেরা। বুলন্দ শহরের এই মর্মান্তুদ ঘটনায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অকুতোভয় নাসিরুদ্দিন শাহ। তাঁর ক্ষুরধার মন্তব্য, ‘যারা লাগাতর আইন নিজের হাতে নিচ্ছে, তাদের কিছুই বলা হচ্ছে না। আমরা তো দেখতে পাচ্ছি নিহত পুলিশ অফিসারের চেয়ে এখন গরুর গুরুত্ব বেশি।’ তিনি সচেতনভাবেই ধর্মীয় শিক্ষা দেননি তাঁর সন্তানদের। এমতাবস্থায় তাঁর আশঙ্কা ‘…আমার সন্তানদের ঘিরে ধরে যদি প্রশ্ন করে, তোমরা হিন্দু না মুসলিম ওরা উত্তরই দিতে পারবে না।
প্রসঙ্গত, বুলন্দ শহরের পুলিশ-হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ও ধৃত যোগেশ বজরং দলের প্রধান এবং উত্তরপ্রদেশের যুব মোর্চার সদস্য। স্মরণে রাখা দরকার উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকার বুলন্দ শহরের তাণ্ডবের বিষয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল অনুসন্ধান করে দেখতে হবে একটি গরু মারা গেছে কিনা, অর্থাৎ ধর্মীয় উন্মাদনার বলি পুলিশ আধিকারিকের মৃত্যু কম তাৎপর্যপূর্ণ।
দেশবাসীকে নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দেশের সংবেদনশীল বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্টজনেরা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ কেন হচ্ছে তা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে সমাজের শরীরে। চার্চের ধর্মযাজক থেকে মুসলিম ধর্মাবলম্বী নেতাদের একাংশ সোচ্চার এই প্রশ্নে। সমাজতাত্ত্বিক সুহাস পাল স্বীকার করেছে একটা নতুন ‘হেজেমনি’র দিকে এগোচ্ছি আমরা। এই ‘হেজেমনি’র জন্মস্থল উপরের শাসন কিন্তু নীচের দিকের সমাজটা তার প্রসার এবং প্রচারের পক্ষে নিরন্তর কাজ করে। বিদ্বেষের বিষ দ্রুত ছড়াচ্ছে সমাজের অলিগলিতে এবং সেজন্যই আমরা গভীরভাবে চিন্তিত।
এই বিদ্বেষের উৎসমূলে আছে অসহিষ্ণুতা। এটি একটি ভাব, একটা বোধ। এর পশ্চাতে অন্তঃসলিলার মতো কাজ করে অন্য একটা বোধ যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আছে একটা বিশ্বাস— আমি বা আমরা যা করছি তা সঠিক, অন্যেরা ভ্রান্ত। পরমত অসহিষ্ণুতা, মতানৈক্যকে না মেনে নিতে পারার মানসিকতা এর কেন্দ্রবিন্দুতে।
এই বোধ, এই ভাবনা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। গণতন্ত্র অন্যান্য মূল সূত্রে মধ্যে অন্যতম হলো সৌভ্রাতৃত্ব। সকলের বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের মতকে গুরুত্ব দেওয়া গণতন্ত্রের মূল কথা। সুতরাং এই ভাবনা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি কুঠারাঘাত। গণতান্ত্রিক নীতি এবং নৈতিকতাকে ধূলিসাৎ করে দেবার এই প্রবণতা বিপজ্জনক এবং আত্মঘাতী।
হিন্দুরা ভারতের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়। তাঁদের সহিষ্ণুতার প্রসঙ্গে ভিগু পারেখ বলেছেন যে চারটি বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে হিন্দুদের সহনশীলতা। প্রথমটি হলো ধর্মীয় নৈতিকতা। দ্বিতীয়টি বর্ণাশ্রম ধর্ণ— জাতপাতভিত্তিক কর্ম। তৃতীয়টি হলো দ্বিমুখী সাধারণ ধর্ম যার মূলে আছে সত্যবাদিতা, চুরি না করা প্রভৃতি। চতুর্থত, ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা। কৃষ্ণ বলছেন, যে আমার কাছে আসে সে যে পথে আসুক না কেন, আমি তার কাছে পৌঁছোই।
খ্রিস্টানরা অত্যাচার করেছে ইহুদিদের উপর। ভারতে এসেছে মুসলমানরা ইরাক থেকে। কেরালায় কোচিনের হিন্দুদের রাজাদের আমলে তাঁরা পেয়েছিলেন স্বশাসিত জেলা। সম্রাট আকবরের ধর্মীয় সহনশীলতার কথা কিংবদন্তির মতো।
আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় আছে ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা। নাগরিকদের কর্তব্যের তালিকায় আছে সহনশীলতার প্রসঙ্গ। তাহলে কেন এত অসহিষ্ণুতা! নাগরিক সমাজের শিরায়-উপশিরায় সহিষ্ণুতার রক্ত সঞ্চালন করতে হবে। অন্যথায় অসহিষ্ণুতার বিষবাস্পে কলুষিত হবে আকাশ-বাতাস। চাই ভয়শূন্য চিত্ত। সংবেদনশীল প্রাণ। আত্মবিশ্বাস এবং সৎ সাহস। চাই সহনশীল রাজনীতি।