একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলা হচ্ছে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ অর্থাৎ ভারতের ক্ষুদ্র রূপ। যুগ যুগ ধরে এই ভূখন্ডে নানা জাতি, নানা ধর্মাবলম্বী, বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষজন এসেছেন ও বাস করেছেন। ভারতের এমন কোনও প্রদেশ নেই যেখানের মূল বাসিন্দাদের একাংশ বাংলায় জন্ম বা কর্মসূত্রে বাস করেনি। এখনও করছে। দু-চারটে উদাহরণ দিই।
১) বিদেশী আক্রমণের কারণে অন্তত ৭০০/৮০০ বছর আগে রাজপুতানা থেকে বেশ কিছু বিত্তবান মানুষ চলে আসেন ওড়িশা ও বাংলায়। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের কিছু এলাকায় তারা প্রাসাদ ও দেবালয় গড়ে তোলেন। এখনও তার নিদর্শন রয়েছে। তারা ছিলেন জৈন ধর্মাবলম্বী। ওদের উত্তর পুরুষেরা আজও রয়েছেন। মুর্শিদাবাদের মূলত জিয়াগঞ্জ ও আজিমগঞ্জে জৈনগুরু মহাবীর ধর্ম প্রচারে আসেন। তিনি বাংলায় তিন-চারটি ধর্ম কেন্দ্র গড়ে তোলেন। আজ সবই তা কালের গর্ভে। তবু যে এলাকায় তিনি বহুদিন অধিষ্ঠিত ছিলেন, তার নামেই নামকরণ করা হয়—বর্ধমান। মহাবীরের অপর নাম, বর্ধমান।
২) কলকাতা শহরে মারোয়ারি, গুজরাতি, বিহারী, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, পাঞ্জাব, দক্ষিণ ভারত থেকে আসা বহু লোক দীর্ঘ সময় ধরে শান্তি ও সমপ্রীতির মধ্যে বসবাস করে। কলকাতার বাইরেও সমস্ত শহরে এরা থাকে। তারা বাংলাকেই নিজেদের দেশ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।
৩) তাদের অনেকেই বাংলার উন্নয়নে তাদের ব্যতিক্রমী ভূমিকার স্বাক্ষর রেখেছেন। যেমন, শেঠ সুখলাল কারনানি। পিজি হাসপাতালের সম্প্রসারণে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ নাম রাখা হয় শেঠ সুখলাল কারনানি হাসপাতাল। কাশ্মীর থেকে কাজের খোঁজে কলকাতায় আসে পন্ডিত পরিবার। সেই পরিবারের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র শম্ভুনাথ ইংরেজী, উর্দু, ফারসি, বাংলা ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করে সদর দেওয়ানী আদালতে রেকর্ড কীপার ও অনুবাদকের চাকরী পান। পরে আইন পাশ করে সরকারি উকিল হন এবং মাত্র ৩৭ বছর বয়সে কলকাতা হাইকোর্টে প্রথম ভারতীয় বিচারক নিযুক্ত হন। তিনি ভবানীপুর এলাকায় একটি ক্লিনিকে গরীবদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দানের ব্যবস্থা করেন এবং সাধারণের জন্য একটা হাসপাতাল হোক তা মনে প্রাণে চাইতেন। তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে এই উদ্দেশ্যে ১৫,০০০ টাকা যোগাড় হয়। কর্পোরেশন একটি বড় বাড়ির ব্যবস্থা করে। সেখানেই গড়ে ওঠে আজকের শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতাল এবং সামনের রাস্তাটিও তাঁর নামে উৎসর্গ করা হয়।
৪) এম. আর. বাঙ্গুর ছিলেন বিখ্যাত ব্যবসায়ী। তাঁরই বদান্যতায় ক্রমাবির্ভাব ঘটেছে আজকের এম. আর. বাঙ্গুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের।
৫) দেশের মধ্যে প্রথম প্ল্যানেটোরিয়াম কলকাতায় তৈরী করেছেন বিড়লা গোষ্ঠী। তাদের তৈরী স্কুল, হাসপাতাল, মন্দির কলকাতার মুকুটে নতুন নতুন পালক সংযোজন করেছে।
৬) পি. টি. নাইয়ার দক্ষিণ ভারতের মানুষ। কিন্তু তার বিভিন্ন বইয়ে তথ্য দিয়ে কলকাতার নানা ইতিহাসকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। এমন আরও বহু উদাহরণ আছে। আমি কয়েকটি মাত্র তুলে ধরলাম।
৭) এই ধরণের ব্যক্তিবর্গ আমাদের বাংলার গৌরব। এছাড়া রয়েছেন শত সহস্র শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, শ্রমিক যারা বিভিন্ন ভাবে বাংলার উন্নয়নের রথের চাকাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। কংগ্রেস, বামফ্রন্ট, তৃণমূল সব আমলেই এই ভ্রাতৃত্ব অটুট রয়েছে।
৮) এখন একদল বহিরাগত রাজনীতির কারবারি যাদের বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পরম্পরার সঙ্গে বিন্দুমাত্র যোগ নেই, যাদের হাত মহান বিদ্যাসাগরের মুর্তি ভাঙতেও এতটুকু কাঁপে না, তাদের সদম্ভ ঘোষণা— আমরা বাংলা ‘দখল’ করব। ‘উঠাকে ফেক দো’। যে কোনও দল ক্ষমতায় আসে জনগণের আশীর্বাদে। দখল বা উঠাকে ফেক দো বাহুবলীদের রণ হুঙ্কার। কোনমতেই সংসদীয় ভাষা নয়। হুমকি দিচ্ছে রাষ্ট্রপতি শাসন জারীর। কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকলেই রাজ্যে ৩৫৬ ধারা জারী করা যায় না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাড়ে ন’বছরের শাসনকালে মরিচঝাঁপি, বিজন সেতু, বানতলা, ধানতলা, ওসি গঙ্গাধর ভট্টাচার্য, ডিসি বিনোদ মেহতার মত প্রকাশ্য দিবালোকে খুন, সূচপুর, নানুর, গড়বেতা, কেশপুর, ছোট আঙারিয়া, সিঙুর, নন্দীগ্রাম, নেতাইয়ের মত নরহত্যা, গণধর্ষণ ও গণহত্যা বাংলার বুকে ঘটেনি। জঙ্গলমহল ও পাহাড়ে পূর্ন শান্তি বিরাজ করছে। বাংলা যুগ যুগ ধরে প্রাণ দিয়েছে, মাথা নত করেনি। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস তৈরী করে, মোহর ছড়িয়ে বাংলার উন্নয়নের গতিরোধ করা যাবে না। শান্তির পরিবেশকে বিঘ্নিত করা যাবে না। একজোট হোন। আমাদের চলার পথে বহিরাগত রাজনীতির কারবারি ও তাদের স্থানীয় এজেন্টদের গুন্ডামির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।