| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আধুনিক ভারতের গার্গী সুকুমারী ভট্টাচার্য : দেবাশিস সেনগুপ্ত

Reporter
দেবাশিস সেনগুপ্ত / ১৭১২ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৫ জুলাই, ২০২২

প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এক আধটা অতি আশ্চর্য ঘটনা থাকে, যুক্তি বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয় না।

আমারও এই রকম একটা ঘটনা আছে, সেইটা দিয়ে এই গপ্পোটা শুরু করি। মনে আছে তখন কলকাতা বইমেলা চলছে। রবিবারের সকাল, একটা টেলিফোন এলো। ফোনটা ধরতেই ও প্রান্তের মহিলা কন্ঠ প্রথমে আমার সঙ্গে কথা বলতে চান জানালেন। যখন জানলেন ওনার কথা বলতে চাওয়া লোকটি আমি, তখন তাঁর নিজের নামটি বললেন। নামটা শুনে আশ্চর্য নয় আমি চমকে গিয়েছিলাম, কারণ ওপারে যিনি ছিলেন তাঁর নাম সুকুমারী ভট্টাচার্য। উনি বললেন “আপনার সম্পাদনায় একুশে সংসদ থেকে প্রকাশিত ‘প্রগতির পথিকেরা’ বইটা আমি কিনতে চাই, কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না, শিপ্রার কাছ থেকে আপনার ফোন নম্বর পেয়ে ফোন করছি”। আমি বললাম “বইটা অনেক দিন শেষ হয়ে গেছে তবে আমার কাছে খানকয়েক কপি আছে আপনাকে দিতে পারবো”। উনি বললেন “তাহলে খুব উপকৃত হবো, আপনার বাড়ির ঠিক লোকেশনটা বলুন আমি কাউকে পাঠিয়ে আনিয়ে নেবো”। আমি হেসে বোললাম “কাউকে পাঠাতে হবে না, আমি নিজে গিয়ে আপনাকে দিয়ে আসবো”। উনি বললেন “আবার আপনি কষ্ট করে আসবেন”? আমি বলেছিলাম, “কাজটা ভালো করেছি এটা তো শিপ্রাদি আনন্দবাজার-এর রিভিউ করতে বলেছিলেন, কিন্তু আপনি যদি আমাকে এরকম আপনি আপনি বলেন, তাহলে সেটা শুনেছি বলে তো আমার অক্ষয় নরকবাস বাঁধা হয়ে যাবে, শিপ্রাদির অমন প্রশংসাও আমাকে বাঁচাতে পারবে না”।

আমার কথায় যে উনি মজা পেয়েছেন সেটা ফোনেও বুঝেছিলাম। হেসে ফেলেছিলেন, বললেন “কবে আসবে”? আমি বললাম “আজই”। উনি বললেন “বেশ, সাড়ে তিনটের সময় আসবে একসঙ্গে চা খাবো”। আমি বললাম “ঠিক আছে”। উনি বললেন “আমার বাড়িটা নাকতলা পোস্ট অফিসের কাছে, এদিকে এসেছো কখনো”? বললাম “আমি আপনার বাড়িটাই চিনি, শিপ্রাদি দোতলায় আপনি তিন তলায়”। এখানে একটু বাড়ির গপ্পোটা বলি। বাড়িটা আদতে ঐতিহাসিক সুশোভন সরকার-এর। শিপ্রাদি হলেন সুশোভন সরকার-এর মেয়ে। আর ওই বাড়িতে সুকুমারীদি-র থাকবার হেতু সুশোভন সরকার-এর ছেলে সুমিত সরকার-এর সঙ্গে সুকুমারীদি-র মেয়ে তনিকা-র বিবাহ। মেয়ের বিয়ের পর সুকুমারীদি পুরোনো দোতলা বাড়ির ওপর নতুন তিনতলা তৈরি করে ওখানে থাকতে শুরু করেন। অবশ্য তনিকা ও সুমিত সরকার দুজনেই দিল্লি-তে অধ্যাপনা করতেন।

আমি সাধারণ যানবাহনে যাতায়াত করলেও রাস্তায় কোনো বড়ো অঘটন না ঘটলে যথাসময়েই গন্তব্যে পৌঁছোই এটা আজও আমার অভ্যেস। কিন্তু সেদিনটা ছুটির দিনের দুপুর হওয়ায় বাস পেতে একটু ঝামেলা হয়েছিল আমি সাড়ে তিন-টে থেকে মিনিট পাঁচেক দেরি করে ফেলেছিলাম। পৌঁছোতেই সুকুমারীদি বললেন, “একটু দেরি করে ফেলেছো, সন্ধ্যা টেবিলে চা দিয়ে দিয়েছে”। সন্ধ্যা ছিল সুকুমারীদির সর্বক্ষণের সহযোগী। সুকুমারীদি নিজেই বললেন, “আমি সব কিছুই সময় মেনে করি। বিকেলে সাড়ে তিন-টে আমার চা খাওয়ার সময়”। চায়ের সঙ্গে লাল আটার লুচি আর ফুলকপির তরকারি খেয়ে শুরু হোলো সুকুমারীদি-র সঙ্গে গল্পো।

সুকুমারীদি-র সঙ্গে যখন আমার প্রথম দেখা তখন উনি প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই, তাই ওনাকে পুরোপুরি সুস্থ, দিব্যি হেঁটে চলে বেড়াচ্ছেন এরকমটা আমি দেখিনি, তবে বেশ কম হলেও বাংলা আকাদেমি, যাদবপুর বিশ্বিবিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্বিবিদ্যালয় এরকম হাতে গোনা দু-এক জায়গায় হয়তো যেতেন কখনো সখনো। পরে কয়েকবার এই রকম কোনো জায়গায় যেতে আমিও ওনার সঙ্গী হবার সৌভাগ্য লাভ করেছি। যে গপ্পো গুলো বলবো তার সবই হয় ওনার বাড়িতে নয়তো কোথাও যেতে যেতে ওনার সেই কালো বেশ পুরোনো অ্যামবাসাডার গাড়িতে শোনা, কোনটা কবে কোথায় শুনেছি, শোনার প্রেক্ষিতটাই বা কি সে সব এখন আর তেমন করে মনে নেই, তবে যে ঘটনা গুলো বলবো সেগুলো মনে আছে স্পষ্ট, সে সব গল্পের সবকটাই ওনার মুখ থেকে শোনা। কে আগে কে পরে সে সব নিয়ে কোনো উৎসাহ দেখাচ্ছি না আলাদা আলাদা গপ্পো আলাদা আলাদা বলবো।

সুকুমারীদি জন্মেছিলেন এক মধ্যবিত্ত খ্রিস্টান পরিবারে। সুকুমারীদি-র বাবা সরসীকুমার দত্ত ছিলেন স্কুলশিক্ষক এবং ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষাতে সুপন্ডিত। শৈশব থেকেই মা শান্তাবালা দেবী সুকুমারী-কে বিভিন্ন ভাষা শেখবার জন্য উৎসাহিত করতেন। পারিবারিক শিক্ষার এই আবহাওয়া তাঁকে ভবিষ্যতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারত তাত্ত্বিক (Indologist) হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল নিঃসন্দেহে।

কেমন ছিল সুকুমারী দত্ত (ভট্টাচার্য)-র ছাত্রজীবন সে গপ্পো একটু জেনে নেওয়া যাক। ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে সংস্কৃত-তে রেকর্ড নম্বর পেয়ে উনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত-তে এম.এ. পড়বার জন্য ভর্তি হতে চান। কিন্তু খ্রিস্টান পরিবারে জন্মানোর অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকালের সব বাঘা বাঘা পন্ডিতরা ওনাকে সংস্কৃত বিভাগে ভর্তি হতে বাধা দেন, ফলে সব থেকে প্রিয় বিষয় সংস্কৃত হলেও ওনাকে বাধ্য হয়ে ইংরেজি-তে এম.এ. পড়তে হয়। খ্রিস্টান পরিবারে জন্মানোর অপরাধে বঞ্চনার উদাহারণ আরও আছে। তার মধ্যে একটি বলছি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের “ঈশান স্কলারশিপ”-এর সবথেকে যোগ্য দাবীদার হলেও ওনাকে স্কলারশিপটি দেওয়া যায়নি কারণ স্কলারশিপটি যাঁর আর্থিক অনুদানে দেওয়া হতো সেই ‘শ্রীযুক্ত বাবু ঈশানচন্দ্র ঘোষ’ মহাশয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে সনাতন হিন্দু ধর্মের বাইরে বিধর্মী কাউকে এই স্কলারশিপটি দেওয়া যাবে না। এতো কিছু করেও শেষ পর্যন্ত কিন্তু খ্রিস্টান কন্যাটির প্রথাগত সংস্কৃত-র এম.এ. হওয়াটা আটকানো গেল না। ছাত্রীটি নিতান্তই বেয়াড়া, লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপিকা হয়েও সে কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ প্রাইভেটে সংস্কৃত-তে এম.এ. পরীক্ষা দিয়ে বসলো। ফলপ্রকাশের সময়ে বিভাগীয় অধ্যাপকরা দেখলেন যে সে বছর সংস্কৃত-তে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়েছে একটি মেয়ে তায় সে আবার প্রাইভেট ক্যান্ডিডেট। ওই রেজাল্টই কাল হল, অসাধারণ মেধাই ছাত্রীটিকে চিনিয়ে দিল। তারপর কোনো এক মহান পন্ডিতের বদান্যতায় সে যাত্রায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগটির মুখ রক্ষা হলো, কোনো একটি উত্তর পত্রের রিভিউ করে “খেস্টান” ছাত্রীটির চার নম্বর কমিয়ে তাকে প্রথম বিভাগে প্রথম না করে প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় দেখিয়ে ফাইনাল রেজাল্ট আউট করা হোলো। তবে তাতে ছাত্রীটির তেমন কিছু এসে যায়নি, এই সব মহান কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত পন্ডিত বা বেত্তাদের ইতিহাস কালের গর্ভে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে আর ওই প্রথমে খ্রিস্টান আর পরে প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতকীর্তি অধ্যাপক অমল ভট্টাচার্য-কে বিবাহ করার সুবাদে ব্রাহ্ম পরিবারের সদস্য সুকুমারী-কে ইংল্যান্ড-এর “কেমব্রিজ” আর ফ্রান্স-এর “সরবোর্ন” বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশ্বের সারস্বত সমাজের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ করে দিয়েছে। এখানে একটা বিষয়ের উল্লেখ খুব জরুরী যে ততদিনে খ্রিস্টান বা ব্রাহ্ম এই সব অপ্রয়োজনীয় অভিধা ছেড়ে সুকুমারী নিজেকে একজন মার্ক্সীয় দর্শনে বিশ্বাসী মানবতাবাদী মানুষ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

বুদ্ধদেব বসুর আমন্ত্রণে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের চাকরীতে ইস্তফা দিয়ে সুকুমারী এলেন যাদবপুর বিশ্বিবিদ্যালয়ে ‘তুলনামুলক ভাষা সাহিত্য’ বিভাগে। এই বিভাগে কিছুদিন অধ্যাপনা করার পর যাদবপুর বিশ্বিবিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিভাগ তৈরি হোলে উনি সংস্কৃত বিভাগে চলে আসেন এবং যাদবপুর বিশ্বিবিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকেই অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। অধ্যাপনা, ছাত্র ছাত্রীদের গবেষণা করানো, নিজের সংসার সামলানো এসবের মধ্যেই তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন তাঁকে তাঁর নিজস্ব গবেষণার কাজে ব্যস্ত রেখেছিল আজীবন। যার ফসল Indian Theogony, Buddhist Hybrid Sanskrit Literature, Fatalism of Ancient India, Women and Society of Ancient India, Legends of Devi, নিয়তিবাদ উদ্ভব ও বিকাশ, বেদে সমষ্যা ও নাস্তিক্য, বেদের যুগে ক্ষুধা ও খাদ্য, বিবাহ প্রসঙ্গে-র, মতো বেশ কিছু গ্রন্থ। একুশে সংসদ আয়োজিত একটি আলোচনা সভা-তে বেদে-র যুগে ক্ষুধা ও খাদ্য বিষয়ে আলোচনা করতে এসে বলেছিলেন, “স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পুর্তি অনুষ্ঠানে চতুর্দিকে সুজলাং সুফলাং শুনতে শুনতে মনে হোলো একবার দেখি তো সে কালে আমাদের দেশ কতটা সুজলা সুফলা ছিল? দেখি কোথায় সুজলা সুফলা, বরং প্রচন্ড খাদ্যাভাবের কথাও আছে, এবং সেই অবস্থায় প্রয়োজনে খাদ্য হিসেবে পশুর মাংস খাবার বিধানও দেওয়া হয়েছে, তাতে নির্দিষ্ট কোনো পশুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ এরকম কোনো নির্দেশ দেখিনি”। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি এই আলোচনা সভা যখন হয়েছিল তখনো ওনার এই নামের বইটি প্রকাশিত হয়নি, আমাদের আলোচনা সভা-র কয়েকদিন পর বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। সম্ভবত সুকুমারীদির অধিকাংশ বাংলা বইয়ের মতো এই বইটিও “ক্যাম্প” থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল। ক্যাম্প প্রকাশনা সংস্থা্র সকলের সঙ্গে ছিল সুকুমারীদি-র আত্মার আত্মীয়তা। এবার সুকুমারীদি-র অসামান্য স্মৃতি শক্তির কথা একটু বলি।

সুকুমারীদি-র স্মরণশক্তি কতোখানি ছিল তার সাক্ষী আমি নিজে। সে সময়ে আমি তখনকার সংবাদ প্রতিদিন কাগজে মাঝে মাঝে উত্তর সম্পাদকীয় ও অতিথি কলমে নানান লেখা লিখতাম। একবার রবিবার-এর পাতায় আমাকে অবৈধ সন্তান বিষয়ে লেখবার কথা বলা হয়েছিল। ‘সন্তানের পরিচয়’ নামে আমার লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল সম্ভবত ২০০১ সালে, সময়টা মনে থাকার কারণটি অবশ্য আমার কাছে খুবই দুঃখের। লেখাটি লিখেছিলাম আমার বিশেষ স্নেহভাজন বন্ধু কবি অমিতেশ মাইতির অনুরোধে। অমিতেশ, রবিবার-এর পাতার দায়িত্ব পাবার পর লেখাটি আমাকে লিখতে বলে। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ওর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর, তাই সময়টা আমার মনে আছে। ২০০১ সালে আমার মায়ের মৃত্যুর তিন মাস পর অমিতেশ অকালে আমাদের ছেড়ে চলে যায়। যাক সে কথা, এবার আসল কথায় ফিরে আসি। ‘সন্তানের পরিচয়’ লেখাটিতে আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যেহেতু সন্তান নিজে তার জন্মের জন্য দায়ি নয়, তাই সন্তানের পরিচয়ে সে বৈধ না অবৈধ এই প্রশ্ন অর্থহীন, সন্তান সন্তানই তার আবার বৈধ অবৈধ কি? এই ভাবনাকে গ্রহনীয় করে তুলতে আমি চেয়েছিলাম প্রাচীন কালের কয়েকটি ঘটনাকে উদাহারণ হিসেবে দেখাতে। সাহসটা হয়েছিল সুকুমারীদির স্নেহের ভরসায়। তখন উনি বেশ অসুস্থ, সদ্য ফিরেছেন হসপিটাল থেকে। একদিন গেলাম দেখা করতে। তখন ওনাকে শুয়ে থাকতে হছে, লেখাপড়া তো দূরের কথা উঠে বসাই বারণ। শুয়ে শুয়েই কথা বলছেন আমার সঙ্গে। কথায় কথায় বলেছি লেখাটার কথা। উনি আমার পরিকল্পনাটা শুনে খুব খুশি হলেন ও উৎসাহ দিলেন। আমি বললাম “বেদ-এর কালে পুরুষ তার স্ত্রীকে কতোখানি মর্যাদা দিত”? উনি বললেন “একটুও দিত না”। এটা বলে একটা সংস্কৃত শ্লোক বললেন। আমি লিখে নিতে চাওয়াতে উনি বললেন মনে আছে ঠিকই তাও একবার দেখেনি দাঁড়াও, তারপর লেখো”। সন্ধ্যা-কে বেদ-এর একটা খন্ড ওনার পড়ার ঘর থেকে নিয়ে আসতে বললেন। মেদিনীপুর-এর এক অখ্যাত গ্রামের স্কুলে ক্লাশ এইট পর্যন্ত পড়া মেয়ে সন্ধ্যা, সুকুমারীদি বলার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঠিক বইটা নিয়ে চলে এলো। ছোটো বেলায় আসার পর সুকুমারীদি ওকে মোটামুটি নিজের সব কাজ নিজে করতে পারার মতো বাংলা ও ইংরেজি লিখতে ও পড়তে শিখিয়েছিলেন। সংস্কৃতটা পড়তে শিখেছিল বোধহয় সুকুমারীদি-র কাছে থাকতে থাকতে নিজের উৎসাহে। বইটা দেখেই উনি সন্ধ্যাকে চল্লিশ পাতা খুলতে বললেন। একটা বালিশের ওপর বইটা রাখা হোলো উনি পাশ হয়ে শুয়ে একটু মাথাটা তুলে দেখার চেষ্টা করলেন, তারপর সন্ধ্যাকে বললেন “চল্লিশ থেকে তেতাল্লিশ পাতার মধ্যেই পাওয়া যাবে, চল্লিশ পাতার পর থেকে সব পাতার প্রথম শ্লোকের শুরুটা একটু পড়োতো”। বিয়াল্লিশ পাতার শুরুর শ্লোকটা শুনে আমাকে বললেন “এই পাতাতেই হবে, বইটা একটু আমার চশমার কাছে এনে ধরে থাকো”। মুহুর্তের মধ্যেই মুখে সাফল্যের হাসি, বললেন ঠিকই বলেছিলাম “লিখে নাও” বলে লাইন চারেকের শ্লোকটা বললেন। আমি কাঁতিয়ে কুঁতিয়ে যদি বা লিখলাম বুঝলাম না একটি বর্ণও, এবার সুকুমারীদি বললেন, “বাংলা করে দিচ্ছি লিখে নাও, “শ্লোকটা যাজ্ঞবল্ক ঋষি-র, লেখো”, বলে বলতে শুরু করলেন, “স্বামী স্ত্রীকে সংগমে আহ্বান করলে স্ত্রী যদি অনিচ্ছা প্রকাশ করে তাহলে তাকে প্রথমে মিষ্ট কথায় তুষ্ট করবে, তাতে অস্বীকৃত হলে বস্ত্র ও অলংকারের লোভ দেখাবে, তাতেও রাজি না হলে হস্ত বা যষ্টি দিয়ে প্রহার করবে”। বাংলা অনুবাদটি শুনে আমি চমকে গিয়ে বলে ফেলেছিলাম, “তার মানে স্বামী চাইলেই স্ত্রী মিলনে বাধ্য”। উনি বলেছিলেন এই রকম উদাহারণ নাকি বেদ-এর কালে ভুরি ভুরি আছে। এই আলোচনার মধ্যেই ওনার সেই মোক্ষম আবিষ্কারটির কথা আমাকে বলেছিলেন যে, “সতী শব্দের কোনো পুংলিঙ্গ হয় না”। আমি বললাম “কেন সৎ” সুকুমারীদি একটু হাসলেন, বললেন “সৎ আর সতী শব্দের মানে কি এক”? সেই প্রথম “সতী” শব্দটি নিয়ে সচেতন ভাবে ভাবতে শুরু করেছিলাম। এখানে একটা প্রাসঙ্গিক তথ্য জানাচ্ছি, “সতী শব্দের কোনো পুংলিঙ্গ হয় না”, এই কথাটি সুকুমারীদি প্রথম ওনার একটি প্রবন্ধে লেখেন, এবং বাংলাদেশের লেখিকা তসলিমা নাসরিন ওনার একটি লেখায় সুকুমারীদি-র লেখার যে প্যারাতে এই লাইনটি ছিল, হুবহু সেই প্যারাটি কোনো জায়গায় সুকুমারীদি-র নামের কোনো উল্লেখ না করেই ওনার নিজের একটি লেখার মধ্যে ঢোকান এবং লেখাটি প্রকাশ করেন। তখন উনি বাংলাদেশে থাকলেও এবং লেখাটি বাংলাদেশে প্রকাশিত হলেও খবরটি সুকুমারীদির কানে আসে। সুকুমারীদিকে খুব শ্রদ্ধা করেন এরকম কয়েকজন তরুণ বিষয়টি নিয়ে আদালতে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু সুকুমারীদি তেমন গুরুত্ব দেননি। এই ঘটনার কিছুদিন পর তসলিমা নাসরিন কলকাতা-তে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন, তখন একদিন নিজেই সুকুমারীদি-কে টেলিফোন করে ওনার বাড়িতে আসেন, এসে নিজেই প্রসঙ্গটা তোলেন এবং বলেন যে “ওই প্যারাতে যা যা লিখেছেন সবটাই আমার নিজের জীবনের কথা, তাই এতো বড়ো সত্যিকে আমি কোটেশন হিসেবে ব্যবহার করতে চাইনি”। একদিন সুকুমারীদি-র সঙ্গে গল্পের সময় তসলিমা প্রসঙ্গ ওঠে, তখন আমি বলি যে “তসলিমা-কে আমার ভালো লাগে না”, কারণ হিসেবে যা যা বলি তার মধ্যে “নাম না করে আপনার লেখা ব্যবহার করেছিল” এই কথাটাও ছিল। তখনই উনি তসলিমা-র ওনার বাড়িতে আসা এবং ওই স্বীকারোক্তির কথা আমাকে বলেন। ওনার কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল তসলিমা-র জন্যে কোথাও একটা স্নেহের জায়গা যেন ওনার মনের মধ্যে আছে, হয়তো পুরুষতন্ত্র এবং ধর্মীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে তসলিমার লড়াইটাই ওনার মনে এই স্নেহের জায়গাটা তৈরি করেছিল।

দিনের পর দিন খুব কাছ থেকে সুকুমারীদি-কে দেখে, স্নেহের প্রশ্রয়ে অনেক বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে আমার মনে হয়েছে সুকুমারীদি শুধু প্রাচীন ভারতত্ত্ব বা মানবীচর্চার তাত্ত্বিক নন সমকালীন মানব সমাজ, সমাজনীতি ও রাজনীতি-তে ওনার মননের যে গভীরতা সেই চিন্তনের অতি সামান্য অংশ আমরা ব্যাবহার করতে পেরেছি, বলা ভালো খোঁজ পেয়েছি। রাষ্ট্রশক্তির সদিচ্ছা থাকলে হয়তো এই গভীর জ্ঞানের আরেকটু আমরা ব্যাবহার করবার সুযোগ পেতাম। আমি জানি না একালের মানবীচর্চা-র তাত্ত্বিকরা সুকুমারীদি-র পর্যালোচনাকে কতখানি গুরুত্ব দেন বা প্রয়োগ করেন। সুকুমারীদি বর্তমান প্রজন্মকে খুব গুরুত্ব দিতেন, শরীরের প্রতিবন্ধকতা মেনে নিয়েও নাতুনদের লেখালেখি খুব মনযোগ দিয়ে পড়তেন এবং শুনতেন। ১৯৯৯ সালে আমার অতি স্নেহভাজন বন্ধু অনির্বাণ দাশ ওর কয়েকজন সহযোগী বন্ধুদের নিয়ে Margins নামে একটি পত্রিকার প্রকাশ শুরু করে। অনির্বাণ ওই পত্রিকাটি দেবার জন্য আমার সঙ্গে সুকুমারীদি-র বাড়ি যায়। উনি তরুণ তাত্ত্বিক গবেষক-দের লেখায় সমৃদ্ধ পত্রিকাটি পড়ে এতো খুশি হয়েছিলেন যে ওনার কাছে আসা অনেককে নতুন পত্রিকাটির কথা বলতেন। অশক্ত শরীরে নিজের লেখালেখির অতো চাপের মধ্যেও নিয়মিত নতুন ছেলে মেয়েদের বৌদ্ধিক কাজ কর্মের খোঁজ রাখতেন, নানা ভাবে সাহায্য করতেন।

আর একটি গপ্পো দিয়ে এই এলোমেলো লেখাটি শেষ করবো। তখন সুকুমারীদি বেশ অসুস্থ, ওয়াকার নিয়েও সবসময়ে নিজের বাড়ির মধ্যে হাঁটাচলা করতে পারছেন না, দিনের বেশি সময়টাই শুয়ে থাকতে হচ্ছে। এই রকম সময়ে একদিন সকালে টেলিফোন করে বললেন যে নন্দন-এ India and Indology – Past, Present, Future ( Prof. Sukumari Bhattacharji Felicitation Volume) বইটির উদ্বোধন ওইদিন সন্ধে সাড়ে ছ’টায়, উদ্বোধন করবেন অমর্ত্য সেন, আমি চাইলে যেতে পারি। অযাচিত এরকম সুযোগ তো আর পাওয়া যায় না। হাজির হোলাম যথা সময়ে, একেবারে সত্যিকারের চাঁদের হাট, অমন সব মানুষদের পাশে নিজেকে একেবারে বেমানান লাগলেও ঢুকে গেলাম সেই চাঁদের হাটে। সুকুমারীদি ও তাঁর কাজ নিয়ে অনেকেই আলোচনা করলেন, সে আলোচনার খানিক বুঝলাম খানিক বুঝলাম না। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে শুনলাম অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলছেন “সুকুমারী ভট্টাচার্য হলেন আধুনিক ভারতের গার্গী” ….

জানি না কোন মন্ত্রবলে আমি আধুনিক ভারতের “গার্গী”-কে অতো কাছ থেকে দেখবার ও তাঁর অতোখানি স্নেহমাখা সান্নিধ্যের পরশ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev