আদিমযুগ থেকেই জীবনযাত্রার উপর সূর্যের প্রভাব মানুষ অনুধাবন করে আসছে। তিনিই একমাত্র দেবতা যাঁকে প্রত্যক্ষ করা যায়। ভারতে সূর্য্যোপাসনার প্রধান উৎসবের নাম ছট পূজা। পুজায় সূর্য এবং তাঁর পত্নী ঊষার (ছটী মাঈ) উপাসনা করা হয়। ‘ছট’ শব্দটির অর্থ ছটা বা সূর্যের রশ্মি যা আমাদের দৃষ্টি শক্তির গভীরতায় নিমগ্ন।
ছট পূজায় মূর্তি উপাসনা করা হয়না। অস্তাচলগামী সূর্য থেকে উদীয়মান সূর্যের পূজো করা হয়।
উড়িষ্যা রাজ্যের পুরী জেলার কোণার্ক শহরে অবস্থিত কোণার্ক সূর্য মন্দিরে সূর্য বিগ্রহের স্থাপনা করা হয়। মন্দিরটি গড়ে ওঠার পিছনে দুটি মত আছে। তার একটি হলো—
নয়ণভোলানো রূপ ছিল কৃষ্ণপুত্র শাম্বর। নারদ মুনির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শাম্ব সামান্য অপরাধে তাঁরই পিতা কর্তৃক অভিশাপের প্রকোপে পরেন। রূপযৌবন খুইয়ে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়।

সূর্যদেবের আরাধনায় কৃষ্ণপুত্র শাম্ব দুরারোগ্য কুষ্ঠ ব্যাধি থেকে শুধু মুক্ত হলেন না, তিনি সূর্যদেবের কৃপাও লাভ করলেন। পরম ভক্তরূপে মান্যতা দিয়ে সূর্যদেব বললেন, ‘শাম্ব, আজ থেকে তোমার নামে পৃথিবীতে যারা যে সব দেবস্থান নির্মাণ করবেন, তারা সনাতনলোক লাভ করবে। এই চন্দ্রভাগা তটে আমাকে তুমি স্থাপন করো। তোমার নামে এই নগর প্রসিদ্ধ লাভ করবে। যতদিন পৃথিবী থাকবে, জগতে তোমারও কীর্তি অক্ষয় হবে।’
সূর্য আরাধনায় শাম্ব রোগমুক্ত হওয়ার কথাও লোকমুখে প্রচারিত হলো সর্বত্র। একদিন শাম্ব নদীর জলে ডুবে স্নান করার সময় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। নদীর জলের স্রোতে সূর্য্যের একটি বিগ্রহ তাঁর কাছে ভেসে এলো। সেই মূর্তির জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হল চারিদিক। শাম্ব মুর্তিটিকে তুলে এনে মিত্রবনের এক প্রান্তে স্থাপনা করলেন। কৌতূহলবশত বিগ্রহটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে নাথ, তোমার এই মূর্তি কে নির্মাণ করেছেন?’
বিগ্রহ তাঁকে জানান দেয়, আগে তাঁর রূপ অত্যন্ত তেজপুর্ণ ছিলো। দেবতাগণ প্রার্থনা করলেন, ‘তোমার রূপ সকল প্রাণীর সহনীয় হোক’। তখন বিশ্বকর্মা পুণ্য সিদ্ধভূমির আবাসস্থল হিমালয়ের কল্পবৃক্ষ দিয়ে এই মূর্তি নির্মাণ করেন শাম্বর জন্য।
সেই থেকেই এই স্থান কেবল রোগমুক্তির জন্য নয়, মুক্তিলাভের জন্য নির্মিত হয়েছে। শাম্ব সেই অলীক মূর্তির জন্য দেবগৃহ নির্মাণ করলেন। এবং সূর্যদেবের আদেশে গরুরে আরোহণ করে শাকদ্বীপে তেজস্বী, সূর্যউপাসক মগরা (ব্রাহ্মণ) দের কাছে গিয়ে মন্দিরে পুজোর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বলেন। মগরা এই প্রস্তাবে বলেন, ‘শাম্ব, সূর্যদেব পূর্বেই আপনার কথা আমাদের বলেছেন। তাঁর এদেশে আমাদের আঠেরোটি ঘর, আঠেরটি বংশ আপনার সঙ্গে জম্বুদ্বীপে যাবে।’

সেই থেকেই চন্দ্রভাগা নদীর তীরের সূর্য মন্দিরে শাকদ্বীপের ব্রাহ্মণ পূজারীরা বংশানুক্রমে পুজো করে আসছেন।
কোনার্ক মন্দিরে যে বিশাল বিগ্রহটি ছিলো তা এখন আর নেই। কালের করালগ্রাসে স্থাপত্যের অনেকাংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত। ৩০০ বছর ধরে বালিরস্তুপে চাপা পরে থাকা মন্দির ১৯০৪ সালে বড়লাট লর্ড কার্জন উদ্ধার করেন। তবে বিপর্যয়বশত মূল সূর্য মন্দিরটি অবলুপ্ত। এখন যেটিকে আমরা মন্দির হিসেবে দেখি, সেটা আসলে নাট মন্দির, মূল মন্দির নয়। অনুমান করা হয়, দিল্লীর ন্যাশনাল মিউজিয়ামে সূর্যবিগ্রহটি সংরক্ষিত আছে।
সমগ্র জীবজগতের উৎপত্তি বা ব্যপ্তি উৎস সূর্য। জবাকুসুম সদৃশ্য কশ্যপপুত্র সর্বরোগহর সর্ব্বপাপবিনাশক সূর্য্যের কাছে প্রণত হোক মস্তক কেবলমাত্র ছট পুজোয় নয়, প্রতিদিন।।
“ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং / মহাদ্যুতিম্, ধান্তারীং সর্বপাপঘ্নং / প্রণতোহস্মি দিবাকরম্।”
খুবই ভাল লাগল।
ভীষণ ভাল লাগলো