| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সুন্দরবনের পেশাজীবীদের আচোক-বাচোক : সসীমকুমার বাড়ৈ

Reporter
সসীমকুমার বাড়ৈ / ৬৫৬ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সুন্দরবন এক মায়াবী জ্যোৎস্নার মতো রহস্যময় জগৎ, যে প্রহরে প্রহরে তার রূপ পালটায়। সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে বিচ্ছন্নতা, অগম্যতা, অনিশ্চয়তা, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা, জল-জঙ্গল-জীবনে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ঘিরে লোক-সমাজে হাজার ধরণের বিশ্বাস, সংস্কার গড়ে উঠেছে। এবং তা অনেকাংশেই মূল ভূখণ্ডের লোকাচার, লোকবিশ্বাস থেকে আলাদা। প্রাচীন কালে গ্রামের প্রতি দুই তিন কিলোমিটার পরপর কিছু না কিছু উপভাষা, লোকবিশ্বাস-লোকাচার পালটে যেত। ভারত-বাংলাদেশের সুন্দরবন ছোট বড় ৩০২ (ভারতের ১০২ এবং বাংলাদেশের ২০০) টি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত, যা অসংখ্য নদী-নালা-ঝোরা-খাঁড়ি দ্বারা বিচ্ছিন্ন। কালক্রমে জনমিশ্রণও ঘটেছে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মানুষের মধ্যে। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু আচার-সংস্কারের বাহক। ফলে প্রত্যেক দ্বীপের স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যযুক্ত ভাষা-সংস্কৃতি, লোকবিশ্বাস, লোকাচারের আছে। কিছু না কিছু পার্থক্যও আছে। লোকসংস্কৃতি হলো সংস্কৃতির বিবর্তিত রূপ। ঋগ্বেদে ‘লোক’র অর্থা জগৎ, কিন্তু অর্থ সংকোচনে বর্তমানে ‘লোক’কে নিম্নবর্গের মানুষকেই বুঝায়। সুন্দরবনে মাঙ্গলী (লবণ উৎপাদনকারী), জেলে, মউলে, বাউলে (বাওয়ালি, ঝাড়-ফুঁক-মন্ত্র-তন্ত্রে সিদ্ধহস্ত), পশু শিকারি, হাঙর কুমির শিকারি, কাঁকড়ামারা, সানা (বাঁধ-ভেড়ি সংরক্ষণ করে যারা), বহরদার ও দেয়াসি, সাইদার (মৎস্যজীবীদের নির্দেশক), সর্প ও তারকেল (গোসাপ) শিকারিদের মতো পেশাজীবীদের অনিশ্চিত জীবনে গড়ে উঠেছে ঝাড়-ফুঁক-তুকতাক-মন্ত্র-তন্ত্র, ওঝা-ফকির-গুনিন নির্ভরতা। নিম্নবর্গের  লোকেদের বিশ্বাস-সংস্কার নিয়েই সুন্দরবনের লোকসংস্কার। সুন্দরবনের শহরবাসীদের কাছে অপরিচিত রীতি নীতিই (অধিকাংশ নঞর্থক নিষেধ) আচোক-বাচোক। বাদাবনে আধুনিক সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অ্যান্টি-ভেনম পৌঁছেছে এবং ভূবনীকরণের ভোগবাদ এসে পৌঁছেছে। পেশাজীবনে কিছুটা যন্ত্র নির্ভরতা এসেছে, ঝড়-কোটালের পূর্বাভাষ মেলায় যেমন সতর্কতা জনিত কারণে নিরাপত্তা বেড়েছে, তেমনি বংশ পরম্পরায় চলে আসা পেশা থেকে অনেক মানুষ সরেও এসেছে। ফলে সুন্দরবনের অনেক আচোক-বাচোক, মন্তর-তন্তর বিলুপ্তি ঘটছে বা নিষেধাত্বক নতুন নতুন চেহারায় হাজির হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে শব্দের মানে। বাদাবনের অলৌকিক ও নৈসর্গিক শক্তিকে ভর করে জঙ্গলযাত্রা করে জেলে-মউলেরা, তাদের লোকবিশ্বাস আমাদের কাছে বহুলাংশে অচেনা।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভয় ভীতি, অজ্ঞানতা, রোগব্যধি ইত্যাদির পিছনে সর্বশক্তিমান কেউ আছে কল্পনা থেকে ঈশ্বর ধারণার উদ্ভব হয়েছিল। এবং নিরাপত্তাহীনতায় মানুষেরই সৃষ্টি ঈশ্বরের উপর মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। কোনো কোনো শক্তি শুভ, অন্য সব অশুভ। অচেনা শক্তি বা কল্প ঈশ্বরকে তুষ্টির উপায় জানা না থাকায় আদিম মানুষ নিজেদের আহার্য ফলমুল মাছ মাংস দিয়ে পূজা পার্বণ শুরু করে এবং ধারাবহিকভাবে ধর্মাচারে পরিণত হয়। ঈশ্বর বিশ্বাস এবং লোকাচার নিয়েই গোষ্ঠীর ধর্ম বিশ্বাস। ধর্মযুক্ত সংস্কারে  গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের অবশ্যই মান্যতার বাধ্যবাধকতা থাকে কিন্তু লোকবিশ্বাস বৃহত্তর সমাজের কাছে পালনীয় নয়। সুন্দরবনের একাধিক ধর্ম বিশ্বাস আছে এবং সামাজিক অংশগ্রহণ আবশ্যিক কিন্তু পেশাজীবীদের বিপন্নতা ঘিরে যে সব লোকবিশ্বাস গড়ে উঠেছে তা একই ধর্মালম্বীদের পালনীয় নাও হতে পারে। আবার ধর্মীয় বিভেদের বেড়াজাল মুছেও দিতে পারে। সুন্দরবনে লোকবিশ্বাস পেশার অনিশচয়তার সঙ্গে যুক্ত কিন্তু ধর্মসম্প্রদায়ের পালনীয় আচার অনুষ্ঠান পূজা-পার্বণ কেন্দ্রিক। অন্যদিকের ভিন্ন ধর্মালম্বী পেশাজীবীদের লোকসংস্কার-লোকবিশ্বাস অনেকাংশে একই হতে দেখা যায়। উইলিয়াম গ্রাহাম সামনারের অভিমত, ‘All at last adopted the same way for the same purpose; hence the ways turned into customs and became mass phenomena, Instincts were developed in connection with them, in this ways folkways arise.’. জল-জঙ্গলের পেশাজীবীরা নমো, পৌণ্ড্র, জেলে-মালো, ধোপা, আনসারি, জোলা, নাইয়া প্রভৃতি অনুচ্চজাতির সম্প্রদায়ভুক্ত। তাদের যাপনচর্যা, মনন,  পেশালব্ধ জ্ঞান প্রায় সমধরণের লোকবিশ্বাস বা লোকসংস্কার সৃষ্টি করছে দ্বীপে। ফলে সুন্দরবনের লোকসংস্কার-লোকবিশ্বাস হয়ে দাঁড়াল নিম্নবর্গের লোকাচার বা লোকসংস্কৃতি। ‘লোক’ শব্দের অর্থ ‘জগৎ’ থেকে বিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় নিম্নবর্ণ। সংস্কৃতি মানবজীবনের অন্তর্নিহিত ঐক্যের ধারণার সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর পশ্চাতে দু’টি অর্থ ক্রিয়াশীল। মন তথা উপলব্ধিকে সংস্কার বা মার্জন করা। ঐতিহ্যগতভাবে এক একটি ভাবনা ও অভ্যাসকে বিবর্তিত করা। তাদের যাপিত জীবনে বিশ্বাস টোটেম-ট্যাবু সঞ্জাত কতগুলো সংস্কারকে পরিচালিত করে। তাতে মিশে থাকে অলৌকিক-জাদুবিশ্বাস, আশাবাড়ি ও ছোটবাড়ি মাহাত্ম্য। আত্মা, ভূত-প্রেত, লৌকিক দেব-দেবী। ট্যাবু সংস্কার। বার-তীথি সংস্কার। লোকভাষা, লোক-উচ্চারণ সংস্কার।

সুন্দরবনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বিপজ্জনক পেশা হচ্ছে মউলেদের পেশা, পরেই রয়েছে জেলেদের পেশা। দুটি পেশায়ই জীবনকে চেয়ে থাকতে হয় অনিশ্চিত দৈবশক্তির উপর। ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু/ তর্কে বহুদূর’ প্রবচনের সমর্থক। জল জঙ্গলে যাতায়াতের নৌকা একমাত্র যানবহণ। স্বাভাবিকভাবেই নৌকা শুধুমাত্র একমাত্রিক পরিবহণযানই নয়, বাঁচা মরার জীয়নকাঠিও বটে। কাঠের নৌকা রূপান্তরিত হয়ে যায়  ‘কাষ্ঠদেবী’তে। সুন্দরবনে এমন টোটেমিক কল্প সত্তার অস্থিত্বের দেখা মেলে। বিশ্বাসে তার জীবিত সত্তা আছে। কাষ্ঠদেবীকে খুশি রাখা জেলে-মউলেদের অবশ্য কর্তব্য, শুধু জীবিকার তাগিদে নয়, প্রাণের তাগিদেও। টোটেম এবং ট্যাবু মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। নৌকা হলো বাদাবনে জলের গাড়ি, বর্তমানে সাধারণত ফেরি নৌকা, ভুটভুটি (যন্ত্র চালিত), ডিঙি, খিলে, পাউখা প্রভৃতি নৌকা ব্যবহৃত হয়। সব নৌকাই রুপান্তরিত হয়ে যায় ‘কাষ্ঠদেবী’তে, যার একটি জীবিত সত্তা আছে। রাগ-অভিমান আছে, পাপপূণ্য বোধ আছে। সুতরাং জেলে মউলেরা নৌকায় থাকাকালীন অনেক আচার বিচার পালন করে। গলুইয়ে কখনও পা দেবে না। মহালে যাওয়ার আগে নৌকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সাজানো হয়। বাঙাল মউলেদের বাড়ির মহিলারা নৌকার গলুইয়ে (অগ্রভাগ) তেল-সিঁদুর মাখিয়ে লাল টুকটুকে করে, ফুলের মালা পরায়। ধূপধুণা প্রজ্জলন করে। মউলেরা গলুইকে (নৌকার অগ্রভাগ) ‘চণ্ডীরূপে’ পূজা করে। নৌকার গলুই-এ চোখ আঁকা হয়। প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হয়- সন্দেশ, বাতাসা, ফলমুল। নৌকার খোলের মধ্যে বসানো হয় ‘সাজন কলসি,’ নামে মঙ্গলঘট। কিন্তু প্রচলিত মঙ্গলঘটের সঙ্গে এর মিল কম। যাত্রায় আগে উপস্থিত মহিলারা উলুধ্বনিতে মুখরিত করে তোলে নদীঘাট। শঙ্খ ও কাঁসরঘটা বাজে। মউলেরা প্রত্যেকেই নৌকাকে প্রণাম করে, আশীর্বাদ চায়-দোয়া মেঙে শুদ্ধ চিত্তে নৌকায় ওঠে। বাদাবনের উদ্দেশ্যে নৌকা চলার শুরুতে বহরদার (প্রধান মউলে, সে গুনিনের ভূমিকাও পালন করে) সুর করে প্রার্থনা করে-

ভাটি গাঙে চাটিয়া

          পাঁচ ফুট দরিয়া

          গাজী গঙ্গা বদর বদর।

নৌকার বাকি মউলেরা দোহা দেয়-গাজী গঙ্গা বদর বদর। গাজী গঙ্গা বদর বদর। তারা জোরে জোরে দোয়া মাঙে-

বনবিবির নাম করে আল্লা আল্লা বল।

          সত্যপীরের নাম করে হরি হরি বল।

          রায় ঠাকুরের নাম করে হরি হরি বল।

হিন্দু-মুসলিম-লোকদেবতা মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। মুসলিম মউলেরাও তেল-সিঁদুর-ধূপধুণো নিতে ভোলে না। বনের দেবী বনবিবি যেমন আছে, আছে সুফি পীর, যদুমণি ফকির, তেমনি জলের মালিক রায় ঠাকুরও বিরাজমান। তবে লোকদেবদেবী-বনবিবি-নারায়ণী-বিশালক্ষ্মী-পীর-দক্ষিণরায়ের অধিষ্ঠান কিন্তু লোকালয়ে বা মন্দির-মসজিদ-গির্জায় নয়, তাদের অধিষ্ঠান মূলত লোকালয় থেকে বাইরে, থানে। বা লোকবিশ্বাসের দেবতার নিরাকার রূপে। ফলত লোকদেবদেবী কখন জাঁত/ধর্মীয় দেবতা হয়ে উঠতে পারে না।

বনের মধ্যে ইচ্ছা হলেই যাওয়া যায় না। বনে যেতে গেলে নৌকার পাস (BLC) দরকার, কিন্তু গত ১৯৮০ সালের পর আর বন দপ্তর আর নৌকার পাস দেয়নি। পাসিনৌকার অপ্রতুলতায় নৌকা কেন্দ্রিক অনেক ফাটকাবাজি তৈরি হয়েছে। আর দরকার জঙ্গলে প্রবেশের মাথাপিছু পারমিট। পারমিট পেতেও পাওয়ায় হাজার ফ্যাঁকড়া। গেল অনুমতির প্রশ্ন, কিন্তু বিপদ-আপদে রক্ষাকর্তাদের মতিগতি পেশাজীবীদের অজ্ঞাত। রক্ষাবিশ্বাসের উপায় হিসেবে যাত্রার প্রস্তুতি পর্বে অনেক মন্ত্র-তন্ত্র, তুক-তাক, তাবিজ-কবজ-মাদুলি পরা সেরে রাখতে হয়। সুন্দরবনে জোয়ার-ভাটি-গোণ বুঝতে হয়। প্রাকৃতিক জ্ঞান তাদের বংশ পরম্পরায় অর্জিত। আবাহাওয়ার আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে থেকে পেশাজীবীরা জঙ্গল, মৌমাছির আচরণ, মাছের আচরণ, তাদের সুখ-আহ্লাদ বিষয়ে বিশারদ। যাত্রার সাজ সরঞ্জম, নৌকা যোগাড়, পারমিট বের করার দায় দায়িত্ব বেশিরটাই দলনেতার। দলনেতাদের জায়গা ভেদে বহু নাম; সাজনদার, দেহাসি, মালিক কিংবা মহাজন। আবার সে এক সঙ্গে গুনিনগিরি করলে কেউ বলে বহরদার, হুকুমের বাউলে বা কালামের বাউলে। দেহাসি (দলনেতা) দলকে বুক চিতিয়ে রক্ষা করবে, তেমনি থাকতে হবে জল জঙ্গলের জ্ঞান। মৌবনের হাওয়া শুকেই অনেকে বলে দিতে পারে মৌমাছির মুখে কোন ফুলের রস। কিন্তু বিপদ-আপদের প্রতিকার তাদের হাতে নেই। স্বাভাবিকভাবে মন্ত্র–তন্ত্র, তুক-তাক, আচক-বাচকের গুরুত্ব খুব একটা হ্রাস পায় না। খলসি, বাইন, সাদা বাইন, গেঁও, ঝানা, গরান, কেওড়া, কাঁকড়া, পশুর, চৈলা, সিংরা, হরগোজা প্রভৃতি লবণাম্বু (ম্যানগ্রোভ) গাছে এপ্রিল মার্চ-মাসে থেকে ফুল আসতে থাকে এবং চলে জুন পর্যন্ত। মউলেরা সাধারণত কপ্পুর জঙ্গল, বুড়ির ডোর, আড়বাঁশিয়া, ধ্বজিখালি, সমসেরা, ছায়া, তালপাটি, কলস, ভুবনেশ্বর, টুলিবাসা, বেনিফুলি, কাঁটাবনি, দক্ষিণ চড়া, পিছেখালি প্রভৃতি জঙ্গলে মধু ভাঙতে যায়। সাধারণত পনের দিনের জন্য দল বেঁধে যায়, নৌকার পরিবহণ ক্ষমতা অনুসারে দলে ৭, ৯ বা ১১ জন করে বিজোড় সংখ্যায় মউলে থাকে। তাদের কাজের ভিত্তিতে পরিচয়: দেয়াসি/দেহাসি (দলনেতা), বহরদার (গুনিন), গাছি (যে গাছে ওঠে), আড়িদার (গাছের নিচে দাঁড়িয়ে যে কাটা মৌচাক পাত্রে লোফে), গাঙনেয়ে (যে নৌকায় থেকে রান্নাবান্না, যারতীয় কাজ করে)। পাহাড়িয়া জংলি মৌমাছি (এপিস ডরসাটা)কে মউলেরা ডাঁশ, বাঘা, মাছি, পোকা প্রভৃতি নামে অভিহিত করে। জংলি মৌমাছি মার্চের মাঝামাঝি থেকে আসতে থাকে। মাঘী পঞ্চমীর গভীর রাতে মউলেদের বহরদার সরস্বতী পূজার পরিবর্তে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে ধ্যানে বসে। চোখ নিবিষ্ট থাকে প্রদীপ শিখায়। রাত গভীর হলে বাও বাতাস বয়। বাতাস নিবিড় হয়ে আসে। যেন চরাচর প্রাণ শূন্য নিঃস্তব্ধতায় আবিষ্ট হয়ে যায়। প্রদীপ শিখা নড়ে না। হঠাৎ প্রদীপ শিখা একদিকে হেলে পড়ে। হেলে পড়া শিখার অভিমুখ দেখে নির্ণয় করে গোণ কেমন হবে। বনবিবি সহায় থাকবে কিনা, মৌমাছির গতিবিধি, আচরণ জানা মউলেদের অত্যন্ত জরুরি। একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় তাদের অনেক অর্জিত জ্ঞানের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু মউলেদের বোধে বিভিন্ন সংস্কার কাজ করে। বনচারীরা জঙ্গলে অবস্থানকালে তাদের অভিজ্ঞতায় বুঝে যায় মৌমাছির গতিবিধি, মৌমাছির নাচন উল্লাস দেখে বোঝে চাকে মধু আছে কিনা। কোন বনে মধু আছে। মৌমাছি ক্লান্ত কিনা। বাদাবনে মৌবাতাস বইছে কিনা। এসব তাদের বংশ পরম্পরায় যাপিত জ্ঞান-এর পরিচয়। ১৯৭৩ সালে জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল জন ফ্রিশ (Karl von Frisch) মৌমাছির আচরণ বিশ্লেষণ করে শরীরতত্ত্বে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি মৌমাছির নাচের কোণ, দূরত্বের গাণিতিক বিশ্লেষণ করেছিলেন। কত দূরত্বে ফুল আছে, তার কৌণিক অবস্থান কী, ফুলে কেমন মধু আছে তার সমস্ত কিছুর সংকেত থাকে মৌমাছির নাচের মধ্যে। কোণ তৈরি হয় সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে। এবং চাককে কেন্দ্র করে নাচবৃত্তের ব্যাসার্ধ বলে দেয় তার দূরত্ব। মউলেদেরও যাপিত পেশাচর্চায় প্রচ্ছন্নভাবে মিশে থাকে এসব নির্নয় ক্ষমতা।

অলৌকিক দৈবশক্তি, যাদুবিশ্বাস জেলে-মউলেদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। গুনিনরা দলের সদস্যদের রক্ষার জন্য শনি বা মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কুড়িয়ে আনা ভাঙা হাঁড়ি কলসির চাড়া আর বেলগাছের শিকড়-বাঁকড়, জরি-বুটি দিয়ে তাবিজ-কবজ বানায় অত্যন্ত গোপনে। শনি/ মঙ্গলবারের বগি পোড়া (খোল পোড়া) মন্ত্রপুত করে নিতে হয়। জন সমক্ষে করলে তাবিজ-কবজের শক্তি থাকে না। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাবিজ-কবজে গঙ্গাজল ছিটাতে ছিটাতে বনবিবির জহুরনামা আওড়ায়-জয় মা বনবিবি, সবারি নক্ষে করো। সুন্দরবনে আর এক জাগ্রত দেবী বিশালক্ষ্মী। কুমিরমারিতে বিশালক্ষ্মীর মন্দিরে দেহাসিরা পূজা পার্বণও করে।  বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার থেকে সাতদিনের বার্ষিক মেলা বসে মন্দির প্রাঙ্গণে, তখন বেশ ধুমধাম হয়। বিশালক্ষ্মী কৃষিজীবি, মৎস্যজীবি, মউলেদের রক্ষাকত্রী। মন্ত্র-তন্ত্র ব্রাহ্মণ্য আরোপিত: মুলেন ব্যাপকং ন্যাসং ধ্যায়েদেবীং পরাং শিবাম। ধ্যায়েদেবীং বিশালাক্ষীং…। তাবিজ-কবজ-মাদুলিতে যেন যাদুশক্তি ভর করে, কোমরে বাঁধলে জঙ্গলে মউলেরা  আত্ম বলে বলিয়ান বোধ করে।

ভারত-বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে খুব চালু একটা প্রবাদ হচ্ছে-‘সাপের লেহা, বাঘের দেহা’। স্থান কাল পাত্র ভেদে উচ্চারণের হেরফের আছে হয়তো কিন্তু বিপন্নতার ভাষা, আকুতির ভাষা এক। বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে খাঁড়ি-নালা-ঝোরা, নদী, বনে মাছ ধরতে, মধু ভাঙতে গিয়ে বা গোলপাতা কাটতে গিয়ে কুমিরের কামড়, সর্প দংশন, বাঘের আক্রমণে বহু প্রান্তিক মানুষ প্রাণ হারায়। ভীমরুলের আক্রমণেও জীবন সংকটের মুখোমুখি হয়। প্রতিকারে শত্রু নাশক নবগ্রহ বিজয়ী সঞ্জীবনী অক্ষয় কবজ ধারণ করে বাগেরহাট জেলার পেশাজীবীরা। তামার বেড়, রূপার কড়া এবং রঙ সহযোগে ঝালাই করা হয় তাবিজের খোল। অনেক ট্যাবু (বিধি নিষেধ) চালু আছে। তাবিজ বানানোর সময় স্বর্ণকার বা বেনিয়াকে অবশ্য পালনীয় হল; তাবিজে থু-থু লাগানো যাবে না। তাবিজ লুঙ্গিতে ঘষা যাবে না, শৌচকর্ম করা কাপড়-চোপড় পরে কাজ করা যাবে না। ওঝারা তাবিজের ভিতরে পুরে দেয় যে সকল জড়িবুটি, ধাতু/বস্তু তার একটি তালিকা দেওয়া হলো:

ক) সাপের শঙ্খ মাখা কাপড়ের অংশ

খ) একুশটি পুরের মাটি (যেমন পার্বতীপুর, পিরোজপুর, মাদারিপুর, ফরিদপুর)

গ) তামা , শিসা, চুম্বকের গুড়ো

ঘ) প্রবাহমান নদীর ভাঙ্গন ও চরের মাটি

ঙ) ২টি সূচাগ্রভাগ

চ) ২টি বর্শির অগ্রভাগ

ছ) ভাত খাওয়ার সময় ভাতে যে ধান পাওয়া যায় তার একটি

জ) শ্বেত বিরালার মূল

ঝ) শ্বেত আখন্দের মূল

ঞ) অনন্তগাছের মূল

ট) বৃহৎ দেবদারু (দারকা) গাছের মূল

ঠ) শিষ আখন্দের মূল

ড) গুয়ে বাবলার মূল

ঢ) দাঁতন গাছের মূল

ণ) খিরিকা মূল

ত) মহাসমুদ্র গাছের মূল

থ) বিলম্ব (বেল) মূল। শিকড় তুলতে হবে রবিবার সকালে। শিকড় তোলার সময় যেন নিজের ছায়া বা গাছের ছায়া না পড়ে।

তাবিজ হাতে, মাজায় (কোমড়) বা গলায় ধারণ করতে হবে। সাপ, বাঘ, কুমির, গাঙডাকাত (বনদস্যু), বাঘ, ভুত-প্রেত কেউ কিছু করতে পারবে না সঞ্জীবনী মাদুলি থাকলে। অল্প সময় বীর্য স্খলনকারীদের বীর্য ধারণ ক্ষমতা বেড়ে যাবে। বহু রোগব্যধী হবে না বা নিরাময় হবে, সংসারে শান্তি, মিল-মহব্বত হবে। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও পেশাজীবীদের অসহায় বিপন্নতায় কুসংস্কার/সংস্কারে, কালা-যাদুবিশ্বাসে তেমন একটা চির ধরেনি। ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বত্র তাবিজ-কবজ-মাদুলি-জলপড়া-তাগাপড়া কিছু না কিছু চালু আছে। এমনকি আঙুলে গ্রহ-রত্ন আংটি পরা ছাড়া শিক্ষিত লোকের সংখ্যা অত নগন্য। দেশ বিদেশের শিক্ষিত সাহেব-সুবোরাও বয়ে বেড়ায় এমন অসংখ্য যাদুবিশ্বাস। তবে সবটাই নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক হলো আত্মবিশ্বাস বাড়া। যেখানে কোনো প্রতিকারের সুযোগ থাকে না সেখানে আত্মবিশ্বাসও একটি শক্তি।

পূর্বেই বলা হয়ে হয়েছে মউলেদের পেশা পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক পেশা। বাদাবনের মধু ভাঙা হলো বাঘের ডেরায় ঢুকে মধু লুট করে আনা। দক্ষিণরায় তাদের মহারাজ, অত্যন্ত শক্তিমান লৌকিক দেবতা। দক্ষিণরায় আর বনবিবির টক্কর লেগেই থাকে। মানুষ কাউকেই চটাতে পারে না। তারা শুধু মুখের পিছনে মুখোশ পরে বাঘ মানুষ খেলতে নামতে হয়। মানুষের খেলাটা বাঘ ধরে ফেলেছে। বাঘের মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তন ঘটেছে। সে মুখোশ আর মুখের পার্থক্য বুঝতে পারে। জল-জঙ্গলের বাঘ, সাপ, কুমিরের মতো শ্বাপদজীবের থেকে আত্মরক্ষায় কোনো হাতিয়ার জঙ্গলে নেওয়ার অধিকার নেই জেলে-মউলেদের। একমাত্রা মৌচাক কাটার দাঁ বা হেঁসো নেওয়া যায়। তা হলে তাদের হাতে থাকে শুধু আচোক-বাচোক, লোকবিশ্বাস। গুনিনের মন্ত্র–তন্ত্র। আগে প্রতি নৌকায় একজন করে গুনিন (হুকুমের বাউলে বা কালামের বাউলে) থাকত। সে সামলাত বাঘ, সাপ, ভূত-প্রেতের মতো অশুভ শক্তি। লভ্যাংশের একটি সমভাগ তার প্রাপ্য। তাই এখন আর কেউ আলাদা করে গুনিন নেয় না, দলনেতা (বহরদার, সাজনদার, দেহাসি, মালিক, মহাজন) সামলে নেয় গুনিনের কাজ। নৌকা জঙ্গলে পোঁছানোর পরই ‘মাল’-এ পা দেওয়ার আগে তারা তিনটি মন্ত্র আওড়ায়। সেগুলো হলো ‘জ্বালান’ ‘চালান’ এবং ‘খিলেন’ মন্ত্র। ‘জালান’ মন্ত্রে বাঘের গায়ে জ্বলুনি ধরে যাবে। ‘চালান’ মন্ত্রে বাঘ সেই দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে চলে যাবে। ‘খিলেন’ মন্ত্রে বাঘ মামার মুখে খিল লেগে যাবে। মউলেদের বিশ্বাস, গুনিন এই মন্ত্র বলে বাঘের মুখে খিল-কপাট লাগিয়ে দিতে পারে।

বাঘের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেওয়ার ‘জ্বালান’ মন্তর হলো —

‘‘যদুমণি ফকির বাবা, যদুমণি ফকির

          দোহাই তোমার ধম্ম বাবা, দোহাই তোমার ধম্ম।

          ভূত প্রেত দৈত্য দানব, বন্ধু বান্ধব

          সাপ আর সাপিনী যত আমার এই

          ছ’জনের মালে পা

          যদুমণি ফকিরের হুকুম তার জ্বলে যাবে গা।”

‘চালান’ মন্ত্রটি নিম্নরূপ:

খোদা দোস্ত মহম্মদ পির পয়গম্বর

           হে রসুল আল্লা কর দুনিয়া পার।

           যদি নাযাস অনুরাগে

            এক লক্ষ আশি হাজার পিরের দোহাই লাগে।

             বাঘ-বাঘিনী দূর তফাত যা (৩ বার)

             মা বনবিবি বিশালাক্ষ্মী মা মা মাগো।

বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে যেমন ব্রক্ষ্মজাল মন্ত্র পাঠ করে বাঘের মুখে খিল লাগানো হয়। এই মন্ত্র পড়লে দাঁতে দাঁত লেগে বাঘ অসাড় অবস্থায় পড়ে থাকবে। বন্যপ্রাণীরা এই সময় কাউকে কামড়াতে পারবে না, এমনকি উঠে দাঁড়িয়ে শিকার করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলবে। ব্রহ্মজাল ‘খিলান’ মন্ত্রটি হলো-

ঔঁ ব্রক্ষ্মা ঔঁ ব্রক্ষ্মা ঔঁ ব্রক্ষ্মা

তুমি সৃষ্টির আদি পিতা।

তোমার নাম স্মরণ করে

মাটিতে দিলাম হাত

এই এলাকায় আছে যত বাঘ কুমিরের জাত

তোমার নামের জোরে অসাড় হয়ে যাক।

দোহাই সৃষ্টির আদি পিতা ব্রক্ষ্মার দোহাই

তোমার নামে যেন কলঙ্ক যেন হয় না প্রভু

অধমের এই মিনতি।

এই মন্ত্রটির মধ্যে খানিকটা সংস্কৃত মন্ত্র-তন্ত্রের প্রভাব আছে। যেখানে পশ্চিমবঙ্গের জ্বালান চালান খিলান মন্ত্র অনেক বেশি বন-জঙ্গলের মাটির গন্ধ মাখা। তবে অঞ্চল ভেদে তিনটি মন্ত্রের অনেক রকম ফের আছে কিন্তু প্রত্যেকটি মন্ত্রে বিষয় ভিত্তিক বক্তব্য প্রায় এক। এই সব মন্ত্রই ভয়ানক শ্বাপদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার আকুতিপূর্ণ।

বনে বিপদগ্রস্থদের রক্ষাকত্রী হলো বনোবিবি। কিন্তু বাদাবনের রাজা দক্ষিণরায়। রাজত্ব নিয়ে দু’জনের বৈরিতা চিরন্তন। কিংবদন্তী আনুসারে দক্ষিণরায় (মউলেরা বলে দক্ষিরায়)-র আছে চুরানব্বইটি বাঘ-বাঘিনীর বিশাল বাহিনী। বড়গাজী খাঁ-ই বা কম যায় কিসে, সে তিরিশটি বাঘের দল সাজিয়ে রেখেছে। সে ছিল এক কিংবদন্তী যুগ, একবার দক্ষিণরায় আর বড়গাজী খাঁ-র মধ্যে লাগল ভীষণ যুদ্ধ। হারবার পাত্র নয় কেউ। ভয়ঙ্কর যুদ্ধে বাদাবন, পৃথিবী রসাতলে যায় আর কী। তখন স্বয়ং কৃষ্ণ অর্ধেক হিন্দু, অর্ধেক মুসলমান রূপে দুই বলিয়ানকে থামালেন। সেই থেকে দক্ষিণরায়ের থানের সামনে পিরের মোকামের অধিষ্ঠান। কবি রুদ্রদেবের ‘রায়মঙ্গল’ বনজীবীদের ঠোঁটে ঠোঁটে উচ্চারিত হয়। এখনও পেশাজীবীরা বিশ্বাস করে দক্ষিণরায় আর বড়গাজী খাঁ-র বাঘ মায়াজাল তৈরি করে পাহারা দেয় সুন্দরবন। তাদের কোপে বা মায়াটানে পড়লেই কাহিনি ভেদ করে সত্যি সত্যি উদয় হতে পারে ডোরাকাটা বাঘ মামা। তাই দু’জনকেই পূজা দিয়ে খুশি হয় মউলে জেলেদের।  বাঙালি মউলেরা বাদাবনে গেলে তারা বা বাড়ির  স্বজনরা বলবে না মনে গেছে, বলবে ‘মালে সারছে’। মালের মাটিতে হাত দিয়ে তিনটি মন্ত্র উচ্চারণ করে বনে নামতে হবে বনে। কিন্তু বনের নিয়ম কানুন অত্যন্ত কঠোরভাবে পালনীয়। মালের পবিত্রতা রক্ষিত না হলেই বনবিবির কোপে পরতে হবে তাদের। নারী পুরুষ উভয়েই মহালে চাক ভাঙার কাজে যায়। তারা কখনও জঙ্গলকে অপবিত্র ‘অশুদ্ধ’ ‘নোংরা’ করবে না। তাদের পায়খানা, প্রস্রাব পেলে মার খৈলেন থেকে তিনটি পাতা চেয়ে নেবে। তার উপর মলমূত্র ত্যাগ করবে। কোনোভাবেই সরাসরি বনের মাটিতে শৌচকর্ম নয়। থুতু ফেলা, বিড়ি খেয়ে মাটিতে ফেলা যাবে না। তা হলেও বনভুমি অপবিত্র হয়ে যায়। বনবিবি গোঁসা করবে। জল-জঙ্গল জীবনে ঘনিয়ে আসবে বিপদ। মৌচাক থেকে মধু উবে যাবে। বনবিবি দক্ষিণরায়ের থেকে তো উদ্ধার করবেই না, উপরন্তু নৌকা সুদ্ধ ডুবিয়ে জানপ্রাণ কেড়ে নিতে পারে।

সুন্দরবনে সাঁওতাল, শবর, মুণ্ডা আদিবাসীরাও মহালে যায়। নারী-পুরুষ উভয়েই মধু ভাঙে। আজকাল বাঙালি মহিলারাও মহালে যায়। আদিবাসীদের সংস্কার কিছুটা আলাদা। বনের মাটিতে পা দিয়েই তারা ধরতি আবা-র পূজা করে। গাছের গোড়ায় তিনটি মাটির তাল বানায়। তাদের পূজ্য বাসুলী দেবী। খানিকটা মাকাল ঠাকুরের মতো মাটির ডেলা বা তাল বানায়। আলতা, সিঁদুর, গামছা, মালা লোহার বালা দিয়ে সাজায় পূজ্য বেদীকে।  ভিজে ছোলা, বাতাসা সাজিয়ে নারী-পুরুষ মউলেরা পূজায় বসে। আদিবাসী সমাজে মহিলাদের অবস্থান যথেষ্ট উঁচুতে। মহিলাদের পুরোহিত হতে অসুবিধা নেই। পূজা শেষে প্রসাদ খেতে দেওয়া হয় বাড়ি থেকে নিয়ে আসা লালঝুঁটি মোরগকে। মোরগ প্রসাদে ঠোক্কর দিলে বুঝতে হবে বাসুলী দেবী খুশি হয়েছে। বনের বিপদ কেটে গেছে, মধু মিলবে অঢেল। কিন্তু মোরগ ঠোক্কর না দিলে আদিবাসীরা কিছুতেই বনে প্রবেশ করবে না। ঘোর অশুভ সংকেত। মোরগ কিছু প্রসাদ না খেলে মহাল শেষ না করে তারা ফিরে যাবে। লোকবিশ্বাসের সঙ্গে কিছুতেই আপোষ নয়।

সুন্দরবনের সাঁওতাল পাড়া ভাদ্র মাসে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে করম উৎসব। তাদের অনাদিকালের বৃক্ষ উৎসব। করম পরবের পাঁচ দিন আগে ভাদ্র মাসে শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তীথিতে শুরু হয় জাওয়া দেওয়া। মহিলারা বাঁশ বা বেতের ঝুড়ি, চুপড়ি, কুলোয় নদী থেকে বালি তুলে তাতে ছড়িয়ে দেয় মটর ভুট্টা ছোলা মুগ কলাই বীজ। বীজের জাওয়া দেওয়ার সময় মহিলারা সমবেত কন্ঠে গায় —

ইতি ইতি জাওয়া, না—

কিঁয়া কিঁয়া জাওয়া

জাওয়া জাগালা মাই

জনার বহুল বহু

ছয় বহু রানি

দুই বহু কানি

কানিকে দে মাই

ঘেউলা ভর পানি।

গান গেয়ে তারা বীজের ঘুম ভাঙায়, যেন বীজের মধ্য থেকে অঙ্কুরোদ্‌গম সুগম হয়। প্রতি সন্ধ্যায় মহিলারা কোমর দুলিয়ে নাচে আর প্রার্থনা করে অঙ্কুরোদ্‌গমের।পাঁচদিনে বীজ অঙ্কুরিত হয়ে যায়। একাদশীতে জাওয়া দেওয়া কুলোর পিছনে পাহান প্রতিষ্ঠা করে একটি করম ডাল। বেজে ওঠে শাঁখ, ঢাক, কাঁসর, ধামসা-মাদল। দ্রিম দ্রিম। নতুন চারাদের স্বাগত বাজনা। সবাই নাচের তালে তালে বিভোর হয়ে যায় করম দেবতার মহিমায়। তাদের বিশ্বাস মাঠ ঘাট বন বাদাড়ে সমস্ত বীজের মধ্যে জীবন গজাবে করম দেওতার ছোঁয়ায়। বাদাবনের গাছে গাছে ঝুলে থাকবে টুসটুসে পদ্মমধু।  আসলে প্রকৃতি পূজারী আদিবাসীদের এই বিশ্বাসে জুড়ে আছে কৃষির উন্নয়ন, বিস্তার এবং বসুন্ধরা সমৃদ্ধির মঙ্গল কামনা।

মূলত মৎস্যজীবীদের দেবতা মাকাল ঠাকুর। সে এখন আর বনবিবি, দক্ষিণরায় বা নারায়ণী-র মতো অতটা দাপুটে এই ঠাকুর নয়, কিন্তু জেলেরা বিশ্বাস লোকাচার ধরে রেখেছে । সে অর্থে কোনো রূপই নেই মাকাল ঠাকুরের। মাকাল ঠাকুর জল জঙ্গলের দেবতা। কেউ বলে আটেশ্বর। পূজার স্থান, কাল, পুরুত কিচ্ছু থাকে না। পুকুর, নদী, খালপাড়ে মাটির তিন ধাপের বেদী তার উপর উল্টানো মাটির গ্লাস আকৃতি জোড়া মাটির স্তূপই মাকাল ঠাকুরের স্বরূপ। চারটি তিরকাঠি বেদীর চারপাশে পুতে লাল সুতো দিয়ে বেঁধে বেড়া বানালেই হল। উপরে লাল চাঁদোয়া। ফুল, তুলশিপাতা, বেলপাতা এই সব পূজার প্রচলিত উপকরণ। বাচ্চাদের চুষিকাঠি, ঘুনসি, ধান, দুর্বা ইত্যাদি তার পূজার উপকরণ। প্রসাদের উপাদানও সামান্য: আলোচাল, পাকাকলা আর খান কতক বাতাসা। কিন্তু নতুন কলকে আর গাঁজা না হলে চলবে না, ঠাকুর গোঁসা করবে। জেলেরা চোখ মুদে বিড়বিড় করে বলে —

  পাতাল জলের রাজা: জয় বাবা মাকাল

          শ্বাস বাড়াও বাবা

          মাছ বাড়াও বাবা

          নইলে মোগো ঘরে খরা মন্দা আকাল।

বস্তুত কোনো মন্ত্রতন্ত্র নেই, দলের সর্দার ভক্তি ভরে যা বলে তাই মন্ত্র। মাকাল ঠাকুরের মাথায় চাপানো হয় ফুল, হাওয়ার দোলায় বা যেভাবেই হোক মাথা থেকে ফুল পড়লে মঙ্গল ভাবনায় মশগুল হয়ে যায় প্রান্তজীবীরা জেলেরা। তাদের বিশ্বাস, মাকাল ঠাকুর ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ পাঠাবে। জালে উঠবে প্রচুর প্রচুর মাছ। নদী-খালে, পুকুর উপচে পড়বে মাছে। জলে নামার আগে জেলেরা মাকাল ঠাকুরকে চটায় না। যেহেতু তীথি নক্ষত্র, বামুন, জাঁক জমক নেই তাই ঠাকুরের কৌলিন্য নেই। মাঠঘাটের দেবতায় বন্দি হয়ে আছে। তেমনি মৎস্যজীবীদের মধ্যে চালু আর একটি লোকবিশ্বাস হলো ‘হাতচাল’ পদ্ধতি। নৌ-যাত্রার আগে মা নারায়ণীর আজ্ঞালাভ। মায়ের পায়ে জবাফুল দেওয়া হয়। জবাফুল পদযুগল থেকে গড়িয়ে পড়লে যাত্রা শুভ। তারা সেই জবা শুকিয়ে মাদুলি বানিয়ে হাতে পরে। লোকবিশ্বাস: তুলারাশির লোক সেই মাদুলি হস্তে পরলে তার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে  চলতেই থাকবে।

জেলে-মউলে কউই এক পেশায় সারা বছরের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে না। সুন্দরবনে পেশাজীবীদের মধ্যে মৎস্যজীবীদের সংখ্যা সর্বাধিক। কিন্তু সারা বছর জলে নামা বারণ থাকে, তখন অন্য পেশা বেছে নিতে হয়। মৎস্যজীবীদের কেউ কেউ মধু ভাঙে। অর্থাৎ সব মউলেই মৎস্যজীবী, কৃষিজীবী। স্বাভাবিকভাবে উভয় সম্প্রদায়ের জীবিকায় লৌকিক বিশ্বাসে অনেক মিল আছে। জল-নৌকা-জঙ্গল ঘিরেই তাদের পেশা, তাই নৌকাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য নিষেধাত্বক ট্যাবু গড়ে উঠেছে। জঙ্গলে অবস্থান কালে জেলে-মউলে-বাউলেদের বাড়িতে স্ত্রী-পরিজনের পালনীয় নিষেধাত্বক ট্যাবু নিম্নরূপ :

১। বাড়ির কেউ বলবে না তাদের স্বামী, ছেলে বা পরিজন বনে গেছে। বলবে ‘মালে সারছে’। ভিক্ষুক বা অন্য কাউকে ভিক্ষা-দানধ্যান করবে না। তাদের বিশ্বাস, যমরাজ (অনেকে বলে নাবণ নাজা) ছদ্মবেশে পরিজনের জীবন নিতে ঘুরে বেড়ায়।

২। স্ত্রী আলতা, সিঁদু্‌ পরবে না, সাজবে না।

৩। চিরুনি দিয়ে মাথা ছানে না।

৪। আয়নায় মুখ দর্শন করবে না।

৫। ভাতের হাঁড়ি নিয়ে পুকুরে  যাবে না।

৬। তরকারিতে ফোড়ন দেয় না।

৭। জ্বলন্ত আগুনে লবণ দেবে না।

৮। সকালে উনুনের ছাই ফেলবে না।

৯। বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান পালিত হবে না

১০। রাতে দরজায় খিল দেবে না। তা হলে মালের মায়াবী ঘেরে বন্দি হয়ে পরিজনের অকালে প্রাণ যেতে পারে।

অবশ্য প্রতি শুক্রবার স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যায়। শুদ্ধচিত্তে বনবিবির জহুরনাম পাঠ করতে হয়। বনে জেলে-মউলেরা চুল-দাড়ি কাটবে না। পশু-পাখি-সাপ হত্যা করবে না। প্রতি সন্ধায় ‘সাজন কলসি’তে সাজনদার শুদ্ধচিত্তে কিছুটা মধু তুলে রাখে। সাজন কলসি হল সাজনদারের কলসি। এটা তার নামেই মঙ্গল কলসি। সন্ধ্যায় তারা বনবিবি, কাষ্ঠদেবীর কাছে দোয়া মাঙে। প্রতি শুক্রবার একবেলা মধু ভাঙায় বিরত থাকে দল, কারণ বনবিবি তখন মক্কায় যায় নামাজ পড়তে। সাজনদার জহুরনামা পড়বে। সাজন কলসি সাজনদারের নামে থাকলেও সে একা কখনও ভোগ করে না। ফিরে গিয়ে দলের সকলের সহমতের ভিত্তিতে পূজায় ক্ষীরের পায়েস বানায়, তাতে অবশ্যই সাজনমধু থাকতে হবে। বনবিবির পূজায় জহুরনামা পাঠ করা হয়। সবাই ভোগ গ্রহণ করে। বাউলে অর্থাৎ গুনিনকে যায় নেওয়া হতো আচক-বাচক পালনে। হিন্দু বাউলে হলে তাকে বলে ‘হুকুমের বাউলে’ আর মুসলমান গুনিন হলে তার পরিচিতি ‘কালামের বাউলে’ হিসেবে। তাদের আচার আচরণে, তন্ত্র-মন্ত্রে বিশেষ পার্থক্য নেই। পার্থক্য হলো খানাপিনায়। ‘হুকুমের বাউলে’ কাঁকড়া, কুঁচে, কচ্ছপ সব খেতে পারে কিন্তু ‘কালামের বাউলে’  কাঁকড়া, কুঁচে, কচ্ছপ খায় না। খেলেই নাকি কানে তালা ধরে যায়। সে বেজ্জুতির একশা, চোখ-কান না থাকলে ‘কালামের বাউলে’র থাকেটা কী? নৌকার হিন্দু-মুসলিম মউলেরা থাকলে পাশাপাশি বসে যে যার বিশ্বাসমতে খাবার খেতে আপত্তি নেই। ছোঁয়া ছোঁয়ির বাছ-বিচার নেই। সাম্প্রদায়িকতা নেই। এ বাদেও যাত্রাকালে জেলে-মউলেরা অনেক নঞর্থক নিষেধ বিধি মানে, পথিমধ্যে আগুন দেখলে যাত্রায় বিরতি দেয়,  সামনে কুকুর দর্শনে যাত্রা বিঘ্ন, মা-স্ত্রী-সন্তান নিষেধ করলে বনে যাওয়া যাবে না। যাত্রাকালে নারকেল-কলা-বেল-তাল-কচ্ছপ ও জন্তুর নাম নেওয়া যাবে না। এর কোনোটাই অমান্য করা মানে যাত্রায় অনিশ্চয়তা ডেকে আনা।

বাদাবনের প্রধানত তিন অধিষ্ঠাত্রী; দেবদেবী-বনবিবি, শাহজাঙ্গলী, নারায়ণী। তাদের তুষ্টির উপরই নির্ভর করে মউলেদের ভাগ্য। জঙ্গলের তিন লৌকিক দেব-দেবী যেন হিন্দুর ত্রিনাথ ও খ্রিস্টধর্মের ত্রিত্বের সমান্তরাল। তেমনি সাঁওতালদের ‘মারাংবুরু’ তার ভাই ‘মনিকো’ ও বোন ‘জহুর অরা’ মধ্যেও ত্রিত্বের ছায়া মেলে। সুন্দরবনে ত্রিত্বের উপস্থিতি রয়েছে সর্বত্র। এখানে জঙ্গলমাতা বনবিবি, তার ভাই শাহজঙ্গলী ও কাষ্ঠদেবী নারায়ণী যেন হিন্দুধর্ম ও খ্রিস্টধর্মের সম্পূরক। জঙ্গলে পা রেখে বাউলে-মউলেরা বনাচার লৌকিক-অলৌকিক সংস্কার পালন করে কাঙ্খিত ফলের আশায়। সুন্দরবনে বেশ কিছু দরিদ্র খ্রিস্টান পরিবার জেলে-মউলের কাজ করে। তারা চার্চে ঈশ্বর, পুত্র, এবং স্প্রিটে (আত্মা) বিশ্বাস করে অর্থাৎ ত্রি-ত্ববাদে বিশ্বাসী। ধর্মমতে তারা যিশু বা মেরীর উপাসক। কিন্তু তারা যখন জঙ্গলে যায় তখন তারা মা মেরীর পরিবর্তে মা বনবিবি, দাক্ষিণরায়, কাষ্ঠদেবীর কাছেই প্রার্থনা করে।

সুন্দরবনের পেশাজীবী সম্প্রদায়ের বাককেন্দ্রিক ট্যাবু শব্দও কম নয়। নিষেধ-বিধি অর্থে ট্যাবু’র প্রথম ব্যবহার করেছিলেন সিগমুণ্ড ফ্রয়েড। সুন্দরবনে অসংখ্য ট্যাবু শব্দ প্রচলিত আছে। ট্যাবুশব্দ আলোচনা সমাজবিজ্ঞান-নৃতত্ত্বর অঙ্গ। তেমন কিছু প্রচলিত শব্দ ও মানের উল্লেখ করা হলো। মাল–বন, জঙ্গল-বাগান (মা বনবিবি, নারায়ণী, বিশালক্ষ্মীর আবাসকে তারা জঙ্গল বলে না), মালে সারা-বনে যাওয়া, খৈলেন-খামার (জঙ্গল), খামার-জঙ্গল, মংলাজ-ফকির, সুজোন-নদীর গতির দিক, মাছি-মৌমাছি, পোকা-মৌমাছি, ডাঁশ-মৌমাছি, আচোক বাচোক-রীতি নীত, কাষ্ঠদেবী-নৌকা, পাড়া-জঙ্গল, হাজত-পূজা করা বা নাম কীর্তন, বাঘ-বাবু/বড়মিঞা/মামা, কাঠের গুঁড়ি -কুমির, ঘেউ-জংলি কুকুর, বাও-বাতাস, সাজন-মৌমাছির ঝাঁক। আবার গামাগাছ-হয়ে যায় নারী গাছ। সে যেন নারায়ণী/বনবিবির প্রতীক। তেমনি বানী গাছ পুরুষ, সে আটেশ্বরের প্রতীক। কু কু (কুঁই কুঁই)-জঙ্গেলে দলছুট ব্যাক্তিকে ডাকা। কারও নাম ধরে ডাকা হয় না। তা হলে দক্ষিণরায় (এখানে বাঘ, টোটেম) নাম অনুসরণ করে পৌঁছে যায় তার কাছে। আবার যেখানে মোবাইল কাজ করে না সেখানে আদিম যোগাযোগের মাধ্যমও, মউলেদের বাগানে অবস্থান জানানো বা সতর্কবার্তা পাঠানোর মাধ্যম। গাঙনেয়ে তাদের সতর্ক করে দেয়, কু-কু শব্দের গণ্ডি পেরিয়ে গভীর বনে ঢুকবে না। মউলেরা মৌচাক পেলেও কু কু বা আল্লা আল্লা আওয়াজ করে। আচোক-বাচোকে দখনের ‘নে’ ‘নি’ বা নঞর্থক শব্দবন্ধ তৈরি হয় বাদাবনের পেশাজীবীদের কাথায়। যাসনে, যাবনি, খাবনি, যাসনি। সুন্দরবনে উপভাষায় মিশেছে ওপার বাংলার শব্দ, দক্ষীণ ২৪ পরগণার নিজস্ব শব্দ, মেদিনীপুরের শব্দ এবং মুণ্ডারি শব্দ। আচোক-বাচোকেও তার সম উপস্থিতি রয়েছে। পেশাজীবীদের যাপিত শব্দ থেকে বৃক্ষ, জল, বনবিবি, দক্ষিণরায়, কাষ্ঠদেবী (নৌকা), মাল ইত্যাদির একটি জীবিত মঙ্গলবোধক, অমঙ্গলবোধক বিশ্বাসে জীবিত সত্তা আছে। দৃশ্য, অদৃশ্য বস্তুর জীবিত ম্যাজিক শক্তিকল্প হলো টোটেম (Totem)… ‘টোটেমত্বের মধ্যে অবশ্যই বিভিন্ন মাত্রায় ধর্মীয় বস্তু যুক্ত হতে পারে, যা যাদুর সঙ্গে মিলিত হয়ে ফিরে আসতে পারে। ঘনঘন বিভিন্ন ধরনের বিশ্বাস অন্য বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে টোটেমত্ব তৈরি হয়, যেমন পূর্বসূরীদের প্রার্থনা, আত্মার ধারণা অথবা অ্যানিমিজম।’১০ এসবের পরিচয় আমরা সুন্দরবনের লোকবিশ্বাসে পেয়েছি।

পূর্বেই বলা হ্যেছে সুন্দরবনে জেলেরা বৃহত্তম পেশাজীবী। জল জঙ্গল ঘিরেই তাদের পেশা জীবন। জঙ্গল-নদী-নালা-খাঁড়ি-ঝোরা ইত্যাদি বন ও জলাশয় তাদের মৎস্য শিকারের ক্ষেত্র। স্বাভাবিকভাবে মৌলেদের মতো জেলেদের পেশাবিপদ প্রায় সমান। জলের মতি-গতি, জোয়ার-ভাটা-গোণ নির্ভর তাদের আয়ের উৎস তালাশ। জল-নৌকা-জাল কেন্দ্রিক তাদের লোকাচারেরও অভাব নেই। নৌকা-জল নিয়ে তাদের সংস্কার মউলেদের মতো প্রায় সমগোত্রীয়। গলুই পূজা, নৌকা বরণ, বুড়োঠাকরানির পূজা, হরির লুট ইত্যাদি উভয় সম্প্রদায়ই করে থাকে। নৌকায় সবচেয়ে বেশি দরকার শুদ্ধাচার, কোনোভাবেই পাপাচার, অনাচার, যৌনাচার করে কাষ্ঠদেবীকে বিষ নজরে পড়া যাবে না। নৌকায় মহিলারা থাকলেও নৌকায় যৌনাচার নিষিদ্ধ। নৌকায় অনাচার করলেই নৌকার নিচে ক্যাঁ-ক্যাঁ (গর্জন) আওয়াজ উঠবে। নৌকা মোচার খোলার মতো নাচাবে এবং কাষ্টদেবী নৌকা ডুবিয়েও দিতে পারে। তখন নারায়ণী-বনবিবি-মাংলাজ ফকিরের দোয়া মাঙতে হবে। কাষ্ঠদেবীর কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। মেয়েরা শুভদিনে নদীতে গিয়ে তেল-সিঁদুর দেবে। তারা শঙ্খ বাজাতে বাজাতে নদী তীরে আসে, নদীর জলে তেল-সিঁদুর-পান-সুপারি দিয়ে পুরুষের জল-জঙ্গলেযাত্রায় মঙ্গল কামানা করে। নদী-সমুদ্রে থাকালীন বিপদের আশংকা দেখা দিলে তারা শণি, গঙ্গা, নারায়ণ অথবা গাজী সাহেবের নামে মানত ধরে। নিরাপদে ফিরতে পারলে নির্দিষ্ট অংকের টাকার পূজা দেবে। তেমনি জাল-নৌকা অন্যান্য সরঞ্জমে যখন অশুভ প্রভাব পড়ে, তাকে শুদ্ধির জন্য হলুদ গোলা জল জাল-নৌকা-হাঁড়িকুড়িতে মাখিয়ে দেয়, এমনকি জাল পাতার জায়গা হলুদ দিয়ে দোষ কাটানো হয়। হাজার সংস্কার বাঁচে জেলে মৌলেদের অনিশ্চিত জীবন।

মাঙ্গলী, পশু শিকারি, হাঙর কুমির শিকারি, সানা, সর্প ও তারকেল (গোসাপ) শিকারের মতো এমন অনেক পেশা প্রায় সুন্দরবনসহ দেশ থেকে ক্রমশ অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। পেশাজীবীদের বংশ পরম্পরায় যাপিত পেশা অবলুপ্ত হলেই কালক্রমে তাদের লোকাচার, সংস্কারও অবলুপ্ত হয়ে যায়। পেশা কেন্দ্রিক লোকাচার, লোকবিশ্বাস, আচার-অচরণ, আচোক-বাচোক বাঁচে। পেশার জীবিত সত্তা না থাকলে আপন ক্ষমতায় লোকবিশ্বাস সাধারণত বাঁচতে পারে না। মানুষের ধর্ম যেমন তার অনুসারী না থাকলে ধর্মবিশ্বাস থাকে না তেমনি দেবদেবীরও অবলুপ্তি ঘটে। যেমন গ্রীক দেবদেবীর পূজা আজকাল আর কেউ করে না। মহাশক্তিমান ‘জিউস’ মৃত। লোকবিশ্বাস বাঁচে পেশার অস্তিত্বে। সুন্দরবনেও বিশ্বায়নের হাওয়া লেগেছে। বিশ্বায়নের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে সামাজিক বিন্যাসে। তবে প্রান্তিক পেশাজীবীদের বিপন্নতায় খুব বেশি হেরফের হয়নি। আগে নাকি দুই একটি বিধবা গ্রাম ছিল এখন সারা সুন্দরবনই বিধবা গ্রাম। মৃত্যুর হাহাকার সর্বত্র। তাই এত বিশাল সংখ্যক দুর্ঘটনাগ্রস্থ জেলে-মউলেদের বিধবা স্ত্রীদের বাস সুন্দরবনে। বৈধব্যের কত রকম ফের: শাঁখা-সিঁদুর পরা বিধবা (তাদের স্বামীরা  জঙ্গল থেকে আর ঘরে ফেরেনি, বিশ্বাস একদিন ফিরে আসবে তাই সধবার আচরণ, বেশভূষা ধারণ করে থাকে), বুড়ি-বিধবা, কুমারী-বিধবা (যাদের বিয়ে ঠিক হয়েছিল কিন্তু পাত্র বিয়ের আগে বনে গিয়ে মারা গেছে), গর্ভবতী বিধবা (যাদের বিবাহিত জীবনের বয়স মাত্র এক বছরের কম, বা স্বামীর মৃত্যুকালে স্ত্রীর গর্ভে বাচ্চা ছিল), হিন্দু বিধবা, মুসলিম বিধবা, খ্রিস্টান বিধবা, পুরুষ বিধবা (যাদের স্ত্রী কুমিরে নিয়ে গেছে), প্রতিবন্ধী বিধবা (যাদের স্বামীরা বাঘ/কুমিরের আক্রমণে স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে)। এমন হাজার বিধবার ক্রন্দনরোল প্রতিদিন সুন্দরবনের বাতাস ভারী হয়ে থাক।১১ সুন্দরবন ভয়-ভীতি মুক্ত হয় নয়, হবেও না যতদিন প্রান্তজনেরা বিপজ্জনক পেশায় যুক্ত থাকবে। ফলত লোকাচার ও লোকবিশ্বাসও থাকবে। কিন্তু সুন্দরবনে লোকাচার, লোকবিশ্বাসে সবচেয়ে ঐতিহ্যগত দিক হলো হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি। ঘরে বা সমাজ জীবনে যারা মতুয়া, বৈষ্ণব, শৈব বা শিয়া-সুন্নি, দলিত খ্রিস্টান জল-জঙ্গলে তারা বনবিবি, বিশালক্ষ্মী, নারায়ণী, দক্ষিণরায়, সত্যপীর, গাজি-পীরের পূজারী বা হাজতকারী। তাদের বাচনে এবং যাপনে সুন্দরবনের অসাম্প্রদায়িক মিশ্র সংস্কার। ১৯৪৭-এর পর থেকে দ্বিজাতি তত্ত্বের সাম্প্রদায়িক ভূত এসে পৌঁছেছে সুন্দরবনেও। উপমহাদেশে ধর্মীয় বিভাজনরেখা যত তীব্র হচ্ছে, তার প্রভাব পড়ছে জল-জঙ্গলে। লোকাচারগুলি ধর্মীয় সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার বিশ্লেষণ করছে কোনো কোনো ‘ভদ্রনোক’। তাই লোকবিশ্বাসে কিছুটা হলেও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিষ বাতাস লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। তবুও একটাই আশার কথা প্রান্তিক জল-জঙ্গলজীবীদের লোকদেব-দেবী, লোকবিশ্বাস এখনও অসাম্প্রদায়িক।

প্রাচীন কাল থেকে বনের রাজ সিংহাসনে ছিল বাঘের অধীষ্ঠান। জঙ্গলের ভয়ঙ্কর সুন্দর ব্যাঘ্রসুন্দরই ছিল রাজা।শুধু ব্যাঘ্র পুরাণেই নয়, সিন্ধুসভ্যতায়ও তার পরিচয় মেলে। সে-ই যে জঙ্গলের রক্ষক, মউলেরাও তা মানে। তারা বাঘের ক্ষতি চায় না, রক্ষাশক্তি চায়। জঙ্গল না থাকলে পেশার অস্তিস্ব থাকবে না। জাতকে চমৎকার একটি গল্প আছে। বোধিসত্ত্ব একবার বৃক্ষ হয়ে জন্মেছিলেন। একদিন বনদেবী বোধিসত্ত্বের কাছে এসে বাঘকে তাড়িয়ে দেবার আর্জি জানালেন। বোধিসত্ত্ব ববলেন –‘আমরা বনে টিকে আছি তা তো বাঘের জন্যই।‘ বোধিসত্ত্বের জ্ঞানে তিতিবিরক্ত হয়ে বনদেবী উগ্রমূর্তি ধারণ করে বাঘদের বন থেকে তাড়িয়ে দিল। রটে গেল বনে বাঘ মামা নেই। সবাই দাঁ কুড়ল নিয়ে ছুটে এলো বন কাটতে। বনদেবী নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার বাঘদের ডেকে নিয়ে এলো। রক্ষা পেল অরণ্য প্রকৃতি।১২ জাতকের গল্পে প্রাকৃতিক ভারসম্যের উপাদার আছে। জঙ্গলজীবীদের কাছেও দক্ষিণরায়, বনদেবী আর বিপন্নতা নিয়েই যে জীবন তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা বিশ্বাসে তা মানে। ভবিতব্য জেনেও তারা বংশ পরম্পরায় মৃত্যুর সাওয়ারী হয়ে বনে যায়।

তথ্যসূত্র :

১। William Graham Sumner, Folkways, Dover Publication, Inc. New York, p-21.

২। পল্লব সেনগুপ্ত, লোক সংস্কৃতির সীমানা ও স্বরূপ, পুস্তক বিপনণ, কলকাতা, পৃ-৪৭।

৩। শঙ্করকুমার প্রামাণিক, সুন্দরবনের মৌলেদের কথা (২০১৯), গাঙচিল, কলকাতা, পৃ-৫৭।

৪। শঙ্করকুমার প্রামাণিক, সুন্দরবন: জল-জঙ্গল-জীবন, সাহিত্য প্রকাশ, কলকাতা, পৃ-২৭।

৫। সসীমকুমার বাড়ৈ, মধুভাণ্ডার-মৌবনে অসনী সংকেত, এবং জলঘড়ি, এপ্রিল-নভেম্বর ২০২০ সংখ্যা, পৃ-২৯১।

৬। বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা: বাগেরহাট (২০১৪), বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃ-৩২৩।

৭। সসীমকুমার বাড়ৈ, সুন্দরবনের মহাল কইন্যা (২০২১), একুশ শতক, কলকাতা, পৃ-৫১।

৮। ড. শেখ রেজওয়ানুল ইসলাম, সুন্দরবনের জনসমাজ ও আধুনিক সাহিত্য (২০২১), সমকালের জিয়নকাঠি প্রকাশন, জীবনমণ্ডল হাট, পৃ-৩৩।

৯। মুকুন্দ গায়েন, বাদাবনের আচোক বাচোক ও মন্তর তন্তর, শুধু সন্দরবন, পৃ-২৭ থেকে ৩০।

১০। http://en.Wikipedia, org/wiki/Toemism, Feb 2011.

১১। সুরঞ্জন মিদ্দে, বিপন্ন বাঘ: নিরন্ন বিধবা (২০২২), একুশ শতক, কলকাতা, পৃ-১৪১।

১২। সুরঞ্জন মিদ্দে, প্রাগুক্ত, পৃ-১৫।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev