স্বাধীনতার ২৬ বছর পর দেশের উত্তরাখণ্ডে কারখানা নির্মানের উদ্যোগ শুরু হয়। তার জন্য কাটতে হবে প্রায় শ’খানেক গাছ। কিন্তু সেই কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন গ্রামের দুই যুবক সুন্দরলাল বহুগুণা ও চণ্ডীপ্রসাদ ভট্ট। তাঁরা গাছকে জড়িয়ে ধরে বিরোধিতা করলেন। কিছুতেই কাটা যাবে না গাছ, যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে গাছ, রক্ষা করতে হবে বন।
এরও বছর দশ আগে এই আন্দোলনের শুরু। তখন উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলি বেশ উন্নত হচ্ছিল। চীন-ভারত যুদ্ধের কারণে তৈরি রাস্তাগুলি বিদেশি সংস্থাদের বেশ নজর কাড়ছিল। তারা ওই অঞ্চলের বনজসম্পদ দখল করতে সরকারের অনুমতি চাইছিল। যেখানে আদিবাসীদের জীবনধারণের জন্য বনজ সম্পদের ১০ শতাংশও ভোগ করতে দেওয়া হত না সেখানে বিদেশি সংস্থা বৃক্ষনিধন শুরু করে দেয়। এর ফলে কৃষির ফলন কমে, মাটি ক্ষয়, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে ওই অঞ্চলগুলিতে। বাধ্য হয়ে উত্তরাখণ্ডের চামেলি জেলায় গ্রামবাসীরা আন্দোলন শুরু করে। পরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
অবশ্য এরও দুশো বছর আগে রাজস্থানের খেজারিলি গ্রামে রাজপ্রাসাদ গড়তে মেওয়ারের রাজা অভয় সিং গাছ কাটা শুরু করলে রুখে দাঁড়ান তিন সন্তানের মা অমৃতা দেবী। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ওই গ্রামের বিষ্ণোয়ই সম্প্রদায়ের লোকেরা। তাঁরাও গাছের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে রেখে শুরু করেন প্রতিবাদ। আর ওই ভাবেই রাজার সৈন্যদের হাতে প্রাণ দেন ৩৬৩ জন বিষ্ণোয়ই সম্প্রদায়ের মানুষ।

সত্তরের দশকের গোঁড়ায় সরকার উত্তরাখণ্ডে দু’হাজার গাছ কাটতে শুরু করলে বিক্ষোভ শুরু হয়। গান্ধীবাদী সমাজকর্মী চণ্ডী প্রসাদ ভট্ট স্থানীয় গ্রামবাসীদের জন্য দশোলী গ্রাম্য স্বরাজ্য সংঘ নামে একটি ক্ষুদ্র সমবায় সংস্থা গড়ে তোলেন। সুন্দরলাল বহুগুণা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে নারী, পুরুষ, ছাত্রদের বিক্ষোভে আহ্বান জানান। সত্তর দশকের শেষ পর্যন্ত কয়েকশো চিপকো আন্দোলনে জড়িয়ে ছিলেন। ওই সময়ে উত্তরাখণ্ডে গাছ বাঁচাতে ছোটখাট বহু বিক্ষোভ হয়। আশির দশকের একেবারে গোঁড়ায় সুন্দরলাল বহুগুণা ও আরও কয়েকজন নেতা ভাগীরথী নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতা করেন; যা পরবর্তীকালে ‘বীজ বাঁচাও আন্দোলন’ নামে পরিচিত। যা আজও শেষ হয়নি।
ওই অঞ্চলের কৃষিকাজে মহিলারা যুক্ত থাকায় তারা ওই বিক্ষোভে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল। পৃথিবীজুড়ে আজ উষ্ণতা নিয়ে যে পরিবেশ আন্দোলন চলছে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। সেই যাত্রা পথের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো চিপকো আন্দোলন। কুমায়ুন গাড়োয়ালের পাহাড়ি অরণ্যের কত নাম না জানা গাছ গাছালির ফাঁকে দমকা হাওয়ার ঝড় তুলেছিলেন চিপকো আন্দোলনের জনক সুন্দরলাল বহুগুণা।
হিমালয়ের বনভূমি যেদিন বিপদের মুখে, যে বিপদ কেবল হিমালয়কেই নয়, বিধস্ত করবে গোটা দেশের জনজীবন। সেই বিধ্বংসী সঙ্কটকে রুখে দেবার তাগিদেই সারা গাড়োয়ালের মানুষজনকে পরিবেশ আন্দোলনের দিকে টেনে এনেছিলেন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পড়া, শান্ত-দীপ্ত চেহারার, সাদা দাড়ি আর মাথায় সাদা ফেট্টি বাঁধা মুখে বলিরেখা ছাপওয়ালা মানুষটি।
সরকারি পক্ষের বনসৃজন প্রকল্পে ইউক্যালিপটাস সম্পর্কে বলেছিলেন, ওই গাছ পালপ, প্লাইউড ও কাগজ শিল্পের কাঁচামাল। অভিজাত মহলের প্রয়োজন মেটায়, কিন্তু মাটির জলস্তরকে নীচে নামিয়ে দেয়, গবাদি পশুও ওই গাছের পাতা খায় না, কীটপতঙ্গ ও পাখি ওই গাছে বাসা বাঁধে না। তারমানে কোনও বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে না। দেশের প্রায় তিন চতুর্থাংশ শিশু খাদ্য ও ভিটামিনের অভাবে অপুষ্টির শিকার। আম, জাম, কাঁঠাল গাছ লাগালে ক্ষতি কি?

সুন্দরলাল বহুগুণা দেরাদুন জেলায় যমুনা নদীর উপর লেহাওয়ার বাঁধ ও গাড়োয়াল জেলায় ভাগীরথী নদীর ওপর তেহরি বাঁধ তৈরির কাজে বিরোধিতা করে বলেছিলেন, ওই বাঁধ হলে জলাধারের বিস্তৃত এলাকা জলমগ্ন হবে। বহু প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ নিশ্চিহ্ন হবে। বিশাল জলরাশির চাপে ভূ-স্তরে ফাটল ধরবে নদীতে বাঁধ দিয়ে জলাধার তৈরি করলে। সেই ফাটল পথে জলাধারের জল মাটির ভিতরে ঢুকে বাষ্পায়িত হয়ে ফের বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য ঊর্ধ্বমুখী চাপের সৃষ্টি করবে। ভূমিকম্পন হবে। ১৯৬৭ সালে মহারাষ্ট্রের কয়নানগরে কয়নাবাঁধের জলাধারের চাপে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এমনিতেই ভূ-কম্প প্রবণ। ভূতত্ববিদদের মতে, ভূমিকম্পের তীব্রতা ৭ রিখটারের বেশি হলে তেহরি বাঁধ থেকে ব্যাপক ধ্বংসের আশঙ্কা রয়েছে। যে শক্তির পরিমাণ হিরোশিমার পারমাণবিক বোমার চেয়ে ১০ গুণ বেশি। তেহরি বাঁধের ফলে গঙ্গাও নির্জীব হয়ে পড়বে।
গঙ্গা দূষণ রোধে সরকারি ব্যবস্থাগুলির সমালোচনা করে বহুগুণা বলেছিলেন, সরকার ‘গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান’-এ ইতিমধ্যে ৫০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। যার বেশিটাই জলে গেছে। বিদেশ থেকে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এসেছে। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলি গোড়া কেটে গাছের মাথায় জল দেওয়ার মতো। দূষণকারী শিল্পগুলি দূষণ করেই চলছে। পরিবেশ দূষণ আটকাতে গেলে চাই জনগণের আন্তরিক প্রচেষ্টা। সাধারণ মানুষকে দূষণের মারাত্মক পরিণতি সম্বন্ধে সচেতন করতে হবে। ভারতবাসীর ধর্মীয় আবেগ ও সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ রেখেই সচেতনতার অভিযান করতে হবে। কারণ তারা হাজার বছর ধরে সেই আবেগ বহন করে চলছে। যে ভাববাদ আপামর জীবকূলের মঙ্গল আনে তা ধ্বংসাত্মক বস্তুবাদের চেয়ে অনেকবেশি গ্রহণীয়। শুধু অর্থ দিয়ে হবে না, বোধ দিয়ে রোধ করতে হবে পরিবেশ দূষণ। সুন্দরলাল বহুগুণার একটি কথাও সরকার কানে নেয় নি, কিন্তু পরিবেশ বিজ্ঞানীরা তাঁর সঙ্গে একমত।
এই লেখাটি থেকে পরিবশ আন্দোলন নিয়ে অনেক কিছুই জানলাম, ধন্যবাদ
মূল্যবান উপস্থাপনা। প্রামাণ্য বিষয়কে যথাযথ ভাবে তুলে ধরা লেখকের মুন্সিয়ানার পরিচায়ক।
তথ্যসমৃদ্ধ এই লেখায় লেখকের যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
ছোট বেলায় দেখতাম বড়দের বড়দের আলোচনা করতে, আজ পুরোটা জেনে সমৃদ্ধ হলাম।
এই আন্দোলনটা সম্ভবত 1973 এইরকম সময় হয়েছিল, এবং বাড়িতে বড়দের আলোচনা করতে শুনেছিলাম, তাই স্মৃতিতে
আছে।
মনে পড়ে গেল আন্দোলনটির কথা। ছোটবেলায় খবরের কাগজে পড়া। লেখাটি ভালো হয়েছে।