‘সানডে হো ইয়া মানডে, রোজ খাও আন্ডে’… এই আন্ডা বা ডিম বাঙালির হেঁসেলের সৌরভ গাঙ্গুলী, যার দাদাগিরি চলে ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে ভাতের পাতে, বিকালের স্নাক্স আইটেমে আর ডিনারে এগকারি অবতারে। সন্তানের পুষ্টি নিয়ে চিন্তিত মায়ের ফুড চার্টে বা দূরপাল্লার যাত্রীর খাবারের কৌটোয় বা অসময়ে অতিথি আগমনে বা স্পোর্টসের মাঠে টিফিনের বাক্সে কাঁচা পাউরুটি, কলার সঙ্গে অথবা অপটু রাঁধুনীর ত্রাতার ভূমিকায় এর অবদান অনস্বীকার্য; কিছুটা ‘রায়-মার্টিনের’ বইয়ের মতো। জীবনের বিভিন্ন আবেগের সাক্ষী এই মুরগী বা হাঁসের ডিম।
যুগে যুগে ভোজনরসিক মানুষ পুষ্টিগুণে ভরপুর ডিমের মাধ্যমে নিজেদের প্রাত্যহিক খাদ্যের চাহিদা মিটেয়ে এসেছে। প্রোটিন ফ্যাট থেকে শুরু করে ক্যালসিয়াম আয়রনের মত মিনারেলসের আকর এটি। তাই বিভিন্ন খাদ্যবস্তুকে পিছনে ঠেলে ডিম মানুষের পাতে জায়গা করে নিয়েছে। পেলব আলু, গোটা ডিমের লাল-হলুদ ঝোল কিম্বা মামুলি শশা, পিঁয়াজ, কাঁচালঙ্কার কুচি পেটের মধ্যে পুরে ময়দার পরোটায় ডিম মাখিয়ে এগরোলের স্বাদ চাখেনি এমন ভোজনরসিকের সংখ্যা নিতান্তই কম। মিশর এবং চীন থেকে পাওয়া রেকর্ড অনুসারে, ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পাখির ডিম মানুষ তার খাওয়ার জন্য প্রথম ব্যবহার করে।

ডিম, পিঁয়াজ কুঁচি, কাঁচা লঙ্কা কুঁচি ও নুন দিয়ে বানানো বাঙালির ঘরে যাকে বলে ডিমভাজা, সেটি আবার মামলেট বা ওমলেট নামে খ্যাত অন্য সংস্কৃতিতে।
কিংবদন্তি অনুসারে, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তার সেনাবাহিনী নিয়ে দক্ষিণ ফ্রান্স দিয়ে যাত্রা করছিলেন, সেখানে বেসিয়ারেসের কাছে একটি সরাইখানায় জীবনে প্রথম একটি পুরু সুস্বাদু অমলেট খেয়েছিলেন এবং তিনি এতটাই তৃপ্ত হয়েছিলেন যে পরের দিনই আদেশ দিলেন, গ্রামের সব বাড়ী থেকে ডিম সংগ্রহ করে তার সৈন্যদের জন্য একটি বিশাল আকারের ওমলেট তৈরি করার জন্য। তার পর থেকেই নাকি ফ্রান্সে ইস্টারে ওমলেট খাওয়ার ট্রাডিসন পরিণত হয়েছে। সাহেবদের নামে কেবল বদনাম দিয়ে ‘নেপোয় মারে দই’ বললেই চলবে না, তার বদলে তারাও যে ‘ওমলেট’ উপহার দিয়ে গেছেন, মানতেই হবে।

আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারে ডিম। ৫০ গ্রাম ওজনের একটি ডিমে মোটামুটি ৬.৩ গ্রাম প্রোটিন থাকে। ডিমের অন্যতম উপাদান হলো কোলেস্টরেল। একটি ডিমে প্রায় ১৮৬ মিলিগ্রাম কোলেস্টরেল থাকে যা শরীরের প্রতিটি কোষের দেওয়াল তৈরি করতে সাহায্য করে। ডিমে কার্বোহাইড্রেট প্রায় থাকে না বললেই চলে ।তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটা করে গোটা ডিম রোজ খাওয়া যেতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীর কোলেস্টরেল সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে রোজ ডিমের সাদা অংশ খাওয়া যেতে পারে।
অনেকেই বলে থাকেন ডিম নাকি পেট গরম করে, তাই ডায়রিয়া হলে ডিম খেতে নেই। ডায়রিয়া হলে দুগ্ধজাতীয় খাবার খেলে বদহজম-সহ অন্যান্য সমস্যা দেখা দেয়। এই সময় শরীরে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে ডিম। সহজপাচ্য এই প্রোটিন দেহে খুব সহজেই গৃহীত হয়। মনে রাখবেন ডিম সব সময় ফুটিয়ে ভালো করে সেদ্ধ করে খেতে হবে। অর্ধ সিদ্ধ ডিম খেলে পেটের নানান সমস্যা হতে পারে। অনেকেই ডিমে নুন দিয়ে খেতে ভালোবাসেন স্বাদের জন্য। কিন্তু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাই কোলেস্টরেল-সহ অন্যান্য জটিল অসুখ থাকলে নুন না খাওয়াই ভালো।

ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে খেতে চান অনেকেই। বর্তমানে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রতিদিন কুসুম-সহ একটি ডিম সবার জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর (বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া)। কুসুমের মধ্যে পুরো ডিমের প্রায় অর্ধেক পুষ্টি উপাদান থাকে। কুসুমের মধ্যে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আইরন, উপকারী বায়োটিন, ভিটামিন এ-ডি-ই, লেটিইন, ফলেট, কলিন এবং জি-অ্যাকজানথাইন থাকে। আমদের খাদ্য তালিকায় প্রতিদিন যে প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা আছে, তা সহজেই সুলভ বাজেটে মেটাতে পারে ডিম।
হাফ ডিমের ব্যাপারটা আজো বড় রহস্যময় আমার কাছে। আশির দশকের গোড়ায় দেখা যেতো, যতই নিম্নবিত্ত পরিবার হোক না কেন রবিবার ছিলো মাংস খাওয়ার দিন। তাও আবার মহার্ঘ্য খাসির মাংস। অথচ তস্য তস্য সস্তা ডিম সুতো দিয়ে কেটে অর্ধেক কেন দেওয়া হতো, তা আজো আমার কাছে রহস্যময়। ডিমের সঙ্গে যৌনতার কোন সম্পর্ক আছে ….এই ধরনের কোন ধারণা কাজ করতো কিনা জানা নেই। তবে হাফ টিকিট ও হাফ ডিমের সঙ্গে আমার আশৈশব আত্মীয়তা। দুটি ক্ষেত্রেই হাফ থেকে ফুল এ উত্তরণ এক চমৎকার অভিজ্ঞতা। যেন ম্যাচিওর হওয়ার ছাড়পত্র।

সাহিত্যিকেরা তাঁদের লেখায় ডিম কে পূর্ন মর্যাদা দিয়েছেন। শুধু সাহিত্যে নয়, রাজনীতির ময়দানে তর্কের স্থান দখল করে নিয়েছে ডিম। ব্রিগেডের জনসভায় ডিমভাত নিউজ চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে দিয়েছিলো। মিড ডে মিলে ডিমের উপস্থিতি বিতর্কের সৃষ্টি করেছে বারবার।
বাজার থেকে টাটকা ডিম কেনার জন্য একটু ঝাঁকিয়ে দেখা হয় কারণ পচা ডিমে নাকি শব্দ আসে। আলোর সামনে ডিম ধরলে ভিতরে রিংয়ের মতো দেখতে পান তবে বুঝতে হবে পচন ধরা শুরু হয়েছে। ডিম কতটা টাটকা জানতে চাইলে ছোটবেলার বিজ্ঞান বইয়ের জ্ঞান অনুযায়ী ডিমকে জলে ডুবিয়ে পরীক্ষা করা তো রয়েছেই। ডুবলে টাটকা, ভাসলে পচা। এত উপায় জানার মধ্যেও একটি কিন্তু রয়েছে। এই বিষয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক তারাপদ রায়ের লেখা একটি গল্প বলি, যা গল্প কম বাস্তব বেশি…

“বাজার থেকে একটি ডিম কিনে এনেছিলাম। বাসায় এসে দেখি সেটা পচা। দোকানে ফেরৎ দিতে গিয়ে দোকানদারের ওপর খুব রাগারাগি করলাম।
বুড়ো দোকানদার অনেকক্ষণ চুপ করে বসে গালাগাল খেয়ে তারপর হাত তুলে আমাকে থামিয়ে তার ডিমের ঝুড়ির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়ে আমাকে করুন কণ্ঠে বললেন, ‘স্যার, আপনার মাত্র একটা পচা ডিম তাই এত রাগারাগি করছেন আর আমার ঝুড়ি ভর্তি পচা ডিম আমি কী করি বলুন তো?’
আমার এই ডিমের গল্প পড়ে বাজার থেকে পচা ডিম কিনে কারোর যদি মাথাগরম হয়, দয়া করে ওই বুড়ো দোকানদারের কথাটা স্মরণ রাখবেন।

ডিমের জন্মবৃত্তান্ত বিতর্কিত হলেও এর চরণচিহ্ন আঁকা আছে পরীক্ষা হলে, সাহিত্যে, রাজনীতির তরজায়, যাপনের অংশ হিসাবে। ‘ঘোড়ার ডিমের’ কথা বাদ দিয়ে বরং জাতীয় ডিম দিবসে (National Egg Day) রকমারি রান্না দিয়ে চেনা ডিমকে অন্যভাবে পরিবেশন করুন নিজ গুণে।
ডিম আমার সব থেকে বেশি পছন্দের খাবার। একবারে দুটি না হলে মন খারাপ লাগে।
বাহ, চমৎকার, জনপ্রিয়তার শীর্ষে ডিম নিয়ে এতো সুন্দর রেসিপি, অবাক করে দিলো, ভীষণ সুন্দর বিন্যাস।
ডিমে আমার দুর্বলতা, সকালে অন্তত একটা ডিমসেদ্ধ আমার চাই রোজ। আগে তো ঠান্ডার সময়ে দুটো ডিমসেদ্ধ লাগত সকালে, খেলাধুলা করতাম, খেলে অসুবিধা হতো না,বছর দশ পনের আগে ডাক্তারের আপত্তি তে সপ্তাহে একটা করে বরাদ্দ হয়, বছর কয়েক মানতে হয়, বাইরে পেলে খেয়ে নিতাম। বাড়িতে এটা নিয়ে অশান্তি ও হতো, আমি ডাক্তারের কথা মানতে চাইতাম না।
এখন রোজ সকালে জলখাবার একটা থাকবেই।
বছরে একবার ব্লাড টেস্ট করাই, সব ঠিকই থাকে