আমাদের প্রায় বাড়ির পাশেই সুন্দরবন। কিন্তু সৌন্দর্য নয়, তার নাম শুধু আমাদের কানে আসে কখনও ইয়াস, কখনও আমফান, কখনও বা অপরাধ কিংবা মানুষের সীমাহীন দুর্নীতি আর প্রকৃতিকে লুটপাট করার সূত্রে। লঞ্চ থেকে এক আধবার বাঘ দেখার আহ্লাদ কিংবা বাঘের আক্রমণে মৎস্যজীবি-মৌলে-কাঁকড়া ধরতে যাওয়া মানুষের মৃত্যুর খবর ছাড়া নাগরিক আলোচনায় সুন্দরবন আর কোথায়! প্রায় দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার ব্যাপী এই বদ্বীপকে বাঁচানো কোন সংহত উদ্যোগ চোখে পড়ে না। কাজেই যা হওয়ার তাই হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন যে তার মৃত্যুর রাস্তা তৈরি করছে সে ব্যাপারে আমাদের কোন হুঁশ নেই। সুন্দরবন যেন হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের অমনোযোগ আর ননপ্রফিটদের প্রফিট মেকিং ভেঞ্চার এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তার সৌন্দর্য, বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণ সবই কমছে। সারা বছর তার কথা না ভাবলে দিনরাত একাকার করে তার দিকে মনোযোগ না দিলে প্রকৃতির দেওয়া এই উপহারকে রক্ষা করা কঠিন।

তার অবস্থা খারাপ তো একদিনে হয়নি, ১২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাকৃতিক আক্রমণে সে বিধ্বস্ত হচ্ছে। সে আঘাত ক্রমেই বাড়ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা তো ঘোষণাই করে দিয়েছেন চলতি শতাব্দীর প্রায় মাঝামাঝি সময় সুন্দরবনের প্রায় অর্ধেক চলে যাবে জলের তলায়। বাকী যে টুকু থাকবে তাতে ঢুকবে নোনা জল। মানুষ সেখানে কীভাবে বাঁচবে তা দক্ষিণরায়, বনবিবি, বনমন্ত্রী, পরিবেশমন্ত্রী, জিও, এনজিও কেউ জানেনা। কেউই হাজির করতে পারছেন না তাকে বাঁচানোর একটা কার্যকর পরিকল্পনা।
সুন্দরবন বাঁচানোর ব্যাপারে রাষ্ট্রকে ফুল মার্কস দূরের কথা পাস মার্কসও দেওয়া যাবে না। অথচ এখানকার ১০৪টা দ্বীপের ৫৪টাতেই বসবাস করেন মানুষ। জঙ্গল বাঁচাতে উদ্বাস্তু তাড়ানোর নামে এখানে চূড়ান্ত নৃশংসতা হয়েছে; ম্যানগ্রোভ বসানোর নামে চলছে সরকারি টাকার শ্রাদ্ধ; উন্নয়নের নামে চলছে লুটপাট। সুন্দরবন সবার কাছে একটা প্রজেক্ট। যাতে টাকা আছে কিন্তু কোন দায়িত্ব নেই। এদিকে জঙ্গল, জমি, অরণ্য সবই বেশ আয়েস করে গ্রাস করছে প্রকৃতি। ছোট হচ্ছে তার এলাকা, একদা যারা দূরে দূরে থাকতো সেই মানুষ আর বন্যপ্রাণ আসছে কাছাকাছি। তাদের পারস্পরিক শত্রুতা বাড়ছে।

সমস্যা সমাধানে কেউ হাতুড়ে দাওয়াই দিচ্ছেন — মানুষ গোল্লায় যাক, তাদের জঙ্গল থেকে তাড়িয়ে বাঁচাতে হবে সুন্দরবন। এরাই জঙ্গলের ক্ষতি করছে। কিন্তু মরা মেরে যারা খুনের দায়ে পড়লেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা সেই চিরউদ্বাস্তু মানুষগুলি যাবেন কোথায়? গ্লোবাল এমিশনের দায় যেভাবে বড় দেশগুলি গরীব দেশগুলির ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে ঠিক সেভাবেই আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা সুন্দরবন ধ্বংসের দায় চাপিয়ে দিচ্ছেন গরীব মানুষদের ওপর। বন্যপ্রাণ বাঁচানোর নামে মানুষ তাড়ানোর নৃশংসতা সুন্দরবন আগেও দেখেছে কিন্তু তাতে সমস্যা মেটেনি।
মৌর্য সাম্রাজ্যের আমলেও সুন্দরবনে ছিল জনবসত। বনবিবির উপাখ্যান বলছে এখানে জনবসত প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো। মানুষ বনবিবি, দক্ষিণরায়কে পুজো দিয়েছে, মানত করেছে, দরবার করেছে রাজাগজা, সরকারের কাছে কিন্তু অবস্থা বদলায়নি। বন ও মানুষ ধারাবাহিকভাবে বিপন্ন হয়েছে। আদতে সুন্দরবন যেন প্রকৃতি, মানুষ আর ভুল পরিকল্পনার একটা ত্রিভুজ। এই ত্রিভুজ আস্তে আস্তে সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। গন্ডার, মহিষ তো কোন কালে অদৃশ্য হয়েছে, আগের তুলনায় কমেছে বাঘও। অরণ্য সংলগ্ন দ্বীপে ঘর বাঁধা মানুষও বাঁচার তাগিদে অন্যত্র সরছেন।

বন্যপ্রাণ ও মানুষ কেউ এখানে ভাল নেই। কীভাবে ভাল থাকবেন তাও পরিস্কার করে কেউ বলছেন না। সরকার, বিরোধী দল, এনজিও, পরিবেশ কর্মী সবাই একে অন্যের ওপর দোষারোপ করছেন। মানুষ-প্রকৃতি-বন্যপ্রাণ সুরক্ষিত রেখে একটা সংহত পরিকল্পনার কথা বলছেন না কেউই। সুন্দরবন যেন রাতে ম্রিয়মাণ আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়ে, খদ্দেরকে তুষ্ট করাই যার কাজ। কোলাহলে যার বেঁচে থাকার আওয়াজটাই শোনা যায়না। সরকারি বাবু ও প্রজেক্টের লোক কেউই তার কথা শোনে না। অরণ্য না বাঁচলে ভূমিপুত্ররা বাঁচবে না, বিপন্ন হবে মানুষগুলির জীবিকা। কে বোঝাবে প্রকৃতি, মানুষ, বন্যপ্রাণ সব নিয়েই এই বন সুন্দর।
বাঘসুমারিতে দেখা যাচ্ছে, বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ওপারে বাংলার বাঘও খাবারের আশায় এদেশে ঢুকে পড়েছে। দায় সকলের। শুধু হুতাশ করলেই হবে না। পথও দেখাতে হবে।
দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার হবে। আয়তন কিলোমিটারে হলে মুশকিল।
ঠিক।শুধরে নিচ্ছি ।আর একটা ভুল আছে ।লেখাটার নাম হবে এ বড় সুন্দর বন ।