বৃদ্ধ ভদ্রলোকের ডান হাতটা দু’হাতে চেপে ধরেছিলাম। একবার মনে হয়ছিল, এ সত্যি নয়। হতে পারে না। এখুনি ঘুমটা ভেঙে যাবে। চোখ চেয়ে দেখব নিজের পরিচিত বিছানায় পড়ে রয়েছি। কিন্তু না, পাশের সর্দারজি এখনও আগের মতোই ‘ওয়ে গুরু তুসসি গ্রেট হো’ বলে চলেছেন। এ পাশে এক বয়স্ক লোক একবার হেল্ডিং, একবার গার্নার, একবার লিলি-র নাম বলে পষ্ট বাংলায় বললেন, ‘কী খেলা খেলেছেন মাইরি’। তখন বুঝলাম, স্বপ্ন নয়— বাস্তবিক আমি গাভাস্কারের হাত দু’টো ধরে আছি।
ফুটবল নয় ক্রিকেট— আমাদের বাড়ির এটাই ধারা। বছরখানেক আগে সবাই যখন আর্জেন্টিনা আর নাইজেরিয়ার খেলা দেখছিল, আমি তখন অফিসে বসে ক্রিকইনফোতে ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের স্কোর দেখে প্যাঁক খেয়েছি। কাজেই ভিক্টোরিয়ায় গাভাস্কার আসবেন শুনে আমাকে আটকে রাখা আর লেগস্টাম্পে ফুলটস বল দিয়ে তেঁদুয়াকে (তেন্ডুলকরকে আমাদের বাড়িতে এই নামেই ডাকা হয়) মারতে বারণ করা একই ব্যাপার।
ঠাকুরদা বিজয় মার্চেন্টের খেলা দেখেছেন। মুস্তাক আলিরও। আর এক বছর জীবিত থাকলে সচিনের খেলাও দেখে যেতেন। বাবা নিয়মিত মাঠে গিয়ে টেস্ট দেখেছেন। ১৯৪৮ এ কানপুরের মাঠে আনঅফিশিয়াল ম্যাচে ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের কিংবদন্তীর ২৫৬ রানের প্রত্যক্ষদর্শী বাবা।
এই দু’জনই বলেন, সানির ব্যাপারটা নাকি আলাদা।
গাভাসকারের সেরা খেলাগুলো যখন হয়েছে, তখন আমি এতটাই ছোট যে তার বেশিরভাগই মনে নেই। তবে ওই খেলাটা ভোলার নয়। ‘কী অবস্থা ?’ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দাদুর প্রশ্ন। বাবা চিন্তিত মুখে বলল, ‘ছ’টা পড়ে গেছে। সানি এখনো রয়েছে ।’ দাদুর আশ্বাস, ‘ও থাকলে ম্যাচ বের করে নেবে।’
না, শেষ পর্যন্ত গাভাসকার থাকেননি। আমরাও জিতিনি। ১৯৮৭-র ব্যাঙ্গালোর টেস্টে ইকবাল কাশিমের বলটা গাভাসকারের ব্যাটের কোণ ছুঁয়ে জমা পড়েছিল রিজওয়ান উজ জামানের হাতে। ৯০ কোটি বুক ভেঙে সানি হাঁটা দিয়েছিলেন প্যাভিলিয়নের দিকে। রিচি বেনো কমেন্ট্রি করতে করতে বলে উঠেছিলেন, ‘and India’s last hope is on his way to the pavilion’।

১৯৭১ থেকে ১৯৮৭ — উপমহাদেশে সূর্য উঠত তাঁর ব্যাট চমকালে। সানি … নাঃ, দেওল বা লিওনি নয় – সানি বলতে দেশোয়ালিরা এবং বিদেশিরা বুঝত গাভাসকারকেই। যাঁর ‘এক কান দিয়ে পেরেক ঢোকালে অন্য কার দিয়ে স্ক্রু বের হবে – মাথায় নাকি এমনই প্যাঁচ। যে নাকি ‘ক্লিকবাজি’ করে কপিলকে বসিয়ে দিয়েছিল … কিন্তু, অ্যান্ডি রবার্টসের মিসাইল, ডেনিস লিলি বা জেফ টমসনের হ্যান্ড গ্রেনেড, রিচার্ড হ্যাডলির টর্পেডো, ইয়ান বথাম বা ইমরান খানের অ্যান্টি ট্যাঙ্ক মাইন – সব থমকে যেত ওই SS লোগো দেওয়া ডাবল সাইমন্ডস ব্যাটের সামনে।
না, সচিনের মতো ভাগ্য নিয়ে খেলতে আসেননি সানি। তাঁকে দিয়ে শুরু, তাঁতেই শেষ। ওপেনিংয়ে বিষ্ফোরক সেওয়াগ, ওয়ান ডাউনে দেবগিরি কেল্লার মতো দ্রাবিড়, পরের দিকে ক্রিকেটার লক্ষ্মণ হিসেবে পুনর্জন্ম নেওয়া বেঠোফেন, আরও পরে কলকাতার মহারাজ – দূর দূর, সে সব তো স্বপ্ন মাইরি।
একবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে, মনে হয় ১৯৭৬ এর সিরিজে ওপেনার অশোক মাঁকড় শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে বলেছিলেন পরে নামব। ওপেনিংয়ের ভার পড়েছিল ব্রিজেশ প্যাটেলর ওপর। সেই ‘দুঃসংবাদ’ পেয়েই ব্রিজেশ বলে ওঠেন, অশোক মিথ্যে কথা বলছে। তা, অশোকের দোষ নেই, গার্নার, রবার্টস, হোল্ডিংকে সামনে পেয়ে যদি শরীর খারাপ না হয়, তবে কবে হবে ?
টিমের অন্য ওপেনারের অবশ্য সে সব হত না। তিনি ক্রিজে থাকলে বোলারদের অস্বস্তি বাড়ত। তাঁকে সঙ্গ দিতেন তাঁরই ভগ্নিপতি বিশে – বিশ্বনাথ। এঁর মতো শিল্পী ক্রিকেট কমই দেখেছে। কিন্তু, সমস্যা একটাই। বাবা বিশ্বনাথ বিস্তর ‘সাহসী ৩৭’ বা ‘চমকপ্রদ ৪৪’ করে আটকে গিয়েছেন । সেগুলোকে ‘অনবদ্য শতরানে’ বদলাননি।
এছাড়া টিমে ছিলেন আরও এক মহাক্ষত্রিয় মহিন্দার ‘জিমি’ অমরনাথ। যাঁর সম্পর্কে সানি বলেন, Courage, thy name is Jimmy। কিন্তু তিনি বোর্ডের বদান্যতায় বেশিরভাগ সময়ই টিমের বাইরে থাকতেন ।

ওহ, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের টেস্ট সেঞ্চুরি ১৪টা। ওই ১৪টা ম্যাচের একটাতেও আমরা হারিনি। কাজেই বাবা বিশ্বনাথের কৃপা হলে আমরা অন্তত হারব না — এই বিশ্বাস সবার ছিল।
এমতাবস্থায় সাহেবদের কাছে ভারতমাতার আব্রু-ইজ্জত রক্ষার দায় এসে পড়ত ক্ষুদ্রকায় এই মারাঠির ওপরই। ওঁর একেবারে শেষ দিকের ১৯৮৬ সালের অস্ট্রলিয়া সিরিজের খেলা ইউটিউবে আছে। সিডনিতে ১৭২, এডিলেডে ১৬৬ নট আউট ইত্যাদি।
তবে, সবকিছু ছাপিয়ে ১৯৮৭র ব্যাঙ্গালোর টেস্ট। পিচের যা অবস্থা তাতে গোলাপ ফুল ফেললেও বোমার মতো ফাটছিল । প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তান ১১৬য় বান্ডিল। মণিন্দর ২৭/৭। আমরাও ভালো কিছু পারিনি, মোটে ১৪৫। তৃতীয় ইনিংসে পাকিস্তান ২৪৫, যতটা মনে পড়ে। তার পর ইকবাল কাশিম আর তৌসিফ আহমেদ পর পর উইকেট পেতে শুরু করলেন। ওঁদের তিন জনই বল করেছিলেন ফোর্থ ইনিংসে। আক্রম, আহমেদ আর কাশিম। গাভাসকারের ৯৬ রানের ইনিংসটাকে বলা হয়, ভাঙা পিচে স্পিন বোলিং খেলার ব্যাকরণ বই। উনি ফিরতেই খেলা শেষ হল। আমরা ১৬ রানে হেরেছিলাম।
ভিক্টোরিয়ায় সেদিন বৃদ্ধ গাভাসকারেরর হাত দু’টো ধরে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যেন সবটা দেখতে পেলাম। ওই মাকখন স্ট্রেট ড্রাইভ, স্কোয়ার কাটের ওই কানে মধু ঢালা ‘টিং’ আওয়াজ। চারটে স্লিপের মাঝখান দিয়ে নিখুঁত লেট কাটে বল গলিয়ে দেওয়া, এলিগ্যান্ট লেগ গ্লান্স। ওই লোকটাই তো প্রথম দেখাল, আমরাও পারি ব্যাট করতে।
‘সরুন না মশাই, আপনি একা দেখবেন নাকি। আমরাও তো ওঁকে দেখতেই এসেছি।’ বাস্তবে ফিরে এলাম। সত্যিই তো ! পেছনে লম্বা লাইন। অবসর নেওয়ার তিন দশক পরও এত লোক দেখতে এসেছে ! সরে যেতে যেতে কানে এল অনেকের মন্তব্য, ‘ওভালের ২২১টাই সেরা, না না করাচিতে দু’ইনিংসে সেঞ্চুরি, দিল্লি টেস্টের ১২১ ভুলে গেছেন ? ৯৪ বলে ১০০। ইংল্যান্ডে ১০১- ভাঙা আঙুল নিয়ে …’ দাদুর কথা মনে পড়ল, মার্চেন্ট, মুস্তাক … যত নামই নাও, সানির মতো কেউ না। রেডিয়োয় রবি চতুর্বেদির গলা, ‘খুবসুরত স্ট্রোক, কলাই কা উপয়োগ কিয়া গাভাসকার নে, মিডউইকেট সে গেন্দ সীমারেখা কে বাহার …’
ক্রিকেট নিয়ে সেই রোমান্টিসিজম আর মনে হয় নেই। রয়ে গেছে শুধু ইউটিউবে কয়েকটা খেলার ক্লিপিংস। আর রয়ে গেছে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া কয়েকটা ইনিংস। ইতিহাস বই পুরনো হয়ে যায়, পুরনো হয় না উপকথা। আর পুরনো হয় না বীরত্ব — যুদ্ধক্ষেত্রেই হোক বা ২২ গজে। তাই তো ২০১৮-র ডিসেম্বরে ভিভ রিচার্ডস নির্দ্বিধায় বলে দেন, ‘Sunny is special, very special.’
উনি ছিলেন বলেই তো শুরুটা হল। এর পর মারকুটে তেঁদুয়া, সিরিয়াস দ্রাবিড়, চাণক্য সৌরভ, খুনিয়া সেওয়াগ, স্টাইলিশ লক্ষ্মণ, খুঁখার কোহলি, নির্বিকার পূজারা … পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত।
Khub bhalo laglo copy…