‘আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ ‘আয়রে সবুজ আয়রে অবুঝ।’ এসব লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর ‘সবুজের অভিযান’ কবিতায়। কবিতাটি প্রকাশিত হয় প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায়। রবীন্দ্রনাথের এই বাণীটি সবুজপত্রেরও বাণী। নতুন যুগের নতুন বাণীকে অঙ্গীকার করা, আলস্য ও অভ্যাসের দাসত্ব ও জড়তা থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলা ১৩২১ (১৯১৪) সালের ২৫ শে বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে প্রকাশিত হল সবুজপত্র। সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী।
প্রথম দু’বছর সেই পত্রিকার লেখক ছিলেন মাত্র দু’জন। সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী আর রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ চৌধুরীমশায়কে বললেন, ‘সবুজপত্রে কেবলমাত্র সম্পাদক এবং একটিমাত্র লেখক যদি সব লেখে, তবে লোকে বলবে কি?’ ঠিক কথা। প্রতি সংখ্যায় দুই লেখকের লেখা পড়তে পড়তে পাঠকের ক্লান্তি আসবে। তাছাড়া যে পত্রিকা নবযুগের সৃষ্টির অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে তাকে অতিক্রম করতে হবে প্রতিকূলতার দুস্তর পথ। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন সঙ্ঘশক্তির।
এই সঙ্ঘশক্তির কথা ভেবে প্রমথ চৌধুরী ১৯১৬ সালে তৈরি করলেন সবুজসভা। প্রতি শনিবার প্রমথ চৌধুরীর কমলালয়ের বাড়িতে বসত সবুজসভার আসর। প্রমথ চৌধুরী আর ইন্দিরা দেবী ছাড়াও এই সভায় আসতেন রবীন্দ্রনাথ, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, হারীতকৃষ্ণ দেব, শিশিরকুমার ভাদুড়ী, বরদাচরণ গুপ্ত, কিরণশঙ্কর রায়, দিলীপকুমার রায়, প্রবোধ চট্টোপাধ্যায়, ননীমাধব চৌধুরী, নলিনীকান্ত গুপ্ত, বিশ্বপতি চৌধুরী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, জগদিন্দ্রনাথ রায় প্রমুখেরা।
সবুজসভার মেজাজটা আড্ডার হলেও আলোচনার বিষয়বস্তু লঘু ছিল না। দেশ-বিদেশের সাহিত্য, অর্থনীতি, প্রত্নতত্ত্ব, রাষ্ট্রনীতি—এসব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হত। অতুলচন্দ্র গুপ্ত লিখেছেন, ‘সব আলোচনায় সকলে যোগ দিতেন এবং আলোচনার ধারা এমন ছিল, অ-বিশেষজ্ঞের মন যাতে উৎসুক, উন্মুখ হয়ে উঠত। … বাঙালি লেখকের মনের পুঁজি যে পশ্চিমের শ্রেষ্ঠ দেশগুলির লেখকদের মনের পুঁজির চেয়ে কম হবে না, বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্যের সঙ্গে বাঙালি লেখকদের মনের যোগ হবে ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ, এটা ছিল মজলিশের অকথিত স্বীকৃতি।’
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সবুজসভার অন্যতম সদস্য। এম.এ পড়ার সময়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অজিতকুমার চক্রবর্তী, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতির সঙ্গে। এঁরা ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত। আবার এঁদের কাছ থেকে সুনীতিকুমার জানতে পারেন প্রমথ চৌধুরীর কথা। চৌধুরীমশায়ের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের জন্য তিনি উৎসুক হয়ে ওঠেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু তাঁকে নিয়ে আসেন সবুজসভার আসরে। সুনীতিকুমারের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনা পাই প্রমথ চৌধুরীর লেখায় :
‘গেল রবিবার অধ্যাপক সুনীতি চাটুজ্যে এখানে এসেছিলেন। লোকটিকে বেশ ভালো লাগল। যদিও phonology তাঁর বিষয়, তবু দেখলুম তিনি সাহিত্যের শুধু খোল চিবিয়ে সন্তুষ্ট নন, তার রসও গ্রহণ করতে পারেন। ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা কয়ে সুখ হয়, কেননা তাঁর বিদ্যা আছে, বুদ্ধি আছে, তার উপর উৎসাহ আছে। এঁকে সবুজদলে টানবার চেষ্টায় আছি। আশা করি কৃতকার্য হব।’
পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর আত্মস্মৃতি ‘চলমান জীবনে’ এক শনিবারের আড্ডায় কিভাবে সকলে ‘সুনীতিকুমারকে নিয়ে পড়লেন’ তার কৌতুককর বর্ণনা দিয়েছেন। কিরণশঙ্কর গুপ্ত সুনীতিকুমারকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি নাকি কৃষ্ণনগর সাহিত্য পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে বাঙালিকে অনার্য বলে ঘোষণা করছেন?’
সুনীতিকুমার উত্তর দেবার আগেই প্রমথ চৌধুরী বললেন, ‘সে ঘোষণাপত্র আমি সবুজপত্রে প্রকাশ করব বলে মনস্থির করছি।’
— ‘কিন্তু’, কিরণশঙ্কর রায় বললেন, ‘সুনীতিবাবুর বক্তব্য নিয়ে প্রবল আপত্তি জানিয়েছে গোঁড়া পণ্ডিতেরা।’
— ‘আপত্তি উঠুক আর লাঠি নিয়ে তেড়ে আসুক’, সুনীতিকুমার উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন, ‘আমি নাচার। আমার বিজ্ঞান আমাকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিয়েছে।’
হারিতকৃষ্ণ দেব সুনীতিকুমারকে একটু খুঁচিয়ে দিলেন, ‘আপনি আবার নৃতত্ত্ব নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলেন কবে?’
দু-আঙুলের ফাঁক দিয়ে একটিপ নস্যি নিয়ে বিশ্বপতি চৌধুরী বললেন, ‘ভাষাতত্ত্বের মূল্য আছে স্বীকার করি কিন্তু বাঙালির সমাজজীবনের আচার-পদ্ধতির অনেক কিছুরই আর্যদের সঙ্গে মিল আছে। সে ব্যাপারটা কি উড়িয়ে দেওয়া যায়?’
সুনীতিকুমার বলেন, ‘সে মিল আছে শতকরা ১৩ জনের সঙ্গে। বাকি ৮৭ জনের খবর নিয়ে দেখবেন তাঁরা আর্য পদ্ধতি মানেন না।’
মৃদু হেসে অতুলকৃষ্ণ গুপ্ত বলেন, ‘কিন্তু আর্য বলে কি কোন বিশিষ্ট জাত আছে সুনীতিবাবু?’
সুনীতিকুমারও হেসে উত্তর দেন, ‘ওটা ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের পণ্ডিতদের মানসিক দৃষ্টি, ওয়ার্কিং হাইপথেসিস।’
কিরণশঙ্কর প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ভাষাতত্ত্ব কি বলে?’
কৌতুকের রেশ বজায় রেখে সুনীতিকুমার বলেন, ‘চৌধুরীমশায়ের মতো গৌরবর্ণ সুপুরুষকে কিছুটা আর্যরক্তের অধিকারী বলে মেনে নেওয়া যায়; কিন্তু বর্ণ ও দেহ গঠনের দিক থেকে অতুলবাবুকে আর্যবংশোদ্ভব বলে স্বীকার করতে বাধে বৈকি।’
সুনীতিকুমারের কথা শুনে সবুজসভার সদস্যরা হো হো করে হেসে ওঠেন। বিশ্বপতিবাবু তাড়াতাড়ি হাত তুলে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বলেন, ‘অন আ পয়েন্ট অব অর্ডার স্যার।’