সম্প্রতি দেশের শীর্ষ আদালতের বিচারপতিদের নানা মন্তব্য, বক্তৃতা, এমনকী বিচারের রায় অভিজ্ঞ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ভারতে যখন গেরুয়া বাহিনীর দাপাদাপি চলছে, প্রশাসন-অপরাধী সহায়তাকারী ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, এসব নিয়ে দেশের বড় অংশের মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে, তখনই এক ঝলক তাজা বাতাসের মতো সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নানা অবস্থান। এমনকী দু’য়েকটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে নস্যাৎ করতে সংসদে আইন পাশের ঘটনাও ঘটছে। যেন মনে হচ্ছে, নতুন একটা পর্যায়ে প্রবেশ করছে ভারতের রাজনীতি-আইন পারস্পরিক সম্পর্ক।
রবিবার, ৮ আগস্ট ২০২১, শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি নুথালাপতি ভেঙ্কট রামানা একটি অ্যাপ উদ্বোধন উপলক্ষ্যে নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে বক্তৃতা করছিলেন। উপস্থিত শ্রোতাদের বিস্মিত করে তিনি বলতে থাকেন, এ দেশে পুলিশ স্টেশন বা থানাগুলি মানবাধিকার তথা নাগরিকদের আত্মসম্মানের পক্ষে বৃহত্তম বিপদ। ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির ‘লিগ্যাল সার্ভিসেস অ্যাপ’ চালু করার অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘The threat to human rights and bodily integrity is the highest in police stations… Going by recent reports, even the privileged are not spared third-degree treatment…’ (মানবাধিকার এবং শারীরিক নিরাপত্তার সবথেকে বড় বিপদ থানাগুলিতেই। সম্প্রতি পাওয়া বিবরণগুলিতে জানা যায়, এমনকী ধনী বা খ্যাতনামা ব্যক্তিরাও শারীরিক অত্যাচার থেকে রেহাই পান না)। বিচারপতি রামানা বলেন, থানাগুলিতে ধৃত ব্যক্তির আইনি সহায়তা না পাওয়ার বিষয়টি ওই ব্যক্তিদের পক্ষে দারুণ শঙ্কার। গ্রেফতার হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টাই মামলাটির ভাগ্য অনেক সময়ে নির্ধারণ করে দেয়, বলেছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেছেন, সাংবিধানিক গ্যারান্টি থাকা সত্ত্বেও থানায় ধৃত ব্যক্তিদের নির্যাতন ও পুলিশি অত্যচার চালানো হচ্ছে।
আমাদের মনে পড়বে, বিশেষ করে বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে অপরাধী অথবা কোনো অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের মারাত্মক অত্যাচারের অভিযোগ উঠছে। এমনকী ভুয়ো সংঘর্ষে মেরেও ফেলা হচ্ছে কোনো কোনো ব্যক্তিকে, এমন ঘটনার কথাও আকচারই শোনা যাচ্ছে। আবার সংখ্যলঘু, দলিত, আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের নির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়েও নিষ্ক্রিয় থাকছে পুলিশ। এরকম অবস্থায় আইনরক্ষকদের উপর আস্থায় খামতি দেখা দিচ্ছে দেশের কোনো কোনো প্রান্তের মানুষদের। হারানো আস্থা ফেরাতে এবার খোদ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিই প্রকাশ্যএ বক্তৃতা করছেন, এটা ভারতীয় গণতন্ত্রে খুবই স্বস্তিদায়ক ঘটনা।
সুপ্রিম কোর্টের নিকট অতীত
বর্তমান প্রধান বিচারপতি রামানা শপথ নিয়েছিলেন চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল। তাঁর আগে প্রধান বিচারপতি ছিলেন শরদ অরবিন্দ বোবদে। তাঁরও আগে এই পদে ছিলেন রঞ্জন গোগোই। বিচারপতি গোগোইয়ের আমলে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকটি রায় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। যেমন, প্রথমত, বিচারপতি গোগোইয়ের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সর্বসম্মতিতে অযোধ্যায় বিতর্কিত পুরো জমিটিই রামমন্দির গড়ার জন্য দিয়ে দেন। পরবর্তীকালে লক্ষ্ণৌয়ের একটি বিশেষ আদালতে বাবরি মসজিদ ভাঙার অপরাধে অভিযুক্ত সকলেই প্রমাণাভাবে খালাস পেয়ে যান। দ্বিতীয়ত, প্রায় একই সময় বিচারপতি গোগোইয়ের নেতৃত্বাধীন এক বেঞ্চ রাফাল কেনা নিয়ে অভিযোগে কেন্দ্রকে ক্লিন চিট দিয়ে দেয়। এমনকী এ বিষয়ে অভিযোগ ও মন্তব্য করার জন্য কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধিকে সতর্ক করে। তৃতীয়ত, একই ভাবে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ করার পরে সিপিআইএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরির করা এক হেবিয়াস কর্পাস মামলায় ওই দলের গ্রেফতার হওয়া নেতা মহম্মদ ইউসুফ তারিগামির জীবনের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এক্ষেত্রে নিয়ম হলো, আদালত ওই ব্যক্তিকে সশরীরে হাজির করাতে বলবে সরকারকে। কিন্তু তা না করে সুপ্রিম কোর্ট সীতারামকে বলে কাশ্মীর যেতে, যা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছিল। এমন আরও একাধিক রায়ের উল্লেখ করা যেতে পারে। সবথেকে আশ্চর্য ঘটনা ঘটে যখন, বিচারপতি রঞ্জন গোগোইয়ের অবসর নেওয়ার মাত্র চার মাসের মধ্যে তাঁকে রাজ্যসভায় মনোনীত সদস্য করে নিয়ে যাওয়া হয়।
সে সময় অনেকে আশঙ্কা করছিলেন, হয়তো সুপ্রিম কোর্ট দেশের বর্তমান শাসকদের সঙ্গে এক সুরেই চিন্তা ভাবনা করছে। কিন্তু গত কয়েক মাসে শীর্ষ আদালতে অন্য ধারা দেশবাসীকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।
বাড়ছে শীর্ষ আদালত ও কেন্দ্র সরকার দ্বন্দ্ব
একটি উদাহরণ দেব। চলতি বছরেই এপ্রিলে কেন্দ্র ট্রাইব্যুনাল রিফর্মস অর্ডিন্যান্স আনে। এই অর্ডিন্যান্সের কয়েকটি ধারা নিয়ে মামলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট অর্ডিন্যান্সের কিছু অংশকে বাতিল করে। এর পরেই এই বিষয়ে একটি বিল সংসদে আনে কেন্দ্র। অর্ডিন্যান্স ও বিলটির উদ্দেশ্য দেশে প্রচলিত নানা ট্রাইব্যুনাল বিলুপ্ত করে দেওয়া। সেটি একটি বিতর্কিত পদক্ষেপ, কিন্তু তার চেয়েও বিস্ময়কর হলো, কেন্দ্রের পেশ করা বিলটিতে সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হওয়া অংশগুলিও বহাল তবিয়তে থাকে। এ নিয়ে বিরোধীরা আপত্তি করলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নির্মলা সাতারামন গুরুত্ব দেননি। সরাসরি ভোটে ফেলে বিলটি রাজ্যসভায় পাশ করানো হয়। আগেই এটি লোকসভাতেও পাশ হয়েছে। এ ভাবে সুপ্রিম কোর্ট বনাম আইনসভা বিরোধের একটি ক্ষেত্রও এই মুহূর্তে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
প্রধান বিচারপতির সাবধানবাণী
আগে উল্লিখিত বক্তৃতায় প্রধান বিচারপতি রমানা বলেছেন, বিচার ব্যবস্থা যদি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে চায়, তাহলে বিচারপতিদের মনে রাখতে হবে, দরিদ্র অসহায় মানুষদের জন্যই বিচারের প্রক্রিয়া কার্যকর রয়েছে। এই অংশের মানুষেরা দীর্ঘকাল বিচার ব্যবস্থার সহায়তা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। বিচার পেতে যে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিচারপতি রামানা। তিনি বলেছেন, বর্তমানে ক্রমশই ব্যবহৃত ডিজিটাল মাধ্যমও গরিব মানুষকে বিচার ব্যবস্থার যথেষ্ট কাছে আনতে পারেনি। তাঁর স্বপ্ন, একদিন নিশ্চয়ই আসবে, যখন বিচার পাওয়ার সুযোগ সবার জন্যই সমান ভাবে বিস্তৃত হবে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদবে না। মোদি-শাহ কি একটু অস্বস্তিতে?