সিন্ধুসভ্যতা, যা হরপ্পা সভ্যতা নামেও পরিচিত, প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর এবং উন্নত নগরসভ্যতা। এটি প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ অব্দ পর্যন্ত বর্তমান পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পরিব্যপ্ত ছিল। সিন্ধুসভ্যতার বহু গুরুত্বপূর্ণ নগর আবিষ্কৃত হয়েছে, যার মধ্যে মোহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, লোথাল, ধোলাভিরা, কালিবঙ্গান, রাখিগড়ি, সুতকাগেনদর এবং সুরকোটাডা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সুরকোটাডা নগরটি কীভাবে সিন্ধুসভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, এর ভূগোল, স্থাপত্য, আর্থ-সামাজিক জীবন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম কেমন ছিল, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনই বা কী পাওয়া গেছে সেখান থেকে আর তার গুরুত্ব কতটা, তা সকলের আগ্রহের বিষয়। এছাড়াও আলোচনা করা দরকার এই সভ্যতার পতনের পেছনে কারণগুলি এবং আজকের প্রেক্ষাপটে সুরকোটাডার তাৎপর্য।

সুরকোটাডা (Surkotada) ভারতের গুজরাট রাজ্যের কচ্ছ জেলায় অবস্থিত। এটি সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিম সীমান্তের দিকের একটি নগর এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় শহরগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও এর গুরুত্ব কম নয়। এটি ধোলাভিরা ও মোহেঞ্জোদারোর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ রক্ষা করত।
সুরকোটাডা একটি কৌশলগত স্থানে গড়ে উঠেছিল। এর কাছ দিয়ে প্রবাহিত হতো একটি ক্ষুদ্র নদী, যার মাধ্যমে জলসংগ্রহ ও কৃষি সহজতর হতো। উপরন্তু, এর পাশেই ছিল একটি প্রাকৃতিক পাহাড়ি অঞ্চল, যা দিত প্রাকৃতিক সুরক্ষা।
সুরকোটাডার প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ পরিচালিত হয় ১৯৬৪-১৯৬৮ সালের মধ্যে, বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক জগৎ ইন্দ্রজিৎ সিংগির নেতৃত্বে। খননের মাধ্যমে এখানে একটি সুসংগঠিত নগরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, যার গঠন, রাস্তা, বাসস্থান, কেল্লা, এবং অন্যান্য সামাজিক পরিকাঠামো প্রমাণ করে যে এটি একটি পরিকল্পিত নগর।
এখানে পাওয়া যায় সিন্ধুসভ্যতার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পোড়ামাটির মূর্তি, সীলমোহর, কাঁসা ও তামার সরঞ্জাম, সম্ভাব্য ঘোড়ার হাড় (যা অনেক ঐতিহাসিকদের মতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ), এবং নির্মাণশৈলীর নিদর্শন।
সুরকোটাডা, অন্যান্য সিন্ধু নগরগুলোর মতো, একটি পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত হয়েছিল। নগরটি সাধারণত দুটি অংশে বিভক্ত ছিল:
উচ্চ নগর (Acropolis বা Citadel) : উচ্চ ভূমিতে নির্মিত এই অংশটি ছিল প্রশাসনিক ও সামরিক কার্যক্রমের কেন্দ্র। এখানে ছিল একটি প্রাচীরঘেরা কেল্লা, যার চারপাশে ছিল প্রহরীর দল। ধারণা করা হয়, এটি রক্ষাকর্তাদের ও শাসকদের আবাসস্থল ছিল।
নিম্ন নগর (Lower Town) : এই অংশে সাধারণ জনগণ বাস করত। এখানে ছিল ঘরবাড়ি, দোকানপাট, রাস্তাঘাট, কুয়া, স্নানঘর ইত্যাদি। ঘরগুলো ছিল ইটের তৈরি, এবং রাস্তা ছিল পরিকল্পিতভাবে গঠিত।
ঘরগুলো সাধারণত একতলা বা দোতলা ছিল, এবং প্রত্যেক ঘরের সাথে সংযুক্ত ছিল একটি কুয়া অথবা বাথরুম — যা সিন্ধুসভ্যতার উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার পরিচায়ক।
সিন্ধুসভ্যতার মানুষজন অত্যন্ত পরিশীলিত ছিল। তারা কৃষিকাজ, পশুপালন, মৃৎশিল্প, বস্ত্রবয়ন, ধাতুশিল্প, ও নির্মাণকর্মে পারদর্শী ছিল। সুরকোটাডায় এ সকল কর্মকাণ্ডের নিদর্শন পাওয়া যায়। কাঁসা ও তামার অস্ত্র, কৃষিযন্ত্র, গহনা, এবং নানাবিধ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া গেছে এখান থেকে।
বিশেষভাবে বলা হতো যে সুরকোটাডা ছিল একটি ঘোড়া-পালনের কেন্দ্র। বলা হতো, এখানে ঘোড়ার দেহাবশেষ পাওয়া গেছে, যা এই অনুমানকে জোরদার করে যে এখানে ঘোড়া পালনের ব্যবস্থা ছিল, যদিও এই বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব তাঁর Indus valley civilisation বইয়ে লিখেছেন, গবেষণার ফলে দেখা গেছে, ঘোড়ার অস্থি বলে যেগুলি সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেগুলি আসলে বুনো গাধার অস্থি।
তাই সিন্ধু উপত্যকায় ওই সময়ে আর্যদের ঘোড়ায় আগমনের তত্ত্ব জোরালো ধাক্কা খেয়েছে এই সিদ্ধান্তে।
সুরকোটাডা বসতি কোনও অর্থেই অনন্য ছিল না। বহু বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে এরকম অনেক বসতি আবিষ্কৃত হয়েছে। এই বসতিকে অনন্য এবং বিশেষ করে তুলেছে সিন্ধু-ঘাগড় অববাহিকায় এখন পর্যন্ত পরিচালিত কোনও খননে, অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি এমন একটি গৃহপালিত প্রাণীর হাড়ের সন্ধান পাওয়া। এই প্রাণীটি ছিল ইকুস ক্যাবালাস লিন বা সরল ইংরেজিতে ঘোড়া। প্রকৃতপক্ষে, দলের প্রত্নতাত্ত্বিক মিঃ একে শর্মা খুব স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, যখন তিনি ইকুস ক্যাবালাস লিন (ঘোড়া) এর ছেদক এবং মোলার দাঁত, বিভিন্ন ফ্যালাঞ্জ এবং অন্যান্য হাড়ের পাশাপাশি অন্যান্য ঘোড়ার মতো প্রাণী ইকুস অ্যাসিনাস এবং ইকুস হেমিওনাসের খুর (বন্য গাধা) এর হাড়ের অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন। তিনি অন্যান্য স্তরে অনেক ইকুস হাড়ের সন্ধানের কথাও জানিয়েছেন , যা অগত্যা ঘোড়ার নাও হতে পারে।

এই আবিষ্কারটি এতটাই চাঞ্চল্যকর ছিল যে বেশিরভাগ প্রত্নতাত্ত্বিক, ভারতবিদ এবং ইতিহাসবিদ এটি অস্বীকার করেছিলেন। এই আবিষ্কার ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাথমিক ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের দ্বারা প্রবর্তিত আর্যদের ভারত আক্রমণের সমস্ত মহান তত্ত্বকে তাদের মাথার উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ১৯২০-এর দশকে জন মার্শাল সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কার করার পর থেকে, অনেক ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ আর্যদের আক্রমণ তত্ত্বকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল নিম্নরূপ:

সিন্ধু-ঘাগড় নদীর অববাহিকায় খনন করা কোনও স্থানেই গৃহপালিত ঘোড়া বা ইকুস ক্যাবালাস লিনের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি । অন্যদিকে, সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসের পর ১৭০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে যে বৈদিক সভ্যতা উপমহাদেশ দখল করে, সেখানে ঘোড়া ছিল সবচেয়ে সম্মানিত প্রাণী। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে আর্য আক্রমণকারীরা অবশ্যই ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে চেঙ্গিস খানের রীতিতে ঘোড়ার পিঠে চেপে সিন্ধু সভ্যতার বসতিগুলিতে আক্রমণ করেছিল এবং স্থানীয়, গরু-চালিত জনগোষ্ঠীকে দমন করার জন্য এর গতিকে কাজে লাগিয়েছিল। এই যুক্তি এতটাই স্পষ্ট এবং অকাট্য বলে বিবেচিত হয়েছিল যে এটিকেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের এই প্রিয় তত্ত্বটি এখন ভারতের একজন বিনয়ী প্রত্নতাত্ত্বিকের দ্বারা ভুল প্রমাণিত হচ্ছিল, যিনি দাবি করছিলেন যে গৃহপালিত ঘোড়া ইতিমধ্যেই পরিচিত ছিল এবং হরপ্পাবাসীরা খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সাল থেকে ব্যবহার করত, অর্থাৎ আর্য যোদ্ধাদের আগমনের অনেক আগে থেকেই।
ইরফান হাবিব-সহ অনেক ইতিহাসবিদ জানিয়েছেন, ঘোড়ার নয়, বন্য গাধার হাড় ছিল ওগুলি। তাই আর্যরাই হরপ্পাসভ্যতার সৃষ্টি করেছিল, এই তত্ত্ব এখন তামাদি হয়ে গেছে।
ঘোড়া জুটলে, চাবুকও জুটে যায় বলে ধারণা বরাবরের। হরপ্পা সভ্যতার ক্ষেত্রে চাবুক আগে জুটেছে, তাই ঘোড়া শেষ পর্যন্ত পক্ষীরাজ ঘোড়া হয়ে উড়ে গেছে দূরবর্তী গ্যালাক্সিতে!
সুরকোটাডা থেকে উদ্ধারকৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে বোঝা যায় যে এখানকার মানুষের ধর্মীয় জীবন ছিল সমৃদ্ধ। পাওয়া গেছে নানা মূর্তি ও প্রতীক, যা পশুপতির আদলে গঠিত, এবং তা হিন্দু ধর্মের শিব-উপাসনার পূর্বসূরী বলে মনে করা হয়।
সীলমোহরগুলিতে নানা প্রাণী ও প্রতীক দেখা যায়, যা সাংকেতিক ভাষা বা প্রতীকী ধর্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত দেয়। যদিও সিন্ধুসভ্যতার লিপি এখনো সম্পূর্ণরূপে পাঠোদ্ধার হয়নি, তবে সুরকোটাডা থেকে পাওয়া নিদর্শন সভ্যতার সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরে।
সুরকোটাডা একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত ছিল। এখান থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য যেমন পাথরের পুঁতি, পোড়ামাটির সামগ্রী, ধাতব সামগ্রী তৈরি করে অন্যান্য শহরে পাঠানো হতো। দূর-দূরান্তের শহরের সঙ্গে এর যোগাযোগ ছিল, এমনকি মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সঙ্গেও এর বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সিন্ধুসভ্যতা কেন ধ্বংস হয়েছিল — এই প্রশ্নে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মতপার্থক্য রয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ভূমিকম্প বা নদী পথ পরিবর্তনের ফলে নগরগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন বাহ্যিক আক্রমণ, বিশেষ করে আর্যদের আগমন, এই পতনের কারণ।
সুরকোটাডার ক্ষেত্রেও কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা অগ্নিকাণ্ড বা হঠাৎ ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এখনো গবেষণা চলছে।
সুরকোটাডা ও অন্যান্য সিন্ধু নগরসমূহ আজকের ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এই নগরগুলির নানা দিক উন্মোচন করছে, যা আমাদের অতীতের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করছে।
সুরকোটাডার স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং সামাজিক গঠন আজকের দিনেও গবেষণা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এটি প্রমাণ করে, প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক ব্যবস্থা কতটা উন্নত ছিল।
সুরকোটাডা নিছক একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়; এটি আমাদের অতীত ঐতিহ্য ও উন্নত প্রাচীন সভ্যতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। যদিও এটি আয়তনে মোহেঞ্জোদারো বা হরপ্পার মতো বড় নয়, তবে এর ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক কেল্লা, ঘোড়ার অস্তিত্ব, এবং সংস্কৃতি একে সিন্ধুসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র করে তুলেছে।
সিন্ধুসভ্যতা এবং সুরকোটাডা আমাদের শেখায় যে পরিকল্পিত নগরায়ন, পরিচ্ছন্নতা, এবং সাংগঠনিক দক্ষতা কেবল আধুনিক সভ্যতার অর্জন নয়, বরং এর শেকড় বহু প্রাচীন ও ঐতিহ্যপূর্ণ। এই অতীত জানলে বর্তমানকে আমরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি এবং ভবিষ্যতের জন্য উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারি।
সুরকোটাডায় ঘোড়ার হাড়ের অনুসন্ধান এখন আর কেউ করেন না। কারণ ঘোড়া সেখানে ছিল না। হরপ্পাসভ্যতার আর্যপন্থীরা ঘোড়া নিযে নাচানাচি করলেও পরে প্রমাণিত হয়েছে বুনো গাধার হাড় ছিল সে সব। গাধাকে পিটিয়ে যেমন ঘোড়া করা যায় না, তেমনি নতুন তত্ত্ব আমদানি করলেই সেটি সর্বজনগ্রাহ্য হয় না।
বাহ