শীত পড়তে শুরু করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের এলনিনোর প্রভাবে ভারত সহ গোটা এশিয়া দেখবে নাকি ইতিহাসের সবথেকে ঠান্ডা দিনগুলো। কিন্তু আমি যদি আপনাদের বলি পৃথিবীতে এমন একটা শহর আছে সারা বছরই বরফের চাদরে মুড়ে থাকে। বছরে তিনটি মাস সেখানে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনস ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে। এই ঠান্ডায় কুড়ি মিনিট দাড়িয়ে থাকলে মুখ ঢাকা পড়ে যায় বরফে, সারা মুখের পেশিগুলো হয়ে যায় অচল। সূর্য ওঠে সকাল সাড়ে দশটার পরে। দুপুর সাড়ে তিনটে বাজতে না বাজতেই নেমে যায় সন্ধ্যা। তবুও এই ভয়ঙ্কর ঠান্ডার কাছে হার মানে না সেখানকার মানুষ।
জীবন থেমে থাকে না এক মুহূর্তের জন্য বরং তারা সেখানে শীতের সময় বাজার করেন, পাবে গিয়ে নাচেন। অবিশ্বাস্য হলো এই ঘটনাটি সত্যি। তবে দেখে নেওয়া যায় আজকের লেখা সেই জায়গার কাহিনী। যেখানে প্রচন্ড ঠান্ডার সঙ্গে দিব্যি লড়াই করে বেঁচে আছেন সেখানকার মানুষজন।
ঘরে বসে শীত শীতে আলোচনা করতে করতেই কিম্বা শীতলতম দেশগুলির কথা শুনতে শুনতেই পরিহিত পোশাকের উপর চাদর চাপিয়ে নিতেন অনেকে। সেখানে যাওয়া তো দূরের কথা, সে দেশের ঠান্ডার গল্প শুনে ঠান্ডা লেগে যায়। আর তাছাড়াও সে সব জায়গায় তাপমাত্রা এতটাই কম যে নাগরিকের সংখ্যা হাতে গোনা। পর্যটকরা সেখানে যাওয়ার সখ বিশেষ দেখান না। এসব কথা শুনে মোটেও শীত থুড়ি ভয় পাবেন না। শীতের আমেজ উপভোগ করে এই শহরের লোকজন দিব্যি রয়েছেন।

শহরটির নাম ইয়াকুৎস্ক। রাশিয়ার একেবারে পূর্বে রাজধানী মস্কো থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রাশিয়ার সাখা প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর, যা বিশ্বের অন্যতম শীতলতম প্রধান শহর। এটি আর্কটিক সার্কেল থেকে প্রায় ৪৫০ কিমি দূরে অবস্থিত এবং পারমাফ্রস্টের উপর নির্মিত বিশ্বের বৃহত্তম শহরগুলির মধ্যে একটি। শহরটি খনি শিল্পের জন্য পরিচিত এবং এর তাপমাত্রা প্রায়শই -৬৪.৪°সে থেকে–৮৩.৯°সে পর্যন্ত নেমে যেতে পারে।
এই শহরের জন্ম আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে ১৬৩২ সালে। ১৬৩২ সালে ইয়েনিসেইয়ের সেনাপতি পেত্র বেকেতভের একটি দল লেনা নদীর তীরে একটি দুর্গ (“অস্ট্রোগ”) স্থাপন করেন। ১৭ শতকের মাঝামাঝি থেকে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের সরকার বিপ্লবীদের নির্বাসনের জন্য ইয়াকুৎস্ককে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেয় কারণ এর তীব্র জলবায়ুর কারণে এটিকে “উন্মুক্ত কারাগার” হিসেবে বিবেচনা করা হত। ইয়াকুৎস্কে ডিসেমব্রিস্ট থেকে শুরু করে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পর্যন্ত তিন প্রজন্মের রাশিয়ান বিপ্লবীদের প্রতিনিধিদের নির্বাসিত করা হয়েছিল এবং তাদের কিছু বংশধর আজও ইয়াকুৎস্কে বাস করেন।

২০২১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ইয়াকুৎস্ক শহরের লোকসংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষ ৫৫ হাজার। বাসিন্দাদের অধিকাংশ খনি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। রাশিয়ার দ্রুত উন্নয়নশীল আঞ্চলিক শহরগুলির মধ্যে অন্যতম ইয়াকুৎস্ক।
ইয়াকুৎস্কের অর্থনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ভিটিম নদী এবং এর উপনদীগুলির সোনার খনির থেকে। সেই সময়ে শহরটি এই অঞ্চলের শিল্প কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং তারপর থেকে শহরটি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত এবং বৃদ্ধি পেয়েছে।
একাধিক খনি কোম্পানি শহরে তাদের সদর দপ্তর এখানে স্থাপন করেছে। মূল্যবান পাথর এবং ধাতু, বিশেষ করে হীরা, সেই সাথে কয়লা, ইয়াকুটস্কের প্রধান রপ্তানি। ২০২১ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫.৫৫ বিলিয়ন ডলার, যা রাশিয়ার পঁচাশিটি ফেডারেল বিষয়ের মধ্যে এটিকে ১৬তম বৃহত্তম করে তোলে। যদিও ২০২২ সালে এটি তীব্রভাবে সংকুচিত হয় (১ বিলিয়ন ডলারের নিচে)। প্রজাতন্ত্রের কৃষি খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইয়াকুটস্কে অবস্থিত, যা প্রজাতন্ত্রের ৮৯% মাংস এবং প্রজাতন্ত্রের দুগ্ধ উৎপাদনের ৩৪% প্রদান করে।

বোঝাই যাচ্ছে এই শহরের মানুষ গরিব নন মোটেও। কয়লা, হিরে, সোনা আর ইউরেনিয়ামের খনি ঘিরে এখানকার অর্থনীতি রীতিমতো শক্তিশালী। অর্থাৎ বরফের ঠান্ডায় শরীর জমে গেলেও টাকার উষ্ণতায় মন কিন্তু থাকে ফুরফুরে।
ইয়াকুৎস্ক কেবল একটি অর্থনৈতিক নয়, বরং রাশিয়ার সমগ্র সুদূর পূর্ব অঞ্চলের একটি প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছিল। ইয়াকুৎস্কের একটি বিশেষভাবে সক্রিয় উন্নয়নের সময়কাল ঘটেছিল ১৯০৬-১৯১৩ সালে II Kraft-এর গভর্নরশিপের সময়কালে, যার সময় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, একটি টেলিফোন স্টেশন এবং বেশ কয়েকটি জাদুঘর নির্মিত হয়েছিল এবং ইম্পেরিয়াল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে পর্যটন একটি ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান ভূমিকা পালন করে। এখানে অবস্থিত লেনা পিলারস নেচার পার্ক ইউনেস্কোর একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং পারমাফ্রস্ট কিংডম একটি পর্যটন কমপ্লেক্স যা এই অঞ্চলের পারমাফ্রস্টের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলি প্রদর্শনের জন্য উল্লেখযোগ্য। গ্রীষ্মকালে লেনা নদী চলাচলের উপযোগী হওয়ায়, নৌকা ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। নৌকা ভ্রমণের সময় লেনা ডেল্টার মনমুগ্ধকর দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
বছরের অন্তত সাত মাস এখানে রাজত্ব করে শীত। অক্টোবর থেকে এপ্রিল এই পুরো সময়টায় ইয়াকুৎস্ক মোড়া থাকে বরফের চাদরে। সেই সময় এই শহরকে দেখলে মনে হবে আপনি কোন প্রেত পুরীতে চলে এসেছেন। মাঝে তিন মাস ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস পৌঁছে যায় মাইনাস ৪০ থেকে ৬০ ডিগ্রিতে। বরফ এতটাই শক্ত হয়ে যায় যে ড্রিল মেশিনেও কাটা মুশকিল হয়। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার এই ভয়ানক ঠান্ডাতেও থেমে থাকে না এখানকার মানুষের জীবন।দোকানপাট খোলা থাকে, মানুষ বাজারে যায় পার্টিতে যোগ দেয় স্কুল বন্ধ থাকলেও অনলাইনে চলে ক্লাস। এমনকি অভিভাবকেরাও বলেন, স্কুল খুলে দাও, আমাদের বাচ্চারা ঠান্ডা সামলাতে শিখবে।

বরফে ঢাকা রাস্তার উপর বরফে জমে যাওয়া মাছ বিক্রি করতে বসেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। মাছ তাজা রাখতে রেফ্রিজারেটরের প্রয়োজন হয় না। শীতলতম শহরে দিব্যি চলে শীতের বিকিকিনি।
আচ্ছা জানতে ইচ্ছা করছে না আপনাদের, কি ধরনের পোশাক আশাক পড়েন ইয়াকুৎস্কের মানুষজন?
হিমাঙ্কের নীচে থাকা তাপমাত্রাকে দিব্যি উপভোগ করে দিন কাটিয়ে দেন!
একটার উপর একটা গরম পোশাক পরাই হলো প্রচণ্ড ঠান্ডায় জীবন কাটানোর প্রধান এবং একমাত্র চাবিকাঠি। তাঁরা সকলেই ‘বাঁধাকপির মতো পোশাক’ পরেন। পাতার অজস্র স্তর একটার পর একটা মিলে বাঁধাকপি তৈরি হয়। ইয়াকুৎস্ক শহরের বাসিন্দারাও প্রকৃতির এই নিয়মকে জীবনে কাজে লাগিয়েছেন। পুরু আস্তরণযুক্ত গরম উলের তৈরি একাধিক পোশাক গায়ে চাপিয়ে বরফের মাঝে আরাম খুঁজে নে। ইয়াকুৎস্কের মানুষজন। ঠান্ডার অনুভূতিই হয় না, বলতে পারেন তাঁদের মস্তিষ্কই ঠান্ডা সহ্য করার জন্য তৈরি হয়ে থাকে।

এখানে পানীয় জল বরফ গলিয়ে তৈরি করতে হয়, রাস্তায় কুড়ি মিনিট দাঁড়ালে চোখে মুখে বরফ জমে যায়, হাত-পা অসাড় হয়ে যায়। প্রচন্ড ঠান্ডায় বাসের জন্য কেউ অপেক্ষা করে না। শীতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সব সময় গাড়িতে চলতে হয়। আর গাড়ি সেটাকে সবসময় মোটা কম্বলে মুড়িয়ে রাখতে হয়, যাতে জমে না যায়।
গাড়িতে না হয় হল, বাড়িতে কি করে ভয়ংকর ঠান্ডা সামলান ইয়াকুৎস্ক শহরের মানুষরা? এখানেও রয়েছে বিজ্ঞানের অভিনব ব্যবহার। ইয়াকুৎস্ক শহরের মাটির নিচ আদতে পারমাফ্রস্ট। এই পারমাফ্রস্ট হলো মাটির অনেকটা গভীরে অবস্থিত হিমায়িত মাটির স্তর। এটি যাতে কোনদিন গলে না যায় তার জন্য বাড়ির নিচে রাখা হয় ফাঁকা জায়গা। কারণ একটুও যদি গরম পড়ে তাহলেই গলে যাবে এই পারমাফ্রস্ট। আর এক ধাক্কায় পুরো শহরটা কাদার সমুদ্রে বসে যাবে।
তবে এত শীতের মধ্যেও ইয়াকুৎস্কর মানুষজন জীবনটাকে উপভোগ করেন পুরোপুরি। গান নাচ পার্টি শপিং সবকিছু করে।
কুর্ণিশ জানাতে হয় এইসব মানুষজনদের যারা প্রতিনিয়ত বরফের ভেতর থেকেও জীবনের উষ্ণতাকে বাঁচিয়ে রাখেন। তারাই সব সময় প্রমাণ করে চলেন প্রতিকূলতার কাছে হেরে গেলে চলবে না বরং তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জিততে হবে প্রতিদিন।।
তথ্যঋণ : উইকিপিডিয়া, আল্টিমেট মোটিভেসান ও অন্যান্য নিউজ ডেস্ক।
বিচিত্র পৃথিবীর বিচিত্র রূপ কথা মনে হয় আপনার এই চমৎকার উপস্থাপনা। কিন্তু কি আশ্চর্য জীবন যাপন
বিপরীত পরিবেশে ভয়াবহ ভয়ানক পরিস্থিতিতেও মানুষ
ঠিক জায়গা করে নেয়, মানিয়ে নেয় নিজেকে পরিবেশের
অনুকূল করে প্রতিকুল পরিস্থিতিতেও।কত অজানারে
জানিয়ে দিলেন কৃতার্থ কৃতজ্ঞতায় স্বীকার করি ।ঐ শহরের
মানুষেরা যেন বলছে,- “তুমি কি দেখাও ভয় ,শৈত্যপ্রবাহ
শীত,ও ভয়ে কম্পিত নয় আমার হৃদয়”।
ভালো লেখা ভালোলাগা ভালোবাসা।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে এত সুন্দর একটি মতামতের জন্য।
মতামত জানিয়ে ছিলাম,কেন দেখতে পাচ্ছি না?