সুটকাগেনদর কি হরপ্পাসভ্যতার এক অবহেলিত কেন্দ্র?
এখানে যে লুকিয়ে আছে অজস্র ক্লু, সেটা ধরার চেষ্টাই করা হয়নি।
১৮৭৫এ মেজর এডওয়ার্ড মকলার আবিষ্কার করলেও ১৯২৯এ অরেল স্টেইনের আগে কেউ সেখানে সেরকম খননকার্য চালাননি।পরে জর্জ এফ ডেলস সাহেব আরও কিছু খোঁড়াখুড়ির চেষ্টা করেছিলেন ১৯৬০-এ।
বালুচিস্তানের মাকরান উপকূলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে ভারতীয় হরপ্পাবিশেষজ্ঞদের নজর সেরকমভাবে পড়েনি। ইরানসীমান্তে দাস্ত নদীর তীরে এর অবস্থান, সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র এটি।
এখানকার ভাষা এখন বালোচ, ব্রাহুই, উর্দু ইত্যাদি। ব্রাহুই ভাষা যে প্রোটোদ্রাবিড়ীয় ভাষাগোষ্ঠীর, তা অনেকেই মানেন।
সুটকাগেনদর নামটির মধ্যেও রয়েছে দ্রাবিড়ভাষার ছাপ।
রোদে পোড়া বা Bake এর তামিল প্রতিশব্দ হল সুট বা সুটুক। আবার ড. সত্যনারায়ণ দাশ-প্রণীত বাংলায় দ্রাবিড় শব্দ বইটিতে পাচ্ছি তামিল চুটু মানে পোড়ানো। এখানে গৃহনির্মাণে ও প্রতিরক্ষাবেষ্টনীর মোটা দেওয়ালের নির্মাণকার্যে পাকা ইট ও রোদে পোড়া বা Baked ইট ব্যবহার করা হত। প্রতিরক্ষা প্রাচীরের নির্মাণে পাথরের খণ্ডও লাগত। সিন্ধুসভ্যতার গৃহনির্মাণে রোদে পোড়া ইট ও উচ্চতর তাপমাত্রায় পোড়ানো পাকা ইট, উভয়েরই ব্যবহার করা হত।
দ্রাবিড় ভাষায় গুণ্ডু মানে গোলাকার বস্তু। তা থেকেই বাংলায় এসেছে গোলা অর্থে গেণ্ড, গেণ্ডুয়া, আর হিন্দিতে গেন্দ, গেন্দুয়া (সাদৃশ্যে)। গেন্দ মানে খেলার বল। যদিও অভিধান মতে প্রচলিত ধারণা হল, সংস্কৃত কুন্দক থেকে গেন্দ বা গেন্দুয়া বা গেণ্ডুয়া এসেছে।
পোড়া মৃত্তিকাগোলক বোঝাতে সুটকাগুণ্ডু কথাটি চলত। সুটকাগেনদর ছিল সীমান্তবর্তী নগর। শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে তিরিশ ফুট মোটা দেওয়ালবিশিষ্ট দুর্গ ছিল এখানে। তাই গোলাগুলতির ব্যাপারটা ছিলই। তামিলে উর বা উরু অর্থে জনপদ বা নগর বোঝায়। মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন নগরের নাম উর। সুটকাগুণ্ডু+উর = সুটকাগুণডুর > সুটকাগেনডুর > সুটকাগেনদর।
আবার পুরনো দিনে চামড়ার বলের অবর্তমানে ইটের টুকরো বা লোষ্ট্র দিয়ে বল খেলা হত। সেদিক থেকে শুকনো বা পোড়ানো ইটকেও গেণ্ড বা গেন্দ বলা হত। তাই সুটকাগেনদর মানে পোড়ানো বা রোদে শুকনো ইটের শহর বোঝাতেই পারে।
হরপ্পা সভ্যতা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম এবং অত্যন্ত উন্নত একটি নগরসভ্যতা, যা খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে প্রসারিত ছিল। এটি সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা নামেও পরিচিত। এই সভ্যতার অন্তর্গত গুরুত্বপূর্ণ নগরসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল সুটকাগেনদর। সুটকাগেনদর বর্তমান পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত, এবং এটি হরপ্পা সভ্যতার পশ্চিম সীমান্তবর্তী একটি বন্দর নগরী হিসেবে খ্যাত।
সুটকাগেনদরের ভৌগোলিক অবস্থান হরপ্পা সভ্যতার বাণিজ্যিক যোগাযোগের প্রমাণ বহন করে। এটি পারস্য উপসাগর এবং মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে ব্যবসার জন্য ব্যবহৃত হত। এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রটির একাধিক স্থাপত্য নিদর্শনের মধ্যে ইটের ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যা হরপ্পা সভ্যতার প্রকৌশল ও নির্মাণ কৌশলের উৎকর্ষকে প্রতিফলিত করে।
হরপ্পা সভ্যতার অন্যান্য নগরসমূহের মতো সুটকাগেনদরেও প্রধানত দুটি ধরনের ইট ব্যবহৃত হতো – পাকা ইট এবং কাঁচা ইট। তবে এই কেন্দ্রটির ইটের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে অন্যান্য স্থান থেকে আলাদা করে।
সুটকাগেনদরের ইটগুলোর সাধারণ পরিমাপ ছিল ৭:৪:১ অনুপাতে — দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার ভিত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ইটের দৈর্ঘ্য ২৮ সেন্টিমিটার, প্রস্থ ১৬ সেন্টিমিটার এবং উচ্চতা ৫.৫ সেন্টিমিটার হতে দেখা গেছে। এই অনুপাতটি হরপ্পা সভ্যতার বৈশিষ্ট্যসূচক, যা ইঞ্জিনিয়ারিং দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই কার্যকর ছিল এবং নির্মাণে সুসংগঠিত রূপ দিয়েছিল।
সুটকাগেনদরের পাকা ইটগুলো উচ্চতর তাপমাত্রায় পোড়ানো হতো, ফলে এগুলো শক্ত ও টেকসই ছিল। দীর্ঘকাল পরেও অনেক ইট ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত পাওয়া গেছে। এটি প্রমাণ করে যে ইট তৈরি করার সময় সঠিক কাঁচামাল নির্বাচন ও পরিশ্রমসাধ্য প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতো।
এই অঞ্চলের মাটি ও খনিজ উপাদানের ভিত্তিতে ইট তৈরি করা হতো। স্থানীয়ভাবে পাওয়া কাদামাটি এবং মাঝে মাঝে বালি মিশিয়ে ইট প্রস্তুত করা হত। সুটকাগেনদরের ইটগুলোতে ক্যালসিয়াম কম পরিমাণে থাকায় এগুলো অধিকতর টেকসই ছিল এবং বাতাস ও জলের ক্ষয়প্রবণতা কম ছিল।
সুটকাগেনদরের নির্মাণে ইট ব্যবহার হতো সুপরিকল্পিত বিন্যাসে। প্রাচীর নির্মাণে ইটগুলো “স্ট্রেচার ও বন্ড” পদ্ধতিতে বসানো হতো, যাতে গাঁথুনি মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই ইট দিয়ে বিভিন্ন প্রকার ভবন, রাস্তা, কুয়া ও ড্রেন তৈরি করা হত, যা তাদের উন্নত নাগরিক পরিকল্পনার প্রমাণ।
বেলুচিস্তানের শুষ্ক ও রুক্ষ পরিবেশে নির্মাণকাজের জন্য বিশেষ ধরনের ইটের প্রয়োজন ছিল। সুটকাগেনদরের ইটগুলো এমনভাবে তৈরি করা হতো যাতে তা অতিরিক্ত গরম, ধুলাবালি ও বৃষ্টির জল থেকে রক্ষা করতে পারে। অনেক গবেষকের মতে, এই ইটগুলোর গঠন ও পোড়ানোর পদ্ধতি পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য উন্নত করা হয়েছিল।
সুটকাগেনদরের ইট কেবল নির্মাণ উপাদান ছিল না, বরং এটি হরপ্পা সভ্যতার উন্নত প্রযুক্তির সাক্ষ্য বহন করে। ইট তৈরির নির্দিষ্ট মানদণ্ড এবং ব্যবহারিক বুদ্ধিমত্তা প্রমাণ করে যে, হরপ্পাবাসীরা শুধু কৃষি ও ব্যবসায় নয়, বরং প্রকৌশল ও নির্মাণপ্রযুক্তিতেও দক্ষ ছিল। সিমেট্রিক ইট, উন্নত বিন্যাস এবং মজবুত কাঠামো তাদের নাগরিক জীবনের মান উন্নত করেছিল।
সুটকাগেনদর হরপ্পাসভ্যতা তথা সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র। এর পশ্চিমেই ছিল পারস্য ও মেসোপটেমিয়া। ব্যাবিলনের সঙ্গে বাণিজ্যও চলত সুটকাগেনদর তথা সুতকাগেনদরের মাধ্যমে। এই অবহেলিত নগরটিতে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক খননের প্রয়োজন আছে। কেননা অন্যান্য সুসভ্য দেশের সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানকার প্রস্তরফলকে, প্রস্তর নির্মিত পাত্রে, ও পাহাড়ের গায়ে উৎকীর্ণ লিপিতে দ্বিভাষিক লিপির সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। এই দ্বিভাষিক লিপির অভাবেই সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি এখনও।যতই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও কম্পিউটার টেকনোলজি কাজে লাগানো হোক না কেন, দ্বিভাষিক লিপির অভাবে সে সবই মাঠে মারা যাচ্ছে। ফলত পত্রিকার প্রবন্ধ ছাপানো ও গালভরা সেমিনার-সাক্ষাৎকারেই সীমাবদ্ধ থাকছে গবেষকদের যাবতীয় লম্ফঝম্প।
একটি লাইনে দ্রাবিড়ীয় সংযোগ কোথায় তার যথার্থ প্রতিফলন ঘটল না। নামকরণ অনুসারে যেহেতু দ্রাবিড় সংযোগ দেখানো এই লেখাটির উদ্দেশ্য ছিল, তাই তথ্য যুক্তি দিয়ে সেটি প্রতিষ্ঠা করলে ভালো হত।