খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫ সালে, ভারত অভিযান শেষে শুষ্ক মাকরান মরুভূমি অতিক্রম করে ফেরার সময় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ও তাঁর সেনাবাহিনী এক স্বল্পপরিচিত উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মুখোমুখি হন — যাদের গ্রিক ভাষায় বলা হতো ইকথিওফাগি, অর্থাৎ “মাছখেকো”। এরা বাস করত আজকের পাকিস্তান ও ইরানের মাকরান উপকূলের নির্জন ও অনুর্বর তটে। পরিবেশ ছিল এতটাই কঠোর ও উদ্ভিদশূন্য যে ইকথিওফাগিরা আগুনের ব্যবহার কখনও শিখতেই পারেনি। তার পরিবর্তে তারা রোদে মাছ শুকিয়ে গুঁড়ো করত এবং তা ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে এক প্রকার সাধারণ রুটি তৈরি করত। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই পদ্ধতি আলেকজান্ডারের সঙ্গী ইতিহাসবিদদের বিস্মিত করেছিল; তাঁরা এই প্রায় বসবাস-অযোগ্য বলে বিবেচিত অঞ্চলে ইকথিওফাগিদের অসাধারণ সহনশীলতা ও ব্যতিক্রমী জীবনযাপনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
ইকথিওফাগিরা সমুদ্রজ প্রাণীর দেহাবশেষ দিয়েই তাদের আশ্রয়স্থল নির্মাণ করত — কাঠামোর জন্য তিমির হাড় ব্যবহার করা হতো এবং ছাদের কাজে লাগানো হতো মাছের আঁশ। তাদের হাতিয়ার ও গৃহস্থালির সামগ্রী তৈরি হতো মাছের কাঁটা ও ঝিনুকের খোল দিয়ে, যা তাদের সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রনির্ভর জীবনযাত্রার সাক্ষ্য বহন করে। আলেকজান্ডারের সঙ্গীরা — বিশেষত নিয়ার্কাস ও ওনেসিক্রিটাস — এই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন এবং একে গ্রিসের বাইরের বিশ্বের বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত বৈচিত্র্যের প্রমাণ হিসেবে দেখেন। আলেকজান্ডারের কাছে এটি ছিল আরেকটি শিক্ষা—মানুষ কীভাবে এমন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে, এমনকি সমৃদ্ধ জীবনও গড়ে তুলতে পারে, যা তাঁর সমসাময়িকদের কাছে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হতো।
পারস্য উপসাগরের মাকরান কোস্টের একটি প্রধান বন্দর ছিল সুতকাগেনদর বা সুটকাগেনদর। সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিমতম এই কেন্দ্রটির অন্যতম প্রধান ব্যবসা ছিল মৎস্যব্যবসা। মাছকে শুকিয়ে তারা নিজেরা ভবিষ্যতের জন্যে সঞ্চয় করে রাখত তো বটেই, বাইরেও রপ্তানি করত। স্বাধীনতার আগে অবিভক্ত ভারতে বহু জিনিসই আসত তথাকথিত পাকিস্তান থেকে। মুলতানি গাই, মুলতানি মাটি, বালুচি ঘোড়া ও সিন্ধের খনিজ লবণ।
তেমনি আসত মাকরান উপকূলে অবস্থিত সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র সুতকাগেনদর তথা সুটকাগেনদর থেকে সুটকি মাছ। সুটকাগেনদর নামটি বড় হওয়ার জন্যে মানুষ সংক্ষেপে এই নামে ডাকত। পারস্য উপসাগরের তীরে এই বন্দরশহর ছিল সিন্ধুসভ্যতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। লোথাল ও বালাকোটের মতো সিন্ধুসভ্যতার বন্দরনগরী।
সুতকাগেনদর নিয়ে ভারতের কোনও হরপ্পাবিশেষজ্ঞ কোনও কাজ করেননি। কেন করেননি, তাঁরাই জানেন। যেহেতু জায়গাটি পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে, তাই তাঁদের উৎসাহ নেই। ১৯৬০-এর পরে সেখানে কোনও খননকার্যও হয়নি। এটি সিন্ধু সভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র। ইরানের লাগোয়া। তাই মেসোপটেমিয়া থেকে হরপ্পাসভ্যতার অন্যান্য কেন্দ্রগুলির চেয়ে এই অঞ্চলের দূরত্ব সবচাইতে কম ছিল। দ্বিভাষিক লিপি বা রোসেটা স্টোনের খোঁজ এখানে মেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যে দ্বিভাষিক লিপির অভাবে হরপ্পাসভ্যতার লিপি তথা সিন্ধুলিপির রহস্যোদ্ঘাটন সম্ভবপর হচ্ছে না, সেই দ্বিভাষিক লিপি হয়তো এখানেই মিলতে পারে।

১৮৭৫-এ মেজর এডওয়ার্ড মকলার আবিষ্কার করলেও ১৯২৮-এ অরেল স্টেইনের (Aurel Stein) আগে কেউ সেখানে সেরকম খননকার্য চালাননি। পরে জর্জ এফ ডেলস সাহেব আরও বিস্তৃতভাবে খননকার্য করেছিলেন ১৯৬০-এ। তার পর থেকেই প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে এ নিয়ে দীর্ঘ নীরবতা।
সিন্ধুসভ্যতার (Indus Valley Civilization) লিপি আজও আমাদের কাছে এক অপার রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। শত শত মুদ্রা, পাত্র এবং অন্যান্য জিনিসপত্রে এই লিপি পাওয়া গেলেও, এখনও পর্যন্ত এটির সম্পূর্ণভাবে পাঠোদ্ধার করা যায়নি। এই রহস্য ভেদ করার অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে একটি দ্বিভাষিক লিপির আবিষ্কার—একই পাঠ দুইটি ভাষায় বা লিপিতে লেখা, যেমন রোসেটা স্টোনের সাহায্যে প্রাচীন মিশরের হায়ারোগ্লিফ লিপি পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়েছিল।
অনেক হরপ্পা প্রত্নস্থানের মধ্যে সুতকাগেনদর (বর্তমান পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে অবস্থিত) এমন একটি স্থান যেখানে এই ধরনের দ্বিভাষিক লিপি পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো: সুতকাগেনদরের ভূগোলগত অবস্থান, সংস্কৃতির বিনিময়ের প্রমাণ, নগর পরিকল্পনা, এবং এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। এই সকল বিষয় একত্রে এটিকে এমন এক স্থান হিসেবে গড়ে তোলে যেখানে দুই ভিন্ন সভ্যতার মধ্যে লিখিত যোগাযোগ ঘটতে পারে এবং সেখান থেকে একটি দ্বিভাষিক দলিল রচিত হতে পারে।
সুতকাগেনদর ছিল হরপ্পা সভ্যতার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত, আরব সাগরের উপকূলে। দাস্ত নদীর মোহনার কাছে অবস্থিত হওয়ায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর হিসেবে কাজ করত। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে দেখা গেছে যে হরপ্পাবাসীরা মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক), এলাম (ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল), ওমান এবং সম্ভবত আরও দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য করত।
মেসোপটেমীয় পুঁথিতে “মেলুহা” নামক একটি অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেটিকে বেশিরভাগ গবেষক হরপ্পা সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত করেন। এই বাণিজ্যের মাধ্যমে পণ্য যেমন কার্নেলিয়ান, তামা, ল্যাপিস লাজুলি এবং তুলা রপ্তানি হত। যখন দুটি লিখিত ভাষায় দক্ষ সভ্যতা বাণিজ্যে লিপ্ত হয়, তখন দ্বিভাষিক লিপি তৈরি হওয়া একান্তই স্বাভাবিক—বিশেষ করে বাণিজ্যিক নথি, চালান বা চুক্তিপত্র হিসেবে। সুতকাগেনদর ছিল এই ধরনের আন্তঃসভ্যতা যোগাযোগের এক আদর্শ স্থান।
সুতকাগেনদরে খুঁজে পাওয়া শিল্পকর্ম ও বস্তুগুলি শুধুমাত্র হরপ্পা সংস্কৃতির নয়, বরং বিদেশি প্রভাবের ইঙ্গিতও দেয়। যেমন মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া একটি সিলমোহর, যাতে মেলুহার একজন বণিককে দেখানো হয়েছে এবং সেখানে সিন্ধু উপত্যকার আদলে খোদিত চিহ্ন দেখা যায়।
বাংলা তথা অবশিষ্ট ভারতে আসত মাকরান উপকূলে অবস্থিত সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র সুতকাগেনদর তথা সুটকাগেনদর থেকে সুটকি মাছ। সুটকাগেনদর নামটি বড় হওয়ার জন্যে মানুষ সংক্ষেপে এই নামে ডাকত। পারস্য উপসাগরের তীরে এই বন্দরশহর ছিল সিন্ধুসভ্যতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। লোথাল ও বালাকোটের মতো সিন্ধুসভ্যতার বন্দরনগরী। সুটকি মাছের সমঝদাররা জানেন, দেশি প্রথায় তৈরি করা সুটকি মাছের সঙ্গে আমদানিকৃত সুটকিমাছের তফাত যথেষ্ট। সামুদ্রিক মাছের সুটকি বানানোর প্রধান একটি বন্দরশহর ছিল সুটকাগেনদর তথা সুতকাগেনদর।