| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

স্বামী বীরেশ্বরানন্দ প্রভু মহারাজ প্রসঙ্গে লিখেছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু

Reporter
শঙ্করীপ্রসাদ বসু / ৮৫৩ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের দশম অধ্যক্ষ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজীর (প্রভু মহারাজ) আধ্যাত্মিক মহিমা এবং সংগঠন-শক্তির কথা বলবার অধিকারী আমি নই। তাঁর সঙ্গে আমার একান্ত নিবিড় পরিচয় ছিল না। আমি কেবল তাঁর কাছ থেকে আমার প্রাপ্তির কিছু কথাই বলতে পারি।

বাল্যকাল থেকে বেলুড় মঠে আমাদের যাতায়াত। কখনো প্রয়াত শিক্ষক রাধাকান্তদার (রাধাকান্ত মল্লিক) সঙ্গে, কখনো বা বাদলদার (মৃগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) সঙ্গে। তখন দেখতাম, একজন হালকা চেহারার ফর্সা সাধু টকটক্ করে হাঁটছেন, হাতে কাগজপত্র, ব্যস্ত-ভাব। আমার ওই শিক্ষক মহাশয়দের সঙ্গে তাঁকে প্রণামও করেছি এবং তিনি চলে যাওয়ার পরে ওঁরা খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে বলেছেন — উনি প্রভু মহারাজ। সেসময়ে সঙ্ঘের সম্পাদক স্বামী মাধবানন্দ, মহান গম্ভীর পুরুষ; মহারাজকে তাঁর কাছে যেতে প্রায়ই দেখতাম। প্রভু মহারাজ ছিলেন সহকারী সম্পাদক।

তারপর তিনি সম্পাদক হলেন। এবার বাদলদার সঙ্গে মহারাজের ঘরেই তাঁকে প্রণাম করতে যেতাম। কখনো কখনো একলাও গিয়েছি। অল্প দু’একটি কথা হতো। আমাদের হাওড়া রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আশ্রমের কথা একটু-আধটু জিজ্ঞাসা করতেন। মাঝে মাঝে দেখেছি, পাশের ঘরে গিয়ে একচিলতে কফি হিটারে খুব গরম করে, সেই জ্বলন্ত বস্তুকে দু-এক চুমুকে শেষ করে দিতেন। কফিই বোধহয় তাঁর প্রধান খাদ্য বা পানীয় ছিল। নচেৎ মূল খাদ্য তিনি খুবই সামান্য খেতেন বলেই শুনেছি, একেবারে পাখির আহার। কী করে তা সত্ত্বেও প্রায় অলৌকিক কর্মক্ষমতা ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বজায় রেখেছিলেন, সে বিষয়ে আমরা ভক্তিভরে রসিকতা করতাম — মহারাজের এতটুকু শরীর, সেজন্য বাতাসের সঙ্গে সংঘর্ষে ক্ষয় পায় না, আর তাই অটুট অব্যাহত আছেন।

স্বামীজীর বিষয়ে আমি তথ্যসন্ধান শুরু করে দিয়েছিলাম, যেভাবেই হোক তিনি সেই খবর পেয়েছিলেন। হয়তো ভরত মহারাজের কাছ থেকে তা জেনেছিলেন। আমার প্রতি ভরত মহারাজের ছিল অহেতুক অকৃপণ স্নেহ।

বেলুড় মঠ গ্রন্থাগারে আমার কাজ করার প্রয়োজন হলো। মঠ-গ্রন্থাগারটি সংরক্ষিত ব্যাপার। তার তখনকার গ্রন্থাগারিক স্বামী ত্যাগীশ্বরানন্দ কড়া মানুষ। বইগুলোকে তিনি বুক দিয়ে আগলে রাখতে চাইতেন। সাধুদেরও বাড়তি সুযোগ দিতেন না। আর আমি হলাম না-সাধু। অথচ আমার প্রয়োজন আলমারির বইপত্তর ঘেঁটে উপাদান সন্ধান…সে-কাজে সাহায্য করার জন্য আত্মীয়-বন্ধুরা সঙ্গে থাকবে (যথা সুনীলবিহারী ঘোষ এবং বিমলকুমার ঘোষ)। বইয়ের পৃষ্ঠার ছবি তুলতেও হবে। সর্বোপরি, ব্রহ্মবাদিন ও প্রবুদ্ধ ভারত পত্রিকার প্রথম দিককার দুষ্প্রাপ্য সংখ্যাগুলির দরকারি অংশ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে টাইপিস্ট বসিয়ে টাইপ করাতে হবে। মঠে সে সুযোগ নেই। লাইব্রেরিয়ান মহারাজকে আর্জি জানালাম। তিনি চমকে শিউরে উঠলেন — আমি যেন প্রায় স্বর্গোদ্যানের নিষিদ্ধ ফলের দিকে হাত বাড়াচ্ছি! আমার প্রতি তাঁর যথেষ্ট স্নেহ ছিল। কিন্তু স্নেহ আর নিয়ম — এই দুই বস্তুকে নিজ নিজ ভূমিতে আটক রাখতে তিনি পারতেন — এক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘনে তাঁর ঘোর অনিচ্ছা। তখন কাতর হয়ে তাঁকে বললাম — তাহলে উপায় মহারাজ? তিনি বললেন, উপায় একটা আছে, একমাত্র উপায় — সেক্রেটারি মহারাজের অনুমতি। তাঁর মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হলো সিদ্ধিলাভ হবে না।

কী আশ্চর্য, আকাঙ্ক্ষা ও আশঙ্কা নিয়ে প্রভু মহারাজের কাছে গিয়ে যখন প্রার্থনা জানালাম, তখন তাঁর শান্তমুখে কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখা গেল না, জেরা বা সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করলেন না। কিন্তু তখনই লাইব্রেরিয়ান মহারাজকে জানিয়ে দিলেন — আমি যা চাইছি তা যেন দেওয়া হয় — যে-কোনো সংখ্যায়।

তাঁর অনুমতিতে আমি কেবল মঠ গ্রন্থাগার নাড়াচাড়া করতে পেরেছি তাই নয়, একসঙ্গে বেশকিছু সংখ্যার পুরনো পত্রিকা বাড়িতে আনতে পেরেছি। তার ফলে ব্রহ্মবাদিন ও প্রবুদ্ধ ভারত থেকে সংগৃহীত স্বামীজীর সমকালীন সংবাদ আমার ও সুনীলবিহারী ঘোষের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বিবেকানন্দ ইন ইন্ডিয়ান নিউজ পেপারস’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। মঠ গ্রন্থাগার ব্যবহারের এই প্রকার অনুমতি স্বামী গম্ভীরানন্দও সম্পাদক থাকাকালে বহাল রেখেছিলেন।

কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ হলো না।

গবেষণা একটা নেশার ব্যাপার। আর স্বামীজীর বিষয়ে গবেষণা তো মহা নেশা। কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগার ও অন্যান্য গ্রন্থাগার নাড়াচাড়া করা যখন শেষ হলো, তখন ১৯৬৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে মনে হলো এবার ভারতের অন্য জায়গায় সন্ধান করতে যাওয়া দরকার। বিশেষত স্বামী বিবেকানন্দ যতখানি না বাংলার ততোধিক ভারতের। সেকালের দক্ষিণ ভারতীয়রা সজোরে সে দাবি করতেন। কিন্তু ভারত ঘুরে গবেষণা করার সঙ্গতি কোথায়? বেশ কিছু সময় ভারতের নানা জায়গায় ঘুরে উপাদান সংগ্রহ করতে হলে খরচ অনেক। তা আমার সাধ্যে নেই। তবু ‘জয় মা’ বলে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে হলো। প্রথম যেতে চাইব পুনা শহরে। কারণ সেখানে বালগঙ্গাধর তিলকের ‘মারাঠা’ ও ‘কেশরী’ পত্রিকার পুরানো সংখ্যা পাওয়া যাবে। শুনেছিলাম, তিলক ও তাঁর প্রধান সহকর্মী এন সি কেলকার স্বামীজীর খুবই অনুরাগী ছিলেন। তাহলে তাঁদের পত্রিকাতে স্বামীজীর বেশকিছু সমকালীন সংবাদ মিলবার সম্ভাবনা। বম্বে যেতে চাই। কারণ তখনকার দিনে কলকাতার পরেই ভারতের প্রধান শহর বোম্বাই। সেখানে পুরানো সংবাদপত্র থাকার সম্ভাবনা। বোম্বাইয়ের রামকৃষ্ণ মিশনের কেন্দ্র আছে। সেখানে মঠের সুপারিশে আশ্রয় মিলবে। কিন্তু পুনায় কি হবে? সেখানে তো মিশনের কেন্দ্র নেই।

পুনশ্চ প্রভু মহারাজের কাছে গুটিগুটি হাজির হয়ে সমস্যার কথা বললাম। তিনি স্বভাবমতো শান্তভাবে শুনলেন এবং সেই ভাবেই বললেন, পুনায় মঠের এক ভক্ত আছে, পি এম বোডাস, তাকে লিখে দিচ্ছি, একটা কিছু ব্যবস্থা করে দেবে।

মহারাজ বোডাসের কাছে চিঠি পাঠালেন। পুনায় হাজির হলাম আমার স্ত্রী মায়াকে সঙ্গে নিয়ে — সে আমার কাজকর্মে কিছুটা সাহায্য করতে পারবে। পৌঁছে অতীব আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। দেখা হলো শ্রীযুক্ত বোডাসের সঙ্গে — উগ্র-গৌর বর্ণ, নীল চক্ষু, চিতপাবণ ব্রাহ্মণ। ডায়নামিক চরিত্রের মানুষ, অগস্ট আন্দোলনের সময় পায়ে পুলিশের গুলি খেয়েছিলেন বলে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটেন। শহরে রাসায়নিক জিনিসের কারখানা, তাতে সফল। শ্রীরামকৃষ্ণের একান্ত ভক্ত। পুনায় পার্বতী পাহাড়ের কোলে অনেকখানি জায়গা নিয়ে প্রাইভেট রামকৃষ্ণ আশ্রম ও ছোট মন্দির করেছেন। প্রভু মহারাজের চিঠি তাঁর কাছে অমোঘ বাণী। সুতরাং তিনি আমাদের দুজনের জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সদ্য-নেওয়া চমৎকার গেস্টহাউসে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। রাঁধুনী পাঠিয়ে দিলেন রান্না করার জন্য। গৃহকর্মের জন্য দিবারাত্রির ভৃত্যও এসে গেল। বলাবাহুল্য বহু প্রকার খাদ্যদ্রব্যও এসেছিল। মারাঠি পত্রিকার উপাদান সন্ধানের জন্য দুইজন সহকারি পাঠালেন। অনুসন্ধান প্রাপ্ত উপাদান টাইপের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং যাতায়াতের জন্য সাইকেল ভাড়াও করে দিলেন। ফলে টাইপ করার আংশিক খরচ ভিন্ন অন্য কোনো খরচই আমার হল না। পুনার কেশরী ট্রাস্ট অফিসে ও অন্যান্য গ্রন্থাগারে সন্ধান করে প্রচুর মূল্যবান তথ্য পেয়েছি এবং স্বামীজীর কিছু স্মৃতিকথা।

সবই ঘটল প্রভু মহারাজের ইচ্ছাবাহী চিঠির কারণে।

দ্বিতীয়বার (১৯৭১-৭২) যখন একই উদ্দেশ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচারের অর্থানুকুল্যে সদলে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত সফরে গিয়েছি, তখনো রামকৃষ্ণ মিশনের প্রেসিডেন্ট স্বামী বীরেশ্বরানন্দের পরিচায়ক-পত্র আমার কাছে অনেক দরজাই খুলে দিয়েছিল। অথচ আশ্চর্যের কথা, সন্ধানকালে আমি কী করেছি বা কী পেয়েছি, সেসব বিষয়ে বিশেষ জিজ্ঞাসাবাদ করেননি, আমি যেটুকু বলেছি সেইটুকুই শুনেছেন।

একাধিক সভায় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তার মধ্যে দুটি সভার কথা বিশেষভাবে মনে আছে। একটি আমাদের হাওড়া রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ আশ্রমে —আশ্রমের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে (১৮ মার্চ ১৯৬৮) যা আহূত হয়। আশ্রম-মন্দিরের উত্তর দিকের জমিতে প্যান্ডেল হয়েছিল। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন স্বামী বীরেশ্বরানন্দ, স্বামী অভয়ানন্দ, স্বামী ওঙ্কারানন্দ, স্বামী গম্ভীরানন্দ, স্বামী দয়ানন্দ, স্বামী অসঙ্গানন্দ, স্বামী সন্তোষানন্দ, স্বামী অপুর্বানন্দ, স্বামী গহনানন্দ প্রমূখ সঙ্ঘের প্রধান পুরুষেরা। প্রভু মহারাজ ছাড়া সকলেই বাংলায় বলেছিলেন। তিনি বলেন ইংরেজিতে। সভা চলার সময় ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো। প্রভু মহারাজের গলায় জোরও বেশি নয়। আমার ওপর ভার পড়ল, তাঁর ইংরেজি ভাষণ তখনি মুখে মুখে বাংলায় অনুবাদ করে শুনিয়ে দিতে হবে। সে কাজ করবার চেষ্টা যখন করছি তখন বাইরের ঝড় বৃষ্টির মত আমার ভেতরেও আশঙ্কার ঝড়-বৃষ্টি। সে অবস্থার কথা মনে গেঁথে আছে।

কাছাকাছি সময়ে আর একবারের ঘটনা। নিবেদিতা শতবার্ষিকী উৎসব উপলক্ষে নিবেদিতা বিদ্যালয় আয়োজিত শতবার্ষিকী সভা — মহাজাতি সদনে ২৮ অক্টোবর ১৯৬৭, সন্ধ্যা ৬ টায়। সেরকম সভা অল্পই দেখেছি কানায় কানায় ভরা মহাজাতি সদন। ভারতীয় মহাজাতির স্বপ্ন যিনি দেখেছিলেন এবং সেজন্য নিজের গরীয়ান জীবন উৎসর্গ করেছিলেন — সেই ভগিনী নিবেদিতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধায় সমস্ত স্থানটি গমগম করছিল। সভায় দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশনের প্রবীণ সন্ন্যাসীগণ-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং শত শত ছাত্রী ও তাঁদের অভিভাবক অভিভাবিকা। মঞ্চের উপরে প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা, প্রব্রাজিকা শ্রদ্ধাপ্রাণা-সহ সন্ন্যাসিনীরা। সভার সভাপতি স্বামী বীরেশ্বরানন্দ। বক্তা ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও ড. রমা চৌধুরী। অসুস্থতার জন্য সভায় উপস্থিত হতে না পেরে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে জানিনা কেন আমাকেও সভার সংগঠকরা বক্তারূপে আহ্বান করেছিলেন। সেদিন খুবই শারীরিক কষ্টে ছিলাম। আগের দিন পায়ে পেরেক ফুটেছে, গায়ে জ্বর, হাঁটছি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। তবু মনে প্রতিজ্ঞা, যেভাবেই হোক সভায় হাজির হব। নিবেদিতার শতবার্ষিকী পালন করছেন তাঁর স্বপ্ন, স্মৃতি ও সাধনায় ভরা বিদ্যালয়। সেখানে উপস্থিত হওয়ার গৌরবময় আনন্দ ত্যাগ করা যায় না। তার ওপর মনে একটা মৃদু অভিমান ছিল রামকৃষ্ণ মিশনের সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে — তাঁরা সরকারিভাবে নিবেদিতার শতবার্ষিকী পালন করবেন না। সেই সিদ্ধান্ত, একটু চিন্তা করলে দেখা যেত, খুবই স্বাভাবিক, কারণ মিশন শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীমা সারদাদেবী ও স্বামী বিবেকানন্দ ছাড়া আর কারও শতবার্ষিকী সরকারিভাবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয় নি — এমনকি স্বামী ব্রহ্মানন্দের শতবার্ষিকীও নয়। তবু অভিমান তো যুক্তির পথ ধরে চলে না — বিশেষত তখন আমি নিবেদিতার বিষয়ে লেখায় মেতে ছিলাম। তাই এ রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের অধ্যক্ষ মহারাজ নিবেদিতার বিষয়ে কি বলেন তা শুনবার জন্য উৎসুক ছিলাম। এর ঠিক উল্টোদিকে অন্য ইচ্ছাও। নিবেদিতার রামকৃষ্ণ-সঙ্ঘ ত্যাগ সম্বন্ধে বাইরের অনেক মানুষ রামকৃষ্ণ মিশনের বিরুদ্ধে যেসব দায়িত্বহীন সমালোচনা করেন, তার একটা জোরালো জবাব দেব ওই প্রকাশ্য সভায়। বক্তব্যে কোনোই অস্পষ্টতা রাখব না।

স্বামী বীরেশ্বরানন্দ তাঁর ভাষণে নিবেদিতার সম্বন্ধে অপরিসীম শ্রদ্ধা জানালেন। তাঁর কথাগুলি গভীর আনন্দে মন ভরিয়ে দিল। নিবেদিতার সমগ্র কর্মজীবনের যে সুবিহীত সম্ভ্রমপূর্ণ বর্ণনা তিনি করলেন, তারমধ্যে ধ্বনিত হয়েছিল রামকৃষ্ণ মিশনের সামগ্রিক মনোভাব। তাঁর ভাষণের শেষাংশে এই স্মরণীয় উক্তিটি ছিল ‘স্বামী বিবেকানন্দ নিবেদিতার মধ্যে দিয়ে আমাদের মাতৃভূমিকে অসামান্য উপহার অর্পণ করেছেন। স্বামীজীর কাছ থেকে নিবেদিতা কোন জীবন-দর্শন লাভ করেছিলেন, তাও বীরেশ্বরানন্দজী নিবেদিতার ‘কালী দ্য মাদার’ গ্রন্থের অংশ উদ্ধৃত করে তুলে ধরেন। মহামাতা কালী তাঁর সন্তানদের ডাক দিয়ে বলেছেন, ‘নিজের জন্য কোনও করুণা চেয়ো না। তা না চাইলেই তোমাকে আমি অপরের জন্য করুণা বহনের বিরাট আধার করে তুলব। যে অন্ধকার তোমার মধ্যে ঘনিয়েছে, তাকে যদি সাহসের সঙ্গে বরণ করতে পার — তাহলেই কেবল তোমার দীপের আলোক অপরকে পূর্ণ করে দেবে মঙ্গলজ্যোতিতে। তুচ্ছতম কাজ পর্যন্ত করে যাও সানন্দে, আর ত্যাগ কর উচ্চপদের আকাঙ্ক্ষা।’

স্বামী বীরেশ্বরানন্দের কাছ থেকে আরও শুনেছিলাম, নিবেদিতা কীভাবে স্বামীজী এবং মাতাঠাকুরানীর কাছে শিক্ষা নিয়ে ভারতবর্ষকে বুঝতে পেরেছিলেন সুগভীর স্তরে এবং তা প্রকাশ করেছিলেন অসাধারণ শক্তিশালী কিছু প্রবন্ধে ও গ্রন্থে। জেনেছিলাম, কীভাবে নিবেদিতা ভারতীয় ধারায় অভিনব একটি নারী শিক্ষালয় স্থাপন ও পরিচালনা করেছেন, প্রেরণা দিয়েছেন ভারতীয় যুবকদের ত্যাগে ও বীরকর্মে, কয়েকজন শ্রেষ্ঠ ভারতীয়কে সাহায্য করেছেন বিজ্ঞান ও শিল্প সাধনায় এবং রাজনৈতিক কারণে বাহ্যত রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিন্ন হলেও তা অব্যাহত ছিল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, ধর্মীয় আনুগত্যের ক্ষেত্রেও। ভগিনী নিবেদিতার মৌলিক প্রতিভা, চরিত্রশক্তি হৃদয়বত্তা এবং পরিপূর্ণ আত্মনিবেদন সম্বন্ধে প্রশস্তি একদা উচ্ছ্বসিত হয়েছিল অগণ্য কণ্ঠে, তাদের ভেতর থেকে স্বামী বীরেশ্বরানন্দ চয়ন করেছিলেন বিশেষ কয়েকটি শব্দকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ যে-শব্দগুলি তা ‘নিবেদিতা ঈশ্বরের জ্যোতির্ময়ী কন্যা’।

ওই সভায় যা বলব ভেবেছিলাম তা বলেছিলাম কিছুটা তীব্র কঠিনভাবে ও ভাষায়। দেখাবার চেষ্টা করেছিলাম, নিবেদিতার সঙ্ঘত্যাগ নিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের বিরুদ্ধে সমালোচনাগুলি কত অসার। আমার মোট বক্তব্য ছিল — রাজনীতি গ্রহণ সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত করার অধিকার যেমন নিবেদিতার ছিল, তেমনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন ধর্ম-প্রতিষ্ঠান রামকৃষ্ণ মিশনেরও অধিকার ছিল নিবেদিতাকে সঙ্ঘ ত্যাগ করতে বলার। স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন — সেই নীতির অনুসরণে রাজনীতিতে অংশগ্রহণে সিদ্ধান্তকারী নিবেদিতাকে সঙ্ঘভুক্ত রাখলে রামকৃষ্ণ মিশন নীতিভ্রষ্ট হয়ে যায়। এই সঙ্গে আবার বহুতর তথ্যের দ্বারা দেখাতে চেষ্টা করেছিলাম — রাজনীতির অংশ বাদ দিলে বাকি সকল বিষয়ে ব্রহ্মচারিণী নিবেদিতার সঙ্গে সঙ্ঘের সম্পর্ক অটুট ছিল। শ্রীমা সারদা দেবী, স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী সারদানন্দের সদা স্নেহাশ্রিতা কন্যা নিবেদিতা কখনই ধর্মক্ষেত্রে সঙ্ঘবহির্ভূত ছিলেন না — তা থাকলে পরবর্তী সময়ে তিনি কিছুকাল সঙ্ঘের মুখপত্র প্রবুদ্ধ ভারত পত্রিকায় সম্পাদকীয় লিখতে পারতেন না, তাঁর সেরা বই ‘দ্য মাস্টার এ্যজ আই স হিম’ উদ্বোধন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হতে পারত না, এবং সঙ্ঘের কাছে গীতাতুল্য স্বামীজীর ‘কমপ্লিট ওয়াক্সের’ ভূমিকাও তাঁকে লিখতে দেওয়া হতো না। এই তিক্ত প্রশ্ন করেছিলাম —বাইরের যেসব মানুষ নিবেদিতার প্রতি ভক্তিতে শ্রদ্ধায় আকুলি-বিকুলি, তাঁরা, রামকৃষ্ণ মিশন নিবেদিতার জন্য কিছুই করেনি, এই গালাগালি দেওয়া ছাড়া নিজেরা কী করেছেন? অথচ রামকৃষ্ণ মিশনের তত্ত্বাবধানেই গড়ে উঠেছে এ-দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়’।

আমার কথাগুলি সুখসেব্য ছিল না। সেই বিরাট সভায় উপস্থিত সকলেই কিছু রামকৃষ্ণ মিশনের অন্ধ অনুরাগী নন। আমার ঝাঁজালো কথায় তাঁরা স্বতই বিরক্তবোধ করতে পারেন। আশঙ্কা ছিল উপস্থিত সন্ন্যাসীরা ওই ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তৃতায় অস্বস্তিতে পড়তে পারেন।

বক্তৃতা শেষে আমি সঙ্ঘাধিনায়ক স্বামী বীরেশ্বরানন্দের দিকে সঙ্কোচের সঙ্গে তাকিয়েছিলাম। না, তিরস্কার নয়, তাঁর মুখে স্নেহের মৃদু হাসি। আমি আমার এক সেরা পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিলাম।

আমার মাস্টারমশাই-এর পুত্র শঙ্খ বসুর অনুমতি নিয়ে লেখাটা সংগ্রহের তালিকায় রাখলাম।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev