উনিশ শতকে আকস্মিক ও আরোপিত কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণের ঢেউ স্বাভাবিকভাবেই আছড়ে পড়েছিল বাংলার ধর্মীয় মৌরসিপাট্টায়। পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতির মাধ্যমে আধারিত সেই নবজাগরণ আদতে বাংলার নবচেতনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। সেই আধুনিক শিক্ষার সোপান বেয়ে আত্মবিশ্বাস ও যুক্তির মানবিক অভিমুখে ধর্মকেন্দ্রিক সমাজজীবনে আঘাত নেমে আসাটা ছিল সময়ের অপেক্ষামাত্র। সেদিক থেকে নবচেতনার আলোয় পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভোগারতিতে ‘বাবু’ বাঙালির আবির্ভাবের বিরূপতার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক পরিসরের উৎকর্ষমুখর প্রকৃতি আপনাতেই সবুজ হয়ে উঠেছিল। সেক্ষেত্রে উনিশ শতকীয় নব্য সংস্কৃতিতে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নবদিগন্তই শুধু সূচিত হয়নি, সবচেয়ে বেশি সাফল্য তাতেই প্রস্ফুটিত। এই সাহিত্যের অভিমুখও ছিল মানবিকতায় পূর্ণ। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির তীব্র প্রভাবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আধিপত্যের প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও নিঃশর্ত আত্মনিবেদনে প্রশ্নাতুর মনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস জেগে ওঠে। সেখানে সমাজমানসে ধর্মীয় অস্তিত্বই শুধু প্রশ্নের সামনে আসেনি, ধর্মীয় সংস্কারে মানবিক অস্তিত্বের বিপন্ন প্রকৃতিও সরবতা লাভ করে। তার ফলে সমাজসংস্কারের সোপানে মানবিক আবেদন মুখর হলেও তার ধর্মীয় পরিসরে ঐশ্বরিক চেতনা নানাভাবে বিস্তার লাভ করে।
নদীর একাদিক শাখানদীতে বিভক্ত হওয়া থেকে উপনদীতে মিশে যাওয়া সবেতেই নদীর অস্তিত্বের মতোই উনিশ শতকে ধর্মীয় সমাজের ভাঙনেও সেই অলৌকিক ঈশ্বরের অবিকল্প পরশ নানাভাবে বিস্তার লাভ করে। ঈশ্বরের আরাধনা-উপাসনা-সাধনায় ধর্মপালনের সোপানে উন্নত জীবনের হাতছানিই সেখানে নানাভাবেই মূর্ত হয়ে উঠেছে। সেদিক থেকে ধর্মের ঐশ্বরিক অভিমুখটি ধর্মীয় সংস্কারের মধ্যেও নিঃস্ব হয়ে পড়েনি, বরং তার নিরাকার অস্তিত্বই আরও শিক্ষাশোভন পরিসরে উপলব্ধির গভীরতায় আবেদনক্ষম মনে হয়েছে। অন্যদিকে ধর্মীয় চেতনায় সংস্কারসাধনের পথটি সমাজের মানবিক আবেদনে সাড়া দিলেও তার ঐশ্বরিক গন্তব্যে ছিল লক্ষ্যাভিমুখী। একারণে ব্রাহ্মধর্মের প্রগতিশীল চেতনার সংস্কারমুখর ক্রমবিস্তারও মানবিক আদর্শে প্রাণিত হতে পারেনি। একাধিক ব্রাহ্মসমাজ গড়ে উঠলেও তার উপাসনায় মানবসেবার অভিমুখ রচিত হয়নি। অন্যদিকে উন্নত জীবনের হাতছানিতে বঙ্কিমচন্দ্রের অনুশীলন তত্বেও দেবত্বের সংস্কার ও গরিমা বর্তমান। সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সুযোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দই ধর্মের অভিমুখটিই পরিবর্তন করে দিয়েছেন। গুরুতে যা ছিল প্রচ্ছন্ন, শিষ্যে তাই প্রকট হয়ে ওঠে।

স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর মানবিক আদর্শ পেয়েছিলেন স্বয়ং গুরুর কাছে থেকে। শ্রীরামকৃষ্ণের ‘যত মত, তত পথ’ ছিল তাঁর আদর্শের আধার। উনিশ শতকে এরূপ ধর্মীয় চেতনায় গণতন্ত্রের পাঠ ছিল অভূতপূর্ব। স্বামীজি সেই পাঠে সামিল হওয়ার অবকাশ পেয়েছিলেন কলেজজীবনেই। তখন তিনি ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত, ডাকনাম বিলে। শ্রীরামকৃষ্ণের পরশ পাওয়ার পূর্বেই তাঁর ধর্মীয় ভাবনার উন্মেষ ঘটেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নরেন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন এক ধর্মানুরাগী পরিবারে। তাঁর পিতামহ দুর্গাপ্রসাদ দত্ত বিশ-বাইশ বছর বয়সেই সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। অন্যদিকে স্বামীজি ছোটবেলা থেকেই সাধু-সন্ন্যাসীর প্রতি তীব্র অনুরাগী ছিলেন। ধ্যান-ধ্যান খেলা থেকে ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন সবেতেই তাঁর ধর্মীয় বোধের পরিচয় নিবিড় হয়ে আসে। সেদিক থেকে শ্রীরামকৃষ্ণে মিলিত হওয়ার জন্য যেন নরেন্দ্রনাথের জীবনে ক্ষেত্রপ্রস্তুত হয়েছিল।
জেনারেল এসেম্ব্লিজ ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে স্কটিশ চার্চ কলেজ ) পড়ার সময়ে একদিকে যেমন তিনি পাশ্চাত্য দর্শনের মাধ্যমে ধর্মীয় মননে সক্রিয় হওয়ার অবকাশ পেয়েছিলেন, অন্যদিকে ব্রাহ্মসমাজের উপাসনায় সামিল হয়ে প্রশান্তি লাভে সচেষ্ট হয়েছিলেন। অথচ কোথাও তিনি স্বস্তি পাননি। এই অস্বস্তিবোধই তাঁকে আরও ঐশ্বরিক চেতনায় উন্মুখ করে তুলেছিল। সেখানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে পাশ্চাত্যের সংশয়বাদ ও অজ্ঞেয়বাদ তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যদি থাকেনই, তবে জগতে এত দুঃখকষ্ট কেন, মঙ্গলময় ঈশ্বরের জগতে এত অমঙ্গলের হাহাকার কীকারণে, এই সব প্রশ্ন তাঁকে মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে। সময় গড়িয়ে চলে, কিন্তু প্রশ্ন অচল থেকে যায়। সেখানে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও নীরবতা পালন করে। ওদিকে বিশ্বনাথ দত্তের অকালপ্রয়াণে পিতার অবর্তমানে সাংসারিক দায়ভারে বিপর্যস্ত নরেন্দ্রনাথ দারিদ্রের পীড়নে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে আরও তীব্র প্রশ্নবাণের সম্মুক্ষে নিজেকে সামিল করেছেন। তাঁর উপশমের নিদান দিয়েছিলেন সেই ইনস্টিউটের অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেস্টি। ওয়ার্ডস্ওয়ার্থের ‘একস্কারসন’ কবিতাটি ক্লাসে পড়াতে সেদিন অধ্যক্ষ দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কথা জানিয়েছিলেন। নরেন্দ্রনাথ তাঁর সেই গুরুতে ঈশ্বরের গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন। সেখানে ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’র মধ্যে নরেন্দ্রনাথ মানবসেবার সোপানে ঈশ্বরসেবার আদর্শ খুঁজেপেয়েছিলেন। সেই মানবিক আদর্শে ‘নররূপে নারায়ণ’সেবাই ছিল তাঁর ঈশ্বরসাধনা, বহুরূপে মানুষের মধ্যে দেবত্বের পরশলাভই তাঁর মানবধর্মের সোপান। অথচ স্বামীজিকেই দেবতা বানানোর তীব্রতায় তাঁর মানবিক আদর্শকেই আমরা অমান্য করে চলেছি, ভাবা যায়!
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
নিবন্ধটি চমৎকার। কিন্তু সুভাষচন্দ্র ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবিটি যথাযথ হলো না। এডিট করা ছবি না দেওয়াই উচিত। লেখকের এই বিষয়ে আরো যত্নবান হওয়া উচিত ছিল।
ছবির বিষয়টি লেখকের নয়, সম্পূর্ণভাবেই সম্পাদকের সিদ্ধান্ত ।