আমার বিশ্বাস, স্বামী বিবেকানন্দ আপামর বাঙালি সমাজের কাছে খুব একটা জনপ্রিয় ক্রীড়া তারকা নন। ফুটবল না খেললে বাঙালিকে খেলার মাঠে জয় করা যায় না। ইদানিং তার সঙ্গে জুটেছে ক্রিকেট। স্বামীজি ফুটবল খেলেছেন, এমন তথ্য এযাবৎ আমি কোথাও পাইনি। কিন্তু খেলেছেন, এ তথ্যও যখন পাচ্ছি না, তখন খেলেছিলেন সেটা বিশ্বাস করা ভালো, বিশেষত বিবেকানন্দের বাণী-ই যখন তার জীবন। ফুটবলের স্বপক্ষে সব থেকে বড় স্লোগান বিবেকানন্দ আমাদের দিয়েছেন। স্বাধীনতা-পূর্ব কালে কোন্ দেশপ্রেমিক বাঙালি স্বামীজির এই ফুটবল – সমর্থন বাক্য উচ্চারণ করে উদ্দীপ্ত হননি –” গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেললে তোমরা স্বর্গের অধিকতর নিকটবর্তী হবে”।
কথাটা সেকালে আর নিছক কথার কথা ছিলো না, বজ্র ঘোষণা বা মন্ত্রের মত মানুষের মুখে মুখে ফিরত। বিশেষ করে এই জীবন-মন্ত্র তারাই উচ্চারণ করতেন, যারা মাঠের ফুটবলের থেকে জীবনের ফুটবলে বেশি বিশ্বাস করতেন — যেমন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। এই ঘোষণার কথা যখন ভাবি, চমকে উঠি স্বামীজির ধর্মদ্রোহী দুঃসাহসী মনোভাবে। বিবেকানন্দ হিন্দু সন্ন্যাসী, গীতা হিন্দুর বাইবেল — তাকে ফুটবলের নিচে ফেলা কি ধর্মের লাইবেল নয়? অথচ, এই কথা বলার জন্য কোনো ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি বিবেকানন্দের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন নি। বিবেকানন্দের চরিত্রের মহিমা এখানেই পরিস্ফুট — তিনি মানুষকে বুঝিয়ে দিতে পারতেন কোন্ অর্থে তিনি কী বলছেন। যারা পানাপুকুরে স্নান করে, উষাকালে গীতা পাঠ করে, বাকি সময় নিষ্কাম নিদ্রায় ডুবে থাকে, তাদের জাগাতে গেলে প্রভাতিক গীতার নামতা ছড়িয়ে মাঠের সংঘর্ষে নামিয়ে দেওয়া দরকার, তবেই তারা গীতার অর্থ বুঝবে, স্বামীজি তা জানতেন। তাই নির্দ্বিধায় বলতে পারি স্বামীজি গীতা – পুরুত ছিলেন না, ছিলেন গীতা – মূর্তি।
ফিরে আসি ক্রিকেটে। স্বামীজি ফুটবলে যদি নাও পদাঘাত করে থাকেন (?), ক্রিকেট যে খেলেছেন, তার প্রমাণ তার জীবনী তে পাওয়া যায়। অদ্বৈত আশ্রম প্রকাশিত স্বামীজির জীবনী গ্রন্থের মধ্যে তার উল্লেখ আছে। এ বিষয়ে আরো তথ্য দিয়েছেন মহেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি বলছেন, ” এখন যাহাকে ক্রিকেট খেলা বলা হয়, তখন ব্যাট আর বলকে চলিত কথায় বলা হতো বাটাম্বল। বেশ সুন্দর খেলা। বীরেশ্বর এই খেলায় বেশ উৎসাহ দেখাতো। সে বল ঠিক মারিতে পারিত। বীরেশ্বর ছিল এই খেলার সর্দার। বাল্যকাল থেকেই দেখা যেত সে যেন সর্দার গিরির জন্যই জন্মিয়াছে। খেলায় সে যা হুকুম করিবে, অন্যরা সেটা মানিবে। এমনকি ঝগড়া হইলে সেই মেটাইবে। এই জন্য বীরেশ্বর যতক্ষণ না মাঠে নামিত, খেলা জমিত না।” দুঃখের বিষয়, বিবেকানন্দের ক্রিকেট খেলা সম্পর্কে আর কোনো যুৎসই তথ্য সেভাবে পাচ্ছি না। তবে শোনা যায়, তিনি নাকি কলকাতার টাউন ক্লাবে ক্রিকেট খেলতেন। এবার একটা স্বপ্ন দৃশ্যের কথা বলি।
দেখতে পাচ্ছি বিবেকানন্দ ক্রিকেট খেলছেন। কার মতো? হ্যামন্ড এ মতো, না ব্র্যাডম্যান এর মতো? আমার ধারণায়, বিবেকানন্দের মধ্যে হ্যামন্ড এর মর্যাদা আর ব্র্যাডম্যান এর dynamism মিলে মিশে একাকার। এছাড়াও ছিল ডাব্লিউ জি গ্রেসের চতুর দুষ্টুমি। আর আমাদের রনজি — তিনিও বিবেকানন্দের মধ্যে ছিলেন স্বমহিমায়। শেষ কথা হিসাবে বলা যায়, ক্রিকেট হলো সেই খেলা যাতে উঁচু হয়ে আছে ব্যাটের রাজদণ্ড, যার থেকে নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ে লাল বলের বল্লাল কৌলিন্য। আনন্দবাজার পত্রিকায় একবার এক বিতর্ক হয়েছিল – রবীন্দ্রনাথ কি ক্রিকেট খেলতেন? এটা আজ প্রমাণিত যে রবীন্দ্রনাথ, এমনকি মহাত্মা গান্ধীও ক্রিকেট খেলেছেন। কিন্তু এঁদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ক্রিকেটের সামঞ্জস্য নেই। কিন্তু বিবেকানন্দের? ক্রিকেট রাজার খেলা, আর আমরা বিবেকানন্দকে মনে করি ‘জীবনের মহারাজা’। আর কে না জানে, ক্রিকেট মনুষ্য- জীবনের খুব ছোট একটা অংশ!
গ্রন্থসূত্র: ‘সহাস্য বিবেকানন্দ’, নব ভারত পাবলিশার্স, কলেজ স্ট্রিট
ঋণ স্বীকার : শঙ্খ বসু