আকাশবাণী কলকাতার অনুরোধে ১৯৯৩ সালে অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসু এই কথিকাটি পাঠ করেছিলেন। তাঁর পুত্র ড. শঙ্খ বসুর সৌজন্যে লেখাটি আমাদের পোর্টালে প্রথম প্রকাশিত হলো। স্বামী বিবেকানন্দের ১৫৮ বছর পূর্তিতে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য—উপদেষ্টা সম্পাদক
১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শিকাগো ধর্মমহাসভার বৈকালী অধিবেশনে এক তরুণ ভারতীয় সন্ন্যাসী, নাম স্বামী বিবেকানন্দ, যখন সমবেত শ্রোতাদের সম্বোধন করেছিলেন—‘ভ্রাতা ও ভগিনীগণ’ বলে, তখন কী ছিল তার মধ্যে যে মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার উচ্চশিক্ষিত নর-নারী উঠে দাঁড়িয়ে উন্মত্ত উল্লাসে করতালি দিয়েছিলেন? তারপর তিনি যখন তাঁর কয়েক মিনিটের ক্ষুদ্র ভাষণ শেষ করেছিলেন তখন কেন তা কবি ও সাংবাদিক হ্যারিয়েট মনরো-র কাছে অনেকের মতো মনে হয়েছিল—‘এই হলো ইতিহাসের মহামুহূর্ত। এই হলো বাগ্মিতার চরম শিখর।’
পৃথিবীতে বহু অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, তাদের হেতু দুর্জ্ঞেয়। অভিভূত মানুষ শুধু বলে, ‘জয় তব জয়’— কারণ তা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এ তো ‘আগমন নয়, এ যে আবির্ভাব।’
তবু সমকালীন আমেরিকার সংবাদপত্রগুলির বিবরণ লক্ষ্য করলে কয়েকটি জিনিস বিশেষভাবে চোখে পড়ে। সাধারণ সংবাদপত্রগুলি (যা বিশেষ গোষ্ঠীর কাগজ নয়) একবাক্যে স্বামীজিকে ‘ধর্মমহাসভার সর্বশ্রেষ্ঠ বাগ্মী’ বলে চিহ্নিত করেছিল—‘সভার শেষে তাঁর কয়েক মিনিটের বক্তৃতা শোনার জন্য শ্রোতারা তার পূর্বে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্যের নীরস বক্তৃতা শুনে যেত। সংবাদপত্রগুলি স্বামীজির অসাধারণ সুন্দর চেহারা, বর্ণোজ্জ্বল পোশাক, অপূর্ব কণ্ঠস্বর, ভাষা ও বাচনভঙ্গির কথা বলেছে মুগ্ধ বিস্ময়ে—আর শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমে নমস্কার জানিয়েছে তাঁর বক্তব্যের উদার মহিমাকে। অন্য বক্তারা যেখানে কেবল নিজ নিজ ধর্মের কথা বলেছেন, যেখানে বিবেকানন্দ বলেছিলেন নিত্য ধর্মের কথা—প্রতিটি বিশেষ ধর্ম যার অন্তর্গত।
উনিশ শতকের শেষে পাশ্চাত্য দেশগুলি যখন অর্থে ও শক্তিতে অহংকৃত, নিজ ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের সমতা স্বীকারে গররাজি, তখন শিকাগো ধর্মমহাসভায় নানা ধর্মের প্রতিনিধিরা এক মঞ্চে বসে নিজ নিজ ধর্মের গৌরব ঘোষণা করছেন— ধর্মের ইতিহাসে এ এক বিরাট ঘটনা, যার মহিমা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন ম্যাক্সমুলার পর্যন্ত। তবু সমস্ত ব্যাপারটাই ইতিহাসের পৃষ্ঠায় আবদ্ধ থাকত, যদি না সেখানে স্বামী বিবেকানন্দের মতো বিশ্বপুরুষের আবির্ভাব হতো, যাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিষয় বহু সংখ্যক মানুষের ধারাবাহিক অনুশীলনের বিষয়।
সংবাদপত্রের বিবরণে এবং গ্রন্থে স্বামীজির ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ব্যক্তিত্ব, ব্রোঞ্জের ঘণ্টাধ্বনির মতো কণ্ঠস্বর এবং সুদর্শন চেহারার বহু বর্ণনা আছে। ব্রুকলির ‘স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকায় :
‘‘…পরণে উজ্জ্বল লোহিত চিত্রবৎ সুন্দর আলখাল্লা, কমলারঙের পাপড়ির তলায় ঘনকৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশ, শ্যামল মুখে দ্যুতিময় চিন্তার অভিব্যক্তি, প্রফেটের উন্মাদনায় জ্যোতির্ময় বিশাল বাঙ্ময় চক্ষু, স্পন্দিত মুখ থেকে উৎসাহিত গভীর সঙ্গীতময় কণ্ঠস্বর…’’
স্বামীজির ভাষা ও বাচনভঙ্গির অজস্র বর্ণনায় ক্ষুদ্র এক অংশ, ‘নিউইয়র্ক ক্রিটিক’ পত্রিকায় :
‘‘সর্বোত্তম শিল্পকৌশলের সঙ্গে তিনি নিজ বক্তব্যকে উপস্থিত করেন, …প্রায়শ উন্নীত হন দিব্য প্রেরণার শিখরে…’’
হার্টফোর্ড ‘ডেইলি টাইমস’-এ :
‘‘তাঁর প্রাচ্যদেশীয় রূপময় মুখমণ্ডল এক অপূর্ব চিত্রের মতো শ্রোতাদের নয়নকে যেমন মোহিত করেছিল, তেমনি তাদের শ্রবণ আনন্দে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল উচ্চ আধ্যাত্মিক ভাবময় বাক্যরাজিতে।’’
‘অ্যাপীল অ্যাভালেঞ্চ’ পত্রিকায় বলা হয়েছিল, ‘‘ইংরেজি ভাষাকে অলংকৃত করেছে এমন অপরূপ দর্শক মাণিক্য পূর্ণ তাঁর শব্দাবলি।’’
‘ফ্রি প্রেস’ কাগজ তাঁর অতি সুন্দর যুক্তির বুনন দেখে মনে করেছিল, তা যেন ‘‘তাঁর স্বদেশে নির্মিত বহুবর্ণরঞ্জিত একখানি সুচিশিল্প, যা প্রাচ্যের সম্মোহক সুগন্ধিতে সিঞ্চিত।’’
বিচিত্র ব্যাপার হলো, স্বামীজির দৈহিক সৌন্দর্য এবং পোশাকের বর্ণগরিমাই আবার তাঁর সমালোচকদের কাছে নিন্দা কটাক্ষের বিষয়। তাঁরা বলেছিলেন, লোকটি অপরের মন জয় করেছে, কেবল সুন্দর মুখ ও ঝলমলে পোশাকের জন্য। আমেরিকায় স্বামীজি যেমন অজস্র প্রশংসা পেয়েছেন তেমনি স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের কাছ থেকে প্রচুর নিন্দাও কুড়িয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কারণ অবশ্য ছিল। পরাধীন দেশের লোক হয়েও কী স্পর্ধা, পাশ্চাত্যবাসী এক হাতে তরবারি, অন্য হাতে বাইবেল নিয়ে বিদেশে ধর্মপ্রচার করতে যায়। লোকটি বলছে, আমরা খ্রিস্টের অনুগামী নই, আমাদের ফিরে যেতে হবে খ্রিস্টের কাছে ইত্যাদি ইত্যাদি। স্বামীজি সেকালে পাশ্চাত্যে বহুপ্রচারিত পাপবাদ সম্বন্ধে বলেছিলেন—মানুষকে মূলে পাপী বলাই সবচেয়ে বড়ো পাপ। স্বর্গের সিংহাসনে বসে থাকা দণ্ডধারী ঈশ্বর এবং অনন্ত নরকের ধারণা ত্যাগ করে তিনি মানুষের অন্তর্নিহিত দেবত্বের চেতনা আনবার আহ্বান জানিয়েছেন। আর প্রাচ্যে ধর্মপ্রচারে রত বিদেশি প্রচারকদের উদ্দেশে বলেছিলেন— ‘‘প্রাচ্যের এখন প্রয়োজন ধর্ম নয়—রুটি। হে পাশ্চাত্যবাসীগণ! তোমাদেরই শাসনের ফলে কোটি কোটি মানুষ অনাহারে মরছে, তাদের ধর্মকথা শোনানোর চেয়ে বড়ো লাঞ্ছনা আর কিছু হয় না।’’
এইসব কথা বলার জন্য তাঁর উপরে কোন ক্ষিপ্ত আক্রমণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তার বিস্তৃত ইতিহাস রচনা করেছেন মেরি লুইস বার্ক। বিদেশে, অপরিচিত পরিবেশে, সেই সংঘবদ্ধ আক্রমণের সামনে বিবেকানন্দের মহাপৌরুষের সংগ্রামের প্রসঙ্গে বিখ্যাত অস্ত্রনির্মাতা বৈজ্ঞানিক হিরাম ম্যাক্সিম বলেছেন—‘‘বিবেকানন্দের মধ্যে দেখলাম ধর্মজগতের নেপোলিয়ানকে।’’ এই নেপোলিয়ানের ব্রহ্মাস্ত্র ছিল বেদান্তের ব্রহ্মবাণী—যা হলো সৃষ্টির একত্ব এবং মানুষের দিব্যত্বের তত্ত্ব—যার বিষয়ে মহান টলস্টয় বলেছেন—বিবেকানন্দের এই বাণী মানবপ্রজ্ঞার শিখর।
‘ব্রুকলিন স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকা স্বামীজির সেই বাণীর প্রসঙ্গে বলেছিল—‘‘তিনি সত্যই হিমালয়ের বিখ্যাত ঋষিগণের এক অপূর্ব নমুনা, নবধর্মের প্রফেট—যিনি সম্মিলিত করেছেন খ্রিস্টীয় নৈতিকতার সঙ্গে বৌদ্ধ দর্পণকে।’’
‘বস্টন ইভনিং ট্রান্সক্রিপ্ট’ বলেছিল— ‘‘বিবেকানন্দ নিছক তত্ত্ব প্রচারক নন। মানবের দেবত্বের কথা প্রচার করার সময়ে তিনি আমাদের মধ্যে এমন শক্তি সঞ্চারিত করে দেন যে, তখন পরম সত্যের সঙ্গে আমাদের খণ্ড জীবনের ব্যবধান ভেঙে যায়।’’
বিবেকানন্দের বক্তৃতা সভায় উপস্থিত হতেন আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের সেরা বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী, সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্মযাজক। আসতেন অগণিত সাধারণ মানুষ। তাঁরা এ কথা তাঁর মুখে শুনতেন—যদি সত্যই কখনো সর্বজনীন ধর্মের উদ্ভব হয় তবে তা বেদ-বাইবেল-কোরানে আবদ্ধ থাকবে না—তাদের গ্রহণ করে আরও এগিয়ে যাবে, কারণ ঈশ্বর-গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যার শেষ নেই।
মানুষের দেবত্বের বাণী নিয়ে স্বামীজি যখন মঞ্চে দাঁড়াতেন তখন মনে হতো, তিনি ‘অনন্তের দিশারি’। বিখ্যাত বাগ্মী অ্যানি বেশান্ত বিবেকানন্দের মধ্যে দেখেছিলেন, সত্যের পক্ষে সংগ্রামী মহা যোদ্ধাকে। তিনি বলেছেন : ‘‘মঞ্চে উপস্থিত অন্য পক্ষেও মর্যাদা, যোগ্যতা ও শক্তির দ্যোতনা ছিল। কিন্তু সব কিছুই আচ্ছন্ন হয়ে গেল বিবেকানন্দের আধ্যাত্মবাণীর অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে; নম্র নত হয়ে গেল সমস্ত কিছু যখন তাঁর মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এল ভারতের জীবনস্বরূপ আত্মতত্ত্ব।… মোহিত ও অভিভূত বিরাট জনমণ্ডলী উৎকর্ণ হয়ে রইল রুদ্ধশ্বাসে—প্রতিটি উচ্চারিত শব্দের জন্য।’’
বিবেকানন্দের বাণী বস্তুতপক্ষে শ্রীরামকৃষ্ণেরই বাণী। শ্রীরামকৃষ্ণের উদ্দেশে স্বামীজি তাই বলেছেন—‘বাণী তুমি, বীণাপাণি কণ্ঠে মোর।’