জাতির আদর্শ
প্রত্যেক ব্যক্তির বা জাতির একটা ধর্ম বা আদর্শ (ideal) আছে। সে ideal বা আদর্শকে অবলম্বন ও আশ্রয় করিয়া সে গড়িয়া উঠে। সেই ideal-কে সার্থক করাই তার জীবনের উদ্দেশ্য এবং সেই ideal বা আদর্শকে বাদ দিলে তার জীবন অর্থহীন ও নিষ্প্রয়োজন হইয়া পড়ে। দেশ ও কালের গণ্ডির মধ্যে আদর্শের ক্রমবিকাশ ও অভিব্যক্তি একদিনে বা এক বৎসরে হয় না। ব্যক্তির জীবনে সাধনা যেরূপ বহুবৎসরব্যাপী হইয়া আসে। তাই মনীষীরা বলিয়া থাকেন—আদর্শ একটা প্রাণহীন, গতিহীন বস্তু নয়। তার বেগ আছে, গতি আছে, প্রাণসঞ্চারিণী শক্তি আছে।
যে আদর্শ আমাদের সমাজে গত একশত বৎসর ধরিয়া আত্মবিকাশের চেষ্টা করিতেছে, আমরা তার পরিচয় সবসময় না পাইতে পারি। যে চিন্তাশীল, যার অন্তর্দৃষ্টি আছে, শুধু সে ব্যক্তি বাহ্য ঘটনা—পরম্পরার অন্তরালে অন্তঃসলিলা ফল্গুনদীরূপা এই আদর্শের ধারাকে ধরিতে পারে। এই আদর্শই আমাদের যুগধর্ম—.. ; ইহার উপলব্ধি হইলে মানুষ বুঝিতে পারে তার পথ কী, তার পথপ্রদর্শক কে?
কিন্তু এই উপলব্ধি সবসময় হয় না বলিয়া আমরা প্রায়ই ভ্রান্ত পথের দিকে আকৃষ্ট হই এবং ভ্রান্ত গুরুর অনুবর্তী হইয়া থাকি। …যদি জীবন গঠন করিতে চাও—তবে ভ্রান্ত গুরু ও ভ্রান্ত পথের প্রভাব হইতে আত্মরক্ষা করো এবং নিজে আত্মস্থ হইয়া জীবনের প্রকৃত আদর্শ চিনিয়া লও।… পূর্বে যে আদর্শ বাংলার ছাত্রসমাজকে অনুপ্রাণিত করিত, তাহা স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ। সে আদর্শের প্রভাবে তরুণ বাঙালি ষড়রিপু জয় করিবার, স্বার্থপরতা ও সকল প্রকার মলিনতা হইতে মুক্ত হইয়া আধ্যাত্মিক শক্তির বলে শুদ্ধ-বুদ্ধ জীবন লাভের জন্য বদ্ধপরিকর হইত। সমাজ ও জাতি গঠনের মূল—ব্যক্তির বিকাশ। তাই স্বামী বিবেকানন্দ সর্বদা বলিতেন, ‘man making is my mission’—খাঁটি মানুষ তৈয়ারি করাই আমার জীবনের উদ্দেশ্য। কিন্তু ব্যক্তিত্ব বিকাশের দিকে এত জোর দিলেও স্বামী বিবেকানন্দ জাতির কথা একেবারে ভুলিয়া যান নাই। কর্মবিহীন সন্ন্যাসে অথবা পুরুষকারহীন অদৃষ্টবাদে তিনি বিশ্বাস করিতেন না। রামকৃষ্ণ পরমহংস নিজের জীবনের সাধনার ভিতর দিয়া সর্ব ধর্মের যে সমন্বয় করিতে পারিয়াছিলেন, তাহাই স্বামীজীর জীবনের মূল মন্ত্র ছিল এবং তাহাই ভবিষ্যৎ ভারতের জাতীয়তার মূল ভিত্তি।
যুব আন্দোলন
বিভিন্ন জাতির মধ্যে যে বিদ্বেষ-বহ্নি এখন প্রজ্জ্বলিত আছে, তাহা যদি নির্বাপিত করিতে হয়, তাহা হইলে দেশে দেশে যুব-আন্দোলনের খুব প্রসার হওয়া উচিত। বিভিন্ন জাতির মধ্যে যাহাতে যুদ্ধবিগ্রহ না হয় এবং পৃথিবীতে শান্তি যাহাতে স্থাপিত হয়, এই উদ্দেশ্যে অনেক দেশের তরুণেরা সঙ্ঘবদ্ধ হইতেছে। …এমন অনেক যুদ্ধ হয় যাহা শুধু কূট চক্রান্তের ফল এবং তাহার দ্বারা কোনও জাতির প্রকৃত কল্যাণ হয় না। …যদি কোনওদিন পৃথিবীতে শান্তি সংস্থাপিত হয়—তবে বিশ্বের তরুণসমাজই তাহা স্থাপনা করিবে।
আজ ভারতের এই হীন অবস্থা কেন? আছে তো সবই—প্রকৃতি, সৌন্দর্য, শারীরিক বল, শিক্ষা, দীক্ষা, বীর্য, বিদ্যা, বুদ্ধি—এর কোনওটির তো অভাব নেই; এসব উপাদান লইয়া আমরা এক নিখুঁত মূর্তি রচনা করিতে পারি, কিন্তু প্রাণ প্রতিষ্ঠার আয়োজন কোথায়? প্রাণ প্রতিষ্ঠা হইবে সেই দিন—যেদিন সমগ্র জাতির মধ্যে মুক্তিলাভের প্রবল আকাঙ্ক্ষা জাগরিত হইবে। কোথায় সে পুরোহিত যে মৃতসঞ্জীবনী সুধা আহরণ করিয়া মুমূর্ষু জাতির দেহপিঞ্জরের মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিতে পারে? যে ব্যক্তি মুক্তির আস্বাদ পাইয়াছে, মুক্ত হইবার জন্য এবং জাতিকে মুক্ত করিবার জন্য যে ব্যক্তি পাগল হইয়াছে, সে ব্যক্তি অপরকে পাগল করিতে পারে এবং সেই ব্যক্তি জাতীয় যজ্ঞের পুরোহিত হইবার যোগ্য। আমাদের এই যুব আন্দোলন এইরূপ শতসহস্র পুরোহিত সৃষ্টি করুক।
চরিত্র গঠন ও মানসিক উন্নতি
সাধনার এক দিক রিপু ধ্বংস করা, অপর দিক সদ্বৃত্তির অনুশীলন করা। রিপুর ধ্বংস হইলেই সঙ্গে সঙ্গে দিব্যভাবের দ্বারা হৃদয় পূর্ণ হইয়া উঠিবে। আর দিব্যভাব হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশ করিলেই সকল দুর্বলতা পলায়ন করিবে।
প্রত্যহ (সম্ভব হইলে) দুইবেলা এইরূপ ধ্যান করিবে। কিছুদিন ধ্যান করার সঙ্গে সঙ্গে শক্তি পাইবে, শান্তিও হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করিবে।
আপাততঃ স্বামী বিবেকানন্দের এই বইগুলি পড়িতে পার। তাঁহার বইয়ের মধ্যে ‘পত্রাবলী’ ও বক্তৃতাগুলি বিশেষ শিক্ষাপ্রদ। ‘ভারতের বিবেকানন্দ’ বইয়ের মধ্যে এসব বোধহয় পাইবে। …’পত্রাবলী’ ও বক্তৃতাগুলি না পড়িলে অন্যান্য বই পড়িতে যাওয়া ঠিক নয়। Philosophy of Religion, Jnuna Yoga বা ঐ জাতীয় বইতে আগে হস্তক্ষেপ করিও না। তারপর সঙ্গে সঙ্গে ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’ পড়িতে পার। রবিবাবুর অনেক কবিতার মধ্যে খুব inspiration পাওয়া যায়।
দলাদলি ও বাংলার ভবিষ্যৎ
আজ বাংলার সর্বত্রই কেবল দলাদলি ও ঝগড়া এবং যেখানে কাজকর্ম যত কম, সেখানে ঝগড়া তত বেশি।… আমি শুধু এই কথা ভাবি—ঝগড়া করিবার জন্যে এত লোক পাওয়া যায়—কিন্তু মিলাইতে পারে, মীমাংসা করিয়া দিতে পারে—এরকম একজন লোকও কি আজ সারা বাংলার মধ্যে পাওয়া যায় না?… আজ বাংলার সর্বত্র কেবল ক্ষমতার জন্যে কাড়াকাড়ি চলিতেছে। যার ক্ষমতা আছে—সে ক্ষমতা বজায় রাখিতেই ব্যস্ত। যার ক্ষমতা নাই সে ক্ষমতা কাড়িবার জন্য বদ্ধপরিকর। উভয়পক্ষই বলিতেছে, ‘দেশোদ্ধার যদি হয়, তবে আমার দ্বারাই হউক, নয় তো হইয়া কাজ নাই।’ এই ক্ষমতালোলুপ রাজনীতিকবৃৃন্দের ঝগড়া ছাড়িয়া, নীরবে আত্মোৎসর্গ করিয়া যাইতে পারে, এমন কর্মী কি বাংলায় আজ নাই? …আজ বাংলার অনেক কর্মীর মধ্যে ব্যবসাদারী ও পাটোয়ারি বুদ্ধি বেশ জমিয়ে উঠিয়াছে। তাহারা এখন বলিতে আরম্ভ করিয়াছে, ‘আমাকে ক্ষমতা দাও—কর্মচারীর পদ দাও—অন্ততঃপক্ষে কার্যকরী সমিতির সভ্য করিয়া দাও—নতুবা আমি কাজ করিব না।’ আমি জিজ্ঞাসা করি—নরনারায়ণের সেবা ব্যবসাদারিতে, contract-এ করে পরিণত হইল? আমি তো জানিতাম সেবার আদর্শ এই—’দাও আর ফিরে নাহি চাও, থাকে যদি হৃদয়ে সম্বল।’
বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে যে ‘Nero is fiddling while Rome is burning’ কথার নূতন দৃষ্টান্ত চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিবে—কোনওদিন ভাবি নাই।