স্বামী বিবেকানন্দ সাহিত্যিক ছিলেন না। সচেতনভাবে সাহিত্যসৃষ্টির প্রয়াস বা অবসর তাঁর ছিল না। যদিও ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় তাঁর লেখনী ছিল অনায়াস গতি। সেকালে অনেক শিক্ষিত বাঙালির মতো ইংরেজিতে লিখতে সম্ভবত তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। অনেকগুলি ভাষা তিনি জানতেন। তাঁর শিক্ষক উইলিয়াম হেস্টির মতো তিনি বহুভাষী বা ভাষাবিদ ছিলেন না। কিন্তু দেশবিদেশের ভাষাসাহিত্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশনে তিনি মূলত সাহিত্য ও দর্শন পড়েছেন (তবে সেকালে বি.এ. ক্লাসের ছাত্রকে পড়তে হত অনেক, এবং তা শুধু সাহিত্য ও দর্শনে সীমাবদ্ধ ছিল না)। স্বামী বিবেকানন্দ সংস্কৃত খুব ভালো জানতেন। আমেরিকা যাওয়ার আগে ও পরে সংস্কৃতচর্চা চলেছে। ভারতীয় ধর্ম ও দর্শন নিয়ে আলোচনার জন্য সংস্কৃতে লেখা মূল গ্রন্থাদি ও তার টীকাভাষ্য তাঁকে অধ্যয়ন করতে হয়েছে। (স্বামী বিবেকানন্দের সংস্কৃতে লেখা কয়েকটি চিঠি পত্রাবলীতে স্থান পেয়েছে)। ১৮৮৮ সালে প্রমদাদাস মিত্রকে তিনি লিখছেন, “পাণিনির ব্যাকরণ কেবল আমার নিমিত্ত প্রার্থনা করি নাই, প্রত্যুত এ মঠে সংস্কৃত শাস্ত্রের বহুল চর্চা হইয়া থাকে। বঙ্গদেশে বেদশাস্ত্রের একেবারে অপ্রচার বলিলেই হয়। এই মঠের অনেকেই সংস্কৃতজ্ঞ এবং তাঁহাদের বেদের সংহিতাদিভাগ সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করিবার একান্ত অভিলাষ। তাঁহাদিগের মত, যাহা করিতে হইবে তাহা সম্পূর্ণ করিব। অতএব পাণিনিকৃত সর্বোৎকৃষ্ট ব্যাকরণ আয়ত্ত না হইলে বৈদিকভাষায় সম্পূর্ণ জ্ঞান হওয়া অসম্ভব। এই বিবেচনায় উক্ত ব্যাকরণের আবশ্যক। ‘লঘু’ অপেক্ষা আমাদের বাল্যাধীত ‘মুগ্ধবোধ’ অনেকাংশে উৎকৃষ্ট।” (বিবেকানন্দ রচনাসংগ্রহ ১. পৃ.৬৪)। আমেরিকায় থাকার সময় (১৮৯৫) স্বামী বিবেকানন্দ ‘যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ’ (ইংরেজিতে অনূদিত), কাশীতে ছাপা সংস্কৃত ‘নারদ ও শাণ্ডিল্য সূত্র’, সব সম্প্রদায়ের ভাষ্যসহ ‘বেদান্ত সূত্র’ চেয়ে পাঠিয়েছেন। বিলেতে তাঁর কাজে সহযোগিতা করার জন্য উত্তম ইংরেজি ও সংস্কৃত জানা দু’জন সন্ন্যাসীকে পাঠাতে অনুরোধ করেছেন ব্রহ্মানন্দকে (০৪ ১০ ১৮৯৫)। স্বামী বিবেকানন্দ নিজে ভালো সংস্কৃত ও ইংরেজি জানতেন বলে গুরুভাইদের তিনি মাঝে মাঝে সমালোচনা করেছেন— “পরকে মারিতে গেলে ঢাল খাঁড়া চাই, অতএব ইংরেজী ও সংস্কৃত বিশেষরূপে অধ্যয়ন করিবে। কালীর ইংরেজী দিনে দিনে বেশ পরিষ্কার হইতেছে। সারদার ইংরেজির অধোগতি হইতেছে, তাহাকে flowery style পরিত্যাগ করিতে কহিবে। বিজাতীয় ভাষায় flowery style লেখা বড় দুষ্কর। তাহাকে আমার লক্ষ ‘সাবাস’-ওহি মরকা কাম, তারকদাদাকেও grammar-টা একবার উল্টে নিতে বলবে। তারকদাদার ইংরেজী ক্রমশঃ দুরস্ত হয়ে আসছে।” (১৮১৫)
স্বামী বিবেকানন্দের ইংরেজি রচনার পরিমাণ বিপুল। (দ্র. The Complete Works of Swami Vivkananda)। বাংলার বাইরে বিদেশে এবং স্বদেশে তাঁকে এক সময়ে প্রচুর বক্তৃতা দিতে হয়েছিল। সেই সব বক্তৃতা পরে গ্রন্থাকারে ছাপা হয়েছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘রাজযোগ’, ‘কর্মযোগ’ ও ‘ভক্তিযোগ’। সাময়িক প্রয়োজনে, অনেক সময়ে অর্থোপার্জনের তাগিদে বক্তৃতা দিতে হয়েছে। তবে ভাষণের জন্য ভাষণ নয়। স্বামী বিবেকানন্দের অধ্যাত্মজীবনের সূচনা থেকে রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত তাঁর যাবতীয় চিন্তাভাবনার পিছনে যে তত্ত্ব ও তথ্য কাজ করেছে তার উৎস একদিকে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও ধর্মগ্রন্থ, অন্যদিকে গুরু প্রদর্শিত মত ও পথ। ১৮৯৬ সালের ২৭ এপ্রিল বিলেত থেকে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে একটি চিঠিতে তিনি লেখেন, “আমি নিজের কর্তৃত্বলাভের আশায় নয়, কিন্তু তোমাদের কল্যাণ ও প্রভুর অবতীর্ণ হবার উদ্দেশ্য সফলের জন্য লিখছি। তিনি তোমাদের ভার আমার উপর দিয়েছিলেন এবং তোমাদের দ্বারা জগতের মহাকল্যাণ হবে, যদিও অনেকেই এখন তা জানো না, এইজন্য বিশেষভাবে লিখছি, মনে রেখ।” এই কথাগুলি প্রত্যক্ষভাবে ‘মঠ’ পরিচালনার জন্য গুরুভ্রাতাদের উদ্দেশে লেখা, কিন্তু একে কিছুটা সম্প্রসারিত করে মানবকল্যাণ ও বিশ্বাত্মবোধ প্রচার স্বামী বিবেকানন্দের যাবতীয় রচনার ভিত্তি বলে গ্রহণ করতে পারি। স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে আর একটি চিঠিতে তিনি লেখেন “Lecture-লেকচার ত কিছু লিখে দিই না. একটা লিখে দিয়েছিলুম, যা ছাপিয়েছে। বাকি সব দাঁড়াঝাপ, যা মুখে আসে গুরুদের জুটিয়ে দেন। কাগজপত্রের সঙ্গে কোন সম্বন্ধই নাই।” তবে আমরা আগে দেখেছি বিদেশে থাকার সময়ে সংস্কৃত গ্রন্থাদি তিনি চেয়ে পাঠাচ্ছেন (অন্যত্র, “একখানা ‘পঞ্চদশী’, একখানা ‘গীতা’, একখানা কাশীর ছাপা নারদ ও শাণ্ডিল্য-সূত্র, পঞ্চদশীর যদি তর্জমা থাকে ও শঙ্করভাষ্যের কালীবর বেদান্তবাগীশের তরজমা ও পাণিনিসূত্রের বা কাশিকাবৃত্তি বা ফণিভাষ্যের যদি কোনও বাংলা বা ইংরেজি তরজমা থাকে ত পাঠাবে।”১৮৯৫)। আসলে স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ‘distribution and propagation of thought-currents’। এইজন্য দেশে-দেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো (অধিকাংশ সময়ে বক্তৃতাগুলি লেখার সময় হত না। জে. জে. গুডউইন শর্ট-হ্যান্ডে লিখতেন), এ নিয়ে তিনি অনেক সময় মজা করেছেন— “একবার ডেট্রয়েটে তিন খণ্ড ঝাড়া বুলি ঝেড়েছিলুম। আমি নিজে অবাক হয়ে যাই সময়ে সময়ে, মধ্যে, তোর পেটে এতও ছিল। এরা সব বলে, পুঁথি লেখ, একটা এইবার লিখতে ফিকতে হবে দেখছি। ঐ তো মুশকিল, কাগজ কলম নিয়ে কে হাঙ্গামা করে বাবা।” (১৮৯৪। দ্র. বিবেকানন্দ রচনাসংগ্রহ, ১, পৃ. ১০৬)
স্বামী বিবেকানন্দের গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংস প্রথাগত বিদ্যায়তনিক লেখাপড়ার ধার ধারতেন না। কিন্তু সকল বিদ্যার সারবস্তু, অমৃতস্বরূপ ব্রহ্মানন্দ তিনি লাভ করেছিলেন। ম্যাসমূলারের লেখা Ramkrishna, His Life and Sayings, 1898 বইটি নিয়ে আলোচনার সময়ে স্বামী বিবেকানন্দ দেখেছেন, “জীবনী অপেক্ষা উক্তি-সংগ্রহ এ পুস্তকের অধিক স্থান অধিকার করিয়াছে। ঐ উক্তিগুলি যে সমস্ত পৃথিবীর ইংরাজী-ভাষী পাঠকের মধ্যে অনেক ব্যক্তির চিত্তাকর্ষণ করিতেছে, তাহা পুস্তকের ক্ষিপ্র বিক্রয় দেখিয়াই অনুমিত হয়। উক্তিগুলি তাঁহার শ্রীমুখের বাণী বলিয়া মহাশক্তিপূর্ণ এবং তজ্জন্যই নিশ্চিত সর্বদেশে আপনাদের ঐশী শক্তি বিকাশ করিবে। ‘বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়’ মহাপুরুষগণ আবির্ভূত হন— তাঁহাদের জন্ম-কর্ম অলৌকিক এবং তাঁহাদের প্রচারকার্যও অত্যাশ্চর্য।” (রামকৃষ্ণ ও তাঁহার উক্তি’, ভাববার কথা)। ১৮৮১-১৮৮৬ তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গ-সান্নিধ্য লাভ করেন। রামকৃষ্ণ উপদেশ দিতেন ‘কথা’র সাহায্যে। সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রে ‘কথা’ কল্পিত কাহিনী, আধুনিক ছোটোগল্পের আদিরূপ। মাস্টারমহাশয় মহেন্দ্রনাথ [শ্রীম] ঠাকুরের কৃপা লাভ করেছিলেন। তিনি ঠাকুরের অমৃতময়ী বাণী তাঁর দিনপঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন, যা অবলম্বনে পাঁচ খণ্ডে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত বা Gospel of Sri Ramakrishna (১৮৯৭) রচিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দ শুধু মাস্টারমহাশয়কে পরম শ্রদ্ধা করতেন না, তাঁর সংকলিত কথামৃতকে প্রভুর যথার্থ জীবনী বিবেচনা করতেন। “I now understand why none of us at tempted His life before. It has been reserved for you this great work. Socratic dialogues are Plato all over You are entirely hidden” কথা-রচনার এই বিশেষ পদ্ধতিটি স্বামী বিবেকানন্দের তত্ত্বমূলক প্রবন্ধে (লেখায় বা ভাষণের লিখিত রূপে) কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে তার পরিচয় নেওয়ার দরকার আছে। রামকৃষ্ণ পরমহংস অনেক সময়ে বেদান্তের গভীর তত্ত্ব বোঝাবার সময়ে আখ্যানের আশ্রয় নিতেন। এর মধ্যে কিছু গল্প রামায়ণ-মহাভারত ও বিভিন্ন পুরাণ থেকে নেওয়া। হাজার গল্পের মধ্যে যা ছড়িয়ে আছে তা থেকে প্রতিপাদ্য তত্ত্বের সন্ধান খুঁজে বার করতে পারেন একমাত্র মহাজ্ঞানী গুরু। অবধূতের শিক্ষা প্রসঙ্গে নিষ্কাম কর্মের আদর্শ বোঝাতে রামকৃষ্ণ এক গল্প শুনিয়েছেন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ও শিবনাথ শাস্ত্রীকে –
শ্রীমদ্ভাগবতে আছে যে অবধূত চব্বিশ গুরুর মধ্যে চিলকে একটি শুরু করেছিলেন। এক জায়গায় জেলেরা মাছ ধর্তে ছিল। একটি চিল এসে একটা মাছ ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। কিন্তু মাছ দেখে পেছনে পেছনে প্রায় এক হাজার কাক চিলকে তাড়া করে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে কা কা করে বড় গোলমাল করতে লাগল। মাছ নিয়ে চিল যে দিকে যায়, কাকগুলোও তাড়া করে সেই দিকে যেতে লাগল। দক্ষিণ দিকে চিলটা গেল, কাকগুলোও সেই দিকে গেল; আবার উত্তরদিকে যখন গেল, ওরাও সেই দিকে গেল। এইরূপে পূর্বদিকে ও পশ্চিমদিকে চিল ঘুরতে লাগল। শেষে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ঘুরতে ঘুরতে মাছটা তার কাছ থেকে পড়ে গেল। তখন কাকগুলো চিলকে ছেড়ে মাছের দিকে গেল। চিল তখন নিশ্চিত্ত হয়ে একটা গাছের ডালের উপর বসল। বসে ভাবতে লাগল— ঐ মাছটাই যত গোল করেছিল। এখন মাছ কাছে নাই আমি নিশ্চিত্ত হলুম।
অবধূত চিলের কাছে এই শিক্ষা করলেন যে যতক্ষণ সঙ্গে মাছ থাকে অর্থাৎ বাসনা থাকে ততক্ষণ কর্ম থাকে আর কর্মের দরুন ভাবনা চিন্তা, অশান্তি। বাসনা ত্যাগ হলেই কর্মক্ষয় হয় আর শাস্তি হয় (শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত ১,১০৬-০৮)।
এইভাবে গল্পের অবতারণা ঘটেছে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত-র পাতায় পাতায়। স্বামী বিবেকানন্দর মনে এই গল্পগুলি কতটা রেখাপাত করেছে তাঁর স্বদেশে ও বিদেশে প্রদত্ত ভাষণে তার পরিচয় মেলে। ছোটোভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, “রাজযোগের বক্তৃতা শুনিয়া অনেকে ক্লান্ত হইয়া পড়েন, এইজন্য স্বামীজী ছোট ছোট উপাখ্যান তুলিয়া ব্যাখ্যা করিতেন, তাহাতে বক্তৃতাটি বেশ সহজ ও সরল হইত এবং রাজযোগের ভাব ও উদ্দেশ্য সহজেই তাহারা বুঝিতে পারিতেন।” (লণ্ডনে স্বামী বিবেকানন্দ)। স্বামী বিবেকানন্দ সম্ভবত নিজে কখনও গল্প লেখা বা গল্প বানানোর চেষ্টা করেননি। ভাববার কথা-র মধ্যে ‘শিবের ভূত’ নামে একটি অসম্পূর্ণ গল্প স্থান পেয়েছে। এটি স্বরচিত, না অনূদিত ঠিক বোঝা যায় না। তবে গল্পের জন্য যা একান্ত প্রয়োজন, সেই পর্যবেক্ষণ ও বর্ণন-শক্তি তাঁর ছিল। পরিব্রাজক পথ চলতে যা দেখেছেন তা নিয়ে অনায়াসে ছোটোগল্প তৈরি হতে পারে। এর সবচেয়ে ভালো দৃষ্টান্ত ‘সুয়েজখালে : হাঙ্গর শিকার’। এখানে শুধু গতিময় মুখের ভাষা নয়, নাটকীয়ভাবে ঘটনা উপস্থাপন ও সংলাপভঙ্গি যথার্থ কাহিনীরস সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে –
“কিন্তু নেহাত হতাশ হবার প্রয়োজন নেই–ঐ যে পলায়মান ‘বাঘা’র গা ঘেঁষে আর একটা ‘খাবড়ামুখো চলে আসছে। আহা হাঙ্গরদের ভাষা নেই। নইলে ‘বাঘা’ নিশ্চিত পেটের খবর তাকে দিয়ে সাবধান করে দিত। নিশ্চিত বলত, ‘দেখ হে সাবধান, ওখানে একটা নূতন জানোয়ার এসেছে, বড় সুস্বাদ সুগন্ধ মাংস তার, কিন্তু কি শক্ত হাড়। এতকাল হাঙ্গর-গিরি করছি, কত রকম জানোয়ার–জ্যাস্ত, মরা, আধমরা উদরস্থ করেছি, কিন্তু এ হাড়ের কাছে আর সব মাথম-হে-মাখম!! এই দেখনা, আমার দাঁতের দশা, চোয়ালের দশা কি হয়েছে বলে একবার সেই আকটিদেশ বিস্তৃত মুখ ব্যাদান করে আগন্তুক হাঙ্গরকে অবশ্যই দেখাত। সেও প্রাচীনবয়সসুলভ অভিজ্ঞতা সহকারে চ্যান্ডমাছের পিত্তি, কুঁজো ভেটকির পিলে, ঝিনুকের ঠাণ্ডা সুরুয়া ইত্যাদি সমুদ্রজ মহৌষধির কোন-না-কোনটা ব্যবহারের উপদেশ দিতই দিত। কিন্তু যখন ওসব কিছুই হল না, তখন হয় হাঙ্গরদের অত্যন্ত ভাষার অভাব, নতুবা ভাষা আছে, কিন্তু জলের মধ্যে কথা কওয়া চলে না। অতএব যতদিন না কোন প্রকার হাসুরে অক্ষর আবিষ্কার হচ্ছে, ততদিন সে ভাষার ব্যবহার কেমন করে হয় অথবা ‘বাঘা’ মানুষ-ঘেঁষা হয়ে মানুষের ধাত পেয়েছে, তাই ‘থ্যাবড়া’ কে আসল খবর কিছু না বলে মুচকি হেসে, “ভাল আছ ত হে’ বলে সরে গেল। আমি একাই ঠকবো?’”
ঘটনা বর্ণনার মতো স্বল্পরেখায় চরিত্র পরিস্ফুটনেও স্বামী বিবেকানন্দ শিল্পীসুলভ নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। ইউরোপে কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত তাঁর পথের সঙ্গী ছিলেন পেয়র হিয়াসাহ এবং তাঁর সহধর্মিণী। স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মদর্শন নিয়ে আলোচনায় আগ্রহবোধ করবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই, কিন্তু তাঁর রসবোধ (সেন্স অফ হিউমারও) অসামান্য। ক্যাথলিক পাদ্রিকে বিয়ে করার জন্য মঞ্চাভিনেত্রীর মন্তব্য কঠোর শ্লেষপূর্ণ। তবে এর মজাটা হয়তো ভারতবাসী ততটা উপভোগ করতে পারবে না।
রামকৃষ্ণ পরমহংসের রসবোধ ছিল প্রবল। তিনি হাসতে এবং হাসাতে জানতেন। গুরুর কাছ থেকে এই গুণটি শিষ্যও পেয়েছেন। শিকাগোতে পঞ্চম দিনের অধিবেশনে সঙ্কীর্ণতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ প্রথমেই বহুপ্রচলিত একটি গল্প বলেন— কুয়োর ব্যাঙ ছোটো কুয়োকেই বিশ্বজগৎ জ্ঞান করত। সমুদ্র থেকে একটি ব্যাঙ সেখানে এলে কুয়োর ব্যাঙ বিশ্বাসই করতে চায় না কুয়োর থেকে বড়ো কোনও জায়গা আছে। সে বলে, আমার কুয়োর থেকে বড়ো আর কিছু হতে পারে না, পৃথিবীতে এর থেকে বড়ো কিছু নেই। সমুদ্রের ব্যাঙ নিশ্চয় মিথ্যা কথা বলছে, তাই তাকে তাড়াও এখান থেকে। ‘সংকীর্ণতাই আমাদের মতভেদের কারণ এই সত্য প্রতিপাদনের জন্য গল্পটি অব্যর্থ। তবে গল্প বলার মাঝখানে স্বামীজীর একটি মন্তব্য চমকপ্রদ ঠেকবে, “এইভাবে দিনযাপন করতে করতে সে দেহে স্ফীত ও মসৃণ হয়ে উঠল, বোধহয় খানিকটা আমার মতনই।” নিজেকে নিয়ে এই কৌতুক করার ক্ষমতা সারা জীবন তাঁর কথায় ও লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। চিঠিতে নিজের মেদ বৃদ্ধি ও উদরদেশের বিস্ফার নিয়ে মজা করেছেন কখনও।
যাকে বলে হাসির গল্প, তার দিকে পরমহংসদেবের ঝোঁক ছিল। এ সব গল্প যে তাঁর মৌলিক সৃষ্টি তা নয় অধিকাংশই পরম্পরাগত লোকশ্রুতির নিদর্শন, যেমন স্যাকরার দোকানে কেশব। কেশব!’, ‘গোপাল, গোপাল।’ ‘হরি হরি।’ ‘হর। হর।” উচ্চারণের মধ্যে ভগবানের নামকীর্তন নয়, ব্যবসাদারদের আভাস-ইঙ্গিতময় কথোপকথন, কিংবা ব্যাঙের টাকা বা আধুলির গল্প, হাতি ব্যাঙকে ডিঙিয়ে যাওয়ায় ব্যাঙের লাথি দেখানো (দ্র ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের কঙ্কাবতী)। পরিব্রাজক বইতে স্বামী বিবেকানন্দের এই ধারার একটি গল্প রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র বইতে একটি চিঠিতে কীভাবে ফিরে এসেছে ভাবলে অবাক লাগে “কোন গঙ্গাহীন দেশে নাকি কলকেতার এক ছেলে শ্বশুরবাড়ী যায়, সেখানে খাবার সময় নাকি চারদিকে ঢাকঢোল হাজির; আর শাশুড়ির বেজায় জেদ, ‘আগে একটু দুধ খাও।’ জামাই ঠাওরালে বুঝি দেশাচার, দুধের বাটিতে যেই চুমুকটি দেওয়া অমনি চারদিকে ঢাকঢোল বেজে ওঠা। তখন তার শাশুড়ি আনন্দাশ্রুপরিপ্লুতা হয়ে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললে, ‘বাবা! তুমি আজ পুত্রের কাজ করলে, এই তোমার পেটে গঙ্গাজল আছে, আর দুধের মধ্যে ছিল তোমার শশুরের অস্থি গুড়া করা, শ্বশুর গঙ্গা পেলেন’।” রবীন্দ্রনাথের সাজাদপুর থেকে লেখা চিঠিতে পোস্টমাস্টারের মুখে একই গল্পের ভাষাত্তর – “এ দেশের লোকের গঙ্গার উপর এমন ভক্তি যে এদের কোনো আত্মীয় মরে গেলে তার হাড় গুঁড়ো করে রেখে দেয়, কোনো কালে গঙ্গার গঙ্গার জল খেয়েছে এমন লোকের যদি সাক্ষাৎ পায় তা হলে তার পানের সঙ্গে হাড়গুঁড়ো খাইয়ে দেয় আর মনে করে তার আত্মীয়ের একটা অংশের গঙ্গালাভ হল।” রবীন্দ্রনাথের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য- ‘এটা বোধ হয় গল্প’, আর পোস্টমাস্টারের গম্ভীর প্রত্যুত্তর ‘তা হতে পারে – কম উপভোগ্য নয়। তবে স্বামী তুরীয়ানন্দকে (তু-ভায়া) নিয়ে স্বামীজির সকৌতুক মন্তব্য সম্ভবত আরও চমকপ্রদ—–“ভায়া যে গম্ভীরপ্রকৃতি, বক্তৃতাটা কোথায় দাঁড়াল – বোঝা গেল না।”
এখানে স্বামী বিবেকানন্দের ভাষাচিত্তার কথা সংক্ষেপে বলে নেওয়া যেতে পারে। প্রাণবান পুরুষ— ভাষায় প্রাণের সঞ্চার করবেন এটাই স্বাভাবিক। ভাষণের সময়ে তিনি ব্যবহার করেন উদাত্ত ভাষাভঙ্গি। সে ভাষা লেখ্য কিংবা কথা তাতে কিছু এসে যায় না– “বল মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই, তুমিও কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হইয়া, সদর্পে ডাকিয়া বল— ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী, বল ভাই- ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ, আর বল দিন-রাত, হে গৌরীনাথ, হে জগদম্বে, আমায় মনুষ্যত্ব দাও: মা, আমার দুর্বলতা কাপুরুষতা দূর কর, আমায় মানুষ, কর।” এখানে লক্ষণীয় তৎসম শব্দের বাহুল্য সত্ত্বেও মুখের ভাষার সঙ্গে এর খুব একটা তফাৎ নেই। এর কারণ ‘সংস্কৃতের গদাই লস্করি চাল’ পরিহার করে তিনি তাঁর ভাষাকে করেছেন সাফ ইস্পাতের মতো ধারালো। অন্যত্র স্বামীজির মুখে আমরা শুনেছি, “ভাষার গোপন কথা সরলতা। আমার গুরুদেবের ভাষাই আমার আদর্শ ভাষা, যা ছিল অত্যন্ত চলতি এবং গভীর অর্থবহ। কেন না চিন্তাধারাকে এমনভাবে অভিব্যক্ত করতে হবে যা অতি সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে পারে।” (“ভাষা প্রসঙ্গে বিবেকানন্দ রচনাসংগ্রহ, ৮, পৃ. ৪০)।
অবশ্য স্বামী বিবেকানন্দের অধিকাংশ রচনা (ভাষণ, এবং অল্প কিছু প্রবন্ধ, এবং আরও অল্প কয়েকটি কবিতা) ইংরেজিতে প্রচারিত, পরে তার বাংলা ভাষান্তর স্থান পেয়েছে আট খণ্ডে সমাপ্ত বিবেকানন্দ রচনাসংগ্রহ বইতে (অপিচ, উদ্বোধন প্রকাশিত স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা)। “আমরা প্রভুর দাস, প্রভুর পুত্র, প্রভুর লীলার সহায়ক”— এ কথা না বললেও চলে। ফলে স্বামী বিবেকানন্দের ইংরেজি রচনা মুখ্যত অবাঙালিদের কথা ভেবে লেখা (বা বলা) হলেও তার মধ্যে প্রভুর কথামৃতের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যায়। কোথাও পরমহংসের মুখে শোনা গল্প স্বামী বিবেকানন্দ প্রায় অপরিবর্তিত আকারে তাঁর ভাষণে ব্যবহার করেন, কোথাও সেই ধারা বা রীতি অনুসরণ করে তত্ত্বব্যাখ্যায় গল্পের আশ্রয় গ্রহণ করেন।
প্রথম ধারার নিদর্শন, একদল মেষের মধ্যে পালিত সিংহশাবক বৃহদাকার বলিষ্ঠ হয়েও মেষের মতো অতিশয় ভীরু ও তৃণভোজী হওয়ার গল্প। পরে অরণ্যের সিংহের সান্নিধ্যে এসে নিজের সিংহত্ব জানতে পেরেছে। এর মধ্যে নিহিত তত্ত্ব হল প্রত্যেকের মধ্যে যে আত্মন্ আছে, তা সর্বশক্তিমান। কিন্তু মানুষ তা ভুলে থাকে বলেই নিজেকে শক্তিহীন জ্ঞান করে, কিন্তু যদি সে নিজের আত্মার উপলব্ধি করতে পারে, তাহলে তার দুর্বলতা দূর হয়ে সে স্বয়ং আত্মন্ হয়ে যায়। (বিবেকানন্দ রচনাসংগ্রহ, ২, পৃ.৪৭ গল্পটির ভিন্নতর রূপ অষ্টম খণ্ড, পৃ.৮৩)। কাহিনীর উৎস শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, ২, পৃ ৫১।
এর সঙ্গে আছে উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের গল্প। আরুণি পুত্র শ্বেতকেতু, জাবালা-সত্যকাম, দেবতা ও দানবের আত্মানুসন্ধান, যাজ্ঞবল্ক্য ও মৈত্রেয়ী এবং নচিকেতার গল্প স্বামীজির ভাষণে বারবার এসেছে। নচিকেতা উপাখ্যান একাধিক ভাষণে এসেছে। (বিবেকানন্দ রচনা সংগ্রহ, ৬, পৃ. ৮১-৮২, ৭, পৃ. ৭২-৭৫)। একই গল্প দু’বার বলার সময়ে তার উপস্থাপনে কিছু পার্থক্য ঘটেছে। মনে হয়েছে শুধু তত্ত্বের জন্য নচিকেতা উপাখ্যান নয়, এর মধ্যে চরিত্র পরিস্ফুটন, সরসভঙ্গিতে ঘটনা বর্ণন, আর সেই সঙ্গে নাটকীয়তার কথাও স্বামীজি মনে রেখেছেন। গল্পটির তিনি নাম দিয়েছেন ‘দিব্য আনন্দের পথ’। সামান্য ভূমিকা আছে প্রারম্ভে— “আজ রাত্রে আমি তোমাদের বেদ থেকে একটি গল্প বলব। বেদ হচ্ছে হিন্দুদের পবিত্র শাস্ত্র, এক বিশাল সাহিত্যসংগ্রহ, যার শেষাংশকে বলা হয় বেদাস্ত। এতে সব তত্ত্বকথা আছে, বিশেষ করে দর্শনের কথা, যাতে আমরা আগ্রহী। এটি প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় লেখা এবং তোমরা মনে রাখবে এটি হাজার হাজার বছর আগে লেখা হয়েছিল।”
এর পর শুরু হল গল্প। এক ব্যক্তি এক বিরাট যজ্ঞ করতে চেয়েছিলেন। হিন্দুদের ধর্মে যজ্ঞে এক বড়ো অংশ হল দান। যাতে বেদী নির্মাণ করে অগ্নিতে আহুতি দানের সঙ্গে নানা মন্ত্র আবৃত্তি করা হয়। যজ্ঞ শেষে ব্রাহ্মণ ও দরিদ্রদের দান করা হয়। প্রত্যেক যজ্ঞের বিভিন্ন ধরনের দানের নিয়ম আছে। একটি যজ্ঞে মানুষকে সর্বস্ব দান করতে হয়। এখন ওই ব্যক্তিটি ধনী হলেও কৃপণ ছিল, অথচ সে নাম-যশের লোভে সবচেয়ে বড়ো যজ্ঞটি করতে চেয়েছিল। যজ্ঞ শেষে সর্বস্ব দানের পরিবর্তে সে তার কানা খোঁড়া বুড়ো গরুগুলি, যেগুলি আর দুধ দেয় না, সেগুলি দান করতে লাগল। নচিকেতা নামে তার এক বুদ্ধিমান বালক পুত্র ছিল। সে পিতার এই হীন দানকর্ম দেখে বুঝল, যে এতে পুণ্যের বদলে পাপই হবে। সে সংকল্প করল এর প্রতিকারের জন্য নিজেকে দান করার কথা বলবে।
সে তাই পিতার কাছে গিয়ে বলল, ‘আমাকে কাকে দান করবে??”
পিতা কোনও জবাব দিল না। বালক দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার তাকে একই প্রশ্ন করল। বারবার এক প্রশ্ন করায় পিতা বিরক্ত হয়ে বললেন “তোকে যমকে দান করব।’
বালকটি সোজা যমলোকে গেল। যম সে সময় বাড়ি ছিল না, তাই সে সেখানে অপেক্ষা করতে লাগল।
তিনদিন পরে যম ফিরে এসে তাকে বলল, ‘হে ব্রাহ্মণ, আপনি আমার পূজার যোগ্য অতিথি হয়েও তিনদিন আমার গৃহদ্বারে অনাহারে আছেন। আপনাকে প্রণাম করি। এই কষ্ট স্বীকারের প্রতিদানে আপনাকে আমি তিনটি বর দেব।’
বালকটি প্রথম বর চাইল, ‘আমার উপর বাবার রাগ যেন চলে যায়। দ্বিতীয় বরে নচিকেতা কয়েকটি যজ্ঞ সম্বন্ধে জানতে চাইল। তারপর তৃতীয় বরের বেলায় সে বলল, “মানুষের মৃত্যুর পরে প্রশ্ন জাগে তার কী হয়। কেউ বলে তার অস্তিত্ব থাকে না, কেউ বলে থাকে। অনুগ্রহ করে আমায় যথার্থ উত্তর বলে দিন।”
মৃত্যুরাজ যম উত্তর দিলেন ‘প্রাচীনকালে দেবতারা এই রহস্যভেদ করতে চেয়েছিলেন। এই রহস্য এত সূক্ষ্ম যে জানা খুবই কষ্টকর। অন্য কোনও বর চাও, এটি চেয়ো না। শতবর্ষব্যাপী দীর্ঘজীবন প্রার্থনা করো। গবাদি পশু, অশ্ব প্রার্থনা করো। বিশাল সাম্রাজ্য প্রার্থনা করো। এর উত্তরের জন্য আমায় অনুরোধ কোরো না। মানুষ জীবন উপভোগের জন্য যা কিছু কামনা করে, সেই সব প্রার্থনা করো, আমি প্রার্থনা পূর্ণ করব। কিন্তু এই রহস্য জানতে চেয়ো না। বালকটি বলল, ‘না মানুষ সম্পদে তৃপ্ত থাকতে পারে না। এমনকি দীর্ঘতম জীবনও খুব সংক্ষিপ্ত। এইসব ঘোড়া, রথ, নাচ-গান, আপনার কাছে থাক। মানুষ সম্পদে সন্তুষ্ট হতে পারে না। আপনি যতদিন চান ততদিনই আমরা জীবিত থাকব। আমি যে বর প্রার্থনা করেছি সেইটি শুধু আমি চেয়েছি।’
যম এই উত্তরে খুশি হয়ে বললেন, ‘পূর্ণতা এক বস্তু, ভোগ অন্য বস্তু, এই দুয়ের লক্ষ্য আলাদা, এরা মানুষকে দু-ভাবে আকৃষ্ট করে। যে পূর্ণতা বেছে নেয়, সে শুদ্ধ হয়। যে ভোগকে বেছে নেয়, সে প্রকৃত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়। পূর্ণতা এবং ভোগ উভয়ই মানুষের কাছে আসে। জ্ঞানী দুটিকে পরীক্ষা করে একটিকে অন্যটির থেকে আলাদা করেন। তিনি পূর্ণতাকে ভোগের চেয়ে বড়ো বলে বেছে নেন, কিন্তু মূর্খ ব্যক্তি দেহের সুখের জন্য ভোগকে বেছে নেয়। হে নচিকেতা, যেসব বস্তু আপাতকাম্য, চিন্তা করে জ্ঞানীর মতো তুমি তা ত্যাগ করেছ।’ যম তখন নচিকেতাকে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করলেন। কঠোপনিষদের প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় বল্লরীতে ‘আত্মতত্ত্ব’ তথা আত্মার স্বরূপ ব্যাখ্যাত হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ জ্ঞানযোগের অঙ্গ হিসেবে নচিকেতা কাহিনীর অবতারণা করেছেন।
রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ কাহিনী পরমহংসদেবের প্রিয় ছিল। ভারতীয় আদি কবির জীবনেতিহাস – দস্যু থেকে ঋষিতে রূপান্তর রামায়ণে একভাবে বর্ণিত আছে, যার কিছুটা বাল্মীকির রচনায়, কিছুটা কৃত্তিবাসের উদ্ভাবনায় আমাদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে। স্বামী বিবেকানন্দ ক্যালিফোর্নিয়ায় শেক্সপিয়ার ক্লাবে রামায়ণের উপাখ্যান আধুনিক ভাষায় আধুনিক মন নিয়ে উপস্থিত করেছেন। তবে গল্প বলাই যে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না তা বোঝা যায় রামায়ণের মধ্যে ভারতবর্ষীয় তথা প্রাচ্য জীবনাদর্শ সন্ধানে তাঁর শেষ কথা হল “আমার জীবনবাণী হল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে বলা পৃথক আদর্শ নিয়ে ঝগড়া না করতে, বরং তাদের দেখানো যে যতই বিপরীত বলে মনে হোক লক্ষ্য উভয়ক্ষেত্রেই এক। আপন আপন দিশায় বিভ্ৰমাচ্ছন্ন জীবন-উপত্যকা পরিক্রমায় আসুন আমরা পরস্পরের সাফল্য কামনা করি।” মহাভারত নিয়েও তিনি শেক্সপিয়ার ক্লাবে ভাষণ দিয়েছেন। মহাভারতের কাহিনীর মধ্যেও তিনি দেখেছেন প্রাচীন ভারতীয় জীবনাদর্শ। গল্পের সঙ্গে চলেছে চরিত্রব্যাখ্যা— ধর্মভীরু কিন্তু দুর্বল, অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের মনে ন্যায়পরতা ও পিতৃস্নেহের মধ্যে আভ্যন্তরিক দ্বন্দ্ব, পিতামহ ভীষ্মের মহিমময় চরিত্র, রাজা যুধিষ্ঠিরের মহৎ ও ধর্মপ্রাণ স্বভাব, অন্য চার ভাই যেমন শৌর্যে, তেমনি ভক্তি ও আনুগত্যে মহৎ, মানবিক প্রজ্ঞায় অনতিক্রান্ত অতুলনীয় কৃষ্ণ, আর চির-বিশ্বস্তা ও সর্বংসহা দ্রৌপদী। জনক কন্যা সীতার পবিত্রতা, নিষ্ঠা, সহনশক্তি যেমন ভারতীয় নারীর আদর্শ, তেমনি সত্যবতীর মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেম, যার কাছে যম হার মানেন—এঁদের নিয়ে গল্পকথার শেষ নেই। স্বামী বিবেকানন্দকে এ সব কাহিনী লিখতে হয়েছে ইংরেজিতে। ইংরেজিতে লেখার ফলে স্বদেশি কাহিনী অনেক সময় একটু বিদেশি রূপ নিয়েছে। লোককথার ক্ষেত্রে এই রূপান্তর বিশেষভাবে চোখে পড়ে। ১৮৯৬ সালে বিলেত থেকে চিঠিতে তিনি লিখছেন, “কোনো বিদেশী খাঁটি ইংরেজি ইংরেজদের মতো তত ভালো লিখতে পারবে না, তার ওপর খাঁটি ইংরেজিতে লিখলে আইডিয়ার যা বিস্তার হবে হিন্দু-ইংরেজিতে তা হতে পারে না। তাছাড়া বিদেশী ভাষায় প্রবন্ধ লেখার চাইতে গল্প লেখা অনেক কঠিন।” (বিবেকানন্দ রচনাসংগ্রহ, ৪, পৃ. ১৪৬)
জড়-ভরতের গল্প বা প্রহ্লাদের গল্প পরমহংসদেবের মতো স্বামী বিবেকানন্দর খুব ভালো লাগত। স্বামীজি অধিকাংশ গল্প শুরু করতেন এইভাবে আমার মনে পড়ছে একটা পুরনো গল্প’ বা “একটা পুরনো গল্প হল”। এই সব গল্প অধিকাংশ কল্পিত বা কখনও লোককথা থেকে নেওয়া। ভগিনী নিবেদিতাকে Cradle Tales of Hindusthan লেখার সময় স্বামী বিবেকানন্দ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন (দ্র. চিঠি ১৫.০২. ১৯০০ “তুমি গল্পগুলি পেয়েছ শুনে খুশী হলাম; ভালো মনে করো এগুলি আবার নতুন করে লেখ; কোনো প্রকাশক পেলে এগুলি ছাপিয়ে প্রকাশ করো, আর বিক্রয় করে কিছু লাভ হলে তা তোমার কাজের জন্য নাও। ও থেকে আমি কিছুই চাইনে।” (বিবেকানন্দ রচনাসংগ্রহ, ৫, পৃ. ১৪০)।
লোককথা বলতে দু’ধরনের গল্প কথামৃতে ও স্বামী বিবেকানন্দের রচনায় দেখা যাবে। রাজার পুকুরে সভাসদদের এক কলসি করে দুধ ঢালতে বলা হলে সকলেই জল ঢালেন, কারণ দুধপুকুরে এক কলসি জল কেউ বুঝতে পারবে না। কিংবা জ্যোতিষী দক্ষিণার বিনিময়ে লক্ষপতি হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন (স্বামী বিবেকানন্দ বোস্টনে থাকার সময় একজন তাঁকে এসে বলে “পৃথিবীর সব সম্ভার তার সব সুখ তোমার, যদি জান, তা কি করে পেতে হয়। আমার কাছে যদি তুমি আস, তাহলে তা পাওয়ার উপায় তোমাকে শিখিয়ে দেব। দক্ষিণা ৫ ডলার।”) রাজাকে জ্যোতিষীর আসন্ন মৃত্যুর দিনক্ষণ জানানোর পর জ্যোতিষীর মৃত্যুর কাল জানতে চাওয়ায়, সঙ্গে সঙ্গে তার মুণ্ডচ্ছেদ ও জ্যোতিষগণনার মিথ্যা প্রমাণ। অনুরূপ আর একটি গল্প— একটা মশা একজনের মাথায় বসেছিল, এক বন্ধু তাকে মারবে বলে এমন এক আঘাত করল যে সে মশা ও মানুষ দুটিকেই মেরে ফেলল। এগুলি অণুগল্প বললে হয়তো খুব ভুল হয় না— “একজন ধনী লোকের বাগানে দুজন মালী ছিল। তার মধ্যে একজন ছিল খুব অলস, কোনো কাজই করত না, কিন্তু মনিব এসে গেলে সে উঠেই করজোড়ে ‘আমার মনিবের মুখখানি কি সুন্দর’ ইত্যাদি স্তুতি করে নাচানাচি শুরু করে দিত। অন্য মালীটি বেশি বলত না, বরং কঠোর পরিশ্রম করে ফল, শাকসবজি উৎপাদন করে অনেক দূরে মনিবের বাড়িতে মাথায় বয়ে নিয়ে যেত।” এখানে গল্পের নিহিতার্থ আদৌ অস্পষ্ট নয়, ফলে স্বামীজির মন্তব্যটি কিছুটা অনপেক্ষিত মনে হয় “এই দুজন মালীর মধ্যে কে বেশী মনিবের প্রিয় হবে?” (বিবেকানন্দ রচনাসংগ্রহ, ৫. পৃ. ১৮৬)। সেই প্রেত বা জিনের গল্প আমাদের সকলেরই জানা আছে। আরব্য উপন্যাসে এ ধরনের অসংখ্য গল্প মিলবে। সেই প্রেতকে সব সময় কাজ দিয়ে যেতে হবে। তা না হলে বিনাশ। তখন সেই কুকুরের কুণ্ডলীকৃত লেজকে সোজা করার নিষ্ফল চেষ্টা এবং শেষে প্রেতের বিদায়গ্রহণ। স্বামী বিবেকানন্দের কৌতুকবোধের কথা আগে বলেছি। ‘কর্মযোগ’ কোনও পরিহাসের ব্যাপার নয়, এখানে কুকুরের লেজের প্রসঙ্গ উত্থাপনে স্বামীজির বক্তব্য হল— “কখনও ধর্মোন্মত্ততার ভাব এলে কুকুরের কোঁকড়ানো লেজের কথা মনে করো।”
সরস ও সহাস্য গুরু ও শিষ্যের কথোপকথন আজও আমরা উপভোগ করি। বেশ বুঝতে পারি শিষ্যমণ্ডলীর সামনে শুরু যখন এই রকম গল্পগাছা করতেন, তখন প্রাণপ্রিয় শিষ্যটি তা কেমন উপভোগ করতেন। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত-র একাধিক পরিচ্ছেদে গুরু শিষ্য সংবাদ বর্ণিত হয়েছে। পরমহংসদেবের মুখে শুনি, “আমি নরেন্দ্রকে বলেছিলুম, দেখ, ঈশ্বর রসের সাগর। তোর ইচ্ছা হয় না কি যে, এই রসের সাগরে ডুব দিই? আচ্ছা মনে কর, এক খুলি রস আছে, তুই মাছি হয়েছিস; তা কোন্খানে বসে রস খাবি। নরেন্দ্র বললে ‘আমি খুলির কিনারায় বসে মুখ বাড়িয়ে খাব।’ আমি জিজ্ঞাসা কন্নুম কেন? কিনারায় বসবি কেন? সে বললে ‘বেশী দূরে গেলে ডুবে যাব, আর প্রাণ হারাব।’ এখন আমি বললুম, বাবা। সচ্চিদানন্দ সাগরে সে ভয় নাই। এ যে, অমৃতের সাগর, ঐ সাগরে ডুব দিলে মৃত্যু হয় না, মানুষ অমর হয়। ঈশ্বরেতে পাগল হলে মানুষ বেহেড হয় না।” (প্রথম ভাগ, পৃ ১৩০-৩১)। কথামৃতে রসসাগর রামকৃষ্ণ পরমহংস গল্প বলেন বটে, তাতে সরসতারও অভাব নেই। তবে তাঁকে কথাকার না বলে রসস্রষ্টাই বলা উচিত। স্বামী বিবেকানন্দ রসসমুদ্রে অবগাহন করেও মননে-দর্শনে, বর্ণনায় বিশ্লেষণে শুধু সত্যসন্ধানী নন, তিনি পথপ্রদর্শক— তিনি শিক্ষক। তবে তত্ত্বাশ্রয়ী রচনাকে আকর্ষণীয় করার জন্য তিনি কথা ও আখ্যানের আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি কথাশিল্পী।
ড. অলক রায়ের “উনিশ শতকের মহাজাগরণ: স্বরূপ সন্ধান” গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত