রামকৃষ্ণ ভাব-আন্দোলনের অন্যতম ঋত্বিক এবং বেলুড় রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পঞ্চদশ অধ্যক্ষ স্বামী আত্মস্থানন্দের প্রয়াণে সেবা ও ভালোবাসাময় একটি জীবনের অবসান হলো। তাঁর বহিরাবয়ব শান্ত সৌম্য। কিন্তু তিনি ব্যক্তিত্বে সমুজ্জ্বল। মনে হতো, পারসোনালিটি শব্দটি যেন তাঁকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয়েছে। এই বরণীয় সন্ন্যাসীর জীবন স্বামী বিবেকানন্দের কর্মে পরিণত বেদান্তের বাস্তব রূপ। সাধারণ মানুষের মঙ্গলকামনায় নিজেকে তিনি সম্পূর্ণ উৎসর্গ করেছিলেন।
ঢাকার নিকটবর্তী সাবাজপুরে ১৯১৯-এর মে মাসের বুদ্ধপূর্ণিমায় স্বামী আত্মস্থানন্দের জন্ম হয়। পূর্বাশ্রমে তাঁর নাম ছিল সত্যকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। ১৯৩৮-এ শ্রীরামকৃষ্ণ-পার্ষদ এবং বেলুড় মঠের চতুর্থ অধ্যক্ষ স্বামী বিজ্ঞানানন্দের কাছে তিনি মন্ত্রদীক্ষা লাভ করেন। ১৯৪১-এর ৩ জানুয়ারি বেলুড় মঠে নবীন ব্রহ্মচারীরূপে যোগদানের পর তাঁর ত্যাগ-তপস্যা-তিতিক্ষার জীবন শুরু হয়। ১৯৪৫ ও ১৯৪৯-এ বেলুড় মঠের ষষ্ঠ অধ্যক্ষ স্বামী বিরজানন্দ তাঁকে যথাক্রমে আনুষ্ঠানিক ব্রহ্মচর্য ও সন্ন্যাস দান করেন।

ধর্মজীবনের প্রথম পর্বে আত্মস্থানন্দজী বেলুড় মঠ ছাড়াও দেওঘর বিদ্যাপীঠ এবং মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রমে কাজ করেছেন। অতঃপর শ্যামলাতালের বিবেকানন্দ আশ্রমে বেলুড় মঠের তদানীন্তন অধ্যক্ষ স্বামী বিরজানন্দের দীর্ঘকালীন সেবা করার সুযোগ তিনি লাভ করেন। ১৯৫১-এ বিরজানন্দ মহারাজের মহাসমাধির পর আত্মস্থানন্দজী পুনরায় কর্মজীবনে ফিরে আসেন এবং ১৯৫২-এ রাঁচির টিবি স্যানাটোরিয়ামের সহকারী সম্পাদক হন। স্যানাটোরিয়ামের কর্মপরিধি বিস্তৃত করার পর তাঁকে বর্মার (বর্তমান মায়ানমার) রেঙ্গুনের (বর্তমান ইয়াঙ্গন) রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের সম্পাদক করে পাঠানো হয়। সেখানকার হাসপাতালকে বৃহৎ আকার যখন তিনি দিয়েছেন তখনই সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে তিনি ১৯৬৫-তে ভারতে ফিরে আসেন। এরপর ১৯৬৬-তে গুজরাটের রাজকোট রামকৃষ্ণ আশ্রমের সম্পাদক হন। ১৯৭৩এ তিনি রামকৃষ্ণ মঠের ট্রাস্টি ও রামকৃষ্ণ মিশনের পরিচালন সমিতির সদস্য হয়েছেন। ১৯৭৫এ তিনি বেলুড় মঠ ও মিশনের সহকারী সাধারণ সম্পাদক হন। এই সময়ে ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সেবাকাজ ও পুনর্বাসনে তাঁর নেতৃত্ব ভোলার মতো নয়। একইসঙ্গে পল্লিমঙ্গল কর্মসূচিতেও তাঁর অন্যতম মুখ্য ভূমিকা ছিল। সারা ভারত জুড়ে প্রান্তিক মানুষদের জন্য তাঁর কাজ অবিস্মরণীয়।

১৯৯২-১৯৯৭ পর্যন্ত স্বামী আত্মস্থানন্দ বেলুড় মঠের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৭-তে তিনি বেলুড় মঠের সহ-অধ্যক্ষ এবং ডিসেম্বর ২০০৭-এ অধ্যক্ষ মহারাজের পবিত্র আসনে বৃত হন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর অবশেষে ১৮ জুন ২০১৭ রবিবার বিকেল ৫.৩০ নাগাদ রামকৃষ্ণ মিশন সেবাপ্রতিষ্ঠানে ৯৮ বছর বয়সে তাঁর মহাসমাধি ঘটে। তার কয়েক ঘণ্টা আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাসপাতালে গিয়েছিলেন মহারাজকে দেখতে। তারপর টুইট-বার্তায় লেখেন – ‘দুপুরেই দেখতে গিয়েছিলাম। সামাজিক ও ধর্মীয় কাজে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন স্বামী আত্মস্থানন্দ। তাঁর প্রয়াণে গভীরভাবে শোক প্রকাশ করছি। তাঁর প্রয়াণ আমাদের কাছে অপূরণীয় ক্ষতি। আর্তের সেবা ও দুঃস্থর কল্যাণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।’ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ব্যবস্থাপনায় ১৯ জুন রাতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পূজনীয় মহারাজের নশ্বর শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেল।

স্বামী আত্মস্থানন্দের জীবনে কর্ম আর ধর্ম একইসঙ্গে মিশেছিল। সেইসঙ্গে ছিল শাস্ত্রপাঠ ও বিবেকানন্দ-সাহিত্যের প্রতি তাঁর বিপুল অনুরাগ। বিদ্যাচর্চা সাধুজীবনের উন্নতির পরম সহায়ক— এই ছিল তাঁর আন্তরিক বিশ্বাস। মনে পড়ে ২০০৫-এ বিবেকানন্দের পৈতৃক বাড়িতে অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর ‘স্বামী বিবেকানন্দ নতুন তথ্য নতুন আলো’ গ্রন্থটির উদ্বোধন তিনি করেছিলেন। অধ্যাপক বসু বহু বছর মহারাজের স্নেহ-সান্নিধ্য লাভ করেছেন। সেই আবেগমথিত স্মৃতি ভেসে উঠেছিল মহারাজের বক্তৃতায় যখন তিনি ‘আমাদের শঙ্করী’ বলে উঠেছিলেন। আসলে স্বামী আত্মস্থানন্দ নিজে যেমন যোগজীবনে আত্মস্থ ছিলেন তেমনি আমাদেরও আত্মস্থ হবার শিক্ষাই দিয়েছেন। এই মহান সন্ন্যাসীর জীবন ও কর্ম সেই পথের দিশারী।
পরম পূজনীয় মহারাজের জীবনী সম্পর্কে সুন্দর লেখা। তাঁর শতবর্ষে প্রণাম।ছোটবেলায় তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছি। একটি প্রতিযোগিতার সার্টিফিকেটে তাঁর সই …যেন পরমপ্রাপ্তি।????????????
পূজনীয় মহারাজের জীবনী সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশিত করবার জন্য ডঃ শঙ্খ বসু মহাশয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ । বিবেকানন্দ অনুরাগী প্রফেসর শঙ্করী প্রসাদ বসুর প্রতি তাঁর আস্তিক দরদ লক্ষণীয় । সমগ্র উপস্থাপনা টি সহজ অথচ সুললিত ভাষায় বর্ণনার জন্য লেখক কে অভিনন্দন।
ডঃ শঙ্খ বসুর লেখা বেলুড় মঠের পঞ্চদশ অধ্যক্ষ্য পূজনীয় স্বামী আত্মস্থানন্দজী’র সংক্ষিপ্ত জীবনী সাগ্রহে পাঠ করলুম। বেশ ভালো লাগলো। পিতা প্রখ্যাত ডঃ শঙ্করী প্রসাদ বসুর সুযোগ্য পুত্রের পরিচয় লেখার মধ্যে ফুটে উঠেছে। অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল।
ড: শঙ্খ বসুর লেখা পূজনীয় মহারাজের লেখাপড়ে তৃপ্ত হলাম। উনি বিশদ ভাবে মহারাজের কর্মময় জীবনী বর্ণনা করেছেন।রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ আশ্রমে তাঁর সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। লেখাটির প্রাঞ্জল উপস্থাপনা আমাদের অধ্যাপক, সাহিত্যিক, বিবেকানন্দ গবেষক শঙ্করী প্রসাদ বসুর কথা বিশেষ ভাবে মনে করায়। লেখক কে অন্তরের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি।
Khub sudar lekha. Suveccha o namaskar janai
স্যার, লেখাটি পড়ে অনেক তথ্য ও অনেক কিছু জানা গেলো। প্রণাম নেবেন স্যার।