১৮৮৬ সাল পয়লা জানুয়ারি, নতুন বছরের প্রথম দিন, সাহেব পাড়ায় কত উৎসব। সেদিন কলকাতার বুকে ঘটে গেল এক অপার্থিব ঘটনা — কাশিপুর উদ্যানবাটির পবিত্র ভূমিতে পূর্ণব্রহ্মস্বরূপ শ্রীরামকৃষ্ণ আপন স্বরূপের প্রকাশ ঘটালেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো সেই মহান বাণী, ‘তোমাদের সকলের চৈতন্য হোক।’
সামাজিক এক অস্থিরতার সময় শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব। মুসলমান শাসনের ফলে সনাতন হিন্দু ধর্মের ভিত্তি তখন অনেকটাই দুর্বল — সঙ্গে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রবল প্রচার এবং ব্রাহ্ম ধর্মের জোয়ারে হিন্দু ধর্ম দিকভ্রান্ত — এই পরিস্থতিতে ঠাকুরের আবির্ভাব। নিজের স্থানটুকু কোথায়, অবলম্বনই বা কি, সেটা শুধু চিনিয়ে বুঝিয়ে ক্ষান্ত হলেন না, দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। কত সহজে তিনি মানুষকে ফেরালেন মূলস্রোতে।
তিনি জেনে ছিলেন মানুষের চেতনার পূর্ণবিকাশ ঘটলে তবেই সে মনুষ্যত্বে প্রতিষ্ঠিত হবে তার জন্য যে মাধ্যমটি প্রয়োজন তাহলো ঈশ্বরে বিশ্বাস। তাই আগেও তিনি বলেছেন ‘ঈশ্বরেতে মন রাখ চৈতন্য হবে।’
কাশিপুর উদ্যানবাটিতে অসুস্থ দেহ নিয়ে চলছে শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ দান। মহাপ্রয়াণ-এর কয়েক মাস আগে ইংরেজি নববর্ষের দিন নর থেকে ‘নরোত্তম’ রূপে আবির্ভূত হলেন। সেই ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলো মুষ্টিমেয় কয়েকজন ভাগ্যবান মানুষ। সেই মুহূর্তে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী শিষ্যরা উপস্থিত থাকলেও, তাঁর কাছে ছিলেন না, ছিলেন গৃহী শিষ্যরা।
সমবেত ভক্তদের নামের উল্লেখ নানান গ্রন্থে আছে। ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গ’ গ্রন্থে কয়েকজনকার নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন — গিরিশ, অতুল, রাম, হরমোহন, বৈকুন্ঠ, কিশোরী (রায়), হারান, রামলাল, অক্ষয় মাস্টার (দিব্যভাব ৩৩৮)। ‘শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথির’ লেখক অক্ষয় কুমার সেন এই কয়েকজন ছাড়াও উপেন্দ্রনাথ মজুমদার ও রাঁধুনী ব্রাহ্মণ গাঙ্গুলীর নাম উল্লেখ করেছেন। স্বামী অভেদানন্দ ভাই ভূপতি ও উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়-এর নাম কথা বলেছেন। স্বামী অদ্ভুতানন্দ হরিশভাইয়ের কথা বলেছেন।
কি ঘটেছিলো সেদিন?
বেলা প্রায় তিনটে। ঠাকুর রামলাল কে ডেকে বললেন, ‘দেখ রামলাল আজ বেশ ভালো আছি বলে মনে হচ্ছে। তা চল একটু নিচে বেরিয়ে আসি।’
লাল পাড় ধুতি, সবুজ রঙের জামা, লালপাড় বসানো মোটা একখানি চাদর, সবুজ রঙের কান ঢাকা টুপি, পায়ে মোজা, ফুল লতা আঁকা চটি জুতো, হাতে একটি ছড়ি নিলেন ঠাকুর। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নেমে হলঘরের দিকে ভালোভাবে একবার দেখলেন ঠাকুর। হলঘরের পাশের ছোট ঘরটিতে নরেন্দ্র ও অন্যব্রতী যুবক বিশ্রাম করছেন। ধীরে ধীরে দক্ষিণের দিকে গেলেন ঠাকুর। উদ্যানের এদিকে ওদিকে ভক্তরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন। গাছের ডালেও দু-একজন ঝুলছেন। সকলেই ঠাকুরকে অবাক হয়ে দেখছেন। আম গাছের তলায় গিরিশচন্দ্র ঘোষ বসে আছেন সেখানেই দাঁড়ালেন সামান্য ঝুঁকে সরাসরি প্রশ্ন,—
‘গিরিশ তুমি কি দেখেচ যে অত কথা যাকে তাকে বলে বেড়াও।’

গিরিশচন্দ্র ঠাকুরের পায়ের কাছে নতজানু হয়ে হাতজোড় করে বললেন অসাধারণ সেই যুগতীর্ণ উত্তর, যা একমাত্র নাট্যকার গিরিশই দিতে পারেন।
“ব্যাস বাল্মিকী যার কথা বলে শেষ করতে পারেননি আমি তাঁর সমন্ধে অধিক আর কি বলতে পারি।”
এই কথা শোনা মাত্রই ঠাকুর সমাধি মগ্ন হলেন।এক অপূর্ব জ্যোতি মুখমণ্ডলে উদ্ভাসিত হল। প্রভুকে এত সুন্দর কেউ কখনো দেখেননি। করুণায় আত্মহারা হয়ে দক্ষিণ হস্ত উত্তোলনপূর্বক ঠাকুর বললেন, “আমি আর কি তোমাদের বলিবো, আশীর্বাদ করি তোমাদের সকলের চৈতন্য হোক।”
ভক্তরা চমকে আনন্দে জয় জয় রবে ফেটে পড়লেন। কেউ প্রণাম করছেন কেউ পুষ্প বর্ষণ করছেন কেউবা তাঁকে স্পর্শ করার জন্য হুড়োহুড়ি করছেন। ঠাকুরের পদধূলি গ্রহণ করে দাঁড়াতেই ঠাকুর ভাবাবস্থায় তার বক্ষ স্পর্শ করে নিচ থেকে উপরের দিকে হাত চালনা করে বলছেন, “চৈতন্য হোক”। সে অদ্ভুত স্পর্শে প্রত্যেকের ভেতর অপূর্ব ভাবান্তর উপস্থিত হয়ে কেউ হাসতে, কেউ কাঁদতে, কেউ বা ধ্যান করতে, কেউ নিজে আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে অহেতুক ঠাকুরে ধন্য হওয়ার জন্য অপরকে ডাকতে লাগলেন। মহামূল্য সম্পদ অকাতরে বিতরণ করছেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। এই আনন্দ জাগতিক নয়, অতি জাগতিক পরমানন্দ।
শ্রীরামকৃষ্ণের ঐশ্বরিক কৃপালাপ করে ভক্তদের জীবন যেন আলাদা খাতে বইতে শুরু করেছিল। সেই সময়কার অনুভূতি বর্ণনা অপূর্ব চিত্রিত হয়েছে কয়েকজন পুঁথিকারের বর্ণনায়। এঁদের মধ্যে বলা যায় অক্ষয় কুমার সেনের কথা।
বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুর গ্রামে তার জন্ম। ঘন কৃষ্ণবর্ণ, রুগ্ন শরীর এবং মন্দ আকৃতির জন্য স্বামী বিবেকানন্দ মজা করে তাকে “শাঁকচুন্নি” বলে ডাকতেন। এই নামে ডাকলেও বিবেকানন্দ তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।
প্রথম জীবনে অক্ষয় কুমার কলকাতার জোড়াসাঁকোয় ঠাকুর পরিবারের ছেলেদের পড়াতেন বলে তাকে অনেকেই ‘অক্ষয় মাস্টার’ বলে ডাকতেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। তিনি পরবর্তী জীবনে ‘বসুমতি’ পত্রিকার অফিসে চাকরি করতেন। অক্ষয় কুমার ঠাকুরের গৃহিভক্ত। দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার-সহ কাশিপুরে ঠাকুরের অপর ভক্ত মহিমাচরণ চক্রবর্তী বাড়িতে প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করেন এবং তাঁর কৃপাদৃষ্টি লাভ করেন। এরপর থেকেই দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত শুরু হয় তার, বহুবার ঠাকুরের পবিত্রসঙ্গ লাভ করেন।
১৮৮৬-এর ১ জানুয়ারির দিন অক্ষয় কুমার সেন কাশিপুর উদ্যানবাটিতে উপস্থিত ছিলেন। রামলালের সঙ্গে ঠাকুর যখন উদ্যানে এলেন, গাছের ডালে কয়েকজন মিলে বানর বানর খেলছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেব কে সেদিকে আসতে দেখে অক্ষয় কুমার গাছ থেকে নেমে তাকে অনুসরণ করতে লাগলেন। হাতে গাছ থেকে তোলা দুটি চাঁপা ফুল ছিল তার কাছে ঠাকুর যখন পথের উপর দাঁড়িয়ে সমাধিস্থ হলেন তখন তিনি ফুল দুটি তার পায়ে দিলেন এরপর ঠাকুর ভক্তদের আশীর্বাদ করে যখন ফিরছেন তখন তাকে বিশেষভাবে দয়া করেছিলেন। ঘটনাটি বিবরণ অক্ষয়বাবু তার পুঁথিতে লিখলেন —
আভি মনোহর বেশ প্রভুর আমার।
বারেক দেখিলে কভু নহে ভুলিবার।।
শ্রী অঙ্গের মধ্যে খোলা বদন মন্ডল।
কান্তি রূপে লাবণ্যেতে করে ঝলমল।।
শ্রী শ্রী ঠাকুরের কল্পতরুরূপি বিশেষ মুহূর্তে অক্ষয় কুমার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ঠাকুর সেদিন অক্ষয় কুমারকে নিজের কাছে ডেকে তার বক্ষে হস্তার্পণ করে কানে মহামন্ত্র দান করেছিলেন। ভক্তের মনে আজীবন লালিত বাসনা সেই মুহূর্তে পূর্ণ করলেন ঠাকুর আর এই আশাতীত সৌভাগ্য লাভ করে অক্ষয় মাস্টারের অবস্থা হয়েছিল বিচিত্র দেহ বেঁকেচুরে গিয়েছিল। তিনি লিখেছেন, ‘রামকৃষ্ণ এখন আমায় যা দেখিয়েছেন, যা বুঝিয়েছেন তাতে বেশ দেখতে পেয়েছি এবং বুঝতে পেরেছি যে তিনি সেই ভগবান, ভগবানের অবতার, দুনিয়ার মালিক সর্বশক্তিমান সেই রাম সেই কৃষ্ণ সেই কালি সেই অনন্ত সচ্চিদানন্দ, মন বুদ্ধির অতীত আবার মন বুদ্ধির গোচর।’
অক্ষয় কুমার সেন এরপর বাকি জীবন শ্রীরামকৃষ্ণের স্মরণম মনন এবং শ্রী শ্রী সারদা মায়ের সেবায় দিন কাটাতেন। পরবর্তীকালে দেবেন্দ্রনাথ মজুমদারের পরামর্শে, স্বামী বিবেকানন্দের উৎসাহে এবং সর্বোপরি শ্রীশ্রীমায়ের আশীর্বাদে ঠাকুরের লীলা সম্বলিত “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি” এবং ‘শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা’ এই দু-খানি গ্রন্থের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ পরিমন্ডলে তিনি বিশেষ সুপরিচিত হন। তার লেখা শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি পড়ে আনন্দিত হয়ে স্বামীজি লিখেছেন, ‘তার কন্ঠে তিনি আবির্ভাব হচ্ছেন। ধন্য শাঁকচুন্নি।’
ছিয়াত্তর বছর বয়সে তার দেহ রক্ষা হয়। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেছিলেন, ‘… আমি ঠাকুর ও মাকে দেখতে পাচ্ছি।’ এরপর তার মুখে এক অনির্বচনীয় জ্যোতি ফুটে উঠেছিল। পরম আনন্দের মধ্যে দিয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গ, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি, সুদেষ্ণা ধর, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় ও শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত।।
সৃষ্টি যুগের অবতার শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুর????????????????????????????????খুব ভালো লেখা
শ্রীরামকৃষ্ণ মন্ত্রের আলোয় আলোক প্রাপ্ত হোক নতুন বছর। ধন্যবাদ????❤️
বাহহ খুব ভালো
ধন্যবাদ।