ভোটের ফলাফলে মহা বিপর্যয়ের পরই কার্যত বঙ্গ বিজেপির কঙ্কালসার চেহারাটা বেরিয়ে পড়েছে। বিশষ করে মুকুল রায় পদ্মশিবির ছেড়ে তাঁর পুরনো দলে ফিরে আসার পরই দলের আসল ছবিটা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে দলের অন্দরেই চড়তে শুরু করেছে বিদ্রোহের সুর। রাজ্য নেতৃত্ব তো বটেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন একাধিক বিজেপি নেতা। যার থেকে দলের ভিতরের গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব কার্যত প্রকাশ্যে চলে এসেছে। বিজেপির একটা বড় অংশ যেমন দলে শুভেন্দু অধিকারীর বেশি গুরুত্ব পাওয়াকে সহ্য করতে পারছে না পাশাপাশি আরেকটা অংশ চাইছে দিলীপ ঘোষের অপসারণ।
এদিকে মুকুল রায়ের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনের পরই বিজেপি-র বহু নেতা বেসুরো হয়েছেন। যার জেরে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগদানের জল্পনা ক্রমশ জোরালো হয়েছে। মুকুল রায় নিজের মুখেই জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে বহু বিজেপি নেতার দলত্যাগের বিষয়ে কথা হয়েছে। প্রশ্ন তাহলে কি মুকুলের হাত ধরে গেরুয়াশিবিরের ভাঙন তরান্বিত হতে শুরু করলো? ঘটনা এখানেই থেমে থাকছে না, বঙ্গ বিজেপি-র ভাঙন জল্পনায় নতুন মাত্রা চড়িয়ে দিয়েছে মুকুল পুত্র শুভ্রাংশু রায়ের মন্তব্য। তিনিও তাঁর বাবার মতোই দাবি করেছেন, অন্তত ২৫ জন বিজেপি বিধায়ক ও ২ সাংসদ তৃণমূলে ফিরতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
জল্পনার অবসান ঘটিয়ে মুকুল রায় ঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিত বিজেপি নেতা তপন সিনহা তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। প্রসঙ্গত; মুকুল রায়ের তৃণমূলে যোগদানের দিনই তিনি উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা সহ সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। বিজেপি ছাড়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিজেপিতে কাজ করতে পারছিলেন না। মুকুল রায় এই অনুগামী ২০১৭ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছিলেন। আবার মুকুল রায় ঘরে ফিরতেই তিনি ফিরে এলেন তৃণমূলে।
শুধু তপন সিনহা নন, বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে ফেরার লাইন এই মুহুর্তে অনেক লম্বা। শুধুমাত্র তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সবুজ সংকেত মিললেই ঘরওয়াপসির হিড়িক পড়ে যাবে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় বেশ কিছুদিন ধরেই বিজেপির অন্দরে ভাঙন রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বিধানসভা ভোটের আগে থেকেই নিচুতলার নেতারা বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। ভোটের ফল প্রকাশের পর অনেকেই বেসুরো বাজতে শুরু করেছেন। ধীরে ধীরে তারাও যে যোগদান করবে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।। এই মুহুর্তে উত্তর ২৪ পরগনার রতন ঘোষ, বাবু মাস্টার ওরফে ফিরোজ কামাল গাজিকে নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। বাবু মাস্টার মুকুল রায়ের সঙ্গে সল্টলেকের বাড়িতে এসে সাক্ষাত করায় সেই জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে।
কিছুদিন আগে কালিয়াগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক সৌমেন রায়কেও তাঁর বিধানসভা কেন্দ্রে এমনকি জেলার কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। জেলা পার্টি অফিসে দলীয় বৈঠকে গরহাজির ছিলেন সৌমেন। তারপর থেকেই মুকুল রায়ের অনুগামী বলে পরিচিত কালিয়াগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক সৌমেন রায়কে নিয়ে জোর জল্পনা ছড়িয়েছে।তৃণমূল নেতারা অবশ্য কটাক্ষ করে বলেছেন, মুকুল রায় দল ছাড়ার পর বিজেপি-র অন্দরে কার্যত ‘মুষলপর্ব’ শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল মুকুলের দলত্যাগের আগে থেকেই বাংলার গেরুয়া শিবিরের অনেকেই বেসুরো হতে শুরু করেছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বাধ্য হয়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় কড়া বার্তা দেন- বিজেপিতে থাকতে হলে ত্যাগ-তপস্যা করতে হবে। যাঁরা শুধু ক্ষমতা ভোগ করতে চান, তাঁরা থাকতে পারবেন না। আমরাই রাখব না। কার্যত বিজেপি দল থেকে তৃণমূলে যোগদানের যে এখন হিড়িক পড়েছে সেটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও টের পেয়েছে।
পদ্ম-শিবিরের অন্দরের ফাটল যে ক্রমশ প্রকট হচ্ছে সেটা আরও স্পষ্ট মুকুল-অনুগামী বাগদার বিজেপি বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাসের বেসুরো হওয়াতে। যদিও তিনি মুকুলের পথে হাঁটবেন কিনা তা স্পষ্ট করেননি। তবে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা যেভাবে তার গলায় শোনা গিয়েছে তাতে জল্পনা বাড়ছে। বছর দুয়েক আগে মুকুল রায়ের হাত ধরেই বিশ্বজিৎ দাস তৃণমূল ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে যোগদান করেন। আবার মুকুল রায়ের তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি মুকুল রায়-সহ তৃণমূল নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।এরপর থেকে বিশ্বজিৎ দাসের বিজেপি ছাড়ার জল্পনা শুরু হয়েছে।
বঙ্গ বিজেপির অন্দরের এই অবস্থার আঁচ পেয়েছেন দিল্লির নেতারা। এই অবস্থায় সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে চাইছেন মোদী-শাহরা। শোনা যাচ্ছে সাংগঠনিক দায়িত্বে বড় দায়িত্ব পেতে পারেন স্বপন দাশগুপ্ত। বাংলার বিধানসভা ভোটে এবার একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে তিনি অনেকটাই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলে বাংলার নাড়ি বোঝার চেষ্টা করেছেন। বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ছিলেন মুকুল রায়। কিন্তু এখন তিনি তৃণমূলে। জায়গাটা ফাঁকা অবস্থায় রয়েছে। সেই জায়গায় একজন বাঙালি ব্যাক্তিকেই বসাতে চাইছেন দিল্লির নেতারা। আর সেখানে স্বপন দাশগুপ্তের মতো নেতাকেই যোগ্য মানছেন অনেকে। কারণ ভোটে তিনি মাঠে নেমে কাজ করেছেণ। বাংলার মানুষের হ্রীদস্পন্দন তিনি বোঝেন। আর সেই কারণে তাঁকেই সাংগঠনিক দায়িত্বে আনতে চান দিল্লির নেতারা। কিন্তু তিনি কি বঙ্গ বিজেপির এই ভাঙন রুখতে পারবেন, দলের মধ্যেকার গোষ্টীদ্বন্দ্ব, নির্বাচন পরবর্তী বিদ্রোহ কি থামাতে পারবেন?
ভোটের মাঠে নেমেছেন বলেই বাংলা আর বাংলার মানুষকে তিনি বোঝেন- এটাই বিজেপির বোধ বুদ্ধি, এই নিয়েই ওরা
এসেছিল দেশের মানুষের ভোটে, আবার দেশের মানুষের লাথি, ঝ্যাটার বাড়ি খেয়েই চিরতরে বিদায় নেবে। কোনও
দাশগুপ্ত- সেনগুপ্ত বা তার বাপ ঠাকুর্দা ওদের ভাঙন পতন রুখতে পারবে না।