বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যের ইতিহাসে প্রাবন্ধিক স্বপন কুমার মণ্ডল শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বিরাজিত। প্রায় দুই’দশক ব্যাপী প্রবন্ধচর্চার ভাষানগরে তাঁর সনিষ্ঠ বিচরন সুনামে-স্বনামে উৎকর্ষমুখর আভিজাত্য ও বনেদিয়ানা লাভ করেছে। একাধিক বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর বর্তমানে সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর স্বপন কুমার মণ্ডল তাঁর ‘জীবন দর্শনের পরশ’ হাজার হজার পিপাসু মনে ছড়িয়ে চলেছেন। একদিকে বাংলা প্রবন্ধের আগলকে ভেঙে যেমন তিনি সাহিত্যের নবদিগন্তকে উন্মোচন করে চলেছেন তেমনি তাঁর পরশ পেতে চাওয়া হাজার হাজার মানুষের মনকে আচলায়তনিক কারাগার থেকে মুক্ত করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।
গবেষণাকর্মের জন্য তিনি ‘কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র’ থেকে ‘মাখনবালা দাস স্মারক গবেষক’ সন্মাননায় সন্মানিত হন ২০০৭ সালে। চতুর্থ আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে (কোচবিহারের দিনহাটা বয়েজ রিক্রিয়েশন ক্লাব আয়োজিত) ‘হিতেন নাগ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪’ লাভ করেন। ২০১৬ সালে পান ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’ পত্রিকার পক্ষ থেকে বিশেষ সংবর্ধনা। ২০১৯ সালে ‘গুরু শিষ্য পরম্পরার একটি উদ্যোগ (পুরুলিয়া)’ কমিটি তাঁকে প্রদান করে ‘শিবরাম গবেষক সংবর্ধনা’। ২০২০ সালে প্রবন্ধ সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‘বর্ণমালা প্রকাশনী ও টেট পয়েণ্ট শিক্ষানিকেতন’ আয়োজিত ‘স্মরণে মননে আশপূর্ণা ও সন্মাননা প্রদান’ অনুষ্ঠানে পান বিশেষ সন্মাননা। এছাড়া বাদলমনি হাই স্কুল (২০১৪), পাকুয়াহাট বইমেলা কমিটি (২০১৮), পুরুলিয়ার দরোদী এইচ জি কে বিদ্যাপীঠ (২০১৯) এর মতো বহু প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন এবং পেয়ে চলেছেন সাহিত্য সন্মাননা ও সংবর্ধনা।
২০০৮ থেকে শুরু করেছিলেন সাড়া জাগানো পত্রিকা ‘বিনিময়’এর সম্পাদনাকর্ম। বাংলার প্রথম শ্রেণির দৈনিক ও সাময়িক পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি সহ তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থের সংখ্যাও এই মুহুর্তে প্রায় পনেরো। ‘বাংলা ও বাঙালি’ (সংবেদন প্রকাশনী, ২০০৭), অনুভবে বৈভবে রবীন্দ্রনাথ (দিশারী প্রকাশনী, ২০১১), ‘বাংলা সাহিত্যে পঞ্চঅনন্যা'(করুণা প্রকাশনী, ২০১৪), ‘আত্মঘাতী দ্বিজেন্দ্রলাল’ (করুণা প্রকাশনী, ২০১৯) এর মতো বিখ্যাত গ্রন্থের পাতায় পাতায় যে ‘জীবনবোধের নির্যাস’ পাঠক পেয়ে থাকেন সেই নির্যাসের অন্দরমহলের হৃ-কেন্দ্র ঢোকার জন্য সাক্ষাৎপ্রার্থী হতে চাওয়া আমাদের। যা আলোকবর্তিকা রূপে সাহিত্যের ইতিহাসে এবং আমাদের ব্যক্তিগত জীবনচর্যার অন্ধকারে ভীষন প্রয়োজন। গত ০১/০১/২০২০, ১৭/০১/২০২০ ও ১৮/০১/২০২০ তারিখে তাই তাঁর পুরুলিয়ার (আমডিহা) বাসভবন ‘দীপালি এপার্টমেন্টে’ আমরা হাজির হই। আমার (সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায়) সাথে ছিলেন মনিপুর স্বামী বিবেকানন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক ড. কার্তিক কুমার মণ্ডল, রামানন্দ কলেজের বাংলা বিভাগের অতিথি অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দও, নিউ আলিপুর কলেজের বাংলার অধ্যাপক বৈদ্যনাথ বাস্কে, দরোদী এইচ জি কে বিদ্যাপীঠের সংস্কৃতশিক্ষক সন্দীপ কুমার ঘোষ।

একদিকে সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য যেমন তাঁর জীবনবোধের হৃল্লেখবীজকে ব্যক্তিজীবনে পাথেয় করে তোলা, তেমনই অপর দিকে তাঁর গভীর দার্শনিকতার পরশকে বাংলার সকল সাহিত্য রসিক-পাঠক-গবেষকদের সুলভ আস্বাদ্য করে তোলা। যা একজন পথহারা পথিকের যেমন মরিচীকাভ্রমকে দূর করবে, তেমনই সকল ধনে ধণী রাজার ভিতরকার সন্নাসীরূপকেও বের করে আনবে। তিনদিনের এই মহার্ঘ সাক্ষাৎকারের নির্যাসটুকু এখানে তুলে ধরা হল।
সিদ্ধার্থ : আজকে স্যার ১ জানুয়ারি। কল্পতরু দিবস। এই দিনটি সম্পর্কে প্রথমেই যদি কিছু বলেন —
স্যার : এই দিন যাঁর সঙ্গে জড়িয়ে পরিচিতি পেয়েছে, তিনি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। মোহময় জীবনে আমাদের চাওয়ার শেষ নেই। ঈশ্বরের কাছেও সেই অনন্ত চাহিদা আমাদের। কামনাবাসনাময় জীবনে শুধু চাই আর চাই। মায়াময় জগতে এজন্য আমাদের অতৃপ্ত চাহিদার জন্যই পরমানন্দময় জগৎও দুঃখযন্ত্রনায় বিষাদে পরিণত হয়। এজন্য ঠাকুর আমাদের আনন্দময় জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কল্পতরু সেজেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর কাছে যা চাওয়া যাবে, তাই পাওয়া যাবে। অবশ্য ঠাকুর এজন্য মোহগ্রস্থ কামনাবাসনা মেটাতে চাইলেন না। অথচ সকলের প্রতি সদানন্দময় জীবনের আশীর্বাদ বর্ষণ করলেন। এজন্য যাতে সেই মোহই কেটে যায় সেজন্য ‘তোদের চৈতন্য হোক’ বলে শুভাশিস জানালেন সেদিন। চেতনার অভাব থেকেই তো মোহের জন্ম হয়। তার আবির্ভাবে তার মৃত্যু সুনিশ্চিত। তখন আনন্দলাভের পথ আপনাতেই সুগম হয়ে ওঠে।
সুপ্রিয় : স্যার আপনি মালদার নামকরা প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেখানে আপনি ‘বিনিময়’ নামে পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। আবার ‘উত্তরবঙ্গ সাহিত্য-সংস্কৃতি’ বা ‘মননবিশ্ব’ নামে দুটি পত্রিকার উপদেশকও ছিলেন। সেক্ষেত্রে প্রকাশনার দিক থেকে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করার আগ্রহ কতটা গ্রহণযোগ্য মনে হয়?
স্যার : প্রথম কথা সব পত্রপত্রিকা লিটল ম্যাগাজিন নয়। আর লিটল ম্যাগাজিনের জন্মই হয়েছে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মানসিকতা থেকে। সেখানে তার অব্যবসায়িক প্রকৃতিই তার বনেদি আভিজাত্য। সেদিক থেকে প্রকাশনার মতো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বহু উদ্দেশ্যসাধক পত্রিকাকে লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে এক করে দেখা সমীচীন হবে না। আসলে লিটল ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠানবিরোধী কণ্ঠস্বর। তার প্রতিবাদী চেতনার লক্ষ্যে থাকে বিপ্লবের হাতছানি। সেখানে ম্যাগাজিনের বারুদশালার বারুদে পোড়ানো লক্ষ্য নয়, উত্তাপ ও আলো ছড়ানোই তার উপজীব্য যা ব্যবসায়িক প্রকাশনায় প্রত্যাশিত নয়।
সুপ্রিয় : তাহলে স্যার বেশকিছু সম্পাদক বলেন লিটল ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠানবিরোধী নয়, প্রতিষ্ঠানের সমান্তরাল। এটা কি বলা যায়?
স্যার : দেখো সমান্তরালের মাধ্যমে শুধু অবস্থানগত ব্যবধান উঠে আসে। তার মধ্য প্রতিযোগিতাও উঠে আসতে পারে, কিন্তু প্রতিবাদ প্রত্যাশিত নয়। লিটল ম্যাগাজিনের মননের বিপ্লব তাতে নিবিড়তা লাভ করে না। এজন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক পত্রপত্রিকায় ধন ও মানের প্রতি সতৃষ্ণ দৃষ্টি লিটল ম্যাগাজিনের গরিমাকে আমল না দিয়ে বাণিজ্যপত্রিকারই দোসর হয়ে ওঠে। সেখানে ম্যাগাজিনের বারুদে প্রথমে যে ব্যবসায়িক প্রকৃতি ছিল, তাই ‘লিটল’ হয়ে বিশেষ করে সাহিত্যের পত্রিকায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সম্প্রতি আমি দিনহাটায় ‘উত্তরবঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন মেলা” উদ্বোধনী বক্তৃতায় সেকথা তুলে ধরি। আমি জানাই, ‘লিটল ম্যাগাজিন’ মূলধনে ‘লিটল’ হলেও মনধনে শুধু ‘বিগ’ নয়, ‘গ্রেট’। এতে তার অস্তিত্বে ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশটা বড়’, তেমনই ‘ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নয়, জানি আমি ভাবি বনস্পতি’। সেজন্য তার আয়ু অল্প হলেও আবেদন সুদীর্ঘ, পরিসর সীমিত হলেও প্রভাবে লক্ষ্যভেদী বাণ। তার সেই লক্ষ্যে থাকে বিপ্লব। এজন্য বাণিজ্য পত্রিকার সঙ্গে সে সমান্তরাল প্রতিযোগী নয়, বরং প্রতিবাদী চেতনায় স্বতন্ত্রতা আভিজাত্য লাভ করে। শুধু তাই নয়, অগ্রদূতের ভূমিকা তার সহজাত। এজন্য সব পত্রিকা লিটল ম্যাগাজিন নয়। আবার সেই বিপ্লবও সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না, বিদ্রোহেই তার অস্তিত্ব আটকে পড়ে। সেক্ষেত্রে তার অস্তিত্বের মূলে ব্যবসায়িক শ্রীবৃদ্ধি নয়, মননের বিপ্লবী প্রয়াসই সদাজাগ্রত। এজন্য বাণিজ্যিক প্ত্রপ্ত্রিকাকে বলা হয় পোষা কুকুর, আর লিটল ম্যাগাজিন ক্ষুধার্ত বাঘ। আন্যদিকে বনের পশুকে পোষ মানালে সে তা বন্যতাকে হারিয়ে ফেলে। সেও হয়ে যাও মানুষের দোসর। এজন্য লিটল ম্যাগাজিন কোনো রকম কারও অধীন থাকতে পারে না। সে স্বাধীন, সে মুক্ত, সে স্বাধীন চিন্তাভাবনার বার্তাবাহী।
সিদ্ধার্থ : আপনার কথায় প্রায় শুনতে পাওয়া যায় ‘হঠাৎ একপশলা বৃষ্টি হলে মনে হয়, / পৃথিবীটা মরূভূমি নয়।‘ সেদিক থেকে এই একপশলা বৃষ্টি কাকে বলব, স্বামী বিবেকানন্দ না রবীন্দ্রনাথকে?
স্যার : আসলে ওটা আমাদের স্যারের (উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ভূতপূর্ব অধ্যাপক প্রণয় কুণ্ডু।) দেওয়াল পত্রিকা ‘সৃজন’-এর জন্য ছাত্রছাত্রীদের দাবিতে চটজলদি লেখা কবিতিকা। অথচ তার ব্যঞ্জনা আমাকে অনুরণিত করে চলেছে। সেদিক থেকে স্বামীজি বা রবীন্দ্রনাথ কেউই একপশলা বৃষ্টি নয়। তাঁরা সব মানবসাগর। মানুষের বৃহত্তর ও মহততর প্রতিভারত্ন তাতে মজুত রয়েছে।
সিদ্ধার্থ : তাহলে আপনি তাঁদের দুজনের মধ্যে কাকে এগিয়ে রাখবেন?
স্যার : অবশ্যই রবীন্দ্রনাথকে। স্বামীজি যেখানে স্বল্পকালেই প্রস্ফুটিত হয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছেন, রবীন্দ্রনাথ সেখানে স্বকীয় প্রতিভায় সৃষ্টিকর্মের বিচিত্রধারায় বিশ্বকেই ধারণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কথায় ঘনীভূত ভারত বিবেকানন্দ দেশের মাহাত্ম্যকে সারা বিশ্বে দিয়েছেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকেই তাঁর দেশের মধ্যেই বিশ্বকে মহিমান্বিত করছেন। তাঁর বিশ্বভারতী তো সেই বিশ্বের এক নীড়। অন্যদিকে স্বামীজি মাত্র ঊনচল্লিশে চলে যাওয়ার তাঁর পূর্ণ পরিচয় আমরা পাইনি। সেখানে রবীন্দ্রনাথ আশি বছর তিন মাস বেঁচেছিলেন। একজন পূর্ণ মানুষের সম্পূর্ণ বিকাশের পরিচয়ে রবীন্দ্রনাথ অতুলনীয়। প্রতিভা আর চরিত্রের অপূর্ব সমন্বয় আর কোথায় আছে !
কার্তিক: তাহলে স্যার আপনি রবীন্দ্রনাথকে পেলে একটিই প্রশ্ন করার অবকাশ পেলে কী বলবেন?
স্যার : কেন, বলব, আপনার পূর্ণ বিকশিত ব্যক্তিত্ব আপনি আজীবন কীভাবে রক্ষা করে গিয়েছেন।
সিদ্ধার্থ : আচ্ছা স্যার, সিলেবাসে যেখানে বৈষ্ণবপদাবলি, শাক্তপদাবলি পাঠ্য, সেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে পাঠ্য করা হয়নি?
স্যার : তোমার প্রশ্নের মধ্যেই তার উত্তর রয়েছে। রবীন্দ্রপদ তো তাঁর কবিতা, তা তো পাঠ্য। অন্যদিকে সঙ্গীতশিক্ষা রবীন্দ্রসঙ্গীত অবশ্যই পাঠ্য। অন্যদিকে বৈষ্ণবপদ বা শাক্তপদ গান হিসাবে নয়, কবিতা হিসাবেই তা পাঠ্য।
সিদ্ধার্থ : স্যার রবীন্দ্রসঙ্গীত বলা হলেও নজরুলগীতি বলা হয় কেন?
স্যার : শুধু রবীন্দ্রনাথ ব্যাতীত অন্যদের গান গীতি বা গানে পরিচিতি পেয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ প্রমুখের কথাও স্মরণীয়। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ব্যতিক্রম। পূর্বে সঙ্গীতের ধারায় শ্যমাসঙ্গীত বা ব্রাহ্মসঙ্গীতের মধ্যে যে শ্রেণিগত চেতনার পরিচয় বর্তমান, সেখানে রবীন্দ্রনাথের একক সঙ্গীত সাধনা আপন ঐতিহ্যে স্বতন্ত্র ধারা লাভ করেছে। তার নিজস্ব বিশেষত্বে কথা ও সুরের অপূর্ব সমন্বয় বর্তমান যা শুধু গীতি বা গানে তা পূর্ণতা পায় না। সঙ্গীতের অভিনব ধারাতেও রবীন্দ্রনাথ অতুলনীয় অনন্য মনে হয়।
সিদ্ধার্থ : স্যার আপনাকে আমার একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন আছে। আপনি যদি স্বপনকুমার মণ্ডলের সাক্ষাৎকার নেন, প্রথম কী প্রশ্ন করবেন?
স্যার : আগে তো স্বপনের মধ্যে থেকে বেরাতে দাও। বেরাতে পারলে নয় ভেবে দেখব। তখন হয়ত বলব, ব্যাটা এতদিন আমায় বন্দি রেখেছিলে কেন। আসলে নিজেকে জানতেই তো জীবন ফুরিয়ে যায়।
সুপ্রিয় : স্যার আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে আপনার প্রবন্ধে কাব্যের ব্যঞ্জনা কেন থাকে।
স্যার : আসলে আমরা প্রবন্ধ সম্পর্কে আমাদের অনেকগুলি নেতিবাচক ধারণা আছে। তার মধ্যে একটি প্রবন্ধ সৃজনশীল সাহিত্য নয়। যেন তাকে জোর করে সাহিত্য করে তোলা হয়। মনে রাখতে হবে, মননশীল সাহিত্য হিসাবে প্রবন্ধের জুড়িমেলা ভার। শুধু তাই নয়, তাতে শুধু যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে প্রমাণের আবেদনে নিঃশেষ হয়ে পড়ে না, কল্পনার উৎকর্ষে তার মননের মধুক্ষরণের প্রয়াসও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংবেদী কবিমানসের পরিচয় তাতেও প্রকাশমুখর। সেখানে প্রবন্ধের নামান্তরে নিবন্ধের পরিসর এজন্য বিস্তৃত হয়ে পড়ে। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ প্রবন্ধ তারই পরিচয়বাহী। অন্যদিকে আমি প্রবন্ধের মধ্যে যুক্তির চেয়ে চিন্তার মুক্তির প্রয়াসে সযত্ন থেকেছি। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই কাব্যিক পরিসর এসে গেছে। সেক্ষেত্রে প্রবন্ধের ভাষাতে সহজবোধ্যতার চেয়ে প্রকাশের বহুমাত্রিক সৌন্দর্য আপনাতেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তুমি যাকে কাব্যের ব্যঞ্জনা বলছ, তার মূলধার সেখানেই।
সন্দীপ : স্যার আমার অনেকগুলি প্রশ্ন রয়েছে। একসঙ্গে করছি। তাতে আপনার সুবিধা হবে। আপনি বাংলার অধ্যাপক হয়েও অন্যান্য বিষয়ে সমান স্বচ্ছন্দ কীভাবে হয়েছেন? কীভাবেই বা আপনি সকল সকলকে আপন করে নেন? সকলে আপনার আপন কেন হয়?
স্যার : বিষয়ের জ্ঞান নির্দিষ্ট হতে পারে, জ্ঞানের কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে না। তার বিস্তার অপরিসীম। শুধু তাই নয়, বিদ্যাশিক্ষায় জ্ঞানলাভের চেতনায় তথ্য জানা ও অভিজ্ঞতার লাভের প্রক্রিয়ার মধ্যেই জ্ঞান পরিসর সীমাবদ্ধ নয়। তার চলন প্রজ্ঞার আলোয় উপনীত হয়। সেখানে ‘নলেজ’ থেকে ‘উইসডম’ পথ সুদূরপ্রসারী হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে তথ্যের মাধ্যমে জ্ঞানলাভের চেয়ে অভিজ্ঞতার মূল্য অনেকবেশি আবেদনক্ষম। এজন্য জীবনের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাঁর মাধ্যমে শিক্ষালাভ অধিক হয়ে থাকে। জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাই জীবনবোধকে আরও সুগঠিত করে তোলে। ব্রেনোলিয়া বা বনভিটা খেয়ে যে জ্ঞানের বোধোদয় হয় না, তাই জীবনের আঘাতে সেই জ্ঞানচক্ষুই খুলে যায়। অন্যদিকে বিশেষীকরণের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাও কম নয়। সেখানে বিদ্যার মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হয়ে পড়ে। ‘সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে’র মুক্তি সেখানে অধরা মাধুরী। এজন্য বিশ শতকেই বিশেষীকরণের যুগ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এজন্য একুশ শতকে ইতিমধ্যেই উচ্চশিক্ষায় সিবিসিএস-এ ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি ওয়েতে পড়ানো শুরু হয়েছে। অন্যদিকে কোনো বিষয়ে সীমাবদ্ধতা তার স্বাস্থ্যের পক্ষেও অস্বাস্থ্যকর। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে তার বিস্তার। এজন্য জ্ঞানকূপে আটকে পড়লে হবে না, জ্ঞানসাগরে পৌছাতে হবে। সেখানেই তো মণি-মুক্তো এবং মুক্তির আনন্দ। তখন চোখের জলেও সমুদ্রের স্বাদ পাওয়া যাবে। চোখের জলও যে নোনতা। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরের সমন্বয় করার মধ্যেই বিদ্যাশিক্ষার উৎকর্ষ বর্তমান। জীবনবোধ গড়ে তোলাই শুধু নয়, মূল্যবোধেও তা অপরিহার্য। শিক্ষকের ভূমিকা সেখানে শুধু পথপ্রদর্শকের নয়, পথিকেরও। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁকে শিক্ষার্থীর বহুক্ষুধা মেটালেই হবে না, ক্ষুধাকে জাগাতেও হবে। এজন্য শিক্ষকদের বিষয়ান্তরে বিচরণে সক্রিয় থাকা শুধুমাত্র প্রত্যাশিত নয়, আবশ্যিক। অন্যদিকে নিজেকে ঋদ্ধ করার লক্ষ্যেই আমার পড়াশোনা। এই জীবন ও জগৎ নিয়ে আমার তীব্র কৌতূহল। সেই জ্ঞানপিপাসাই আমায় ছুটিয়ে বেড়ায়। ভাবি কারও মধ্যে যদি এই পিপাসা ছড়িয়ে দিতে, তাহলেও আমার লাভ। অন্তত সে যদি জ্ঞানসাগরে সেই মুক্ত কিংবা মুক্তি পায়, এই প্রত্যাশাও আমাকে প্রাণিত করে।
অন্যদিকে নিজেকে ছড়ানোর মধ্যেই তো আনন্দের বসতি। সেখানের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার মধ্যেই রয়েছে আমাদের জীবনের আসল সবার্থকতা। কবিগুরুর ভাষায় ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া / বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাড়ি সাড়া।‘ সেখানে রয়েছে আত্মীয়তার পরম পরম, আনন্দময় জীবনের হাতছানি। এজন্য সকল আমি আপনার করে নেই না, সকলেই আমার আত্মীয়। আমি আন্তরিক ভাবে ভালোবাসি বলেই হয়তো তাঁরা আমায় ভালোবাসে।
সন্দীপ : স্যার, আপনার সঙ্গে আমার বছরপাঁচেক আগে পরিচয় হয়েছিল। সেদিন থেকেই থেকেই আপনার প্রতিবাদীসত্তা লক্ষ করেছি। এবিষয়ে যদি কিছু বলেন—
স্যার : দেখো মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ একটি অসাধারণ কথা আছে। ‘বেটার টু রেইন ইন হেল দ্যান টু সার্ভ ইন হেভেন’ অর্থাৎ স্বর্গের দাসত্বের চেয়ে নরকের রাজত্ব শ্রেয়। আমাদের সেই মিথ্যার স্বর্গে দাসত্বের মানসিকতায় সত্য কথার সৎসাহসই আমরা হারিয়ে বসেছি। সেখানে সাধারণই অসাধারণ হয়ে গেছে। যে শিক্ষক সময় মেপে স্কুল করেন, তাঁর সময়মাফিক চলন আপনাতেই অসাধারণত্বে প্রচার লাভ করে। অথচ শিক্ষকের সময় মেনে চলাটাই তো স্বাভাবিক। সেখানে সময় না মেনে চলাটাই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে কোনো দোকানদার মালে ভেজাল দেন না। যেন তিনি মহৎ কর্ম করে চলেছেন। আরে ভেজাল না দেওয়াটাই তো স্বাভাবিক। অথচ সেই স্বাভাবিকতাই অস্বাভাবিকবোধে অসাধারণত্ব লাভ করেছে। সেখানে আমরা সব সমঝোতা এক্সপ্রেসের যাত্রী। মাঝে কেউ সেই সত্য প্রকাশে সোচ্চার হলেই আমাদের মনে হয় সে বা তিনি প্রতিবাদী। অথচ মনে আর মানে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের সেই প্রতিবাদে সামিল হতেই হবে। এটাই স্বাভাবিক। সেখানে আমাদের পোষমানা পাশবিক দাসত্বের প্রাণ বাঁচলেও, মান বাঁচে না, মনেরও অপমৃত্যু ঘটে। আসলে মানুষের অভ্যাসে বেঁচে থাকার মধ্যে সার্থকতা খুঁজে পাওয়ায় সে যে কখন পোষমানা পশুর মতো নিজের স্বতন্ত্রতাকেই হারিয়ে ফেলে, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ পায় না। সেখানে জার্মাণ দার্শনিক নীৎসের একটি কথা আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়। হীরা কয়লা থেকে পাওয়া যায়। সেই কয়লা নরম বলে আগুনে পোড়ে। আর হীরা সবচেয়ে শক্ত বলে মাথায় শোভা পায়। সেখানে পোষমানা সমাজজীবনে সত্যবাদীকে প্রতিবাদী মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক মনে হয় না।
সন্দীপ : আপনি এত জ্ঞানী মানুষ, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রফেসর। তাঁর পরেও আপনি ছাত্রদের নিয়ে স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেরান, জমিয়ে আড্ডা দেন। এসব আপনি করেন কীভাবে?
স্যার : কেন, স্বচ্ছন্দে। আসলে শিক্ষকের দায় ক্লাসরুমের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না। আমাদের দেশে পূর্বে টোলের আশ্রমিক শিক্ষা ছিল। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছিলেন গুরু-শিষ্য। শিষ্যরা তখন গুরুর কাছে থেকে শুধু শিক্ষা পেত না, গুরুর সান্নিধ্যে তাঁর জীবন-যাপনের পরশ আপন করে নিতে পারত। তারপর যখন আধুনিক শিক্ষার সোপানে ক্লাসরুম নির্ভর শিক্ষা এল, তখন সীমিত সময়ে শিক্ষায় এল অভিনয়ের পালা। সেই ছাত্র-শিক্ষক তখন থেকে গুরু-শিষ্যের অভিনয়ে সামিল হয়ে গেল। সেই শিক্ষক-ছাত্রের অভিনয় দক্ষতায় যত দূরত্ব বাড়তে থাকল, ততই গুরুর গুরুত্ব লঘু হয়ে গেল। অভিনয়ে আরোপিত সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সেখানে শিক্ষক-ছাত্রের প্রয়োজনের সম্পর্ক অভিনয়ের মতোই কৃত্রিমতায় প্রাণহীন হয়ে পড়ে। কেউ কারও কাছে পৌঁছাতে পারে না। প্রতিমার সামনের দিক জানা গেলেও পিছনের দিকটি সম্পূর্ণই অজানা থেকে যায়। সেক্ষেত্রে শিক্ষককেই সহজ হয়ে ছাত্রের কাছে পৌঁছাতে হবে। তাহলে ছাত্রও গুরুকে পূর্ণভাবে লাভ করার অবকাশ পাবে। অবশ্য আমি আমার ছাত্রের কাছে পৌছানোর লক্ষ্যেই শুধু মিশি না, আমি ওদের মধ্যে নিজেকে খুঁজে চলি নিরন্তর। ওদের মধ্যেই আমার শিক্ষকজীবনের পূর্ণতা।
সন্দীপ : আচ্ছা স্যার, আপনি যেকোনো বিষয়ে এভাবে গুছিয়ে কথা বলেন কীভাবে?
স্যার : আসলে আমরা মনোজগতে যা ভাবি, বলার সময় তাই গুছিয়ে বেরিয়ে আসে। সেখানে বলাটাই কলা হয়ে উঠলে তার উপাদেয়তা তীব্র আবেদনক্ষম মনে হয়। সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের মধ্যে তার অবাধ বিচরণ স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যাশিত। মৌমাছির মতো ফুলে ফুলে মধু সঞ্চয় করে ছাত্রছাত্রীদের মধু দানেই তাঁর কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না, ছাত্রছাত্রীদের প্রজাপতির মতো ফুলে ফুলে মধু আস্বাদনে সামিল করাও তাঁর দায়ের মধ্যে পড়ে। এজন্য তাঁদের শিক্ষার মাধ্যমে বাকশক্তির প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। শুধু তাই নয়, এই শক্তিই প্রকাশের উৎকর্ষে শিল্প-সাহিত্যে উন্নীত হয়। কাঁথাশিল্পের মতো কথাশিল্পের পরিসর আপনাতেই প্রকাশমুখর। মনে রাখতে হবে প্রাচীন গ্রীকে শিল্প-সাহিত্যের পূর্বে বাগ্মীতার পাঠ শুরু হয়েছিল। সেখানে ভালো বক্তা কীভাবে হওয়া যায়, তাই নিয়ে গভীর চর্চা শুরু হয়েছিল। এছাড়া কথায় আমরা বলি থাকি অত ছলাকলা করতে হবে না। সেদিক থেকে যেখানে ছলনা কথায় কলা বা আর্ট লাভ করে নান্দনিকতা লাভ করে, সেখানে গুছিয়ে কথা বলার আবেদন সর্বত্র প্রকাশমধুর মনে হয়। সামান্যে অসামান্য তার বিস্তার, ক্ষুদ্রে বৃহতের হাতছানি তার সৌরভ।
সন্দীপ : স্যার, এত কাজ, দায়িত্বের মাঝে আপনি নিজেকে প্রাণবন্ত রাখেন কীভাবে? আপনার অফুরন্ত হাসির উৎস যদি একটু বলেন—
স্যার : জীবনে সবকিছুকে সহজ ও স্বাভাবিক করে নিতে পারলেই নিজেকে প্রাণবন্ত রাখা যায়। শোক-দুঃখ-যন্ত্রণা, অভাব -অনটন আমাদের জীবনের স্বাভাবিকতাকেই প্রকাশ করে। অথচ তা আমরা মেনে নিতে পারি না। এই না-মেনে নেওয়ার আমাদের জীবনকে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। মুখের হাসি উবে যায়, চোখের জল গড়িয়ে নামে। আমাদের অনন্ত চাহিদা, অপরিসীমা অতৃপ্তি যা আমাদেরকে নিত্য অভাববোধে ক্ষতবিক্ষত করে চলে। সেখানে সুখের অভাব অসুখ, সুস্থতার অভাব অসুস্থ। অথচ ‘অভাব’-এর মধ্যে থাকে ‘না ভাব’। এই ভাবের শুন্যতাবোধেই আমাদের স্বভাব অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে, আমরা অবসাদে ভুগতে থাকি। এজন্য বস্তুবিশ্বের সেই অভাববোধ অনিবার্য। তাকে স্বাভাবিক ও সহজ করে নেওয়া প্রয়োজন। সহজানন্দ না জাগলে যে আমরা বিবেকানন্দে পৌঁছাতে পারব না, পাব না পরমান্দের সৌরভ, আসবে না জীবনানন্দের পরম পরশ। সীমাবদ্ধ বস্তুবিশ্বের অভাবকে কাটিয়ে ওঠার জন্য তো আমাদের মননবিশ্ব রয়েছে। সেখানে বিনে পয়সায় মননের মধুর যত খুশি আস্বাদন করা যায়। ভাবেরও অ-ভাব নেই, অভাবেরও নেই কোনো বালাই। অন্যদিকে আমাদের হাসির মধ্যে থাকে ভালো থাকার বিজ্ঞাপন। এজন্য সেই বিজ্ঞাপনী হাসি কৃত্রিমতায় ভরা। আমি জীবনের সহজ ও স্বাভাবিক প্রকৃতিতে বিশ্বাসী। কাজ বা দায়িত্ব সবেতেই আনন্দ খুঁজে পাওয়ার জন্যই তো সর্বদা প্রাণবন্ত থাকতে হবে। সেখানেই যে হাসির অফুরন্ত উৎস উপহার সাজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সন্দীপ : স্যার, আপনি যেখানেই কোনো অনুষ্ঠানে যান, তার খবর প্রকাশিত হয়। এটা কী করে সম্ভব হয়?
স্যার : সেটা সাংবাদিকেরা ভালো বলতে পারবেন। খবর হয় ঘটনার গুরুত্ব বুঝে, ব্যক্তিত্বের প্রভাবে আর পত্রিকার স্বার্থে। সেখানে নেতিবাচক খবরের গুরুত্বে ইতিবাচক লঘু হয়ে পড়ে। আবার মেঘের আড়ালে সূর্য দেখানোর প্রয়োজনে তার অস্তিত্ব আপনাতেই জায়গা করে নেয়। সেদিক থেকে ভালো খবরের আলোর পরশে সেসব খবর হয়ে থাকে বোধ হয়।
সুপ্রিয় : স্যার, আপনি প্রায় পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতির প্রশংসা করেন। আপনাকে কি পুরুলিয়ার সংস্কৃতি নতুন করে ভাবিয়েছে?
স্যার : অবশ্যই। দেখো সংস্কৃতির মধ্যে যাপিত জীবনের বিশেষ করে আমোদ-প্রমোদ তথা বিনোদনের ভূমিকা অপরিহার্য। সেখানে পুরুলিয়ায় লোকসংস্কৃতির সজীব অস্তিত্ব যেভাবে একালের ভোগবাদী সংস্কৃতির বহুমাত্রিক বিনোদনের মধ্যেও সচল সজীব রয়েছে, তা ভাবলে বিস্ময় জাগে। যেমন তার বৈচিত্র্য, তেমনই তার বিস্তৃতি। সেখানে আপনাতে আপনি তুষ্টের মধ্যে আভিজাত্যবোধ বর্তমান যা অন্য জেলাগুলিতে লক্ষ্য করা যায় না। আধুনিক বিনোদনের হাতছানিও তাকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। ছো, ঝুমুর, নাচনী, টুসু, ভাদু প্রভৃতি এযুগেও সমান সচল। অবশ্য তার মানে এই নয় যে, এসবই তার ইতিবাচক দিক। তার নেতিবাচকতাও বর্তমান।
সুপ্রিয় : স্যার নেতিবাচক দিকগুলি যদি একটু বলেন—
স্যার : সময়ের সঙ্গে সঙে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে মানুষের সংস্কৃতিচেতনা লাভ করে। সেখানে লোকসংস্কৃতিও অস্থিতিশীল। সেই লোকসংস্কৃতি এখন জনসংস্কৃতিতে আত্মগোপন করেছে। সেখানে রক্ষণশীল চেতনায় কোনো সংস্কৃতিতে বাঁচানো গেলেও তাতে প্রাণের সাড়া মেলে না। এজন্য মন ও মানের উৎকর্ষবোধে আমজনতার লোকসংস্কৃতির পাশে পরিশীলিত সমাজের নান্দনিক সংস্কৃতির বিস্তার লাভ করা একান্ত কাম্য। সেখানে ঝুমুর গানের পাশে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি বা আধুনিক গান জায়গা পাক, নাচনীর পাশে আধুনিক নাটক। তার জন্য প্রয়োজন প্রগতিশীল উদার দৃষ্টিভঙ্গি। আমি নিশ্চিত সেই সংস্কৃতি শুধু সময়ে অপেক্ষা।
সন্দীপ : স্যার, আমি একটি হাই স্কুলে পড়াই। ছাত্রছাত্রীদের নানাভাবে মানোন্নয়নের চেষ্টাও করি। আমি কীভাবে মানোন্নয়নকে আরও বড় জায়গায় নিয়ে যেতে পারি, এবিষয়ে যদি কিছু বলেন?
স্যার : আগে বুঝতে হবে কার মান উন্নয়ন হবে। শিক্ষার মান? সেটা তার তাত্বিক ও প্রয়োগের বিষয়। জীবনের মান? সেটা অনেকটাই নির্ভর করে আমি কীভাবে শেখাব, তার উপরে। যেমন হাতেকলমে শেখালাম বা নানাভাবে বিষয়টাকে চর্চা করলাম, তাতে ভালো করে শিক্ষা হবে না। এজন্য প্রথমেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষকের সম্পর্ক্কে পরিবর্তন করে শিক্ষার্থী-শিক্ষক করে তুলতে হবে। এজন্য ছাত্রদের মধ্যে যেমন সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে, শিক্ষককেও হতে আন্তরিক। ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ওদুটো একান্ত কাম্য। অন্যদিকে সেখানে ‘আপনি আচরি ধর্ম পররে শেখাও’ নীতি অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি যখন বিদ্যাসাগর বা স্বামীজির মতো হওয়ার কথা বলছি, ছাত্রছাত্রীর কাছে সহজবোধ্য হবে না। সেখানে তাঁরা মহতের দৃষ্টান্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেও কেন মহৎ, তা অস্পষ্ট থেকে যায়। এজন্য শিক্ষক তাঁর নিজের মধ্যেই সেই মহতের পরিচয়কে তুলে ধরতে সক্ষম হলে, তা সহজেই মহতের রোল মডেলটি সুবোধ্য হয়ে ওঠে। সেখানে শিক্ষকের চলন-বলন-কথনের পাশাপাশি তাঁর যাপনের মধ্য দিয়ে সেই মহত্ব প্রতিমায়িত হয়ে উঠলেই তা ছাত্রছাত্রীদের কাছে সবাকমূর্তি লাভ করে। শিক্ষায় ব্যাখ্যার চেয়ে উদাহরণের আবেদন বেশি। সেখানে আদর্শ শিক্ষক শুধু পথ দেখান না, নিজেও তার আদর্শপথিক। সেখানে ছাত্রের মানোন্নয়নের জন্য প্রথমেই শিক্ষকের মানোন্নয়ন একান্তভাবেই আবশ্যিক।
সুপ্রিয় : আপনার জীবনে পথপ্রদর্শক হিসাবে আপনি কার নাম বলবেন?
স্যার : সেভাবে কারও নাম বলা ঠিক হবে না। ছোটবেলায় সম্মানবোধ গড়ে উঠেছিল বাবাকে দেখে। তখন বাবার প্রতি মানুষের সম্মানবোধ আমাকে প্রভাবিত করেছিল। আমার বাবা ছিলেন এলোপ্যাথিক চিকিৎসক। হাতযশ ছিল অসাধারণ। আর ছিলেন প্রবল ব্যক্তিত্বশালী। অথচ তাঁকে বুঝে ওঠার আগেই তিনি আমার নয় বছরেই অদৃশ্য হয়ে যান। সেক্ষেত্রে কোনো একক ব্যক্তি নয়, অসংখ্য গুণী মানুষের প্রতিকূলতার মধ্য আনুকূল্য লাভের চরিতকথাই আমাকে পথ দেখিয়েছে। এছাড়া আমার জীবনের প্রতিকূলতাই আমাকে জীবনের পথ চিনতে সাহায্য করেছে। সব সময়ে যে চিনে উঠতে সমর্থ হয়েছি, তাও নয়। এই যেমন বাবা ছিলেন চিকিৎসক ডাক্তার। আমি ভেবেছিলাম আমি পিএইচডি স্বীকৃত ডক্টর হব যাতে বাবাকে ছাড়িয়ে যেতে পারি। ডক্টরেট করেও বাবাকে ছাড়ানো তো দূর্ অস্ত, তাঁকে ছুঁতেও পারিনি। তিনি যেভাবে মানুষের কাছে আপনজন হয়েছিলেন, তা আজও ভেবে পাই না। আজও আমি ডাক্তারগিদ্রো মানে ডাক্তারের ছেলে। আমি যেন ঐ নামেই তাঁদের কাছে পরিচিতি পেয়ে যাই। আমার বাবা যে ডক্টরেটের বাবা।

সুপ্রিয় : স্যার আপনি শ্রীকান্ত পাঠক ছদ্মনামেও লেখেন। এই ছদ্মনামটি কীভাবে এল?
স্যার : শিলিগুড়িতে একসময় ‘উত্তরভূমি’ বলে একটি মাসিক পত্রিকা বেরাত। বছরখানেকের সেটি বন্ধ হয়ে যায়। তাতে আমি নিয়মিত লেখা শুরু করেছিলাম। সেই সময় সম্পাদক আমাকে দিয়ে বই রিভিউ করাতে চাইলেন। এজন্য একই নামে সমালোচনা করার চেয়ে ছদ্মনাম ব্যবহারের প্রস্তাব দেন তিনি। সেখানেই ‘শ্রীকান্ত পাঠক’ উঠে আসে। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত যেমন সাধারণের মধ্যে অসাধারণ দিকগুলি খুঁজে ফিরেছিল, আমিও তেমনই সমালোচনার ক্ষেত্রে ভালো দিকগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিতে চেয়ে ‘শ্রীকান্ত’ নামটি ধারণ করেছিলাম। আর সমালোচক মানেই তো পাঠক। এজন্য শ্রীকান্তের পদবি পাঠক।
সুপ্রিয় : আপনি আপনার দিদিমার কথা নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন। তাঁর সম্পর্কে যদি কিছু বলেন—
স্যার : দিদিমা আমার শৈশবের মধুবন। তাঁর আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে আমার ছেলেবেলার গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে বর্ষার বর্ষণমুখর জীবনে শরতের নীল আকাশের হাতছানি এসেছিল, শীতার্ত জীবনে নেমেছিল বসন্তের সজীবতা। বালবিধবা মা যখন সংসারের দাঁড় মরীয়া হয়ে আগলে ছিল, দিদিমা তখন আমার জীবনতরীর পালে হাওয়া দিয়েছিলেন। নাই রাজ্যের দেশে তিনিই ছিলেন আমার আছের রানিমা।
সুপ্রিয় : আচ্ছা স্যার আপনার কাছে নারীত্বের স্বরূপটি কীরকম?
স্যার : আমার কাছে ‘নারীত্ব’-এর ব্যাপ্তি সুবিস্তৃত। তার প্রেয়সী-শ্রেয়সী থেকে মাতৃত্বের প্রকাশ নানাভাবেই আমাদের জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। অন্যদিকে সেই নারীত্ব শুধু গৃহিণীপনায় আটকে থাকায় তার পরিসর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এজন্য তার বিস্তার প্রয়োজন। সেখানে পুরুষের সঙ্গিনীর চেতনায় আর কতদিন তাকে বন্দি থাকতে হবে, তা ভাবলে অবাক লাগে। তার স্বয়ং সম্পূর্ণতা মানবসভ্যতার স্বার্থেই প্রয়োজন।
বৈদ্যনাথ : স্যার আপনি বলে থাকেন স্থানীক ভ্রমণের চেয়ে মানসিক ভ্রমণ শ্রেয়। সেখানে স্থানিক ভ্রমণ কতটা কার্যকারী মনে হয়?
স্যার : দেখো মানসিক ভ্রমণ একান্তভাবেই মনগত। বই পড়ে বা সিনেমা দেখে কিংবা কারও কাছে শুনি কল্পনার ডানায় ভর করে ভ্রমণের মধ্যে স্বপ্নের দেশে পাড়ি দিতে পারি। সেই মানসিক ভ্রমণের মধ্যে মনই আধার, মনই নিয়ন্ত্রক। মনে মনে ভ্রমণের মধ্যে অজানাকে জানা, অচেনাকে চেনার অতৃপ্ত বাসনা মেটানোর পরিসর নেই ঠিকই, কিন্তু তার আনন্দ উপভোগের পরিতৃপ্তিবোধ তীব্র আবেদন। সেখানে স্থানিক ভ্রমণের দেখার দৃষ্টিকে অন্তর্দৃষ্টিতে সুগভীর ও সুদূরপ্রসারী করে তোলে। এজন্য ভ্রমণ যেখানে শেষ হয়, সেখানেও মানসিক ভ্রমণের সূচনা হতে পারে। অবশ্য স্থানিক ভ্রমণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সোপান বেয়ে চেনা-জানার জগৎ শুধু বিস্তৃতি লাভ করে না, মননের পরিসরেরও বহুমাত্রিক বিস্তারের অবকাশ মেলে। তারপরেও মানসিক ভ্রমণের আভিজাত্যবোধ বর্তমান। বস্তুবিশ্ব যেখানে সীমাবদ্ধ, মননবিশ্ব সেখানে অপরিসীম। এজন্য স্থানিক ভ্রমণে অতৃপ্ত মনই কল্পনার ডানায় ভর করে অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করলে কথাই নাই। দেখার দৃষ্টিটাই তখন বদলে যাবে। জীবনানন্দের ভাষায় উঠে আসবে, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’। সেখানে যাত্রা যেমন উৎকর্ষবোধে অভিযানে সামিল হয়, ভ্রমণও তেমনই আভিজাত্যবোধে আবিষ্কারে মিলে যায়। তখন ‘শিশির কণায় মানিক ঘনায়, দুর্বাদলে দীপ জ্বলে’।
বৈদ্যনাথ : সেক্ষেত্রে বাস্তবের গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কি স্থানিক ভ্রমণের প্রয়োজন আছে?
স্যার : আসলে বিপুলা পৃথ্বীর প্রতি মানুষের আজন্ম কৌতূহল। অন্যদিকে সীমাবদ্ধ পরিসরেই আমাদের জীবন অতিবাহিত হয়। একঘেয়েমির মধ্যেই জীবন কাটে। সেখানে স্থানিক ভ্রমণের মধ্যে থাকে বিপুলা পৃথিবীর উদার হাতছানি। সীমা থেকে অসীমের আমন্ত্রণ। সেখানে ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ থেকে ‘দ্বারে দ্বারে মোর ঘর আছে’র আশ্রয় আন্তরিক হয়ে ওঠে। বাস্তবের গ্লানি থেকে মুক্তিতে তা সক্রিয় মনে হবে। আসলে মানুষের মধ্যেই রয়েছে, যাযাবর প্রবৃতি আর পর্যটকসত্তা। এজন্য পারিবারিক জীবনে তাতে টান পড়তেই ভ্রমণের সদিচ্ছা জেগে ওঠে। এজন্য বাস্তবের গ্লানি নয়, সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তিপিয়াসী মনের চলনে স্থানিক ভ্রমণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
বৈদ্যনাথ : তাহলে স্যার আপনার মতে কোন্টা উপকারী?
স্যার : দুটোই। আমি কালকূটের ‘অমৃতকুম্বের সন্ধানে’ বের হতে চাই, আবার ‘শাম্ব’-এর সান্নিধ্যও চাই।
সিদ্ধার্থ : স্যার আপনার খালি গলায় গান শোনার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। যদি একান্তে কোনো গান গাইতে বলা আপনাকে, আপনি কোন গান গাইবেন?
স্যার : দেখো গানের অভ্যাস নেই আমার। সেখানে অন্য পাঁচজন লোকের মতো আনন্দের প্রকাশে বা দুঃখের আকাশে আমার মুখে গান উঠে আসে ঠিকই, কিন্তু তাকে ঠিক গান বলা যায় না। তবে আমাকে গান বাছতে বললে রবি ঠাকুরের ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানটিই বেছে নেব। সেটি জীবনের উত্তরণকে অসাধারণ ভাবে ব্যক্ত করেছে।
সিদ্ধার্থ : স্যার আপনার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন আশুতোষ বর্মণ। তিনি চলে গেলেন। তাঁকে যদি স্বপ্নে দেখা পান, কী বলবেন?
স্যার : বলব, বড্ড ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে কেন?
স্যার আপনার কি স্বপ্ন আছে?
স্যার : অবশ্যই। আমার বাবা ছোটবেলায় বাল্যপাঠ বইটি মলাট দিয়ে তার উপরে আমার নাম লিখেছিলেন ‘শ্রী স্বপন কুমার মণ্ডল’। স্বপন নামটি আমার বড় মামার দেওয়া। বাবা তার কলবরে বৃদ্ধি করেই ক্ষান্ত হননি, শ্রীবৃদ্ধিও করেছেন। তারপর তিনি স্বপনকে রেখে না-ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন। সেদিক থেকে সেই স্বপনকে পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করাই আমার একমাত্র স্বপ্ন। কাজলের একক সৌন্দর্য নেই, অপরের চোখেই সে সুশোভিত। আমিও সেই স্বপ্নের কাজল হতে চাই।
প্রায় দুই’শতক ব্যাপী – লেখা হয়েছে। শতক না দশক হবে।
খুব সুন্দর।। ধন্যবাদ জানাই সবাইকে।
যথাযথ কথোপকথন । সাহিত্যের একটি ব্রাত্য ধারা প্রবন্ধপাঠ। অথচ বুদ্ধিদীপ্ত এই ধারাটি। বাঁধন থাকা অত্যন্ত জরুরী। স্যারের প্রবন্ধ গুলি পাঠ করে একদিকে সাহিত্য রস যেমন পাঠক পেয়ে যান তেমনি হদিশ পান নানা তথ্য ও তত্ত্বের। আমি স্যার ের অনেকগুলি প্রবন্ধ পড়েছি। প্রত্যেকটি প্রবন্ধ সাহিত্যরসে অনবদ্য। এমন একটি কথোপকথন সত্যিই খুশির জোয়ার এনে দেয়। সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। স্যারকে প্রণাম জানাচ্ছি।