প্রতি রবিবার বিকালে ঘাটের ধারে মন্দিরের পিছনে কয়েক জন ছেলে বসে আড্ডা মারে। চায়ের দোকানে বা মাচানে বসে লোকেরা যে ধরনের আড্ডা মারে সে রকম আড্ডা নয়; সাহিত্য আড্ডা। তারা এখানে স্বরচিত কবিতা ও গল্প পাঠ করে। আবার তারাই সেই লেখার সমালোচনা করে।
আজ অমরেন্দ্র তার লেখা পাঠ করবে। আড্ডায় এসে বসতেই অন্যরা তাই বলল, ‘অমরেন্দ্র দা, আজ কিন্তু আপনার পালা। মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। তবে আজ আমি কবিতা পাঠ করব না, একটা গল্প পাঠ করব।’
সবাই শুনে খুব খুশি,’ হ্যাঁ দাদা, আজ আপনি একটা গল্পই পাঠ করুন। অনেক দিন আপনি গল্প পাঠ করেন নি। আপনার গল্পের মাধুর্যই আলাদা। শুনতে খুব ভালো লাগে।’
‘রিয়েলি?’
‘হ্যাঁ, দাদা।’
অতএব অমরেন্দ্র গল্প পাঠ করার জন্য যখন প্রস্তুত হল ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল, কফি হাউসের সেই আড্ডাটা…. অমরেন্দ্র ফোনটা ধরল,’ হ্যালো!’
‘কে, অমরেন্দ্র দা বলছেন?’
‘হ্যাঁ, বলছি। আপনি কে বলছেন?’
‘আমি সবিতা বলছি, অমরেন্দ্র দা।’
এই সবিতা মেয়েটা হল অমরেন্দ্রর বোন কঙ্কনার বান্ধবী। কিছুদিন আগে সে কঙ্কনার সঙ্গে তাদের বাড়ি বেড়াতে এসেছিল। নতুন মেয়ে দেখে অমরেন্দ্র কঙ্কনাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কে রে কঙ্কনা, চিনতে পারলাম না।’
‘আমার বান্ধবী, নাম সবিতা।’
‘ও, আচ্ছা।’
তারপর সবিতাকে বলেছিল,’ আর সবিতা, এ হল আমার দাদা। নাম অমরেন্দ্র সরকার। খুব ভালো লেখে। দাদার লেখা পড়লে তুই— এত ভালো লেখে!
‘তাই নাকি?’ তারপর সবিতা অমরেন্দ্রকে নিজে জিজ্ঞেস করেছিল,’ কী লেখেন?’
অমরেন্দ্র কিছু না বললে কঙ্কনা বলেছিল,’ দাদা বলবে না, আমি বলছি। দাদা গল্প, কবিতা, উপন্যাস সব কিছুই লেখে এবং খুব ভালো লেখে।’
অমরেন্দ্র কঙ্কনাকে তখন বলেছিল, ‘সেই তখন থেকে তো খুব ভালো লেখে ভালো লেখে করছিস, তুই কি আমার লেখা পড়েছিস?’
‘পড়িনি তো এমনি বলছি?’
‘কোথায় পড়েছিস? মিথ্যা কথা বলার জায়গা পাস নে না!’
কঙ্কনা বলেছিল, ‘বিকাল বেলায় তুই যখন বাড়িতে থাকিস না তখনই পড়ি। কী সুন্দর লাগে পড়তে! তোর লেখা পড়ে মাঝে মাঝে আমার কী মনে হয় জানিস, তুই যদি আমার নিজের দাদা না হয়ে সবিতার দাদা হতিস, বা পাড়ার অন্য কেউ হতিস, তো আমি তোর প্রেমে পড়ে যেতাম। হ্যাঁ রে দাদা।’
অমরেন্দ্র চমকে উঠেছিল, ‘কী বললি!’
‘হ্যাঁ দাদা, আমি ঠিকই বলছি। তোর লেখায় যা আবেগ আর অনুভূতি রয়েছে!’
সবিতা চুপ করে তাদের দুই দাদা-বোনের কথা শুনছিল। আর মাঝে মাঝে অমরেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে দেখছিল।
অমরেন্দ্র সবিতাকে বলেছিল, ‘তুমি কঙ্কনার কথা একদম বিশ্বাস করবে না সবিতা, ও কী বলতে কী যে কখন বলে ফেলে তার ঠিক নেই। মাঝে মাঝে তাইতো আমরা ওকে ‘ক্ষেপী’ বলি। আমি মোটেও ভালো লিখতে পারিনা। তবে আমাদের একটা সাহিত্য আড্ডা বসে, সেই আড্ডায় অনেকেই খুব ভালো লেখে।’
সহাস্যে সবিতা বলেছিল, ‘আপনি যতই বলুন, আপনার কথা বিশ্বাস করব না। কঙ্কনার কথাই বিশ্বাস করব।’
‘তা তো করবেই। কারণ, তোমরা হলে চোরে চোরে মাসতুতো ভাই যে!’
সবিতা তার পাতলা ঠোঁটের মিষ্টি হাসি উপহার দিয়েছিল।…
দুই.
অমরেন্দ্র বলল, ‘বলো।’
সবিতা বলল, ‘ভালো আছেন?’
‘হ্যাঁ, ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?’
‘ভালো আছি।’
‘বেশ, কী খবর বলো তাহলে।’
সবিতা বলল, ‘গত রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। সেই স্বপ্নটা বলব বলেই আপনাকে—
‘বেশ, কী স্বপ্ন দেখেছ বলো, শুনি!’
সবিতা বলল, ‘আমি শিয়ালদহ স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় একটা লোক, দেখতে ছিপছিপে গড়ন। মাথায় বেশ লম্বা, গায়ের রং কৃষ্ণ বর্ণ, মুখে না কাটা কাঁচা পাকা দাড়ি, গায়ে ফুল শার্ট, সাদার উপর কালো দাগ টানা। আর পরনে নীল জিনস প্যান্ট, পা দুটো জড়ানো। আমার কাছে এসে বলল, ‘দারুণ খবর! একটা দারুণ খবর!’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী রকম দারুণ খবর?’
লোকটা তার পিঠের ব্যাগ থেকে একটা ম্যাগাজিন বের করে বলল, ‘এই ম্যাগাজিনে একটা উপন্যাস বেরিয়েছে। তরুণ লেখকের একটা উপন্যাস। বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে পাঠক মহলে বিরাট সাড়া পড়ে গেছে। গত পঞ্চাশ বছরে এত ভালো উপন্যাস কেউ লিখতে পারেন নি। এটাই হল, দারুণ খবর।’
‘তাই নাকি!’ আমি নড়ে দাঁড়ালাম।
‘হ্যাঁ।’
‘কী উপন্যাস?’
‘আলো-অন্ধকার।’
‘এই উপন্যাসের মধ্যে কী আছে?’
‘অনেক কিছু আছে। আমি আপনাকে সব গুছিয়ে বলতে পারছি না। তবে পড়লে বুঝতে পারবেন।’
‘ম্যাগাজিনটা একটু দেখি!’
‘না না, দেখানো যাবেনা। পুরনো হয়ে যাবে।’
‘না দেখালে ম্যাগাজিন কে কিনবে?’
‘কেনার মতো কত মানুষ আছে।’
‘আছে তো কেউ কিনছে না!’
‘ঠিক কিনবে। বিমান বন্দরে যখন চলে যাবো সব বিক্রি হয়ে যাবে। পয়সা অলা লোক ওখানে বেশি থাকে।’
‘ঠিক আছে। না দেখাবে লেখকের নাম তো বলবে?’
‘হ্যাঁ, তা বলব।’
‘তো বলো!’
‘লেখকের নাম অমরেন্দ্র সরকার।’
‘কী নাম বললে!’
‘অমরেন্দ্র সরকার।’
‘আচ্ছা?’
‘বলুন!’
‘তোমার কাছে লেখকের কোন ছবি আছে?’
‘থাকবে না আবার? আছে। দেখবেন নাকি?’
‘একটু দেখাও, দেখি!’
অমনি সে লেখকের ছবি বের করে দেখাল, ‘এই দেখুন!’
ছবিটা দেখে আমি তো অবাক, এ যে আপনার ছবি! ছবিতে কী সুন্দর করে আপনি হাসছেন! আর আপনার সুন্দর দাঁত গুলো কী সুন্দর ঝকঝক করছে!…. আমি লোকটাকে বললাম, ‘উনি আমার পরিচিত।’
‘পরিচিত! আপনার! হা-হা-হা-’ লোকটা হাসল।
‘হ্যাঁ গো, উনি আমার সত্যি পরিচিত। আমার বান্ধবীর দাদা।’
লোকটা শুনল না, ‘কী যা তা বলছেন! ইনি কেন আপনার বান্ধবীর দাদা হতে যাবেন? ইনি হলেন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক অমরেন্দ্র সরকার। যাঁর এখন অনেক দাম, অনেক নাম।…’
‘আমার বান্ধবীর দাদাও অমরেন্দ্র সরকার। তিনিও লেখালেখি করেন এবং খুব ভালো লেখেন।’
‘উনি আপনার বান্ধবীর দাদা অমরেন্দ্র সরকার। লেখালেখি করেন বলে উনি লেখক নন। আর ইনি হলেন লেখক অমরেন্দ্র সরকার। দু’টি মানুষ কি তাহলে এক হলেন?’
‘কিন্তু ছবিতে দেখে যে আমি স্পষ্ট চিনতে পারলাম। উনি আমার বান্ধবীর দাদা।’
বিরক্ত হয়ে লোকটা এবার একটা কষে ধমক মারল আমাকে, ‘থামুন তো, যত্ত সব!’
আমি বললাম, ‘একটা ম্যাগাজিন নেব, দাম বলো।’
‘দাম দু-হাজার টাকা লাগবে।’ লোকটা বলল।
‘কী! একটা ম্যাগাজিনের দাম দু-হাজার টাকা! কী যা তা বলছ!’ আমি চমকে উঠে বললাম।
‘আমি যা তা বলছি না ম্যাডাম, আমি ঠিকই বলছি।’
‘না, তুমি ঠিকই বলছ না।’
‘আমি ঠিকই বলছি, আপনার যদি মনে ধরে তো নেবেন, মনে না ধরে নেবেন না।’
‘কিন্তু তাই বলে একটা ম্যাগাজিনের দাম দু-হাজার টাকা? আমরা ম্যাগাজিন কিনে পড়ি না বুঝি!’
‘পড়েন না কখন বললাম?’
‘মুখে বলছ না ঠিকই, কিন্তু মনে মনে তো বলছ। যাইহোক, পাঁচশো টাকায় দেবে?’
লোকটা সরাসরি বলল, ‘না, দেব না।’
‘আর পঞ্চাশ টাকা ধরে দিচ্ছি! সাড়ে পাঁচশো টাকা দিচ্ছি!’
লোকটা এবারও বলল,’ হবেনা।’
‘হবে, দাও!’
লোকটা তখন, ‘কেন খামোখা বিরক্ত করছেন, বলুন তো! হবে কি হবেনা দেখে বুঝতে পারছেন না?’
‘না হলে কিছু করার নেই।’ আমি লোকটার কাছ থেকে সরে দাঁড়ালাম।
‘আপনার কিছু করার না থাকলে আমারই বা কী করার আছে!’ লোকটা ভিড়ে কোথায় হারিয়ে গেল। আমারও ঘুম ভেঙে গেল।’
তিন.
ফোনে অনেকটা সময় চলে গেল বলে অমরেন্দ্র আজ আর গল্প পাঠ করল না। গল্পের মতো করে সে শুধু সবিতার দেখা স্বপ্নটা বলল।
শুনে সবাই বলল, ‘দারুণ!’ তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘মেয়েটা আপনার কে হয়, দাদা?’
‘আমার কেউ হয় না, তবে আমার বোনের বান্ধবী হয়।’ অমরেন্দ্র বলল।
‘মেয়েটা দেখতে কেমন?’
‘বেশ সুন্দরী। টিকালো নাক, গোল গাল…গায়ের রং দুধে আলতা।’
‘আইবড় তো?’
‘হ্যাঁ, আইবড়।’
‘তাহলে আপনি এক কাজ করুন দাদা, মেয়েটাকে আপনি ধরে বেঁধে ফেলুন! যাতে সে সারাজীবন আপনার কাছে বাঁধা থাকে।…’
রাত্রি ন-টার পরে অমরেন্দ্র আজ মেয়েটাকে এই জন্যই ফোন করবে। এহেন স্বপ্ন দেখে যে মেয়ে তাকে যে ধরে বেঁধে ফেলতেই হবে। তাকে যে ধরে….
আব্দুস সাত্তার বিশ্বাস, সারাংপুর খাসপাড়া, ডোমকল, মুর্শিদাবাদ।