স্বাস্থ্যসাথি নিয়ে রাজনৈতিক স্তরে খুব আলোচনা চলছে। হওয়ারই কথা। মধ্যবিত্ত-সহ রাজ্যের সব মানুষকে নিয়ে অতীতে কোনও এত বড় সরকারি প্রকল্প হয়নি। অনেকে স্বাস্থ্যসাথির সঙ্গে আয়ুষ্মাণ ভারত প্রকল্পের তুলনা করছেন। বলা হয় আয়ুষ্মাণ দেশের ৪০ শতাংশ মানুষের জন্য। কিন্তু ওয়েবসাইটে গিয়ে খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় কার্যত সংখ্যাটা আরও অনেক কম হবে। স্বাস্থ্যসাথিতে যেমন মাঝে মধ্যে রিফিউজালের খবর পাওয়া যাচ্ছে (যদিও ১০ কোটি বেনিফিসিয়ারির সংখ্যার বিচারে অভিযোগ খুবই নগন্য), নেট-এ সার্চ দিয়ে দেখুন, আয়ুষ্মাণেও এমন অভিযোগ বহু। আমাদের মতো দেশে এই ধরনের প্রকল্প চালু করতে গেলে, কিছুদিন এসব হবে। যতদিন না ব্যবস্থাটা একটা স্বাভাবিক স্থিতিতে পৌঁছয়। সবার জন্য স্বাস্থ্য, পৃথিবীতে খুব কম দেশে এমন প্রকল্প আছে। নীতিগত ভাবে বলাই যায়, সরকার যদি সবার জন্য রাস্তা তৈরি করতে পারে, সবাইকে পানীয় জল দিতে পারে, সবাইকে পাঠ্যবই দিতে পারে, স্বাস্থ্যও দেওয়া সম্ভব। প্রয়োজন মানসিকতার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা যুগান্তকারী প্রকল্পে হাত দিয়েছেন। সফল হলে ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে। এখানেই প্রশ্ন, যদি সবার জন্য স্বাস্থ্য প্রল্প ভাবা যায়, তবে কেন সবার জন্য ‘ন্যূনতম আয়’ নিশ্চিত করার কথা ভাবা যাবে না? বিশেষ করে যখন এই ভাবনার সঙ্গে বাংলার একটা সম্পর্ক আছে। কী ভাবে? বলি তাহলে সেই ইতিহাস।
একটি পিছিয়ে যাওয়া যাক। ১৯৪২ সালে জন্ম কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণার। পৃথিবীতে প্রথম এই রাজনৈতিক আদর্শ যার চিন্তার ফসল, সেই মানুষটি, ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ, উইলিয়াম হেনরি বেভরেজ-এর জন্ম স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতের অবিভক্ত বাংলায়। ১৮৭৯ সালের ৫ মার্চ। এখানেই পৃথিবীর এই মানবিক ভাবনার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক।
পরে উইলিয়াম হেনরি বেভরেজ দীর্ঘ সময়ের জন্য লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের ডিরেক্টর পদে ছিলেন। তার পর প্রায় দেড়শো বছর কেটে গেছে। কিন্তু তাঁর সেই ভাবনাটা হারিয়ে যায়নি। ক্রমাগত সমৃদ্ধ হয়েছে। তারই নতুন রূপ, ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ নীতি।
পোপ ফ্র্যান্সিস, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকেরবার্গ, ইয়োরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট লুই গুইনডস, তিনজনই একমত, যে কোভিড-১৯-এর দুর্নিবার বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে এখনই উপযুক্ত সময়, ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ নীতি রূপায়ণের। ইংরেজিতে কথাটা বেশ পরিচিত অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মীদের কাছে। বাংলা করলে বলা যায়, ‘সবার জন্য ন্যূনতম আয়’। সেটা কী? সেটা হল, যে নাগরিকরা কাজ করে আয় করতে পারেন না, তাঁরা যাতে রোজগারহীন অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য না হন তার একটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। অর্থাৎ রোজগারহীন সব নাগরিকের জন্য একটা নির্দিষ্ট আয় নিশ্চিত করা। এর ফলে রোজগারহীনদের চার বেলা খাওয়া, ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজের পড়া, চিকিৎসা এবং সভ্য-ভদ্র জীবন যাপনের জন্য ন্যূনতম যেটুকু টাকা দরকার, সেটুকু অর্থ সরকারের থেকে তাঁরা অধিকার হিসেবে পাবেন। সরকারের থেকে পাওয়া ওই টাকা তারা বাজারে খরচ করবেন। তাতে চাহিদা বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে জোগানের উপর। বাড়বে উৎপাদন। উৎপাদন বাড়লে লোকেরা কাজ পাবে, মজুরি নিয়ে বাড়ি ফিরবে। উৎপাদনের এবং অর্থনীতির চাকা ঘুরতে থাকবে।
এই মুহূর্তে দেশে প্রায় ৮১ কোটি মানুষ রেশন পান। এছাড়াও সরকারের বেশ কিছু কল্যাণপ্রকল্প রয়েছে। তা সে ১০০ দিনের কাজই হোক অথবা বিভিন্ন পরিষেবায় ভর্তুকি। সব যোগ করে যে টাকাটা দাঁড়াবে তার সঙ্গে আরও কত অর্থ যোগ করতে হবে সকলের জন্য ন্যূনতম রোজগার নিশ্চিত করতে, সে হিসেব অর্থনীতিবিদেরা করবেন। সরকারকে নিতে হবে নীতিগত সিদ্ধান্ত। করোনায় ধাক্কায় অচল অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশে দেশে বেশ গুরুত্ব দিয়ে এই ভাবনা শুরু হয়েছে। হালকা ভাবে হলেও ভারতেও এই নিয়ে আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে। এই সিদ্ধান্ত সরকারি স্তরে বা রাজনৈতিক স্তরেও হতে পারে, আবার গণ-আন্দোলন থেকে ওঠা দাবিতেও সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কোন পথে হবে, বা আদৌ হবে কি না, তা আমরা জানি না। আমরা শুধু প্রশ্ন রাখছি, দুনিয়ায় দেশে দেশে এই নিয়ে চর্চা যখন চলছে, আমরা কি শুধু মুখ বন্ধ করেই থাকব? না আমাদেরও এই নিয়ে কিছু বলার আছে? এই প্রশ্নটাই আমরা আপাতত রাখছি পাঠকের সামনে।
করোনার ধাক্কায় ভারতের কাজের জগতের ছবিটা খুবই ঝাপসা। জিডিপি সঙ্কুচিত ভয়াবহ ভাবে। বেকারি আকাশ ছোঁয়া। কর্মহীন কোটো কোটি। ভারত একা নয়। বিপন্ন দুনিয়ার সব দেশই কম-বেশী। ভারত গরিব দেশ বলে হয়তো তার বিপন্নতা বেশি। আর এই বিপন্ন পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তার নীতি নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছে নতুন করে।
১৯৪২ সালে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম বেভরেজ তার একটি রিপোর্টে প্রথম বলেন রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। রাষ্ট্রকে কল্যাণকামী হতে হবে। তার ফলে অর্থনীতিতে বৃদ্ধি আসবে। যুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটিশ সরকার সেই নীতি প্রয়োগ করে, এবং সারা পৃথিবীর সামনে এক নতুন রাজনীতি এবং অর্থনীতি তুলে ধরে। যার মূল কথা ছিল, দেশের সমস্ত নাগরিক যারা কোনও না কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত, তারা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ট্যাক্সের মাধ্যমে বা অন্য কোনও সূত্র মারফত রাষ্ট্রকে দেবে। আর বিনিময়র রাষ্ট্র দেশের সব বেকার, অসুস্থ, অবসরপ্রাপ্ত, কর্মহীন-বিধবাদের আর্থিক দায় গ্রহণ করবে। যা কল্যাণকামী রাষ্ট্রের সারমর্ম। বেভরেজ মনে করতেন দারিদ্র এবং আর্থিক অনিশ্য়তা থাকলে বাজার অর্থনীতি এবং ধনতন্ত্র টিকবে না। আর ধনতন্ত্র বা ক্যাপিটালইজম দারিদ্র এবং আর্থিক অনিশ্য়তা দূর করতে পারবে না। তার জন্য চাই রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ।
‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ নীতি ফিনল্যান্ড কয়েক বছর আগেই গ্রহণ করেছে। করোনা বিধ্বস্ত স্পেন জানিয়ে দিয়েছে তারা এই পথে হাঁটা শুরু করেছে, এবং করোনা সমস্যা মিটে গেলেও তারা এই নীতির সঙ্গে থাকবে। করোনা বিধ্বস্ত আরেকটি ইয়োরোপীয় দেশ ইটালি এই নীতি অনুসরণের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। জার্মানিতে সাড়ে চার লক্ষ নাগরিকের সই করা আবেদন পত্র জমা পড়েছে সরকারের কাছে ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ নীতি চালু করার দাবিতে। ফ্রান্সে ২০১৭-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সমাজবাদী প্রার্থী এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তিনি পরাজিত হন। কিন্তু করোনার কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে ফের বিষয়টি তিনি সামনে এনেছেন। ‘দ্য স্ট্রেংথ অফ ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ এই শিরোনামে ফ্রান্সের ‘লা মদ’ সংবাদপত্রে কিছু দিন আগে তাঁর প্রকাশিত নিবন্ধ বেশ আলোরনও ফেলেছে। তাঁর মতে, এই নীতিই হচ্ছে করোনার প্রকৃত সামাজিক প্রতিষেধক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর আগুন থেকে একদা ফিনিক্স পাখির মতো উঠে এসেছিল রক্তপাতহীন বিপ্লবের মতো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ভাবনা। করোনার বিপর্যয়ের মধ্যেই শোনা যাচ্ছে ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’-এর কথা। এই নীতি রূপায়ণ হোক বা না হোক, এই কথা যে সমাজ থেকে উঠে আসছে তা একটা জিনিসই প্রমাণ করে, সেটা হল, গণতান্ত্রিক মানুষ অসাম্যের বিরুদ্ধে। প্রমাণ করে, ভ্রাতৃত্ব, শান্তি, সাম্যের দাবিতে ফরাসি বিপ্লব থেকে মানুষের যে পথ হাঁটার শুরু, তা এখনও শেষ হয়নি। এবং ভুলে যাবেন না, পরিযায়ী শ্রমিকরা কয়েক মাস আগেই বাড়ি ফেরা জন্য যে দীর্ঘ পথ হাঁটলেন, সেই পথ হাঁটাও তার-ই অংশ।
Very good article and the views expressed by Shri Moitra is a matter of great public importance. Very innovative idea.
শুধু বাংলা নয়।সারা দেশের জন্য এটা করা উচিৎ। বাংলায় আরম্ভ হলে ভারতেও শুরু করতে বাধ্য হবে এমন একটা প্রকল্প শুরু করার জন্য।নিঃসন্দেহে এতদিনে আমাদের দেশে এটা করে দেওয়া দরকার ছিল।আজ সত্তর বছর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ও কেনো দেশের লোক না খেয়েবিনা চিকিৎসায় মরবে।আর কিছু লোক শুধু ক্রিম খাবে।তাদের tax এর টাকা সরকার এ ভাবে দেশে বণ্টন করুক।কেউ যেনো বিনা চিকিৎসায় নাখেয়ে না মরে। সবার জন্য মিনিমাম সব ব্যবস্থা খাদ্য, কাপড়, ঘর,স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সরকারকে দিতে হবে।বিনিময়ে সরকার দেশের লোকের কর্মভার ও নিয়ে নিক।কোথায় তাদের কাজ করাতে হবে এদের শিক্ষা অনুসারে কাজের দায়িত্ব ও দিক।আগামী দিনে এটাই হোক সরকারের প্রধান কাজ।