এই বাংলার জেলায় জেলায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য জাগ্রত মন্দির। আজকের প্রচ্ছদে থাকবে বাংলার তাঁত-শিল্পের অন্যতম পীঠস্থান হুগলী জেলার দামোদর ও রননদীর মধ্যবর্তী রাজবলহাটের প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো এক বিখ্যাত শ্বেত কালিকা দেবী — মা রাজবল্লভী মন্দির প্রতিষ্ঠার ঘটনা।
সেই আমলে রাজবলহাটে একটি প্রসিদ্ধ ছোট বন্দর ছিল যা দিয়ে ভারতের বিভিন্ন বাজারে আমদানি রপ্তানি হতো। অতীতে ভুরশুট রাজ্যের রাজধানী ছিল এই প্রাচীন জনপদ রাজবলহাট-হাওড়া ও হুগলি জেলা নিয়ে গঠিত একটি প্রাচীন মধ্যযুগীয় রাজ্য। ভুরশুট শব্দটি এসেছে ভুরিশ্রেষ্ট শব্দ থেকে যার অর্থ বহু বণিকের বসতি।
রাজবলহাট নিয়ে একটি বিখ্যাত প্রবাদও আছে — “চার চক, চৌদ্দ পাড়া ও তিন ঘাট এই নিয়ে হয় রাজবলহাট”। কথাটির অর্থ হল চার চক বলতে দফর চক, সুখর চক, বৃন্দাবনচক আর বদুর চক অর্থাৎ চারটি ক্রসিং; চোদ্দোপাড়া বলতে নন্দীপাড়া, দেপাড়া, মনসাপাড়া, শিলবাটি, ভড়পাড়া, উত্তরপাড়া, দিঘির ঘাট, কুমোর পাড়া, বাঁড়ুজ্যে পাড়া, দাস পাড়া, কুঁড় পাড়া, নস্কর ডাঙা, সানা পাড়া ও পান পাড়া — এই ১৪ টি স্থানীয় পাড়া আর ঘাট বলতে দীঘির ঘাট, মায়ের ঘাট ও বাবুর ঘাট অর্থাৎ তিনটি স্নানের অঞ্চল।
ত্রয়োদশ শতকে সদানন্দ রায় এই নদী বিধৌত জলাকীর্ণ এলাকাকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র করে রাজপুরের উত্থান ঘটান এবং গড়ে তোলেন এক বিশাল হাট।
রাজবল্লভী দেবীর আবির্ভাবের একটি কাহিনী আছে।
১১৯২ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে মহাম্মদ ঘোরীর রাজত্বকাল। তৎকালীন ভুরশুট পরগণায় পাল সাম্রাজ্যের পর এখানে ধীবর রাজবংশের রাজত্ব ছিল। এই রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন শনিভাঙ্গর। গড় ভবানীপুরের রাজা চতুরানন্দ নিয়োগী ধীবর রাজা শনিভাঙ্গরকে পরাজিত করে ভুরশুট দখল করেন। চল্লিশ বছর রাজত্ব করার পর চতুরানন্দ তাঁর জামাতা রাজা সদানন্দ রায়কে সিংহাসনে অভিষিক্ত করেন।

একদিন জঙ্গলাকীর্ণ এক অঞ্চলে শিকারে গিয়ে রাজা সদানন্দর মনে প্রাণী হত্যা করার পাপের অনুশোচনার জন্ম হয়। তার শিকার করা পশুদের সামনে বিষন্ন চিত্তে দাঁড়িয়ে আছেন ভাবছেন তিনি এতই নরাধম যে ব্রাহ্মণ কুলে জন্মগ্রহণ করেও শুধুই রাজরক্ষায় নিজেকে আবদ্ধ রেখেছেন। সূর্য তখন অস্তগামী, দামোদরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজা হঠাৎই দেখলেন রুদ্রমালা পড়ে এক ব্রাহ্মণ ধ্যানমগ্ন অবস্থায় পদ্মাসনে বসে আছেন। রাজা তার কাছে গিয়ে প্রণাম করলেন, করে তাকে তার মনের দ্বন্দ্বের কথা জানালেন। তার উপদেশেই রাজা সদানন্দ শিব সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন। সেই সাধনাকালেই মহামায়া দেবী ষোড়শী রমণীমূর্তি রূপে দেখা দেন। আদেশ করেন এই জায়গাতেই যেন তার মূর্তি প্রতিষ্ঠা ও পুজোর ব্যবস্থা করা হয়। এর পরেই সাধক সদানন্দ বরাভয়দায়িনী, নৃমুন্ডমালিনী, শ্বেতকালিকা দেবী রাজবল্লভী মায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। রাজার দ্বারা প্রতিষ্ঠা করা এই নগরের নাম হয় রাজপুর আর দেবীর নাম রাজবল্লভী।
তিনি রাজবল্লভীর স্বপ্ন দেশে মন্দির তৈরি করেছিলেন তাই রাজবল্লভীর মায়ের নাম হাটের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজবল্লভী হাট পরে তা হয়ে ওঠে রাজবলহাট। এই মন্দিরের সংস্কার বেশ কয়েকবার করা হয়েছে ফলে প্রাচীনত্তের কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না বর্তমানে। রাজবল্লভী দেবী সাদা কালি নামেও পরিচিত। তিনি দুর্গা কালী এবং সরস্বতী মিশ্ররূপ। মন্দিরের পাশে পাল সেন যুগের নির্মিত একটি বিষ্ণুমূর্তি আছে। মন্দিরের প্রবেশ করলেই নাট মন্দির তারপরেই মায়ের মন্দির। এছাড়াও রয়েছে একটি দুয়ার বিশিষ্ট আটচালা তিনটি শিবের মন্দির, একটি ষড়ভুজাকৃতি বানেশ্বর মহাদেবের মন্দির।
দেবী মূর্তির প্রতিষ্ঠাকাল ১২৪২ খ্রিষ্টাব্দ ধরা যেতে পারে। প্রতি ১২ থেকে ১৪ বছর অন্তর দেবীর নবকলেবর হয়। গঙ্গা মাটি ও গঙ্গাজল দিয়ে প্রায় ছ-ফুট উচ্চতার এই মূর্তি তৈরি হয়। সেই দেবী মূর্তিকে বৈশাখ মাসে শুভ অক্ষয় তৃতীয়ার দিন প্রতিষ্ঠা করা হয়। যে কারণে অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ভোরবেলা মায়ের বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
দেবী মূর্তিটি বাম পা বিরুপাক্ষ শিবের মাথার ওপর এবং ডান পা বিশ্রাম নিচ্ছে মহাকাল ভৈরবের বুকে। বাম হাতে তালুতে আছে একটি সিঁদুরের পাত্র আর ডান হাতে দেখা যাচ্ছে ছুড়িকা। কোমরের ছোট ছোট কাটা হাতের মালা যা দৃশ্যমান নয় কারণ দেবী বস্ত্র (১৪ হাত শাড়ি) পরিহিতা। গলায় নরমুন্ড মালা। বিভিন্ন শহর ও গ্রাম থেকে আসা ভক্তরা দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসে।
মন্দিরের দ্বার খোলা হয় সকাল সাতটায় পুজো শুরু হয় ১১টা থেকে দুপুর দেড়টায় ভোগ নিবেদন ভাত ডাল, ঘন্ট (সবরকম সবজি দিয়ে তরকারি, তাতে দেয়া হয় কুচো চিংড়ি), তেঁতুল দিয়ে মাছের অম্বল (যা কিনা মা খেতে ভালোবাসে) এবং পায়েস। চাইলে দর্শনার্থীরাও এই ভোগ পেতে পারেন কূপণ কাটতে হবে তার জন্য।

এরপর সন্ধ্যা আরতি সাতটায়। আরতি শেষে মাকে নিবেদন করা হয় লুচি, সন্দেশ ও ছানা। সবশেষে মাকে তামাক সেজে গিয়ে দরজা বন্ধ করা হয় রাজবল্লভী মাকে প্রায় সারাদিন পুজো দেওয়া হয়।
এখানে দুর্গাপুজো মহাসমারোহে পালন করা হয়। পুরনো রীতি মেনে নবমীর দিন হয় ছাগবলি ও মহিষ বলি হয়। ঐদিন মায়ের অন্ন ভোগ হয় না তার বদলে ছাতু ভোগ নিবেদন করা হয়। চৈত্র সংক্রান্তির দিনও অন্ন ভোগের পরিবর্তে চিঁড়ে ভোগ নিবেদন করা হয়।
রাজবল্লভী মায়ের মন্দির পরিচালনায় জন্য একটি কমিটি আছে তারা মায়ের সারা বছরের পূজোর খরচ চালানোর ব্যবস্থা নিজেরাই করে রেখেছেন। মায়ের নামে একটি বড় দীঘি এবং বেশ কয়েকটি পুকুর আছে, বেশ কয়েক বিঘা জমি। মায়ের নামাঙ্কিত কিছু জমিতে কিছু দোকান ঘর ভাড়া দেয়া আছে। এছাড়াও অগণিত ভক্তের এবং বিশেষ করে গ্রামবাসীদের সক্রিয় সহযোগিতা রয়েছে। এইসব মিলিয়ে যা আয় হয় তাদিয়ে মায়ের সেবা হয়। এছাড়া কারুর বাড়িতে বা জমিতে প্রথম যে ফলনটি হয় তা রাজবল্লভী মাকে উৎসর্গ করেন, এমনকি নিজের পুকুরের মাছটিও মাকে ভালোবেসে ভক্তরা উৎসর্গ করেন। বছরের পূজোর ভাগ কয়েকটি পালা করে চলে, যখন যার পালা তখন তিনি সব ব্যবস্থা করে থাকেন।
বহু গ্রন্থে রাজবলহাটকে শাক্তপীঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আজও কালী পূজোর সময় রীতিনীতিতে নানান তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ দেখা যায়। শ্বেতকালীর দর্শন পেতে ঘুরে আসতে পারেন হাওড়া-তারকেশ্বর রেলপথে হরিপাল স্টেশন থেকে ট্রেকার বা বাসে আধ ঘন্টার দূরত্বে রাজবল্লভী মায়ের মন্দিরে।
বাহ! কাছেইতো। অবশ্যই যাবো। দারুণ লেখা।
থ্যাঙ্ক ইউ ????
আপনি রানী বলেছেন। এটা কোথায় বুঝলাম না।একটু জানাবেন
আপনি রণ নদী বলেছেন। এটা কোথায়?