সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের নিঃশব্দ প্রয়াণ ঘটে গেছে গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর। হ্যাঁ, নিঃশব্দ প্রয়াণই বলব। আমাদের ভিতরে এমন একজন মাস্টার আর্টিস্ট বেঁচে ছিলেন, এমন একজন সুপণ্ডিত লেখক বেঁচেছিলেন, আমরা তাঁর প্রয়াণে নীরবতা পালন করলাম। আমরা অশ্রুপাত করলাম না। তাঁকে নিয়ে যে কথাবার্তা হতে পারত তা হয়নি। তবে একটি কথা সত্য, ধীরে ধীরে তা হচ্ছে। বাঙালি যতটা বিস্মৃতপ্রবণ ভেবেছিলাম ততটা নয়। বাঙালি হুল্লোড় ভালবাসে ভেবেছি, তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। এখানে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজকে নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর একজন বড় লেখক যিনি খুব পপুলার নন, যাঁকে দেখলে লোকে সিনেমার নায়ক দেখার মতো করে হৈ হৈ শুরু করে না, বরং চেনেই না বলা যায়, যিনি বেঁচে থাকেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শিক্ষকের মতো। সিরাজ সেই ভাবেই বেঁচে থাকবেন বলে মনে হয়। আমি সিরাজের অনুরাগী। আমি সিরাজের গল্প উপন্যাস পড়েছি কিছুটা শিক্ষার্থীর মতো। যেমন পড়েছি ৫০-এর দশকের মহাশ্বেতা, দেবেশ রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে। যেমন পড়েছি বিভূতি তারাশঙ্কর মানিক সতীনাথকে।
আমি সিরাজের মৃত্যুর পর বহরমপুর গিয়ে ওঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা সৈয়দ হাসমত জালালের সঙ্গে তাঁদের পৈতৃক ভিটে কান্দির আগে খোসবাসপুর গ্রামে গিয়েছিলাম, দেখে এসেছি মাটির নীচে শায়িত আমার প্রিয় লেখককে। ছুঁয়ে এসেছি কবরের মাটি। তাঁর হিজলকে অনুভব করতে চেয়েছি দ্বারকা নদীর ধারে গিয়ে। তিনি ছিলেন যে মাটির মানুষ, সেই মাটিতে মিশে গিয়েছেন। সে ছিল এক আশ্চয অনুভূতি। সেই যাত্রা আমার মনে থাকবে। আমার মনে আছে অল্প বয়সে দেখা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণ, রোগ জর্জরিত শ্যামলের প্রয়াণ। আমার মনে থাকবেবাড়ির পেছনে নিমগাছটির নীচে সিরাজের অন্তিম শয়ান। তাঁদের পৈতৃক ভিটেয় তাঁর সুপণ্ডিত পিতার কবর। শুনেছি তাঁর পিতার পুস্তক সংগ্রহ ছিল সামান্য। আমি তীর্থ দর্শনের মতো দেখে এসেছি সব। কিন্তু আমি দেখিনি বুঢ়া পীরের দরগা তলা বা কালুডিহি, বা সেই প্রাচীন পথ যে পথে যাত্রা করেছিলেন পীর সায়েব, সফিউদ্দিনের আব্বাহুজুর। সেই হিজলের বন, নদীর চড়া, অনেক গো-গাড়ির এক সঙ্গে যাত্রা। কত কিছুই না দেখিনি বলছি বটে, কিন্তু সবই সত্য নয়, আমাকে দেখিয়েছেন সিরাজ মুদ্রিত অক্ষরে অক্ষরে।
সিরাজকে আমি কবে প্রথম পড়েছি তা আর স্মরণে নেই। আলাপ হয়েছিল তাঁর কর্মস্থল আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসে লেখক রমাপদ চৌধুরীর ঘরে। তিনি বোধ হয় সদ্য আমেরিকা থেকে ফিরেছেন। আপ্লুত হয়েছিলাম তাঁকে দেখে, কথা বলতে পেরে। তখন আমি তাঁকে পড়ে ফেলেছি কিছুটা। গোঘ্ন পড়েছি, পুষ্পবনে হত্যাকান্ড, জাতীয় মহাসড়ক, বুঢ়া পীরের দরগা তলায়, উড়োচিঠি, এমনি কত সব গল্প। হ্যাঁ, হয়ত আমার ভুল হতে পারে। কোনো গল্প হয়ত পরে পড়েছি, কত দিন হয়ে গেল তারপর। পড়েছিলাম তৃণভূমি। আমার মনে হয়েছে সিরাজ বহন করেছেন তারাশঙ্করের প্রকৃত উত্তরাধিকার। কেমন সেই উত্তরাধিকার ? সিরাজ কি তারাশঙ্করের সৃজনকে অনুসরণ করেছেন ? তাঁকে পড়লে কি তারাশঙ্করের কথা মনে পড়ে ? এক বিন্দুও নয়। তাঁর লেখায় ছিল না তারাশঙ্করের কোনো ছায়া, বরং আমি অন্য লেখকের লেখায় তা দেখেছি, মহাশক্তিধর সেই লেখকেরআরম্ভে তো নিশ্চয়। আমি বলতে চাইছি অন্য কথা। বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্করই প্রথম অন্ত্যজ মানুষকে নিয়ে আসেন গল্প উপন্যাসের প্রধান চরিত্র করে। তাঁর আগে আমাদের গল্প, উপন্যাস মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত বাঙালি আর জমিদার, ভূসম্পত্তি্মাণ মানুষের কথা বলেছে। সে বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথকে, শরতচন্দ্রের কথা মনে রেখেও বলা যায়। শরতচন্দ্রের মহেশ বা অভাগীর স্বর্গ গল্পব্যতীত আর তেমন ভাবে অন্ত্যজ মানুষ কই। শ্রীকান্ত উপন্যাসের কিছু অংশের কথা বলা যেতে পারে অবশ্য। বিভূতিভূষণে ছিল হতদরিদ্র ব্রাহ্মণের কথা, অলস পরজীবী গ্রামের নিম্নবিত্তের কথা, আর ছিল অব্রাহ্মণের উত্থান ( ইছামতী )। হ্যাঁ, বিভূতিভূষণের গল্পে আছে খুব সাধারণ, অন্ত্যজ মানুষের উপস্থিতি। কিন্তু এত বিপুল হয়ে তা নয়। দরিদ্র ব্রাহ্মণ, দরিদ্র গ্রামের মানুষই ছিল প্রধান উপজীব্য। তা আমাদের সাহিত্যকে নিশ্চিত দিয়েছে নতুন মাত্রা। কিন্তু আমাদের গল্প উপন্যাসে অন্ত্যজ মানুষের কথা সেইভাবে ছিল না। এল তারাশঙ্কর থেকে। সেই হাঁসুলিবাঁকের কাহার সম্প্রদায়ে তার প্রকৃত আরম্ভ, তারপর অসংখ্য গল্প, আরো সব উপন্যাসে। সেই উত্তরাধিকার নিয়ে সিরাজ বীরভুমের সীমান্তবর্তী মুর্শিদাবাদের হিজল অঞ্চলের দরিদ্র, অন্ত্যজ হিন্দু মুসলমানকে নিয়ে এলেন তাঁর গল্পে আর উপন্যাসে।
গত শতকের ৫০-এর দশকে যে লেখকদের আবির্ভাব, তাঁদের ভিতরে সিরাজ, শ্যামল, মহাশ্বেতার লেখায় অন্ত্যজ মানুষ এসেছে তার রক্ত মাংস নিয়ে। আর সিরাজ তার ভিতরে আলাদা করে নিলেন নিজেকে অন্ত্যজ বাঙালি মুসলমানকে আমাদের সাহিত্যে নিয়ে এসে। হ্যাঁ, স্বাধীনতার পরে এই বাংলায় সিরাজই প্রথম অর্গল খুলে দিলেন। তার আগে সেইভাবে কিছু ছিল না। দেশভাগের পর ওপার বাংলায় লেখা হয়েছে, বাঙালি মুসলমান তার আত্মপরিচয় লিখেছে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আবু ইসহাক মাহমুদুল হক থেকে পঞ্চাশের দশকের হাসান আজিজুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসে। এই বাংলায় আরম্ভ করলেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। আমাদের বাংলা ভাষা সাহিত্য মূলত হিন্দু অভিজাত গোত্রের মানুষের হাতেই ছিল। শিক্ষাদীক্ষার অধিকারী ছিলেন তাঁরা। ফলত বাংলা গল্প উপন্যাসে ছিল না প্রতিবেশি মুসলমানের তেমন উপস্থিতি। মহেশ গল্পে গফুর জোলার কথা বলতে পারি, শ্রীকান্ত উপন্যাসের কিছু অংশ, ৪০-এর দশকের অচিন্ত্য সেনগুপ্তের গল্পে। হ্যাঁ, মানিকবাবুর পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসের হোসেন মিঞাকে তো আমরা মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি মনে করব না। মাস্টার আর্টিস্টের সে ছিল এক রূপক নির্মাণ। উপনিবেশ গড়ছিল হোসেন মিঞা ময়না দ্বীপে। ঔপনিবেশিকের কোনো ধর্ম নেই।
আমরা সে দীনতা থেকে মুক্ত হয়েছি সিরাজের লেখা পড়ে। সাহিত্যি তো আমাকে দেশ চেনায়, কাল চেনায়, চেনায় মানুষ। আমাদের সাহিত্যে ( এপারের সাহিত্যে ) আমরা তেমন ভাবে দেখিনি বাঙালি মুসলমানকে, তাহলে পরিচয়ের আড় ভাঙবে কী করে ? স্বাধীনতার পরই তাঁরা এলেন। এই বিষয়ে সিরাজের একটি চিঠির কথা আমার মনে পড়ছে। মহেশ গল্পের গফুর জোলার একটি বলদই ছিল। গফুর সেই বলদকে পালন করত। সে তো ভূমিহীন চাষা, গোটা গল্পের এই কনসেপ্ট একটু গোলমেলে ছিল। একটি বলদ কোনো চাষা অমনভাবে পালন করেনা। সিরাজ তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন। জোড়া বলদ হলে মানা যেত। এক বলদে চাষ হয় না। গফুর তাকে পালন করবে কেন ?
সিরাজ মুরশিদাবাদের হিজল অঞ্চলের অন্ত্যজ হিন্দু মুসলমানের জীবন চরিতে প্রবেশ করেছেন তাঁর গল্প উপন্যাস নিয়ে। আমি আগে গল্পের কথা বলি। উড়োচিঠি, গোঘ্ন, বুঢ়া পীরের দরগা তলায়, বাগাল, মৃত্যুর ঘোড়া, রানীরঘাটের বৃত্তান্ত, সূর্যমুখী, পুষ্পবনেহত্যাকাণ্ড—কত যে প্রিয় গল্প আছে আমার। সময়ে অসময়ে পড়ি।পড়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। বেলা যেন পড়ে আসে। সিরাজ ছিলেন মানবিক। ছিলেন জীবন সন্ধানী। উড়ো চিঠি গল্পের উত্তরপশ্চিম রাঢ়ের সেই প্রত্যন্ত গ্রাম কালুডিহির কথা আমার মনে পড়ে। কালুডিহির বুড়োরা সবাই একেকজন ব্যাস মুনি। এপিক পুঁথির ভারে কুঁজো হয়ে ঠুকঠুক করে পা ফেলছে শ্মশান কিংবা কবরের দিকে। কত গল্পের ঝাঁপিই না খুলে বসে। আমার মনে হয়েছিল এ যেন মহাকবি কালিদাস বর্ণিত সেই সব গ্রাম বৃদ্ধ, যারা সন্ধ্যায় বসে রাজা উদয়ন ও বাসবদত্তার গল্প বলে। কালুডিহির বদরুবুড়ো এক চিঠির কথা শুনোয়। যে গাঁয়ে কোনোদিন খাজনা আদায়ের লুটিস দিতে আসা তসিলদারের পিয়ন ব্যতীত আর কেউ কখনো ঢোকেনি, সেই গাঁয়ে এক চিঠি নিয়ে এল ডাক পিয়ন। কত পথ হেঁটে এসেছে সে, আমোদ আলি সাকিন কালুডিহি ডাকঃ সোনাতলা ঠিকানাওয়ালা চিঠি নিয়ে।কী অপূর্ব এই গল্প। গ্রামের মানুষের হৃদয়টিকে একটু একটু করে উন্মোচন করেছেন সিরাজ। কে আমোদ আলি ? কই, ঐ নামে তো কোনও মানুষ নেই কালুডিহিতে। ঘর্মাক্ত ডাক পিয়ন হতাশ হয়। দু’পয়সা বকশিসের আশা ছিল তার, হবে না। গুড় পানি খেয়ে ঠান্ডা হয়েও কী বলবে ধরতে পারে না।তখন গাঁয়ের লোক, বুড়ো থেকে জোয়ান, বুড়ি থেকে ঘোমটা ফেলা বউরা বলে, চিঠিটা পড়ে শোনাও দেখি। সেই চিঠিতে কোনো এক মামোদ আলি খড্ডা থেকে লিখেছে, ভাই আমোদ আলি, আমি তুমার ভাই মামোদ আলি, আমি দুরারোগ্য ব্যাধিতে শয্যাশায়ী, মৃত্যু আমার সমুখে, তুমি আমাকে লইয়া যাও।
আহারে, ভাই বড় আদরের ধন। সে মরছে কতদূরে। চিঠির কথা শুনে কালুডিহির মোড়ল থেকে বেওয়াবুড়ি, সকলের চোখ বুঝি ভিজে যায়। কে আমোদ, তার ভাই মরছে কোন দেশে। ভাই মামোদ আলি। হয়ত আমোদ আলি ছিল, এখন নেই। কবরে আছে। তারা কবরের দিকে তাকায়। কত মানুষ জন্মেছে এই কালুডিহিতে, কত মানুষ মাটি নিয়েছে। তার ভিতরেই আছে নিশ্চয়। কিন্তু কোন ঘরের তারা ? ঐ আমোদ মামোদ। তখন এক প্রাচীনা স্মরণ করল ঐ যে বাঁশঝাড়ের ধারে ছড়া বাস্তু—পরিত্যক্ত এক ভিটে, ঐ খানে থাকত যে এক বেওয়া, বুধনি বহরি, তার ছিল দুই ছেলে, তারাই হবে আমোদ মামোদ।সেই যে একবার রাজার হাতি এল কালুডিহিতে, সেই হাতির পিছু পিছু বুধনির এক ছেলে হারিয়ে গেল। কত বালক হাতির পিছু ধরেছিল, সবাই ফিরে এল, ফিরল না বুধনির এক বেটা। তাকে রাতভর খুঁজল তার মা ডেকে ডেকে, কিন্তু পেল না। জিন তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ঠিক। ধীরে ধীরে উন্মোচন করেন সিরাজ। কেমন সেই উন্মোচন, কতখানি আত্মীয়তা থাকলে এই উন্মোচন হয়। হ্যাঁ, হত দরিদ্র সে কালুডিহির মানুষের সঙ্গে, বুঢ়া পীরের দরগাতলার বেন্দাবনের সঙ্গে, বাগাল গল্পের বালক হরিবোলা, রানীর ঘাটের বৃত্তান্ত গল্পের সুরি পাগলির বেটা ফালতু সূর্যমুখী গল্পের সেই কাপড়ওয়ালা থেকে তৃণভূমি, অলীক মানুষ থেকে জানমারি মায়া মৃদঙ্গ উপন্যাসের নিরুপায় কিন্তু মানুষগুলির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। কালুডিহির মোড়ল সাজিয়েছিল গো গাড়ি। আমোদ আলি নেই বলে তার ভাই, গাঁয়ের ছেলেটি দূর দেশে একা একা মরে যাবে। তা কখনোহতে পারে ? তারা রওনা হয়েছিল মৃত্যুপথযাত্রী মামোদ আলিকে নিয়ে আসতে। কিন্তু যাবে কোথায় ? খড্ডা কোথায় ? ডাক পিয়নের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়নি। হায় হায়।