| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-এর ছোটগল্প ‘মানুষ’

Reporter
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ / ১০৭১ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২২

দূরে সবুজ বনরেখা। সে-বনরেখার পেছনে যে নীল পাহাড়গুলো দিগন্তরেখায় ঢেউ তুলে সারি-সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে, পাহাড়িরা বলে সেখানে নাকি একটি স্বচ্ছ জলের গভীর হ্রদ আছে, যার চারিধারে প্রাচীর সৃষ্টি করে ভিড় করে রয়েছে দীর্ঘ ঘন সন্নিবদ্ধ পাইন-বৃক্ষ। ওই সবুজ বনরেখা পেরিয়ে সেই স্বচ্ছ জলের হ্রদের তীরে জড়াজড়ি-হয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা ঘন পাইনের বন ঘেঁষে আজ সকালে এক ঝাক নাম-না-জানা হলদে পাখি উড়ে গেল।

হলদে পাখির ঝাক উড়ে গেল, সকালের নম্র মিগ্ধ সোনালি রোদের ভেতর দিয়ে মনির তা-ই চেয়ে চেয়ে দেখেছে, অলস কান পেতে শুনেছে তাদের পাখার সম্মিলিত অস্কুট ধ্বনি, আর চলতে-চলতে হোঁচট খেয়েছে। বনের অন্তরালে ওরা মিলিয়ে গেলে পাহাড়ের ওপরে ঝাউগাছটার তলে একটা তামাটে রঙের পাথরে সে বসলে। হলদে পাখির ঝাক গেল মিলিয়ে, ওধারে পাহাড় বেয়ে হলদে শাড়িপরা একটি মেয়ে উঠে আসছে ওপরে; পথটা আঁকাবাকা ও বন্ধুর, তাই সে চলছে ধীরে-ধীরে, মৃদু পায়ে।

ওপরের আকাশ কিছুটা সোনালি, কিছুটা ধূসর; দূরে কোথায় গভীর বনে ঘুঘু ডাকছে। পাহাড়ের নিচের নোংরা কাঠের বস্তিগুলো থেকে কুয়াশার মতো ধুয়ে উঠছে হাওয়াশূন্য আকাশ বেয়ে অতি ধীরে, ওই মেয়েটির চলার মতো। স্থানটি নিস্তব্ধ; সে-নিস্তব্ধতার মধ্যে মেয়েটির পায়ের মৃদু শব্দ এবার জেগে উঠল; ও কাছে এসে পড়েছে; একটা গাছে ও বাকের আড়ালে ঢেকে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত পরে অদূরের ওই গোলগাছটির কাছে সে বেরিয়ে এল, তারপর গাছের তলায় সরে এসে সেখানে উবু হয়ে বসল। গাছ হতে লাল ফুল ঝরে সে-স্থানটা ভরে রয়েছে, তাই সে তার আঁচলে কুড়িয়ে নেবে।

মেয়েটি অন্ধ; তবু পথের সাথে তার পায়ের জানাশোনা, আর তার হাতের সাথে ফুলের পরিচয়। প্রতি সকালে সে অমনি করে আঁকাবাঁকা ও বন্ধুর পথ বেয়ে কোমল পায়ে পাহাড়ে উঠে আসে, গাছটার তলায় এমনি করে উবু হয়ে বসে আঁচল ভরে লাল ফুলগুলো কুড়িয়ে আবার নিচে নেবে যায়; নিচের নোংরা কাঠের বস্তিতে সে থাকে। এধারে তামাটে রঙের পাথরে বসে নীরবে তা-ই চেয়ে-চেয়ে মনির দেখে, তার ফুল কুড়োনোর ভঙ্গি, সরু কোমল হাতদুটি, স্থির নিস্তব্ধ ছোট মুখটি। মনিরের কথা সে হয়তো জানে না, তাই কোনোদিন ফুলকে গালে চেপে ধরে হঠাৎ হেসে ওঠে মধুর কণ্ঠে, নয়তো যে-শুকনো বাসি ফুলটি সে তুলে নিয়ে অবজ্ঞাভরে ছুড়ে দূরে ফেলে দিয়েছিল, সেটাকেই আবার স্নেহভরে হাতড়ে-হাতড়ে কুড়িয়ে নেয়, সযতনে ঠোটের কাছে তুলে ধরে অস্ফুটকণ্ঠে কী সব কয়ে ওঠে, আর ঠোটের প্রান্তে হাসে একটু লাজরক্তিম হাসি।

ওপরে আকাশে এমন প্রসারিত অনুচ্চারিত নীরবতা আর দূরবিস্তৃত অতীতের শুভ্র বেদনাময় বিস্মৃতি যে মনিরের ঘুম-ক্লান্ত অবসন্ন মন হঠাৎ উদাস হয়ে উঠে ডানা মেলে ওই সোনালি আর ধূসর আকাশ বেয়ে নিঃশব্দ পাখাসঞ্চারে কোথায় যেন উড়ে চলল; বোধহয় হলদে পাখিদের পিছু পিছু সেই স্বচ্ছ জলের হ্রদের তীরে আর ঘন পাইনের বনে। মেয়েটির হলদে আঁচল লুটিয়ে পড়েছে সবুজ ঘাসে, লাল ফুলশয্যার ওপরে তার কোমল হাতদুটি চঞ্চল হয়ে উঠেছে, থেকে-থেকে কাচের চুড়িতে মৃদু শব্দ উঠছে, আর তার দেহের একধারে, গালের আর চুলের প্রান্তে সূর্যের আলোর স্পর্শ লেগেছে। কী যেন হল হঠাৎ তামাটে পাথরটি ছেড়ে মনির উঠে দাড়াল, মৃদু পায়ে আস্তে-আস্তে অদূরের ওই গাছটির পানে এগিয়ে চলল, যেগাছের তলায় বস্তির ওই অন্ধ মেয়েটি তার হলদে আঁচল ভরে তুলছে লাল ফুল। নিচের কাঠের বস্তি থেকে যে-হাওয়াশূন্য আকাশ বেয়ে ঋজুরেখা এঁকে কুয়াশার মতো ধুয়ো উঠছে, একটু হাওয়া বইতে সে-রেখা কেঁপে উঠল, কিছু ভেসে গেল, কিছু মিলিয়ে গেল, আর তা-ই দেখে মনিরের মনের যে ধারা স্থির ও নিষ্কম্প হয়েছিল হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। পায়ের শব্দে মেয়েটি মুখ তুলে চাইলে, ফুল কুড়োনো তার থেমে গেল, স্তব্ধ নিমীলিত চোখের রেখা রহস্যময় ছায়ায় আরো গভীর হয়ে উঠল, প্রশ্নের উত্তর সে বাইরে খোজে না, খোজে অন্তরের গভীরতায়। ফুলশয্যার ধারটাতে সবুজ ঘাসে পা ছড়িয়ে মনির বসে পড়ল, ওধারে মুখ ঘুরিয়ে তাকালে দিগন্তের পানে, সেখানে কিসের একটা আবছা চলমান কম্প্রমান রেখা জেগে উঠেছে : আরেক আঁক পাখি আসছে বোধহয়; তারপর সে মুখ ফিরিয়ে আবার যখন চাইলে মেয়েটির পানে তখন দেখলে যে তার স্তব্ধ চোখ ঘিরে শঙ্কা জেগে উঠেছে, আর তার চঞ্চল হাত ঘিরে যে-ফুলগুলো একটু আগে মুখর হয়ে উঠেছিল, সেগুলোও যেন তার এই অনাহুত আগমনে দৃষ্টিহীনতার অন্ধকারের গায়ে কান পেতে স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। যে-হাওয়া ধুয়োর ঋজুরেখা কাপিয়ে দিয়েছিল, সেই হাওয়ার মতো মনির হঠাৎ আস্তে কথা কয়ে উঠল ।

—ভয় পেয়ো না : আমি বসেছি তোমার কাছে।

—কে তুমি?

মনির কোনো কথা কইল না, দুটো-তিনটে ফুল কুড়িয়ে ওর আঁচলে ঢেলে দিয়ে সে হাসলে ঠোটের প্রান্তে, তারপর বললে,

—আমার হাতে দুটো ফুল দাওনা, এই যে আমি হাত পেতেছি তোমার কাছে।

মেয়েটি ফুল দিলে না, তার স্তব্ধ চোখে এখনো বিস্ময়ের স্পষ্ট রেখা। ওধারে দূর হতে শব্দ ভেসে আসছে, সূর্যকিরণে ঢেউ তুলে উদ্দাম গতিতে আরেক ঝাক পাখি উড়ে আসছে। এদিকে, গায়ের রং তাদের ধূসর, ঠোটগুলো লম্বা আর চিকন, তারা যেন আকাশের দেহ কেটে উড়ে চলেছে। আরেকটি ফুল কুড়িয়ে নিয়ে তার হলদে আঁচলে ছেড়ে দিয়ে মনির আকাশের পানে চাইলে, আবার হাসলে স্বচ্ছকণ্ঠে, বললে :

—আওয়াজ শুনছ? আচ্ছা বল তো, ওই পাখিগুলোর কী রং? মেয়েটি কোনো উত্তর দিলে না; তাই আবার হাসল মনির, বললে :

—তুমি জান না।…ওগুলোর রং কালো, অন্ধকারের মতো কালো। আচ্ছা ওরা কোথেকে উড়ে আসছে, বলতে পার?

সে-কথাও বলতে পারে না মেয়েটি, যে-মেয়ে পায়ে পথ চিনে নিত্য পাহাড়ে উঠে আসে, ঝরা-ফুলগুলো আঁচলে কুড়িয়ে আবার চলে যায়; তার চোখে স্তব্ধ বিস্ময়, আর সরু হাতে নিশ্চলতা।

—শোন। দূরে, বহুদূরে নীল সাগরের মাঝখানে একটা ছোট দ্বীপ, যে-দ্বীপের চারধারে উন্মত্ত সাগরের উত্তাল ঢেউ দুলে-দুলে ফুলে-ফুলে নাচে। যে-দ্বীপটি ভরা ছোট ছোট গাছ, যে-গাছগুলো উদ্দাম হাওয়ার বেগে শুধু নুয়ে-নুয়ে পড়ে। এবং হাওয়ার আঘাতে সঙ্কুচিত সেই গাছগুলো জড়িয়ে বাস করে এই পাখিগুলো, যারা সারাক্ষণ চিৎকার করে, ডানা ঝাপটিয়ে সংগ্রাম করে উদ্দাম হাওয়ার সাথে। তারপর কে যেন কখন এই পাহাড়ের কথা, দীর্ঘ ঘন পাইনের বনের কথা আর স্বচ্ছ জলের গভীর হ্রদের কথা বলে দেয় তাদের কানে-কানে, তারা দ্বীপ ছেড়ে ওই হাওয়ার চেয়েও উদ্দাম গতিতে উড়ে আসে এদিকে, ওড়ে আর সারা আকাশময় বলে সে-হাওয়া-বিক্ষুব্ধ দ্বীপের কথা, বলে, কেউ যেন যেয়ো না সেখানে, সেখানে শান্তি নেই, আছে শুধু সংগ্রাম।

—তুমি কে? কোথায় তোমার দেশ?

—সেই দ্বীপে —সেই নীল সাগরের দ্বীপে আমি থাকি। —কে যেন আমার কানেও বলে গেছে এই দেশের কথা, যে-দেশ তোমার ওই চোখের মতো স্তব্ধ, আমিও চলে এসেছি সেদ্বীপ ছেড়ে। ওই পাখিদের আমি চিনি, ওদের আমি জন্মাতে দেখেছি, ওদের ঠোটের আঁচড় আমার দেহে চিহ্ন হয়ে আছে।

ধূসর রঙের পাখির ঝাক মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, তাদের পাখার আওয়াজ নিঃশব্দ নিশ্চল পাহাড়ের খাজেখাজে ঘাসের ডগায় আর গাছের চূড়ায় প্রখর হয়ে উঠেছে, হাওয়াও কাঁপছে বুঝি। মেয়েটির ভাষাশূন্য নিমীলিত চোখ যেন কোনো কথার আঘাতে চঞ্চল হয়ে উঠল।

—আমার হাত নাও, এই যে, ধর একবার হাতটি।

মনির হাত বাড়িয়ে ওর করতল স্পর্শ করলে, আর কয়েক মুহূর্ত পর মেয়েটি তার বাড়ানো হাতটি ধরলে গভীরভাবে, তবু যেন আলগোছে। মনির হাসলে, বললে, —আমি। আমার হাত ধরেছ তুমি। আমাকে তোমার ভয় নেই।

ওদের মধ্যে জানাশোনা হয়ে গেল, মেয়েটির কোমল হাত ওই লাল ফুলগুলোর মতো মনিরকেও চিনে নিলে, আর ওদের হাতের স্পর্শ বেয়ে দুজনার অন্তরের গভীরতম কথা নিঃশব্দে এল-গেল, মুখে তারা কিছুক্ষণ নীরব হয়েই রইল।

—তোমার নাম কী?

—মুলকী। তোমার?

—আমার নাম? আমার নাম হাওয়া। বলে দিগন্তের পানে চেয়ে মনির হাসলে, সে হাসির কোনো অর্থ নেই।

রোদ চড়ছে আকাশে, গাছের তলাটা ছায়াচ্ছন্ন। দূরে সবুজ বন আর নীল পাহাড়ের ঢেউ, যার মাঝে ধূসর রঙের পাখির ঝক এতক্ষণে মিলিয়ে গেছে। সেদিকে একবার চেয়ে মুলকীর হাতটি আস্তে একটু দুলিয়ে মনির বললে :

—আমি যখন এসেছিলাম তোমার কাছে, তখন তুমি কী ভেবেছিলে মুলকী?

—কী জানি। কিছু ভাবি নি শুধু শব্দ পেয়েছিলাম।

—শব্দ পেয়েছিলে, কিন্তু শব্দ শুনে ও কিসের শব্দ বলে তোমার মনে হয়েছিল?

মুলকী উত্তর দিলে না; সে শুধু শব্দই শুনেছিল; কিসের যে শব্দ, তা ভাবতে পারে নি। আর হাতটি আবার দুলিয়ে মনির বললে :

—তুমি ওই আকাশের মতো, তোমার কাছে এক সময়ে আমি মুক্তি চেয়ে নেব মুলকী, তোমার চোখের অন্ধকারের অসীমতায় আমি পথ খুঁজে নেব।

নিস্তব্ধ আকাশের তলে পাহাড়-ঘিরে সে-নিস্তব্ধতার গভীরতা, ঘুমের মতো নিশ্চলতা। কয়েক মুহূর্ত নিশ্রুপ থেকে মনির হঠাৎ প্রশ্ন করলে :

—আচ্ছা, এই যে ফুলগুলো কুড়োচ্ছিলে, এগুলোর কী রং তুমি জান?

—জানি; লাল।

—কী করে জানলে?

—মা বলেছিল। হ্যাঁ, এগুলো লাল, রক্তের মতো।

—রক্তের মতো? রক্ত দেখেছ তুমি?

—না। মা বলেছে ফুলগুলো রক্তের মতো লাল, আর সে-রং ভারি সুন্দর। তাই এগুলো রোজ আমি কুড়োই।

—ভুল বলেছে তোমার মা। এগুলো লাল নয়, ওই পাখির মতো কালো, অন্ধকারের মতো কালো, তোমার চোখে যে-অন্ধকার সে-অন্ধকারের মতো কালো; আর সে-অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে মুক্তির পথ, সে-পথ দিয়ে আমি মুক্তিলাভ করব মুলকী।

মুলকী হঠাৎ শিউরে উঠল, এক হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো একবার স্পর্শ করলে, তারপর মনিরের হাত ছেড়ে দিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে কয়ে উঠল ।

—আমার চারধারে এই যে আঁধার, এগুলোও এমনি আঁধার? না না, তুমি মিছে কথা বলছ, মা বলেছে লাল —এগুলো রক্তের মতো লাল।।

—মা মিছে কথা বলেছে। এদেশে শান্তি আছে বটে, কিন্তু এদেশের মানুষরা মানুষকে ঠকায়, তাই তোমার মাও তোমাকে ঠকিয়েছে। আমি থাকি দ্বীপের দেশে, সেখানে শুধু প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম; সেখানকার লোকেরা ঠকায় না কাউকে, তোমাকে আমিও ঠকাচ্ছি না মুলকী। শোন, কোথাও কোনো বর্ণ নেই, আছে গভীরতম নিবিড় তিমির।

—না না।

—না নয়, সত্যি বলছি; তোমার ভালোর জন্যই বলছি। সত্য কথায় মন আহত হয়, তাই এরা শান্তির দেশে লোককে মিছে কথা বলে মুলকী। আমার কথা মেনে নাও, চারধারে যে নিচ্ছিদ্র প্রগাঢ় অসীম অন্ধকার, সে-অন্ধকারকে ছিদ্র করে কেন তুমি আঘাত দেবে, এতে যে শুধু তোমারই লোকসান। তোমাকে পূর্ণাঙ্গ ও সম্পূর্ণ হতে হবে, নইলে তোমার কাছে আমি মুক্তি চাইব কী করে মুলকী?

আর কোনো কথা না বলে মুলকী উঠে দাড়াল, তার আঁচল হতে ফুলগুলো সবুজ ঘাসের ওপর ঝরে পড়ল ঝরঝর করে, যেন ভুল ভেঙে ঝরে পড়ল, আর তার চোখের রেখায় স্তব্ধতা নিবিড়তম হয়ে উঠল। কয়েক মুহূর্ত স্থিরভাবে দাড়িয়ে থেকে সে ধীরে-ধীরে চলে গেল শূন্য-আঁচলে ব্যথা-মিশ্রিত-বিস্ময় ভরে নিয়ে, পেছনে লাল ফুলশয্যা অনাদৃতভাবে রইল পড়ে।

মৃদু হাওয়া বইছে; ঝাউগাছে অস্পষ্ট শো-শো শব্দ হচ্ছে। শুকনো হাওয়ার আঘাতে উপেক্ষিত লাল ঝরাফুলগুলো যেন শুকিয়ে উঠেছে, আর সূর্যের আলো হতে কাচা সোনার মতো স্নিগ্ধ রং মুছে গেছে। দূরে বনরেখার সবুজ রঙে পাহাড়ের নীল রঙে আর ধূসর আকাশের বুকে যে-মোহ জড়িয়ে ছিল এতক্ষণ, সে-মোহ হালকা ও ফিকে হয়ে আসছে ক্রমে-ক্রমে, তাই মনির এবার উঠবে, উঠে আঁকাবাকা বন্ধুর পথ বেয়ে নিচে নেবে যাবে, ঘাড়ে রোদ চিনচিন করবে, কাকরগুলো ঠেকবে পায়ে।

এর পরদিন ওই লাল ফুলগাছের নিচে ঝরাফুলের পাশে মুলকী বলে বটে, কিন্তু ফুলগুলো আর কুড়োলে না, সোজা হয়ে বসে অন্তরের অন্ধকারের পানে দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। এদিকে তামাটে রঙের পাথরে বসে তা-ই কতক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখে মনির হঠাৎ উঠে দাঁড়াল; দিগন্তে আজ যেন মেঘ জমেছে, আর ঢেউ-তোলা পাহাড়মালা ঘন নীল হয়ে উঠেছে, তার চেয়ে ওই-যে হলদে শাড়ির বেগুনে-আঁচল সবুজ ঘাসের প্রান্ত ছুঁয়েছে সে-ম্লান ক্ষীণ স্পর্শটুকু মনিরের চোখে লাগল ভালো। পাহাড়ের নিঃশব্দতায় পায়ের মৃদু আওয়াজ হল, নিস্তরঙ্গ স্তব্ধ দিঘির মতো মূলকীর চোখদুটি তরল হয়ে উঠল, আর তার পাশে ঘাসের ওপর গতকালের মতো পা ছড়িয়ে মনির বসে পড়ে দূর-দিগন্তের পানে চেয়ে চোখের প্রান্তে হাসতে থাকল। তারপর ঘাড় হেলিয়ে ওর হাতের পানে চেয়ে সে বললে :

—আমি; হাওয়া।

মুলকীর চোখের স্তব্ধতা থেকে-থেকে এত অতল হয়ে ওঠে যে, কেউ কথা কইতে গেলে সে আবার হাঁপিয়ে গিয়ে ভেসে আসে ওপরে। কয়েক মুহূর্ত নির্বাক থেকে আবার মনির বললে ;

—ফুল কুড়োচ্ছ না যে? —মা কী বললে, আবার লাল বললে বুঝি? মিছে কথা।

—মাকে-তো আমি কিছু জিজ্ঞেস করি নি।

তারপর খানিকক্ষণ মূলকী আর কিছু বললে না, আর তাই মনিরও নীরব হয়ে রইল, কথাগুলো যেন শূন্যের অভ্যন্তরে ডুব মেরে রয়েছে। দূরে ওই পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কারা যেন উবু হয়ে পিঠে বোঝা নিয়ে পথ চলছে, স্মৃতির আবছা পটে কারা যেন হাঁটছে, মুখ চেনা যায় না তাদের। ওদের পানে চেয়ে মনিরের প্রথম মনে হল যেন তাদের সে চেনে, শেষে মনে হল যে তারা মানুষ; কথাটা প্রথমে তার খেয়াল হয় নি বলে সে তাদের চেনে বলে ভুল করেছিল। অন্তরটা যেন পাখি, থেকে-থেকে বেরিয়ে এসে নিঃশব্দে এদিকে-ওদিকে ঘুরে বেড়ায় অলসভাবে, এধারে-ওধারে গাছের পাতায় ঝোপের ভেতরে আলোতে ছায়াতে কী যেন খুঁজে বেড়ায়; এবার মুখ উঁচিয়ে দেখলে সেই লোকগুলোর পানে। যারা পাহড়ের কোলঘেঁষে পথ চলছে, যখন তাদেরকে মানুষ বলে মনে হল তখন সে হঠাৎ উড়ে চলল আবছা-হয়ে-উঠে অজস্র কুয়াশার মধ্য দিয়ে, যেন যে-দেশ কখনো দেখা যায় না সে-দেশে যাচ্ছে, অতীতের দেশ হতে ঘুম নিয়ে আসবে, নিয়ে এসে ওই যে গাছের পাতাগুলো নিঃশব্দ হাওয়ায় নড়ছে আর চিকচিক করছে সেগুলোকে নিস্পন্দ করে তুলবে।

পাশে মুলকীর অতল স্তব্ধতা এবার যেন ছলছল করে উঠল : ভাসা-ভাসা কণ্ঠে সে কয়ে উঠল :

—চারধারে এত আঁধার, এত আঁধার? আমার ভয় করছে।

রক্তের মতো কী একটা ভারি সুন্দর রঙের কথা সে যে মায়ের মুখে শুনেছিল, সে-রং মিছে হয়ে মুছে গেছে বলে তার অন্ধকার নিবিড়তম হয়ে উঠেছে, এবং সে-অন্ধকারে সে যেন তলিয়ে যাচ্ছে। এবার গতকালের মতো স্বচ্ছ কণ্ঠে মনির হেসে উঠল, ওর একটি হাত ও মুঠোয় নিয়ে বললে :

—ভয় কী মুলকী, এই যে আমি তোমার হাত ধরেছি।

—তুমি কে? তোমাকে আমি চিনি না।

—আমাকে তুমি নাই-বা চিনলে, এই যে আমি তোমার হাত ধরেছি এই স্পর্শটুকু তুমি চিনে রাখ, তাহলে অন্ধকারকে তোমার ভয় করবে না মুলকী।

—ওই স্পর্শকে আমার ভয় করছে, তুমি আমার হাত ছেড়ে দাও।

মনির হাত ছেড়ে দিলে।।

ওধারে শোঁ-শোঁ শব্দ হচ্ছে, মনির ভাবলে হাওয়ায় ঝাউগাছে বুঝি অমন শব্দ হচ্ছে, আকাশের পানে চেয়ে দেখলে আরো একঝাঁক পাখি উড়ে আসছে; তাদের রুপালি পাখা সোনালি আলোয় ঝলমল করছে।

—পাখি উড়ে যাচ্ছে? হঠাৎ মুলকী একটু সচকিত হয়ে উঠল, মাথা ঝুঁকিয়ে প্রশ্ন করলে মনিরকে।

—হ্যাঁ, একঝাঁক পাখি।

—তাদের গায়ের রং কী?

—কালো।

—কালকের পাখিগুলোর মতো?

—হ্যাঁ, আর তোমার চোখের অন্ধকারের মতো কালো।

—ওদের তুমি চেন? ওরা নীল সাগরের দ্বীপ থেকে উড়ে আসছে? ওদের ঠোটের আঁচড় আছে তোমার গায়ে?

—দ্বীপের দেশের লোক আমি, সগ্রাম করি বলে মিছে কথা বলি না। ওদের রং কালো, ওদের আমি চিনি।

হঠাৎ তীক্ষকণ্ঠে মুলকী চেঁচিয়ে উঠল, কেউ বুঝি তার গায়ে ছোরা বিধিয়ে দিয়েছে। ওপরে পাখার আওয়াজ প্রখর হয়ে উঠেছে, আকাশের বুক কাপছে, নীরবতার সুর যেন ধরা-পড়ে গিয়ে অস্কুটকণ্ঠে কেঁদে উঠছে, ব্যর্থ হয়ে পালাবার পথ খুঁজছে।

—কোথায় তোমার হাত, ও দ্বীপের দেশের লোক?

—এই যে, এই যে, আমার হাত।

—এত আঁধার যে তার মধ্যে যেন ডুবে যাচ্ছিলাম, তোমার হাতের স্পর্শ ভালো লাগছে —কী তোমার নাম?

—হাওয়া। বল একবার, শুনি।

—হাওয়া।

—কী মিষ্টি তোমার গলা, আর কী গভীর; হৃদয়ের উৎস হতে তোমার কথাগুলো যেন উৎসারিত হয় মুলকী।

রোদ চড়ছে, গাছের ছায়া যেন আরো ঘনীভূত হচ্ছে, ঘন-পল্লবের ফাঁকে সূর্য ঝকমক করছে।

—আচ্ছা মুলকী এ-পাহাড়ের পথ তুমি কী করে চিনলে, এ-ফুলগাছের খবর কী করে জানলে।

—আগে আমার মা ফুল কুড়োতে আসত, তার সঙ্গে আমিও আসতাম। মার পা ভেঙেছে বলে আর চলতে পারে না তাই আমি তার জন্যে রোজ ফুল কুড়োই। মা এ-ফুল ভালোবাসে।

—আজ তুমি ফুল কুড়োবে না?

—না ।

—মা মিছে কথা বলেছে আর ঠকিয়েছে, তাই তার জন্যে আমি ফুল নিয়ে যাব না। আর, কালো ফুলকে আমি ঘৃণা করি।

—আমি যে মিছে বলি নি তা কী করে বুঝলে?

—না, তুমি মিছে কথা বলতে পার না; তুমি দ্বীপের দেশের লোক, যে-দ্বীপে ওই পাখিরা থাকে, আর যাদের আওয়াজ আমি শুনেছি।

মনির হাসল অস্পষ্ট গলায়, তারপর তার হাত ছেড়ে আস্তে উঠে পড়ল, দিগন্তের পানে চেয়ে বললে :

—এবার পালাই। তুমি নাববে না?

—নাবব। … কিন্তু অমন লাগছে কেন?

—কেমন লাগছে?

—ভয় করছে, মনে হচ্ছে কোথায় যেন গভীর গুহা তার ভেতরে পড়ে যাব। তোমার হাতটি আমাকে দাও…

—এই নাও। ওঠ।… কিন্তু দ্বীপের দেশে যখন আমি ফিরে যাব মুলকী, তখন তো তোমাকে একা দাঁড়াতে হবে, এই পথ দিয়ে একা চলতে হবে?

—না, কেন তুমি যাবে? না, যাবে না, এই শান্তির দেশে তুমি থাকবে কিন্তু মিছে কথা বলবে না, আর তোমার হাতটি আমাকে ধরতে দেবে।

—তাহলে তুমি কী দেবে আমাকে?

—কী দেব, কী দেব? মুলকীর কণ্ঠ থেমে গেল, চলাও। তার এমন কী আছে যে সে দিতে পারে সে-লোকটাকে, যে-তাকে ডাঙ্গার ইশারা দেবে? মনিরের অদ্ভুত প্রশ্ন তাকে বিমূঢ় করে ফেলল, তার হাত ছেড়ে দিয়ে সে অস্ফুট কণ্ঠে বললে : কিছু দিতে পারি না।

—নাও, হাত ধর। যা তুমি আমাকে দেবে, সে-অমূল্য দান তুমি জান না মুলকী। তুমি ক্রমে-ক্রমে বন্ধনে জড়িয়ে পড়ছ, আর আমার মুক্তি আসছে দ্রুত তোমার চোখের অন্ধকার হতে।

—কিন্তু তোমার দান আমি বুঝতে পারি।

—আমার দান যে বন্ধন তাই অত স্পষ্ট, তোমারটা মুক্তি বলে অস্পষ্ট। তোমার দানই বড় মূলকী। তোমাকে আমি ঠকিয়েছি, আমাকে মাফ কোরো।

কী একটা আবেগ মেয়েটির অন্তরের অন্ধকার তরঙ্গিত করে তুলল, সে মনিরের হাতটি কঠিনভাবে চেপে ধরল, কয়েক মুহূর্ত পরে রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল :

—তোমার কাছে আমি ঠকতে চাই। আমাকে ছেড়ে তুমি কখনো চলে যেয়ো না। বল যাবে না?

—সে-কথা কেউ কখনো বলতে পারে না মূলকী। বলে, মনির আর দাড়াল না, ওর হাত ধরে নাবতে লাগল নিচে—এতটা দ্রুতভাবে যে মূলকী দুয়েকবার হোঁচট খেল, শেষে একটা বড় পাথরে ঠোকর লেগে একটা আঙ্গুলে আঘাত পেল। ওর পায়ের কাছে মনির উবু হয়ে বসল, দেখলে আঙ্গুলটার ধার দিয়ে রক্তের সূক্ষ্মরেখা দেখা দিয়েছে।

—ছিঃ। হঠাৎ মুলকীর ম্লান কপােলে রাঙা আভা জেগে উঠল, আর তাই চেয়ে দেখে মনির শুধােল :

—কী?

—তোমার ওই হাত—যে-হাত তুমি আমাকে ধরতে দিয়েছ সে-হাত দিয়ে তুমি আমার পা ছুঁয়ো না। বলে একটু নিচু হয়ে হাতটি সযত্নে ধরে তুলে কোমলভাবে সে মাথায় ঠেকিয়ে রাখলে কয়েক মুহূর্ত, তার চোখের প্রান্তে হালকা পক্ষ্ম ঘিরে ওই রক্তরেখার মতো অশ্রুরেখা দেখা দিল। তার মুখে রোদ ঝলমল করছে, গলার নিচে ঘাম জমেছে আর কপােলে এমন প্রশান্ত শ্যামলিমা যেন ওই আবছা ধূসর নীল-দিগন্তের প্রসারিত অনুচ্চারিত চিরমৌন স্নিগ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ওর ঘােট কপােলটি ঘিরে।

—তোমার আঙ্গুল দিয়ে রক্ত পড়ছে মুলকী!

—পড়ুক।

—ব্যথা করছে খুব?

—করছে, কিন্তু ওই ব্যথাটুকু ভারি ভালো লাগছে কেন?

—ও হল বন্ধনের শৃঙ্খলের ব্যথা। বন্ধন তুমি চাইছ বলে সে-শৃঙ্খলের ব্যথাও প্রশান্তি, যে-প্রশান্তি শৃঙ্খলের ব্যথার আনন্দ থেকে উৎসারিত হয়েছে, সে-প্রশান্তি আমার কাছে অভিরাম লাগছে মুলকী।

মনিরের বাসার চারধারে পাহাড়, এবং এ-স্থানটা সে ভালোবাসে। মুক্ত স্থানে নিজেকে ধরা যায় না বোঝা যায় না; মানুষের মন যেন আলো, বাধা সরিয়ে দিলেই ছড়িয়ে পড়ে।

তখন পাহাড় বেয়ে আকাশকে ধূসর করে আঁধার উঠছে আর উপত্যকার বুকে ঘন ছায়া জমে উঠছে ধীরে-ধীরে, এখানে-ওখানে তারা ফুটছে দুয়েকটা, যেন আকাশের চোখ খুলছে। একে-একে, আকাশ নয়ন মেলে চাইতে আরম্ভ করছে। দূরে কোথাও কোন বস্তিতে সম্মিলিত গভীর কণ্ঠে পাহাড়িরা সান্ধ্যপ্রার্থনা করছে, তারই আবছা-হয়ে-ওঠা সুর অস্পষ্টভাবে ভেসে আসছে। সঁঝের আকাশ ভরে-তুলে যার কাছে পাহাড়িরা সান্ধ্যপ্রার্থনা করছে, তিনি হয়তো থাকেন পর্বতের শিখরে-শিখরে, রক্তজবার মতো লাল ঝরাফুলে, উড়ন্ত পাখির ডানার রহস্যময় শব্দে, আর বনানীর বর্ণে। হয়তো শীতের বস্ত্র দেবার জন্যে অথবা উচু দুর্গম তুষারশুভ্র পর্বতের ওপাশে দৈত্যের কবল হতে শিশুদের বাচাবার জন্যে অথবা রাত্রির কৃষ্ণ-আবরণে অবগুণ্ঠিত কৃষ্ণকায় প্রেতের নখের আঁচড় হতে মানুষের প্রাণ বাঁচাবার জন্যে তারা প্রার্থনা করছে, কিন্তু তবু সেটা প্রার্থনা, সম্মিলিত গম্ভীর উদাত্তকণ্ঠে স্বনিত সন্ধ্যার ধূসর নিস্তব্ধতায় অপূর্ব অচিন্তনীয় প্রার্থনা, যেন ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে তারা পর্বতমালায় ঘুম নাবাচ্ছে, এবং এবার তারা ঘুমিয়ে পড়বে, জাগবে না আর যতক্ষণ পর্যন্ত উষার শান্ত স্নিগ্ধ আলো পুবের পাহাড়ের শীর্ষ স্বচ্ছ করে না-তোলে।

সন্ধ্যার আবছা আলোর নিস্তব্ধতা ঘিরে একটা অপরিসীম বিস্তৃতি, সে-বিস্তৃতি আর সমবেত কণ্ঠের প্রার্থনার অস্পষ্ট স্বপ্নের মতো মধুর সুর স্থানটিকে মায়াময় ও অবাস্তব করে তুলেছে, এবং, এর মধ্যে নিশ্চল হয়ে বসে থেকে মনিরের মনে হল যেন এ-কোনো ভুলে-যাওয়া জগৎ, যেন কোনো অচেনা-অপরিচিত দূর-দূরান্তের আকাশের প্রান্তবর্তী ম্লান নক্ষত্র।

কখন সান্ধ্যপ্রার্থনা থেমে গেছে, অন্ধকারাচ্ছন্ন উপত্যকার মাঝে নিচ্ছিদ্র নীরবতা প্রগাঢ় হয়ে উঠেছে, কোথায় কোন গাছে একটা নিশুতিরাতের পাখি ডাকতে শুরু করেছে; চারধারে নিশাজল পড়তে আরম্ভ করেছে, যেন ঘুম নাবছে, তন্দ্রা নাবছে, আর ওপরে কালো আকাশে তারা —অগুনতি তারা বিস্মৃতির স্পন্দনের মতো কাপছে-নড়ছে।

অতগুলো তারার মধ্যে কোন তারা যে-ইশারা করলে কে জানে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো হঠাৎ উঠে দাড়িয়ে মনির চলতে শুরু করে দিলে । কাকরে আর পাথরে ভরা পথ, —নৈঋত কোণের ওই প্রত্যন্ত পর্বতটির বিশালকায় জন্তুর মতো দেহের ছায়ায় সে-পথ কালো হয়ে উঠেছে; ওধারে পাহাড়ি কুকুর ঘেউঘেউ করছে, মাথায়-কাপড়-দেওয়া কে যেন চলে গেল পাশ দিয়ে।

বস্তিতে লোকে নিচুগলায় কথা কইছে, তারই গুঞ্জন ভেসে আসছে থেকে থেকে : এঘরে-ওঘরে আলো জ্বলছে —স্তিমিত ম্লান আলো, আর প্রত্যেক ঘরের দরজায় আগল পড়েছে। ওধারে একটা দীর্ঘ সরু বৃক্ষ, তার নিচে খানিকটা স্থান পাথরে বাঁধানো, আর তার পাশে যে-নিচু নোংরা কাঠের ঘর, সে-ঘরের রুদ্ধ দরজার সম্মুখে দাড়িয়ে পল্লবমর্মরের মতো স্বপ্নিল কণ্ঠে মনির ডেকে উঠল :

—মুলকী।

কয়েক মুহূর্তব্যাপী নিশ্চলতা ও নীরবতা; মূলকী এল না, দরজা খুলে বেরিয়ে এল বেঁটে মতো চেপ্টামুখাে একটা লোক, ছোট ছোট তার চোখ আর বোঁচা নাক, হাতে লাঠি আর হারিকেন লণ্ঠন। তার মুখে কথা নেই, শুধু হারিকেনের স্তিমিত আলোয় ওর ছোট চোখদুটি ধকধক করে জ্বলতে লাগল; তার পেছন দিয়ে একটা কুকুরের মুখ বেরিয়ে এল লম্বা উঁচু পাহাড়ি কুকুর, তার সরু দীর্ঘ ও তীক্ষ্ণ জিহ্বা লকলক করছে, আর তার চোখও যেন ওই নির্বাক লোকটির চোঁখের মতো আবছা আলোয় জ্বলছে হিংস্রভাবে। কয়েক মুহূর্তব্যাপী নীরবতার পর মনির নতমাথায় রাস্তায় নেবে এল, পেছনে দরজার প্রান্তে লণ্ঠনের আলো আঁধারের বুকে ম্লান-আলো ছড়িয়ে নিষ্কম্প হয়ে রইল, আর কুকুরটির গলায় কেমন ঘড়ঘড় আওয়াজ হতে থাকল। রাস্তার পাশের নালা হতে ভাপসা গন্ধ আসছে।

মনির ধীরে-ধীরে পথ চলছে, এক-আধবার আকাশে চেয়ে তারা দেখছে আর পাথরে হোচট খাচ্ছে থেকে-থেকে, এমন সময়ে পেছনে একজোড়া পায়ের আওয়াজ বেজে উঠল, কিছুটা অসংযত ও দ্রুত তার চলার শব্দ। পেছনের অন্ধকার হতে চাপা গলায় কে যেন কয়ে উঠল : কে যায়? তারপর সে হাঁপাতে থাকল। মনির থমকে দাড়াল, বললে না কিছু পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলে আবছা আঁধারের গায়ে মুলকীর মতো একটা দেহ ফুটে উঠেছে। অস্পষ্টভাবে। সে-ছায়ার মতো কায়াটি আবার শুধােল :

—কে যায়?

—আমি। আমি হাওয়া।

—তুমি, দ্বীপের দেশের লোক? তোমার গলার আওয়াজ আমি পেয়েছিলাম আমাদের ঘরের দোরে। কেন গিয়েছিলে? কেন চলে এলে?

—ওই লোকটির আর তার পেছনের কুকুরটার চোখ জ্বলছিল।

—তাই চলে এলে? তুমি ভয় পাও? না, না; তোমার হাত ধরে যে আমি সাহস পাই মনে, তুমি ভীতু নও।

—তুমি পালিয়ে এসেছ মুলকী?

—হঁ্যা। কিন্তু তুমি কেন গিয়েছিলে?

—গিয়েছিলাম তোমাকে একটা কথা বলতে।

—সে কী কথা?

—এখন থাক।

—বল। তুমি ভয় পেতে শুরু করেছ বলে আমি ভয় পাচ্ছি। বল না সে কী কথা?

—শোন। আকাশের নীরবতা আর নির্জনতায় ডুবে থেকে হঠাৎ মনে জাগল যে তোমার সাথে প্রবঞ্চনা করায় আমার পাপ হয়েছে।

—তুমি প্রবঞ্চনা করেছ, দ্বীপের দেশের লোক?

—হ্যাঁ। তোমাকে নিঃসহায় করেছি বটে কিন্তু সহায় হবার সামর্থ্য ও শক্তি-তো আমার নেই মুলকী। তোমাকে মিথ্যে বলেছিলাম, ওই ফুলের রং, ওই পাখির রং কালো নয়, কালো রং তোমার চোখে, আর সারা জগৎ ভরে শুধু সাত রঙের লীলা। আর আমার দেহে পাখিদের ঠোটের আঁচড় নেই, ওদের আমি চিনি না!

শুধু সেদিনকার মতো প্রগাঢ় নীরবতা ও অন্ধকারের মধ্যে মুলকী অস্ফুটকণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠল ; বিশ্বাসভঙ্গের আঘাতে মুখটি অসহায় হয়ে উঠতে চাইলেও সে তরল হবার চেষ্টা করতে লাগল, মুখে আভা এল না।

পেছনে অন্ধকারের মধ্যে কটা স্তিমিত আলো-বিন্দু মিটমিট করে উঠল, কারা যেন সেখানে কথা কইছে, পথের কাকরে তাদের চরণ বাজছে। তার ক্ষীণ আওয়াজ মূলকীর কানে গেছে বোধহয়, তাই সে সোজা হয়ে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল, তারপর কিছুটা কম্প্রমান গলায় বলে উঠল :

—তারা আসছে, আমাকে খুঁজতে আসছে। তোমার হাতটি দাও, সে-হাত ধরে আমি তাদের সম্মুখে সোজা হয়ে দাঁড়াব।

—না। আমি পালিয়ে যাচ্ছি। তোমার চোখের অন্ধকারে আমি মুক্তি চেয়েছিলুম মুলকী, মৃত্যু চাই নি।

কালো আকাশে তারা ঝকঝক করছে, ঘনায়মান তমসায় মনির মিলিয়ে গেল, নিমীলিত চোখে প্রগাঢ় স্তব্ধতা ভরে তুলে স্থির মূর্তির মতো অন্ধকারের গায়ে যেন ঠেস দিয়ে মুলকী দাড়িয়ে রইল । নিস্তব্ধতার মধ্যে ওদের পায়ের আওয়াজ আর অস্পষ্ট কথা থেকে-থেকে কানে ভেসে আসছে।

###

রোদ কড়া হয়ে উঠেছে পৃথিবীর গায়ে, চুলের গোড়ায় আর ঘাড়ে ক্ষীণ প্রদাহ হচ্ছে, তবু মনির পাহাড়ে চড়তে লাগল। সেই নীল পাহাড়মালা ও সবুজ বনের ধারে যে-স্বচ্ছ জলের গভীর হ্রদ আছে, তার শীতলতা অত বদ্ধ ও সঙ্কীর্ণ কেন, সে-সরোবর উদ্বেলিত তরঙ্গায়িত হয়ে উঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে না সারা বিশ্বময়? একথা ভাবলে মনির, তারপর মুখ তুলে চেয়ে দেখলে ওই সম্মুখের গাছের তলায় কে যেন বসে রয়েছে —যার দেহ গাছের ছায়ার শীতলতায় অনুজ্জ্বল ও স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। ও মুলকী। —পায়ের আওয়াজ শুনছি। কে ওখানে? স্তব্ধ মুলকীর দেহ এবার যেন চঞ্চল হয়ে উঠল, স্তব্ধ চোখে ঔৎসুক্য সৃষ্টি করে সে প্রশ্ন করল। মনিরের ঔৎসুক্য নিঃশেষ হয়ে গেছে, তাই সে একবার চোখ তুলে অলসভাবে চেয়ে দেখলে আকাশের প্রান্তের সাদা মেঘগুলোর পানে, তারপর চাইলে পাহাড়ের নিচে যে-কটা ভেড়া চরছে সেগুলোর পানে; এবার একটু কেশে অনুচ্চ গলায় বললে :

—আমি। থেমে আবার বললে : তোমাকে বলতে এলাম যে তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। তোমার চোখের অন্ধকারে আমি মুক্তি চেয়েছিলাম, মুক্তি পেলে তুমি, আর বন্ধনের শৃঙ্খলে আমি জড়িয়ে পড়ছিলাম; তুমি আমাকে জড়িয়ে ফেলেছিলে।

—গলার স্বর অত দূর হতে আসছে কেন?

—দূরে বসেছি বলে।

—কাছে এসে বস। তোমার কোনো কথা আমি বিশ্বাস করি না, শুধু তোমার হাতটিকে আমি চিনি। কাছে এস। তোমার হাত ধরতে দাও আমাকে।

—না। আজ চলে যাচ্ছি।

—কোথায়? সেই দ্বীপের দেশে? …আমিও যাব, আমাকে নিয়ে চল, এখানে আমিও থাকব না; এখানকার মাটি পাহাড় গাছপালারা কথা কয় না, বুড়োর মতো অচল হয়ে থাকে, এখানে আমার ভালো লাগে না।

—দ্বীপের দেশে আমার ঘর নয়। কোনো দ্বীপ আমি জানি না।

—এও মিথ্যে? মুলকীর মুখ যেন ভেঙে আসছে, ব্যথার আঘাতে তার চোখের রেখাগুলো কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে; ক্ষণকাল নীরবতা, তারপর আবার সে শুধাল :

—তুমি কে?

—আমি মানুষ। এই পৃথিবীতে জন্মেছি, এই পৃথিবীতেই মরব। তাই আমরা মানুষরা শুধু প্রতিশোধ নিতে চাই, কার বিরুদ্ধে জানিনে। আমরা এখানে কামড় দেই, ওখানে আঁচড় কাটি, সত্য চিনিনে বলে থুতু ফেলে মিথ্যে বলি, আর আমরা স্নেহ-মমতা সৃষ্টি করে সে-স্নেহ-মমতা লাথি মেরে ভেঙে দেই, বেদনায় হাসি।

—তোমার কথা আমি বুঝতে পারছিনে। অন্ধকারে আমার ভয় করছে, তোমার হাত দাও, দাও।

—না।

তীক্ষকণ্ঠে তিক্ত বিকৃত সুরে অসহায়ভাবে হঠাৎ মুলকী চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল, উঠে দাত দিয়ে হাত কামড়াতে লাগল, চুল ছিড়তে লাগল, এবং অবশেষে একটা অদ্ভুত প্রগাঢ় স্তব্ধতায় সে শান্ত হয়ে এসে মাথাটা ঈষৎ হেলিয়ে কী যেন ভাবতে থাকল, চোখের রেখা ভাষার অতীত শূন্যতায় স্পষ্ট ও স্থির হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পর সে আবার শুধাল :

—আকাশে ও কিসের শব্দ?

—একঝাক পাখি উড়ে যাচ্ছে।

—কী তার রং?

—ধূসর।

—কোত্থেকে উড়ে আসছে?

—জানিনে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে মুলকী কিছুটা কোমল ও নরম কণ্ঠে কয়ে উঠল :

—তুমি ফুল নেবে? প্রথম দিন আমার কাছে হাত পেতে তুমি ফুল চেয়েছিলে, আমি দেই নি; আজ দেব, নেবে?

পাহাড়ের নিস্তব্ধতা হতে কেউ কোনো উত্তর দিলে না : শুধু অসীম আকাশের প্রান্তে উড়ন্ত পাখিদের পাখার ম্লান-হয়ে-আসা অস্পষ্ট শব্দটুকু এখনো শোনা যাচ্ছে, যেন দূরান্তের চিরঅন্তরিত রহস্যময় গোপন বাণী বেদনার সুরে অতি ক্ষীণভাবে গোঙাচ্ছে। মুলকীর চোখের অন্ধকারের বাইরের বিরাট অত্যুজ্জ্বল শান্ত দিনটি বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে সেই গোঙানির সুরে, আর সে-ঘুম বেয়ে কোমল ব্যথার ওপর দিয়ে নিঃশব্দ চরণে কখন-যে মনির পাহাড় হতে নেবে গেছে মুলকী জানতে পারে নি; তার কান হয়তো সেই শূন্যতায় ভরে উঠেছিল, যে শূন্যতায় সৃষ্টির জন্ম।

কার্তিক ১৩৪৯ অক্টোবর ১৯৪২

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev