বৃহৎ জানলাটা খোলা।
ঝোড়ো হাওয়া ঝাপটা মারছে আমার সারা দেহে। খোলা জানলা দিয়ে ঢুকছে সে- হাওয়া—উদ্দাম মুক্তির নিশ্বাস নিয়ে। বন্ধনহীন হাওয়া ছুটছে জোরে কঠিন তীব্র হয়ে—জুঁই ফুলের শুভ্র কোমলতা গুঁড়িয়ে দিয়ে—তুলোর মতো উড়িয়ে নিয়ে।
লতিয়ে আছি বিছানায়, তার কোমলতার সাথে দেহের উষ্ণ কোমলতা মিশিয়ে। নিজকে মিশিয়ে দিয়েছি ভোরের উন্মত্ত আকুল আহ্বানের মাঝে, যেখানে তার লজ্জানম্র অরুণ পরশ বিলীন হয়ে গিয়েছে।
দূরে দীর্ঘ ঝাউগাছগুলোতে অবিশ্রাম মর্মরধ্বনি—বহু নিপীড়িতের করুণ মর্মভেদী আর্তনাদের মতো। বৃহৎ গাছগুলো অধীরভাবে দুলছে, আর সেই সঙ্গে দুলছে আমার হৃদয়। চোখ বুজে আছি পরম তৃপ্তিতে।
বৃষ্টির ছাটে আমার সারামুখ ভিজে যাচ্ছে, জ্বলজ্বল করছে আমার মুখ সিক্ত ফুলের মতো। চোখের পাপড়ি ভারি হয়ে উঠেছে, যেন আনন্দের আতিশয্যের মতো।
ঝোড়ো হাওয়ারই মতো এসেছে সেই লাল-প্যান্ট-পরা ছেলেটা—ছোট্ট পাখিটির মতো নরম কোমল।
তার ভেজা ঠোঁট দুটো ফাক হল একটু—
‘বাবু, পত্রিকা’
—জানলা দিয়ে কাগজসুদ্ধ সে হাতটা গলিয়ে দিলে, জলের অল্প ছাট-লাগা ভাঁজ করা কাগজ। ছোট্ট ছাতায় ঢাকা তার মুখ জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। কপালের ওপর চুলগুলো তার চঞ্চল হয়ে উড়ছে।
কচি মুখটি তার ক্লান্ত,—হাওয়ায় ছাতাটা সে স্থিরভাবে ধরে রাখতে পারছে না। বগলে তার একরাশ কাগজ, বাসায় বাসায় বিলি করবে।
ছোট্ট নরম পাখিটির মতোই ঠিক। বয়স হবে তের-চৌদ্দ। দেখতে কিন্তু অনেক ছোট। লাল প্যান্টটার ওপর হলদে শার্টটা তার গায়ের সঙ্গে খাপ খায় বেশ, — যেন দু’রঙা প্রজাপতি। তার কোমল মুখে শ্রান্তির আর ব্যস্ততার ভাব দেখতে বেশ লাগে। ঠিক যেন তিন-চার বছরের ছোট মেয়ের তার পুতুলের বিয়েতে চিন্তাযুক্ত ব্যস্ততার মতো।
বাড়ানো হাতটা নাড়লে সে— ‘নিন বাবু’।
ওর বাড়ানো হাত, আমার গুটানো হাত। ডাকলুম, ‘ভেতরে আয়।’ দরজা ঠেলে সে ভেতরে এল।
আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সে–ছোট্ট ভেজা ছাতাটা ঘরের কোণে রেখে। ছাতাটা বেয়ে জল ঝরছে। দরজার প্রান্ত থেকে ছেলেটার দাঁড়ানোর স্থান পর্যন্ত কয়েকটা ভেজা পায়ের ছোট্ট দাগ।
পূর্ণ নিস্তব্ধতার মাঝে ছেলেটি কেমন যেন নিশ্চল নির্বাক হয়ে পড়েছে। পড়বেই-তো,— ছেলেমানুষ! বাইরের উন্মত্ত কলরব থেকে এসে ঘরের সুগভীর স্তব্ধতার মাঝে স্তম্ভিত হয়ে পড়বে বৈকি। এখানে ঝড়ের ঝাপটা আর বৃষ্টির ছাট লাগছে না তার দেহে।
ও তাকিয়ে আছে আমার পানে, — স্বচ্ছ চোখ দুটোতে কৌতূহলের ছায়া।
ভালো করে বালিশটা জড়িয়ে নিয়ে বললুম —
‘নাম কী তোর?’
একবার ঢোক গিলে কম্পিত মৃদুস্বরে বললে—
‘শিশু।’
দূর থেকে ভেসে-আসা অপূর্ব বাঁশির সুরের মতো লাগল নামটা। চমৎকার! এ-যেন তার দেহের ভাষা!
তারপর পরিচয়, জানাজানি, যেন বসন্তের কানাকানি হয়ে গেল আকাশে-বাতাসে। শিশুর ঠোঁট-কাঁপা বন্ধ হল, স্থির হল তার কণ্ঠ। নিবিড় পরিচয়ের ইঙ্গিত জানিয়ে তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ফুটল মধুর অনাবিল হাসি–ঝরনার কলধ্বনির মতো।
দেহ ক্ষুদ্র, নাম ক্ষুদ্র, আর ক্ষুদ্র তার পরিচয়।
দূরে কোথায় কোন্ অজ্ঞাত পল্লিতে তার বিধবা মায়ের ছোট্ট নীড়টি,—উন্মুক্ত সুনীল আকাশের তলায়, স্নিগ্ধ নিবিড় সবুজ বনানীর ছায়ায়।
ঘুরে নীড়ের লক্ষ্য সে। তাই সে লাল প্যান্ট আর হলদে শার্ট পরে কাগজ বগলে নিয়ে বেড়ায়। মায়ের অপরিসীম স্নেহ বুঝি তার সারা দেহে জড়িয়ে আছে। তাই ঝড়ের ঝাপটা তার গায়ে লাগে না, বৃষ্টির তীব্র ছাট তার দেহে বেঁধে না। তার সারা দেহময় মায়ের প্রশান্ত বক্ষের উষ্ণতা, মাথার চুলে মায়ের কোমল আঙ্গুলের পরশ। তার সারা পথের কাঁকর আড়াল করে যেন বিছানো আছে মায়ের আঁচল, সারা বাতাসে যেন মায়ের মঙ্গলময় আহ্বান। চোখের সম্মুখে তার অহর্নিশি ভাসছে দুটি চোখ—মায়ের স্নিগ্ধ গভীর উজ্জ্বল চোখ, ধ্রুবতারার মতো। পথ চলতে তার ভুল হয় না, পথের আঘাত তার পায়ে লাগে না। তার দিনগুলো যেন রঙিন ফানুস, ইচ্ছেমতো সেগুলো ওড়ানো যায়।
নির্লিপ্ত—নিরুদ্বেগ—সুখী সে, মায়ের বক্ষের নীড়ে পরম নিশ্চিন্ত!—এত নিশ্চিন্ত যে, মেঘাচ্ছন্ন ভয়াবহ আকাশ তার কাছে বজ্রহীন।
শহরে সে কাগজ বিলি করে। দিনান্তে সে মায়ের কাছে ফিরে যায় কত খেয়া পার হয়ে, গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে, মেঠো রাস্তা বেয়ে, সাঁঝের আবছা আঁধারের মাঝখান দিয়ে, পথ চিনে-চিনে।
দুয়ারে প্রদীপ জ্বেলে মা হয়তো উৎকণ্ঠিতভাবে প্রতীক্ষা করেন সাঁঝের শ্রান্তিভরা নিস্তব্ধতায়। যে-পথটা দূরে বটগাছটাকে ঘিরে ওপাশে বিলীন হয়ে গেছে, সেদিকে মা বুঝি অনিমেষে তাকিয়ে থাকেন। প্রদীপের কম্পমান আলো পড়ে তাঁর মুখে, — চোখে তাঁর সুনিবিড় প্রশান্তি।
উন্মুক্ত আকাশে তারার মেলা, গাছগুলোতে স্বপ্নিল ছায়া। দূরে-দূরে পাখির মুখে ভাষা, আর বাতাসে ‘কে যেন এল’র গান।
মাথার কাছে খোলা জানলা—মায়ের বুকে ঘুমায় সে অঘোর ঘুমে। তারাগুলো সস্নেহে তাকিয়ে থাকে, চাঁদ বিছিয়ে দেয় তার রুপালি আলো।… সমগ্র রাত্রিব্যাপী স্নিগ্ধ নিটোল ঘুম। তারপর ভোরের আলো তাকে জাগিয়ে দেয়—কাঁচা সোনার মতো ভোরের আলোর রং। আচমকা জাগে সে, সোনার কাঠির পরশে জেগে ওঠার মতো।
হঠাৎ শিশুর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে ডাকলে, ‘বাবু’!
কেমন যেন চমকে উঠলুম। অজানা আশঙ্কায় মনটা দুলে উঠল। পুকুরের স্থির জলে কে যেন একখণ্ড পাথর ছুড়ে হঠাৎ আলোড়িত করে তুলল। প্রশ্ন করলুম, ‘কী রে?’
কিছু বললে না, কিন্তু কান্নার আবেগে ওর নাকের ডগাটা কাঁপছে। অবশেষে কান্না থামিয়ে বললে —
‘আজ দুদিন মার আমার বড্ড অসুখ, টাকার অভাবে ওষুধপথ্য দিতে পারছিনে। দুটি টাকা ধার দিতে পার আমায়?’
মনটা আমার হঠাৎ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। পাঁচটি টাকা হাতে দিয়ে বললুম, —
‘নে, ও ধার-টার কিছু নয়,—আরো যদি লাগে তো বলিস আমায়।’
তার জলভরা চোখের ভেতর মধুর হাসি ঝিকমিকিয়ে উঠল,—অবিশ্রান্ত বর্ষণের পর ঝলমলানো রোদ ওঠার মতো।
চলে গেল শিশু।
ঝড় তখন থেমে গেছে!…
তারপর দুদিন ভোরের আকাশ ছিল গাঢ় নীল, আর আলোর মাঝে ছিল চমক-লাগানো ঝলকানি। গাছের সজীব সবুজ পাতায় ছিল নবীনতা, আর মখমলের মতো তৃণভূমিতে ছিল দখিনা বাতাসের শিহরন।
সারা বিশ্বময় আলোর সমারোহ, সারা প্রকৃতিব্যাপী বিরাট প্রতীক্ষা, —কোথায় কে যেন আসবে।
এল না সে দুদিন ধরে, যে-দুদিন গেল আলোর ঝলমলানির ভেতর দিয়ে।
তারপর তৃতীয় দিন আবার সারা আকাশ ঘনিয়ে এল, বাতাস ছুটল জোরে, ধাক্কা মারলে আমার ঘরের রুদ্ধ দ্বারে। অস্ফুট আর্তনাদ করে দ্বার খুলে গেল।
বাইরে দাঁড়িয়ে শিশু, — সে যেন ঝড়ের বাণী।
ঘর আমার জলে ভেসে যাচ্ছে, আর উদ্দাম বাতাস যেন আশ্রয় খুঁজছে ঘরের কোনায়-কোনায়।
প্রাণের আনন্দ শিশুর মুখে ঝিকমিকিয়ে উঠছে। হেসে বললে, —
‘মার অসুখ সেরেছে।’
বুকটা আমার ভরে উঠল।
মার অসুখে তার বড্ড ভয় হয়েছিল, — সারা রাতদিন এক মুহূর্তের জন্যেও সে মায়ের পাশ থেকে নড়েনি। মা যেন লতিয়ে গেছেন বিছানায়। সারা দেহ যেন মূর্ছিত, স্তব্ধ কালো চোখ দুটি ক্লান্তিতে ভরা, আর শুভ্র দেহটি ছিল তৃপ্ত।
মায়ের অপরূপ মূর্তি। শুভ্র কাপড় পরা শুভ্র দেহটির মনোরম কান্তি। সারা মুখের স্নিগ্ধ দীপ্তির মাঝে বৃহৎ কালো চোখ দুটি গভীর, শান্ত ও উজ্জ্বল। আর অম্লান দেহটি যেন শেষরাতের জ্বলজ্বল শুকতারা!
শিশুর অনুযোগ, মা শুধু সাদা শাড়ি পরে। ওর আজন্মের সাধ, মাকে একবার রঙিন শাড়ি পরাবে, মেঘমুক্ত উজ্জ্বল নীল আকাশের মতো হবে শাড়ির রং।
শিশুর চোখদুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোনায় হাসির আভা ঝিকমিক করে উঠল।
বললে, —
‘আচ্ছা বাবু, মাকে তুমি কল্পনা করতে পার?’
সারামুখ তার আনন্দে টলমল করছে।
কিন্তু হঠাৎ পুকুরের স্বচ্ছ জলে পড়ল উড়ে-যাওয়া মেঘের কালো ছায়া। চোখদুটি তার ছলছল করে উঠল। বুঝলুম।
একটা হালকা নীল শাড়ি কিনে দিলুম। সে নাচতে-নাচতে চলে গেল—যেন একটা আনন্দের হাওয়া-ভরা কান্না উড়ে গেল। …গভীর রাতে স্বপ্নে দেখলুম আবোল-তাবোল, দেখলুম, শুধু হালকা নীল শাড়ি, আর একটি সুপ্ত ছেলের কচি মুখ।
…সন্ধ্যা হয়- হয়।
বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে পড়ছি একখানি বই সন্ধ্যার ক্ষীণ আলোকে। পড়ব আমি, যতক্ষণ পর্যন্ত অক্ষরগুলো আবছা না হয়ে উঠবে।
সামনে ক্ষুদ্র বাগানে অজস্র ফুল, তার রং লেগেছে আমার মনে। স্তব্ধ সন্ধ্যাটি আজ বড় শান্ত—বড় স্নিগ্ধ।
রুদ্ধ নিশ্বাসে আমি পড়ছি…যেখানে সত্যের আবরণে ঢাকা মিথ্যে অকস্মাৎ প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।
যাচ্ছে।
আমার এক বন্ধু এল। আমায় শেষ পর্যন্ত পড়তে দিলে না। অক্ষরগুলো এখনো পড়া বন্ধুটি হঠাৎ আমায় চমকে দিলে। সামনের দিকে ঝুঁকে বললে, ‘শিশু মায়ের কথা বলে তোর কাছ থেকে টাকা নেয় নাকি রে?’
চমকে উঠলুম।
‘হ্যাঁ—কিন্তু কেন?’
বন্ধুটি একগাল হাসল।
‘সব বাজে কথা। ওর মা-বাপ কেউ নেই, শুধু ফাঁকি দিয়ে টাকা মারে।
মাথাটা আমার ঝিমঝিম করছে।
বইয়ের এই কটা লাইন যেন বড় হয়ে আমার সম্মুখে নেচে বেড়াচ্ছে, — যেখানে রয়েছে সত্যের আবরণ থেকে নিষ্ঠুরভাবে মিথ্যের প্রকাশ হয়ে পড়ার কথা।
ক্ষুদ্র বাগানটা যেন জ্বলে উঠেছে…তারি তপ্ত আঁচ লাগছে আমার মনে। …
পরদিন শিশু এল। কাগজটা রেখে মধুর হেসে বললে,—
‘কাল মা বলল, তুমিও তার ছেলে। বাঃ! বেশ মজা হল—’
আমার ভেতরে যে-আগ্নেয়গিরিটা ফেটে পড়বার উপক্রম করছিল, সেটা যেন জাদুমন্ত্রে শীতল হয়ে গেল এক মুহূর্তে!–
তাকে কাছে টেনে এনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললুম, ‘হ্যাঁ, আমি হলুম তাঁর বুড়ো ছেলে—কেমন?’
অমন সরল স্বচ্ছ চোখ—ও কি মিছে বলতে পারে!
কিন্তু একদিন—
যেদিন কাগজে ভয়াবহ যুদ্ধের খবর—জার্মেনির অমানুষিক অত্যাচারের খবর, — সমগ্র জগদ্ব্যাপী আতঙ্কের সাড়া—
সেদিন—
কঠোরভাব প্রশ্ন করলুম,
‘সত্যি করে বল শিশু—তোর মা আছে?’
শিশুর মুখ মুহূর্তে পাণ্ডুর হয়ে গেল, ফ্যাকাসে…সামনের দেয়ালের মতো সাদা। চোখদুটি তার ভীতিচঞ্চল, আর ঠোঁট-দুটি অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে।
হঠাৎ সে অদ্ভুত স্বরে বললে, —
‘আছে—’
তারপর পালিয়ে গেল দমকা হাওয়ার মতো—সবকিছু যেন অকস্মাৎ ওলটপালট করে দিয়ে। বৃষ্টির একটানা ঝমঝমানি সুর আমায় অলসভাবে শুইয়ে রেখেছে। স্বপ্নাবিষ্ট চোখদুটি আমার ঘুরে বেড়াচ্ছে হারানো দিনগুলোর কোনায়- কোনায়—যেখানে ব্যথার রাশ জমা রয়েছে। মনে পড়ছে—এমনি বাদলা দিনে কে কবে বলেছিল একটি দুঃখের কথা, কে ফেলেছিল এক ফোঁটা চোখের জল।
কাগজ হাতে এসে ঠেকল—
‘বাবু।’—
করুণ কণ্ঠস্বর—যেন তেপান্তর হতে ভেসে আসা। চমকে উঠলুম। একদিনে কি শুকিয়েছে ছেলেটা!
আরো একটা কী যেন হাতে এসে ঠেকল, — কাগজে মোড়া নীল শাড়িটা, আর একটা পাঁচ টাকার নোট। দিয়ে সে কুণ্ঠিতভাবে চলে যাচ্ছিল।
ডাকলুম, —
‘শিশু!’
হাত দিয়ে স্পর্শ করলে প্রজাপতি যেমন কেঁপে ওঠে, তেমনি সে কেঁপে উঠল। তারপর কান্না আসবার আগে যেমন করে রুদ্ধ নিশ্বাসে লোকে কথা বলে, তেমনিভাবে কটা কথা সে এক নিশ্বাসে বলে ফেললে—
‘মিথ্যে কথা বলেছিলুম আমি, মা নেই আমার। কিন্তু মাকে অমনি করে ভাবতে আমার খুব ভালো লাগে বাবু…মিথ্যে কথা বলছিনে, বিশ্বেস কোরো।’
অনেক কিছু যেন তার বলবার ছিল, বলতে পারলে না। তবু মনে হল, তার ঐ না-বলার ভেতরই সব কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়ে গেছে।
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লুম। …
স্তব্ধ হয়ে পড়েছি,—বৃষ্টির একটানা সুর বুঝি আমায় চেতনাহীন করে ফেলেছে।
হারানো অতীতের একটি দিনের মতো সে আমার অজ্ঞাতে চলে গেল—জল-ঝরার শব্দের মাঝে নিঃশব্দে।
—ভাবছি শুধু, কী অদ্ভুত, কী আশ্চর্য!
আরো ভাবছি, হারানো দিনগুলো আজকের মতো অত মধুর-দুঃখময় নয়। মধুর- দুঃখময়,—কারণ, সে আর ফিরে আসেনি কখনো, ঝড়ের প্রভাতে ঝড়ের বাণী হয়ে আর আসেনি!
সুনির্মল মুক্ত আকাশ যে-চোখে সে অহর্নিশ দেখত, সে-চোখের নীলিমা তাকে টেনে নিয়ে গেছে বহু দূরে—কোথায় কে জানে!
ঘরের মধ্যে ভেজা পায়ের দাগগুলো কবে রোদের তাপে শুকিয়ে গেছে। বৃষ্টির ছাট আর ভালো লাগে না।
বৃহৎ জানলাটি বন্ধ।…