রবীন্দ্রনাথের গানের শব্দ পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা কোনও দিনই রবীন্দ্রনাথের অনুমোদন পায়নি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তাঁর সব সৃষ্টি কালের নিয়মে অপ্রাসঙ্গিক ও তামাদি হয়ে গেলেও তাঁর গানগুলি চিরকালীন হয়ে থাকবে। কথা ও সুরের এই আশ্চর্য মেলবন্ধন তাঁর এক ঐশ্বরিক সৃষ্টি। তাঁর গানের কথা বা সুরের উপরে কোনও রকম হস্তক্ষেপ রবীন্দ্রনাথ কখনওই সহ্য করতে পারতেন না। তাঁর বিপুল সৃষ্টিসম্ভারের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিল গানগুলি। তাদের তিনি লালন করেছেন সন্তানস্নেহে। এ নিয়ে ছিল প্রচ্ছন্ন অহংকারও। একবার দিলীপকুমার রায় ‘তোমার বীণা আমার মনোমাঝে’ গানটিতে নিজেই সুরারোপ করতে চাইলে রবীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি কি বলতে চাও আমার গান যার যেমন ইচ্ছা সে তেমনই ভাবে গাইবে? আমি তো নিজের রচনাকে সেরকম ভাবে খণ্ডবিখণ্ড করতে অনুমতি দেই নি। যে রূপ সৃষ্টিতে বাইরের লোকের হাত চালাবার পথ আছে তার এক নিয়ম, যার পথ নেই তার অন্য নিয়ম। আমার গানে আমি তো সেরকম ফাঁক রাখি নি যে, সেটা অপরে ভরিয়ে দেওয়াতে আমি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠব।’ অর্থাৎ তিনি স্পষ্টভাবে বলে গিয়েছেন যে, তাঁর রচনায় অন্য লোকের ‘হাত চালানোর’ কোনও অধিকার নেই। হাত চালাতে যাঁরা গেছেন, তাঁরা স্পষ্টতই নিন্দিত ও ধিকৃত হয়েছেন তাঁর কাছে।
বিশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত পেশাদার উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথের গানের কথা আর সুরকে বদলিয়ে নিয়ে নিজেদের খুশিমতো গাইতেন। রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়ে বারেবারে তাঁর অসন্তোষ আর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ১৯২০ সালে কে. মল্লিক গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে ‘আমার মাথা নত করে দাও’ গানটি রেকর্ড করেছিলেন কথা এবং সুরের যথেচ্ছ পরিবর্তন করে। কবির কথায়, ‘সে গান শুনিয়া আমার মাথা সত্যই নত হইয়া গেল।’
রবীন্দ্রসংগীতের আসল সম্পদ তার কথা, তার নিখুঁত শব্দচয়ন। তাই গানের প্রতিটি বাণীই প্রাণকে স্পর্শ করে যায়, গভীর উপলব্ধিতে চেতনা ঋদ্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রত্যেকটি গানের অন্তরালে রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কথা আর সুরের চয়ন এবং বয়ন-কাহিনি। গানের কথাতেই উন্মোচিত হয় কবিমনের মানসপট, অন্তর্লোকের ভাব-কল্পজগৎ, বাহ্যিক ঘটনাক্রম আর অবচেতনার অভিঘাত। তাই গভীর অনুভূতি আর মনন থেকে রচিত রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতিটি বাক্য শাশ্বত এবং কালোত্তীর্ণ। সেই বাক্যকে সামান্যতম বদল করার প্রচেষ্টা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে আঘাত হানার স্পর্ধিত অহংকার। সেটি তখন আর রবীন্দ্রসংগীত থাকে না। সম্পূর্ণ অনাবশ্যক এক কেলোয়াতি বলে মনে হয়। অঞ্জন দত্তর বং কানেকশন সিনেমায় পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে তে গানের মধ্যে ‘উলালা উলালা’ প্রিলুড বা ইন্টারলুডের ব্যবহার বিরাটভাবে সমালোচিত হয়েছিল। নচিকেতার ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা বাঙালি ভালোভাবে নেয়নি। ‘তবে একলা চলতে হয়’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করেছিল। ঋতুপর্ণ ঘোষ ‘অসুখ’ সিনেমায় যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন রবীন্দ্রগানে, তাও সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন পায়নি, সমালোচিত হয়েছিল। কবরী বাঁধার কোনও পরিবর্তন বাঙালি মানতে চায়নি।
খেয়া কাব্যগ্রন্থের ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের অনুমতিক্রমে পঙ্কজকুমার মল্লিক সুরারোপ করলেও সেটি রবীন্দ্রসংগীতের তকমা পায়নি কিংবা গীতবিতানেও অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
১৯৪০ সালে জোড়াসাঁকোর বিচিত্রা ভবনের এক অনুষ্ঠানে গভীর বেদনায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমার গান যাতে আমার গান বলে মনে হয় এইটি তোমরা কোরো। আরো হাজারো গান হয়ত আছে, তাদের মাটি করে দাও-না, আমার দুঃখ নেই। কিন্তু তোমাদের গান যেন আমার গানের কাছাকাছি হয়, যেন শুনে আমিও আমার গান বলে চিনতে পারি। এখন এমন হয় যে, আমার গান শুনে নিজের গান কিনা, বুঝতে পারি না। নিজে রচনা করলুম, পরের মুখে নষ্ট হচ্ছে, এ যেন অসহ্য।’ শুধু রবীন্দ্রসংগীত কেন, কোনও শিল্পীর সৃষ্টিকে কাটাছেঁড়া করা বা তার উপরে কলম চালানোর অধিকার আমাদের কারও নেই।
রবীন্দ্রনাথ যখন নিজেই তাঁর গানের কথা বা সুরকে পরিবর্তন করবার অনুমতি দেননি, বরং বারবার আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, তখন কেন সর্বত্র এই ‘খোদার উপর খোদকারি’র চেষ্টা?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের বাণী এতই নির্দিষ্টভাবে সুরসংশ্লিষ্ট যে, কিছুতেই তার পরিবর্তন করা যায় না। এটা করতে গেলে ভাব ও ভঙ্গি, দু-টোই বদলে যায়। তাই সে চেষ্টায় তিনি নিজেই সকলকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন।