“আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে/তাই হেরি তায় সকল খানে”….
কয়েকদিন আগে পঁচিশে বৈশাখ আমাদের দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কলকাতার জোড়াসাঁকো এসেছিলেন কবিগুরুকে তাঁর জন্মদিনের শ্রদ্ধা জানাতে। এই কয়েক বছর ধরে সামনে ভোট আসলেই বিজেপির বেশ হিড়িক পড়েছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। যেন বাঙালির প্রাণের ঠাকুরের রচনা থেকে দু লাইন কবিতা গান আওড়ে জয় করে নেবো বাংলা!! কিন্তু বারংবার চেষ্টাতেও হাত সেই খালি করেই ফিরতে হচ্ছে। কেন জানেন?
অমিতবাবু, আপনি সহজ পাঠ পড়েছেন? ওই যে, “আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে… বনে থাকে বাঘ… রাম বনে ফুল পাড়ে… কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি?”
পড়েননি তাই জানেন না… এই সহজ পাঠের সাবলীল পথে হেঁটেই আমরা হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েছি যে ঠাকুরকে তাকে চিনতে জানতে দেশ বিদেশের পড়ুয়ারা পাতার পর পাতা থিসিস লেখে। মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা জোড়াসাঁকো কিংবা শান্তিনিকেতনে বসে থাকে। অনুভব করে কি ছিলো সেই মহামানবের লেখনীতে যা আজও অনুরণিত বাঙলী সমাজজীবনের প্রতি ক্ষণে সেখানে আপনিও পড়লে কোনোদিনই পঁচিশে বৈশাখ পালন করতে এইভাবে ছুটে আসতেন না বাংলায়।
আপনি কি জানেন, এখানে প্রতিটি বাঙালি শিশু প্রথম পাঠ বলতে শেখে রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গী করে। সেখানে আপনি কিভাবে একাত্ম হবেন আমাদের প্রাণের ঠাকুরের সাথে। রাজনীতি দিয়ে ঠাকুরকে জয় করা যায় না। এ ঠাকুর আমাদের প্রাণের ঠাকুর। আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। আপনার ক্ষুদ্র স্বার্থে এ ঠাকুর ধরা দেয়না। সেই আকাশের মত উদারতা আপনার কিংবা আপনার দলের কারো নেই। থাকলে এই হানাহানি, বিদ্বেষ-এর রক্তদাগ লাগতোই না ভারতের বুকে।
মজার বিষয়, আপনি তো এটুকুই জানেন না যে, বৈশাখের পঁচিশ তারিখ ‘রোবিন্দ্রণাথ টেগোর’-এর জন্মদিন নয়… বাঙালীর প্রেম, বিরহ, আনন্দ, দুঃখ, চেতনা, চৈতন্যের আত্মা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। অমিতবাবু বাঙালী রবীন্দ্রনাথকে শিরায় উপশিরায় ধারণ করে আছে। পঁচিশে বৈশাখ আপামর বাঙালী তাঁকে স্মরণ করে প্রিয়জনের মত।
ঠাকুর প্রণামের বাহানায় আপনার এই রাজনীতি তাই হাস্যকর। কি মনে করছেন রাজনীতি দিয়ে কবিগুরুর শিকড়ের সন্ধান খুঁজে পাবেন? যাঁকে কোনোদিনই মননে ধারণ করবার ক্ষমতা হবে না আপনাদের মত ব্যবসায়িক স্বার্থ কায়েমী মানুষদের। তাঁকে বুঝতে গেলে রাজনীতির দাড়িপাল্লা সরিয়ে রাখতে হবে।
এইযে পঁচিশে বৈশাখ আপনি এলেন যেন মনে হলো আয়োজন শুধু আপনারই আসার…. উদ্দেশ্য তো বাহানা মাত্র। চারদিকে মিডিয়ার সাজসাজ রব। আপনি কখন নামছেন? কোন গাড়িতে উঠছেন? মালা কখন দেবেন? মালার সাইজ কত… এসবের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে আপনারই তো জয়গান গাওয়া হচ্ছে। ঠাকুর তো বিস্মৃত!
আসলে ভোট আসছে তো… এগুলো এখন বাঙালী বোঝে জানেন তো! সামনেই পঞ্চায়েত তারপর লোকসভা… এখন পরপর পরীক্ষা। তাই রবীন্দ্রনাথকে পাকড়াও করে সাংস্কৃতিক খোঁচা দিয়ে ভোট টানার কৌশল আর কে না বোঝে! তা না হলে উত্তরপ্রদেশে সিলেবাস থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যে বাদ দেওয়া হয়েছে সেটা জেনেও তো নীরবে আছেন দিব্য।
আপনি কি ভাবছেন আপনাদের ওই গরু, গোবর, ভাগাভাগির মাঝে রবি ঠাকুরকেও জায়গা করে দেবেন? আর সেটা বাঙালী মেনে নেবে? জেনে রাখুন, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাংলার আবেগ এক জিনিস। আর বাংলার ভোটারের ভোট সচেতনতা আরেক জিনিস। দুটো ভাবনা সম্পূর্ন বিপরীত দিকে অবস্থান করে। রবীন্দ্রনাথ দিয়ে বাংলার ভোটারের মন জয় করার বাসনা ত্যাগ করুন। কারণ আপনি চব্বিশ পর্যন্তও যদি কবিগুরুর মূর্তির পাশে বসে থাকেন তাও বাঙালী আপনাদের ভোট দেবে না। বাংলার মানুষ এসব দেখে ভোট দেয়না। কেন শুধু শুধু রোদে গরমে পুড়ে এইসব করতে আসেন বলুন তো?
আপনি আসলে এখনও জানেন না… বাঙালীর কিছু জিনিস সার্বজনীন। যেমন দুর্গাপুজো, ঈদ, বড়দিন আমরা জাতি ধর্ম বর্ণ ও সকল রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে একত্রে পালন করি ঠিক তেমনি রবীন্দ্রজয়ন্তীতেও আমরা সার্বজনীন। সেখানে তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস, বিজেপি হয়ে কে প্রচারের আলো টানলো তার দড়ি টানাটানি নেই।
ছিলোও না কখনো। আপনারাই ক্ষমতার লোভে বারংবার ভাগাভাগির কুৎসিত নেশায় মেতে উঠেছেন। আমাদের উৎসব, আমাদের মহাপুরুষ, আমাদের গৌরব গর্বকে নিজেদের কুট রাজনীতির চালে শুধু অসন্মান করে চলেছেন। কিন্তু আমরা বাঙালী… রবীন্দ্রনাথের আবেগ অনুভূতি দিয়ে আমরা ভোটের ময়দানে লড়াই করিনা। সেটা এখনো আপনারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।
আচ্ছা অমিতবাবু আপনি নিশ্চিত জেনেছেন গত পঁচিশ তারিখ রবীন্দ্রনাথের কর্মক্ষেত্র তাঁর সাধের শান্তিনিকেতন আশ্রমে পালিত হয় নি ওনার জন্মদিন। হবেই বা কি করে! ওখানে তো আপনারা দেড় ইঞ্চি জমির জন্য অমর্ত্য সেনের মত ব্যক্তিত্বকে হেনস্থা করতে উঠেপড়ে লেগেছেন!
অমর্ত্য সেনের বাবা মায়ের পরিচয় জানা আছে আপনার? আপনি জানেন এই অমর্ত্য নামটা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের দেওয়া। যিনি শুধু বাঙালী নন গোটা দেশের গর্ব। সেই মানুষটিকে আপনারা রোজ অপদস্থ করছেন। কি ভাবছেন বাঙালী এসব জানে না? বোঝে না? যদি না হয় তাহলে বিদ্যুৎ চক্রবর্তীকে এসব অসভ্যতামী বন্ধ করতে বলুন। তবে তো বুঝবো আপনি রবি ঠাকুরের পুজোর যোগ্য।
শুনলাম আপনি নাকি রবীন্দ্রনাথের ঠিকুজি কুষ্ঠির খোঁজ নিচ্ছেন। বাঙালীর ঠিকুজি কুষ্ঠি যদি একটু পড়তেন তাহলে এই মেকি ঠাকুর প্রেম দেখাতে মাঝেমধ্যেই ছুটে আসতে হতো না।
আসলে কি বলুন তো… আপনি ফুলের সমুদ্র এনে ঠাকুরের পায়ে অর্পিত করলেও আপনার পূজা সম্পূর্ন হবে না। হতে পারে না। যে ঠাকুরকে একাধারে শান্তিনিকেতনে অপমান করছেন অন্যধারে কলকাতায় মাল্যদান করছেন… এই দ্বিচারিতা আমরা বুঝি। ভোটের হিসাব করতে এসেছেন তো? এর ফল বাঙালী সেই হিসেবেই বুঝিয়ে দেবে।
গুরুদেবের আদর্শ যে জাতির রোজকার জীবনের সূর্যোদয়ের সঙ্গে উদিত সেই অমোঘ ভালোবাসার বাঁধন খোলার চেষ্টা করবেন না। এতে হিতে বিপরীত হবে। বাঙালী উৎকট স্বাধীনতাভোগী নয়। বাঙালী সংযমী… সৃষ্টি কৃষ্টির বাহক। এই সংস্কার আমরা রবি ঠাকুরের থেকেই শিখেছি। তাকেই তো রোজ বয়ে নিয়ে বেড়ায় বাঙালী। আপনার ক্ষমতা কি খন্ডানোর। বৃথাই সে চেষ্টা।
আপনাদের অতীতের মতো আগামীতেও খালি হাতেই ফিরতে হবে। ঠিক যেভাবে কর্নাটক ফিরিয়ে দিলো। ঘৃণার চাষ তো সেখানে কম করেননি প্রচারে। কিন্তু জনগণ আপনাদের ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দেখালো সবার উপরে মনুষ্যত্ব। সেখানে কোনো জাতি, ধর্ম, বর্ন, রঙের জায়গা নেই। আগামীদিন বাংলা তথা গোটা দেশ দেখাবে ভারতবর্ষ সূর্যের নাম কেন?
১৬.০৫.২০২৩