মানুষ আসে সমুদ্র দেখতে। আর সমুদ্রের মুখ ঢেকেছে হোটেল। অথচ তার চেহারা সাফসুরত রাখতে মানুষ আইন বানিয়েছে। কিন্তু কে আর মানে সেই আইনকানুন! একেকটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর প্রকৃতির রোষ তছনছ করে দেয় উপকূলের বুকে গজিয়ে ওঠা সেসব কুৎসিত নির্মাণ। তবুও আমাদের হুঁশ ফেরেনা! ইয়াসের ধ্বংসলীলা আমাদের অপদার্থতা ও নির্লজ্জ লোভের চেহারাটাকে আবার সামনে আনলো।
প্রকৃতির কাছে মানুষ যায় তার মনের ব্যাটারিটাকে একটু রিচার্জ করে নেওয়ার জন্য। কিন্তু একশ্রেণীর হোটেল ব্যবসায়ীর টাকা বানানোর নেশা সেটুকুও কেড়ে নিতে চাইছে। দীঘা, তাজপুর, মন্দারমণি, শঙ্করপুর-এ রাজ্যের সমুদ্রসৈকতগুলির দিকে তাকালে এই লোভের চেহারাটা স্পষ্ট হয়। সৈকত দখল করে বেআইনিভাবে গড়ে উঠছে হোটেল, বসছে হাটবাজার। অবাঞ্ছিত নির্মাণের দাপটে মানুষ সাগরের শান্ত সৌন্দর্যটাকে উপভোগ করতে পারেননা। এতে কিন্তু ভ্রমণবিন্দুগুলির আকর্ষণ কমছে।

এদিকে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা লাগাতার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, বঙ্গোপসাগরের জলস্তর আরও এক মিটার বাড়লেই রাজ্যের লক্ষাধিক হেক্টরব্যাপী উপকূলবর্তী এলাকা ভেসে যাবে। আয়লা, আমফান আর সাম্প্রতিক ইয়াস একথার সত্যতা প্রমাণ করেছে। কিন্তু আমাদের লোভ আর অভ্যাস বদলায়নি। এমনকি ইয়াস এর পরও মন্দারমনিতে আবার শুরু হয়ে গেছে হোটেল বানানোর কাজ!
টুরিস্টদের চোখের সামনে সমুদ্রকে অনুগত ভৃত্যের মত হাজির করানোর এই প্রবণতা যে অবশেষে মানুষকেই বিপন্ন করবে এই সরল সত্যটুকু হোটেল ব্যবসায়ীরা বুঝছেন না। ক’দিন আগে সংবাদপত্রে দেখলাম, মন্দারমণিতে আবার সমুদ্রের কাছেই হোটেল নির্মাণের ছবি! আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে হোটেল মাফিয়ারা। কোস্টাল রেগুলেটরি জোন অ্যাক্ট অনুযায়ী এখানে কোনসময়েই হোটেল বানানোর কথা ছিলনা। তা তৈরি হয়েছিল আইন ভেঙেই। এখন প্রকৃতির রোষ যখন পূর্বাবস্থাকে ফিরিয়ে এনেছে তখন সাগরের কান ঘেঁষে আবার হোটেল বানানোর এই চেষ্টাকে রুখতেই হবে। আশার কথা এই যে, এমন বেআইনি কাজ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখে পড়েছে। তিনি এই অপকর্ম রোধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।

শুনতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি যে, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের মদত ছাড়া এই বেআইনি নির্মাণ সম্ভব নয়। এটা একটা কোটি কোটি টাকার খেলা। স্থানীয় পরিবেশপ্রেমীদের সংগঠনগুলি সব জায়গাতেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু হোটেল বানানো বন্ধ হয়না। আশ্চর্যের কথা এই যে, বেআইনি হোটেল ব্যবসায়ীরা এখন ক্ষতিপূরণের দাবিও করছেন! প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে বৈধ করতে চাইছেন তাদের বেআইনি ব্যবসা। এই অপকর্ম আটকাতেই হবে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রবল ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পাশাপাশি রাজ্যের উপকূলবর্তী এলাকাগুলিকে বেআইনি দখলদারদের থেকে মুক্ত করার একটা সুযোগও করে দিয়েছে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। কেউ কেউ এটাকে রুটিরুজির প্রশ্নের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। প্রশ্ন হল, খেতে পাচ্ছিনা বলে অন্যের থেকে কেড়ে খাওয়া যেমন অন্যায়, ঠিক তেমনি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষকে বিপন্ন করে সমুদ্রের ধারে বেআইনি নির্মাণ করা তার চেয়েও বড় অন্যায়। মানুষের লোভ ও দূষণে প্রকৃতির খামখেয়ালীপনা বাড়ছে, অবশেষে বিপন্ন হচ্ছে মানুষই। উপকূল এলাকা থেকে বেআইনি দখলদার ও নির্মাণ সরানোর এটাই আসল সময়। দেরি করলে আমরা রাজ্যের সৈকতগুলিকে রক্ষা করার সুযোগ হারাবো।
সময়োপযোগী লেখা। এখন কথা হচ্ছে এই বেআইনী হোটেল ব্যবসায়ী কারা ? বেশীরভাগই রাজনৈতিক ব্যবসার কালো টাকা আইনী করার আর একটি বেআইনী পথ। বেশিরভাগটাই বেনামে। কাটমানি,স্মাগলিং,কয়লা,গরু পাচার ও নানা বেআইনী কারবারে উর্পাজিত কালো টাকা হোটেল ব্যবসায় খাটছে। মুখ্যমন্ত্রীর নজরে পড়েছে ? উনি কি ঘর থেকে শুরু ক’রবেন ? ভালো। আশায় চাষা।