‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে/উঁকি মারে আকাশে…’
ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই শিশুতোষ কবিতাটি হাত-পা নাড়িয়ে আবৃত্তি করেনি, এমন ছাত্র-ছাত্রী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। পালকি চড়ে পাবনার শাহজাদপুরে আসার সময় পথের দুধারে লম্বা লম্বা তালগাছ দেখেই নাকি শিশুতোষ কবিতাটি লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।
আসলে ভাদ্র মাস এলেই মনে পড়ে তালের কথা। আর তালের কথা মনে হলে অজান্তেই তাল ফুলুরি/বড়া, তালের ক্ষীর, লুচি, পিঠে… খাওয়ার জন্য মন আকুলি বিকুলি করে ওঠে। বারমাসে তেরো পার্বণের বাংলাদেশে সব সময়ই পাওয়া যায় বিভিন্ন ফল। ভাদ্রমাসের ফল তাল, একটি সুস্বাদু ও লোভনীয় ফল। প্রবাদ আছে ভাদ্র মাসে তাল পাকে গরমের প্রভাবে।
সারাবছর ধরেই এখন তাল পাওয়া যায়। কথায় বলে, ‘ভাদ্র মাসের তাল না খেলে কালে ছাড়ে না’, আর সেই তালের ম-ম গন্ধে তাড়িয়ে তাড়িয়ে তাল ফুলুরি খাওয়ার উৎসব হলো নন্দোৎসব। —‘তালের বড়া খেয়ে নন্দ নাচিতে লাগিল’।
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে জন্মাষ্টমী পালিত হয়। কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল রাত্রে। গোকুল রাজ নন্দ সেই আনন্দে উপহার বিতরণ করেছিলেন। জন্মাষ্টমীর পরের দিনই ভারতের বহুস্থানে পালিত হয় নন্দোৎসব। নন্দ উৎসবেই প্রথম খাওয়া হয়েছিল তালের বড়া। ভাদ্র মাসে জন্ম হওয়ার কারণে পাকা তাল কৃষ্ণের অতি প্রিয়। জন্মাষ্টমীকে বলা হয়ে থাকে ঠাকুর জনম। পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় ধুমধাম করে পালন হয় নন্দোৎসব। শিশুরা শ্রীকৃষ্ণের জীবনসংক্রান্ত বিভিন্ন ছড়া কেটে, গান গেয়ে বাড়ী বাড়ী থেকে সংগ্রহ করে তালের বড়া।

জীবনে অতি ব্যস্ততার মধ্যেও ঘরে ঘরে বানানোর রেওয়াজ চলে যাচ্ছে। অথচ বাঙালির এই খাবারটির প্রতি দুর্বলতা বহু পুরোন। অগত্যা নির্ভর হতে হয় মিষ্টির দোকানগুলোতে। বাড়ির গৃহদেবতাকে ভোগ দেওয়া জন্যই হোক কিম্বা রসনা পরিতৃপ্ত করতে, গৃহস্থ থেকে সাধু-সন্ন্যাসীদের নির্ভরতার স্থান দোকান। তালের বড়া তৈরির পরিশ্রম থেকে রেহাই পেতে দোকান থেকে কিনে আনাই সহজ পন্থা বলে মনে করেন বাড়ির গৃহকত্রী।
তালে থাকে প্রচুর পরিমাণ খনিজ ও আঁশ। প্রোটিন, শর্করা, চর্বি, অ্যামাইনো অ্যাসিডেরও ভালো উৎস তাল। এ ছাড়া আছে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক ও আয়রন।
তাল গাছকে ঘিরে বাঙালির তথা বাংলার তাল বেতালের গল্প নেহাত কম দিনের নয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তালনবমী’ গল্প প্রায় অনেকেই পড়েছেন৷ তালনবমী এক করুণ ছোটগল্প। গাঁয়ে গঞ্জে তালনবমীর ঘটনা কিন্তু বিরল নয়। এই গল্পটিকে নিয়ে একটি সিনেমাও তৈরী হয়েছে।
দেবী দুর্গার একটি ব্রতর নাম তালনবমী। দেবীকে বলা হয় তালুজা। হয়তো সেই নামের অপভ্রংশের নাম তালনবমী। ভাদ্র মাসে শুক্লা পক্ষে রাধাষ্টমীর পরদিন নবমী তিথিতে পালন করা হয় এই ব্রত।

তালগাছের কথা উঠলেই আরেকটা কথা মনে পড়ে— সেটা হল তালগাছের ভূত। ছোটবেলায় তালকে যেমন ভালো লাগতো তেমনি ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে থাকা তালগাছের ভূতের গল্প শুনলেই ঘুমিয়ে পড়তাম।
লোডশেডিং এর দাপটে তালপাতার পাখায় যে কত রাত হাওয়া খেতে হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই।
তাল কে ঘিরে বাংলার লোকায়ত ব্রত-পার্বন, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলের জীবনের সঙ্গে তাল, ‘তালের বড়া’ বাঙালদের ভাষায়, আর ঘটিদের ভাষায় ‘তাল ফুলুরি’, তালের ক্ষীর, মালপোয়া, শীতকালে তাল পাটালি, তালের রস, আমুদে লোকেদের জন্যে তালের তাড়ি— সব মিলিয়ে একটা জমজমাট ব্যাপার আরকি!
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের কারণে তালগাছ আজ কমতে কমতে বিলুপ্তপ্রায়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বজ্রপাত প্রতিরোধ, নদীভাঙ্গন ঠেকানো, জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন মোকাবেলায় বড় ভূমিকা রাখে তালগাছ। তালগাছ আত্মপ্রত্যয়ী এবং আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক। অনির্বচনীয় স্বাদ গ্রহণ করতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সুউচ্চ, ঋজু তালগাছ রক্ষা করতে হবে।