ধূপ, ধুনো, ফুল, আরতি, শঙ্খধ্বনি ভেসে আসছে আজ কমবেশি প্রতিটি বাড়ি থেকেই। উমা ফিরে যেতে না যেতেই ধনদেবীর আরাধনায় মেতে উঠেছে গোটা বাংলা। আজ বলবো এই বাংলারই কিছু ব্যতিক্রমী লক্ষ্মী পূজার কথা।
বাতাসে হিমের হালকা পরশ। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধান ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়া জোৎস্নার আলো জানান দিচ্ছে কোজাগরী পূর্ণিমা আগত। এমনই ফুটফুটে জ্যোৎস্না রাতে প্রত্যেক বছরের ন্যায় রাত জেগে ছায়া ও ছবির দুই মূর্তিকে দুপাশে নিয়ে লক্ষ্মীর আরাধনায় প্রাচীন ঐতিহ্যে মেতে ওঠে বীরভূম জেলায় অবস্থিত মুরারই থানার গোঁড়শা গ্রামের বাসিন্দারা।
শতাব্দী প্রাচীন এই লক্ষ্মী পূজোই গোঁড়শা গ্রামের মূল উৎসব। ধনৈশ্বর্য ও সৌভাগ্যের দেবীর লক্ষ্মীর আরাধনার জন্য পূর্ব পাড়ায় লক্ষ্মী দেবীর নামে যে তিন বিঘা জমি ও পুকুর আছে, সেই জমিতে ধান ও পুকুরে মাছ চাষ করে যে আয় হয় এবং সঙ্গে এলাকার বাসিন্দাদের থেকে চাঁদা তুলে সেটি ভাগ করে গ্রামের পূর্ব পাড়া ও পশ্চিম পাড়া একত্রে দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্মী পূজার আয়োজন করে আসছে। সম্প্রীতির বাতাবরণে প্রাচীন প্রথা মেনে সৌহার্দ্যপূর্ন পুজা উদযাপন করাই এই গ্রামের রীতি।
কোজাগরী মানেই জাগরণের রাত। দুই পাড়ার উদ্যোক্তারা তাই লক্ষ্মী পূজার রাতে কোন বছরে যাত্রাপালা, কোন বছরে বাউল গান বা কোন বছরে কবিগানের মধ্যে দিয়ে রাত জাগেন। দুই পাড়াতেই পাকা দালানের মন্ডপ রয়েছে। দুই পাড়াতেই পদ্মফুলের উপর লক্ষ্মী প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে এক পাটাতনে বাম ও ডানে ছায়া ও ছবি নামে দুই মূর্তিকে সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়।
লক্ষ্মী পূজার পরের দিন পরে চাঁদ যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, বাতাসে হালকা কুয়াশায় চাঁদের আলো যখন মিশে যাবে ঠিক তখনই দুই পাড়া ঢাক ঢোল বাজনার তালে ঠাকুর ভাসানের জন্য গ্রামের ল-পুকুর পাড়ে নিয়ে যায়।
বিসর্জনের সময় বাজি ফাটানোর প্রতিযোগিতা হয়। ল-পুকুর পাড়ে দুই পাড়ার এক পাড়া যদি বাজির মধ্যে কদমগাছ ফুটিয়ে তোলে,তখন অন্য পাড়া চর্কি বাজিতে আলোর রেশনাই নিয়ে রাঙিয়ে তোলে আকাশ। প্রায় দু-ঘন্টা ধরে দুই পাড়ার মধ্যে বাজি প্রতিযোগিতা চলার পর, যখন সূর্য লাল হয়ে পুব আকাশে উঁকি মারে, তখন প্রতিমা বিসর্জন হয়।
লক্ষ্মীপূজো ঘিরে পশ্চিমপাড়ায় বসে গ্রামের মেলা। শতাব্দী প্রাচীন গোঁড়শা গ্রামের এই “ছায়া ছবি মূর্তির লক্ষ্মী” পুজো ঘিরে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনে ভরে যায়। আশপাশের এলাকার হিন্দু মুসলিম সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ গোঁড়শা গ্রামের এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মী পূজার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন।

এবার বলবো বিনপুর-২ ব্লকের হাড়দা গ্রামের লক্ষ্মী পূজার কথা। একশো তেষট্টি বছর পুরোনো এই পুজোয় একই চালায় লক্ষ্মী আর সরস্বতী একসঙ্গে পূজিত হয়। এটাই রীতি এখানকার।
বিষ্ণুপুরাণ অনুসারে লক্ষ্মী (সম্পদ, সৌভাগ্য, বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার দেবী) এবং সরস্বতী (জ্ঞান, শিল্পকলা ও সঙ্গীতের দেবী) উভয়ই ভগবান নারায়ণের স্ত্রী। এই গ্রামে বিষ্ণুপুরাণ মতে পুজো করা হয়। তাই এখানে মা লক্ষ্মী একা আসেন না, সঙ্গে থাকে দেবী সরস্বতীও (সাধারণত চালায় লক্ষ্মীর বাম দিকে থাকেন সরস্বতী)। এছাড়াও লক্ষ্মী ও সরস্বতীর দু-পাশে চার জন সখী থাকেন। লক্ষ্মী সরস্বতীর সঙ্গে থাকেন দু’জন সেবাদাসীও। তাঁদের উপরে থাকেন ‘লুক-লুকানি’, এবং মাথার উপরে থাকেন নারায়ণ। আশ্বিনের কোজাগরী পূর্ণিমায় এইভাবেই ‘একই চালি’ বা ‘একই চালায়’ দেবীর আরাধনা করা হয়।
হাড়াদা হল ঝাড়গ্রাম জেলার বিনপুর ২ নম্বর ব্লকের একটি গ্রাম। এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীনত্ব।১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে গ্রামের মোড়ল স্বপ্নদৃষ্ট হয়ে মন্ডল-বাকুলের পারিবারিক কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার শুরু করেন। এখন গ্রামে স্থায়ী লক্ষ্মী মন্দির রয়েছে। প্রতিবছর একই কাঠামোর উপর মৃন্ময়ী প্রতিমা তৈরি করা হয়।
এই গ্রামের বিশেষত্ব হলো লক্ষ্মীপূজার জিলিপি। চাল গুঁড়ো, বিউলি ডালের গুঁড়ো ও সামান্য ময়দা মিশিয়ে এক বিশেষ ‘খামি’ বানানো হয়।অন্য রকম পদ্ধতিতে বানানো অত্যন্ত সুস্বাদু এই জিলিপির টানে ভিড় জমান জেলার নানান প্রান্তের মানুষ। এই উৎসবের মরশুমে প্রায় ৩০০ কুইন্টালের বেশি জিলাপি বিক্রি হয় এখানে। নিলামের মাধ্যমে মন্দির প্রাঙ্গণে মাত্র এক জনই বরাত পায় এই দোকান দেওয়ার। ভিড় এড়াতে প্রথম এবছর অনলাইনে জিলিপির বুকিং শুরু হল। জিলিপির দাম ১০০ টাকা কেজি নির্ধারিত হয়েছে। জিলিপি বিক্রির বরাত কে পাবেন তার জন্য গ্রামের মন্দিরে ডাক (নিলাম) হয়েছে। অনেকেই অংশগ্রহণ করেছিলেন। শেষে দু লক্ষ নিরানব্বই হাজার টাকায় জিলিপি দোকানের বরাত পেয়েছেন সিন্টু সাহা। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ওই একটা দোকানেই জিলাপি কেনেন।

হাড়দা গ্রামে সাহা ও মণ্ডল পরিবারের উদ্যোগে এই পুজো হয়ে থাকে। জিলিপি, ফল,অন্নভোগের পাশাপাশি থাকে নাড়ু, লুচি ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়।
টানা পাঁচ দিন ধরে চলা এই বিরাট কর্মকাণ্ডে পুজোর পাশাপাশি থাকে যাত্রাপালা-সহ বহু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যা আয়োজন করতে গড়া হয় কমিটি। এই পুজোয় বাইরে থেকে কোনও চাঁদা তোলা হয় না। হাড়দা গ্রামের বসবাস ৫০০টি। সাহা-মণ্ডল পরিবারের থেকে পুজোর চাঁদা দেওয়া হয়। এই বছরও অন্য বারের মতোই লক্ষ্মী পুজো ঘিরে সাজ সাজ রব। সুযোগ হলে অবশ্যই করে আসুন এই গ্রাম থেকে পুজোর সময়।
এই গ্রামে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোয় মহাসমারোহ হয়! তিন রাত ধরে চলে বাউল গান। ২৯ বছর আগে মন্দির বানিয়ে পুজো শুরু করেন গ্রামবাসীরা। সারা বছর নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে দু-বেলা পুজো হয়। তবে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর দিনটিতে মহাসমারহের সঙ্গে পুজোর আয়োজন করা হয়। এই পুজো ঘিরে গ্রামে চালু রয়েছে কড়া নিয়ম। পুজো উপলক্ষ্যে কয়েকদিন ধরে গ্রামের কোনও বাড়িতে আমিষ রান্না হয় না। কারণ দশমী শেষ মানেই এই গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীর পুজো শুরু।
উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ ব্লকের ৭ নম্বর ভাণ্ডার গ্রাম পঞ্চায়েতের পূর্ব ভাণ্ডার গ্রামে কোজাগরি পূর্ণিমায় লক্ষীনারায়ণের প্রাচীন মূর্তি ঘিরে তিন রাত ধরে চলে বাউল গান।
সালটা ১৯৯৬। কথিত আছে অন্যের জমিতে চাষ করছিলেন কৃষক নরেশ বর্মন। এই জমির মালিক ছিলেন গোকুল চন্দ্র বর্মন। নরেশ এই জমিতে চাষ করার সময় তার লাঙ্গলের ফলায় লেগে যায় একটি পাথর। পাথরটিকে তুলে পরিষ্কার করলে দেখতে পাওয়া যায় সেটি একটি লক্ষী নারায়ন মূর্তি। মূর্তিটি লম্বায় প্রায় দেড় ফুট, চওড়ায় প্রায় এক ফুট। খবর পেয়ে ছুটে আসে প্রশাসনের কর্তারা। কিন্তু মূর্তিটিকে নিয়ে যেতে বাধা দেয় গ্রামের লোকজন। তারা বলে এই মূর্তি তাঁরা প্রশাসনের হাতে তুলে দেবেন না। অতএব নিরাশ হয়ে খালি হাতে ফিরে যায় প্রশাসনের কর্তারা। ১৯৯৬ সাল থেকেই এখানে পুজো শুরু হয়।
শুধু কোজাগরি পূর্ণিমায় নয় সারা বছরের যে কোন অনুষ্ঠানে বিয়ে অন্নপ্রাশনে গ্রামবাসীরা লক্ষীনারায়ণ মন্দিরে এসে সোনা রুপোর গয়না মাকে অর্পণ করে যান। আশেপাশের গ্রাম থেকেও প্রচুর লোকজন আসেনি মন্দিরে পুজো দিতে। কোজাগরী পূজা উপলক্ষে এখানে মেলা বসে তিনদিন ধরে। তিন দিন তিন রাত ধরে বাউল গানের আসর বসানো হয়। মা লক্ষ্মী এখানে তাদের প্রাণের দেবী। দূর্গা পুজো থেকেও লক্ষ্মীপূজায় বেশি আনন্দে মাতেন এই গ্রামের লোকেরা। নতুন নতুন জামা কাপড় পড়ে, আনন্দে, আত্মীয়-স্বজনের উৎসব মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ।
জাগ্রত এই দেবির পূজার অংশ নিতে অবশ্যই ঘুরে আসুন কালিয়াগঞ্জের লক্ষ্মীনারায়নের মন্দিরে।
তথ্যঋণ : আনন্দবাজার অনলাইন, আজ তক এবং অন্যান্য