শান্তিনিকেতনে তখন চিকিৎসার পরিকাঠামো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। মেটারনিটি হোম বলে কিছু নেই। ডাক্তারের অভাব, লেডি ডাক্তার বা ধাত্রীও নেই। ঠিক এইসময় এক বিদেশিনী সন্তানসম্ভবা মায়ের সব দায়িত্ব তুলে নিলেন শান্তিনিকেতনের ঠানদি ক্ষিতিমোহন সেনের সহধর্মিণী শ্রীমতী কিরণবালা দেবী। তিনি যে কোনো সংকটেই তাঁর দরাজ হৃদয় নিয়ে এগিয়ে আসতেন। এক্ষেত্রেও তিনি অধ্যাপক তানের ডাকে মাদাম তানের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। জন্ম নিল এক শিশু বাংলার মাটিতে। যে শিশুর পিতা এবং মাতা চীনদেশীয়, তাকে পৃথিবীর আলো প্রথম দেখালেন এক বাঙালি দরদী মহিলা শান্তিনিকেতনের ঠানদি। ভাষা ও সংস্কৃতির সব প্রাচীর ভেঙে আগমন ঘটল নবজাতিকার।
সদ্যজাতাকে নিয়ে যাওয়া হল কবিগুরুর কাছে। রবীন্দ্রনাথ কন্যার মুখ দেখে নাম রাখলেন ‘চামেলি’, বললেন, ‘এ আমাদের চীনাভবনের চামেলি’। অধ্যাপক তান রবীন্দ্রনাথকে আদর্শ করে চামেলির জন্মের আগেই ভারতবর্ষে এসেছেন তাঁর স্ত্রী ও পুত্র কন্যাকে নিয়ে। নিজের দেশ থেকে টাকা সংগ্রহ করে অধ্যাপক তান গড়ে তুলেছিলেন শান্তিনিকেতনের চীনাভবন। যেটি দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা ভাষা অধ্যয়নের প্রাচীনতম কেন্দ্র। অধ্যাপক তান ছিলেন এই ভবনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। চীন ও ভারতীয় সংস্কৃতির সেতুবন্ধনে কবিগুরুর প্রয়াসকে সফল করে তুলতে তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
তান ইউন-শান ১৮৯৮ সালের ১০ই অক্টোবর চীনের হুনান প্রদেশের চালিং কাউন্টিতে জন্মগ্রহণ করেন। এক কনফুসিয়াস পন্ডিত ও শিক্ষকের কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন তান। খুব কম বয়সেই তিনি পিতা মাতাকে হারান। প্রথমে কাউন্টি তারপর জেলা স্কুলে তিনি পড়াশোনা করেন। কনফুসিয়াস ক্লাসিক, প্রাচীন ও সমসাময়িক চীনা দর্শন ও সাহিত্য, চার রাজবংশের ইতিহাস, প্রাচীন ও আধুনিক কবিতা এবং উপন্যাসের বইগুলি তিনি পড়ে ফেলেন। ১৯১৯ সালে চাংশার হুনান টিচার্স কলেজ থেকে তিনি স্নাতক হন। কলেজে তাঁর সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও ৎসে-তুং। তান এরপরে চীনা ও পাশ্চাত্য বিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। একই সঙ্গে বৌদ্ধশাস্ত্রে পাঠ গ্রহণের পাশাপাশি তিনি নানা পত্রিকায় লেখালিখি ও প্রকাশনার কাজ শুরু করেন। মাও ৎসে-তুং এর সঙ্গে রাজনৈতিক কিছু কর্মকান্ডেও নিজেকে যুক্ত করেন।
চীনে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হলে তান চীন ছেড়ে মালয়েশিয়া যাবার সিদ্ধান্ত নেন। মালয়েশিয়ায় জোহোরের এক স্কুলের অধ্যক্ষ চ্যান নাই-ওয়েইয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় ও কিছুদিন পর ১৯২৬ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তান সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন ও চীনা সাহিত্যের উপরে কাজ শুরু করেন এবং স্থানীয় সংবাদপত্রে লেখালেখি শুরু করেন। ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় চীন সফরের সময় তাঁর সঙ্গে তান ইউন-শানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। সেসময় দুজনের মধ্যে নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। শান্তিনিকেতনে বহু ভাষা ও সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র গড়ে তোলার আগ্রহে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতায় যোগদানের আমন্ত্রণ জানান।
১৯২৮ সালে তান শান্তিনিকেতনে চীনা স্টাডিজের অধ্যাপক হিসাবে বিশ্বভারতীতে যোগ দেন। সেইসময় মাত্র পাঁচজন ছাত্র নিয়ে ক্লাস শুরু হয়েছিল। তান নিজে সংস্কৃত শিখতে শুরু করেন। তবে ওই সময়ে পৃথক একটি হল বা বিল্ডিং চীনা সাহিত্যের জন্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল না। অর্থের অভাব ছিল। তান অর্থ সংগ্রহ করার জন্য নানা স্থানে ঘুরে বেড়ান। চাকরিও করেন। তিনি এজন্য সিঙ্গাপুর ও রেঙ্গুনে গিয়েছিলেন। বছর তিন শান্তিনিকেতনে থাকার পর তিনি চীনে ফেরেন এবং শান্তিনিকেতনে চীনা ভাষা চর্চা ও কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সহায়তা সংগ্রহে সফল হন। ১৯৩৩ সালে নানকিংয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সিনো-ইন্ডিয়ান-কালচারাল সোসাইটি। ভারতবর্ষের সোসাইটির সভাপতি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের কেন্দ্রস্থলে চীনা ভবন নির্মাণের জন্য জমি দিলেন। তান আশ্রম সচিব ও শিল্পী সুরেন্দ্রনাথ করের সহযোগিতায় বৌদ্ধ স্থাপত্যশৈলী অনুকরণে চীনা ভবন প্রতিষ্ঠার একটি নকশা তৈরি করলেন। তারপর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করে ১৯৩৬ সালে সংগৃহীত অর্থ (পঞ্চাশ হাজার টাকা) এবং সিনো-ইন্ডিয়ান-কালচারাল সোসাইটির আনুকূল্যে প্রাপ্ত এক লক্ষ টাকার বই নিয়ে শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন। ওই বছরেই তাঁর উদ্যোগে ভবন নির্মাণের কাজও শেষ হয়। নন্দলাল বসু, বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেইজ, বিনায়ক মাসোজী এবং কলাভবনের ছাত্রছাত্রীরা দেওয়ালচিত্র তথা ফ্রেস্কো দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। ভবনের চারপাশে তান ফুলের গাছ দিয়ে সাজান।
১৯৩৭ সালের ১৪ই এপ্রিল বাংলা নববর্ষের দিন চীনা ভবনের উদ্বোধন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উদ্বোধন করে তিনি বলেছিলেন,
“এদিনটি আমার কাছে বস্তুতই একটি স্মরণীয় দিন।… ভারতবাসী ও চীনাবাসীর মধ্যে সংস্কৃতি ও বন্ধুত্ব আদানপ্রদানের একটি ব্যবস্থার পত্তন আজ করা গেল।”
তান ইউন-শান চীনা ভবনের প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। তিনি বিশ্বভারতীর আর্থিক অবস্থার জন্য বেতন নিতে অস্বীকৃত হন। তবে চীনা সরকার তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। মহাত্মা গান্ধী রবীন্দ্রনাথকে লেখেন – “চীনা ভবন হোক চীন ও ভারতের মধ্যে জীবন্ত যোগাযোগের প্রতীক।” পরবর্তী কালে যুগল কিশোর বিড়লা চীনা ভবনে গবেষণার জন্য পাঁচ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেন।

সেই সময়ে উদয়নের পরেই বিরাট বাড়ি এই চীনা ভবন। বিশ্বভারতীতে তখন আর্থিক অবস্থা একেবারেই সচ্ছল নয়। চামেলির মা মাদাম তান চীনে শিক্ষকতা করে স্বামীর স্বপ্নে হাত মিলিয়েছিলেন। পরে তিনিও শান্তিনিকেতনে চলে আসেন। সঙ্গে দুটি শিশুসন্তান। পুত্রের নাম তান-লি আর কন্যার নাম তান-ওয়েন। অধ্যাপক তান চীনে নিজের জমি বেচেও এখানকার কাজ চালিয়েছিলেন বহুবছর।
অধ্যাপক তানের সন্তানরা শুধু ভারতীয় হয়েছেন তাই নয়, যে শিশুকন্যা তান-ওয়েন চীন থেকে ভারতে এসেছিলেন সেই কন্যা বিশ্বভারতীতে বাংলা এম এ’তে প্রথম হলেন। দিল্লীর ইন্দ্রপ্রস্থ কলেজে পরবর্তীতে তিনি বাংলা পড়িয়ে খ্যাতি লাভ করেন। বড় দিদি তান-ওয়েন আমেরিকায় গিয়ে অসুস্থ হলে শান্তিনিকেতনে সকলে চিন্তায় পড়লেন। ছোট বোন দিদির সুস্থ হবার সংবাদ পেয়ে লিখলেন, “দিদি ভালো হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন। ভগবান আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন। এবারে ভালোয় ভালোয় দেশে ফিরে এলেই নিশ্চিত হই। ভারতবর্ষই আমাদের দেশ।”
১৯৪২ সালে চীনা সামরিক নেতা ও এক সময়ে জাতীয় সরকারের চেয়ারম্যান, যিনি পরবর্তী কালে প্রজাতন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রপতি চিয়াং কাই-শেক এবং মাদাম চিয়াং শান্তিনিকেতনের চীনা ভবন পরিদর্শনে বিশেষ সন্তুষ্ট হয়ে আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করেছিলেন।
১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হলে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক উন্নয়ন ঘটে। তবে রবীন্দ্রনাথের আদর্শের প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়া হয়নি। চীনা ভাষা শিক্ষা অব্যাহত থাকলেও বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের উপর গবেষণা উপেক্ষিত ছিল। বিষয়টি তানকে বিব্রত করেছিল। ওদিকে চীনা সরকার তানের সম্মানী বন্ধ করে দেয়। তখন তাঁকে বেতনে রাজি করানো হয়। চীনা ভবন অনেক নতুন পন্ডিতদের আকর্ষণ করে টেনে আনতে সমর্থ হয়েছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত আমেরিকান সিনোলজিস্ট এবং চীনের ইতিহাসবিদ ডঃ লুথার ক্যারিংটন গুডরিচ ১৯৫৩-৫৪ সালে সাইনোলজির ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আসেন।
১৯৫৬ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই তান’কে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রপতি মাও ৎসে-তুং তাঁর বন্ধুকে এ সময় স্বাগত জানান। ১৯৫৭ সালে ভারত ভ্ৰমণে এসে চৌ এন-লাই শান্তিনিকেতনে আসেন এবং রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে ষাট হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেন। ১৯৬২ সালে শান্তিনিকেতনে এসে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু যখন তাঁর সমাবর্তন ভাষণে চীন-ভারত যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন তখন তান ইউন-শান কান্নায় ভেঙে পড়েন। ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণার কাজ চালিয়ে গেছেন।
তানের জ্যেষ্ঠ পুত্র তান চুং ১৯২৯ সালে ১৮ই এপ্রিল মালায়ার জোহোর রাজ্যের মাতুয়াবাহারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে আসেন। বিশ্বভারতী থেকে পিএইচডি শেষ করেন। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী হুয়াং ই-শু দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান।
তানের দ্বিতীয় পুত্র তান চেং ১৯৩২ সালে চীনের চাংশায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালে সস্ত্রীক দেশ ত্যাগ করে শান্তিনিকেতনে আসেন। ১৯৭৯ – ১৯৮৭ পর্যন্ত চীন ভবনে চীনা ভাষা শেখাতেন। তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
তানের তৃতীয় পুত্র তান লি ও মাতা পিতার সঙ্গে শান্তিনিকেতনে আসেন। আর তানের চতুর্থ পুত্র তান অজিত ও পঞ্চম পুত্র তান অর্জুন শান্তিনিকেতনেই জন্মগ্রহণ করেন। তাই এই দুই পুত্রের নামেও ভারতীয় ছাপ স্পষ্ট।
সুদূর চীন দেশ থেকে এসে একটি পরিবার পুরোপুরি ভারতীয় তথা বাঙালি হয়ে উঠেছিলেন শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনকে ঘিরে। তান ইউন-শান ১৯৭৯ সালে দেশিকোত্তম সম্মানে ভূষিত হন। এই মহান মানুষটি ১৯৮৩ সালে বিহারের বুদ্ধগয়ায় পরলোকগমন করেন।