বিশ বছর আগে আমি প্রথম জীবন্ত তন্দুরে হাত লাগাই হকার ইউনিয়নে হোলটাইমারি করার সময়। আজও বিশ্বাস করি বিশ্বে প্রত্যেক বস্তুর প্রাণ আছে— জড় বস্তু বলে কিছুই হয় না— সে অন্য বিতর্ক। আমরা তখন হকার ইউনিয়নের সারাক্ষণের কর্মী। ঠিক হল চারজন হোলটাইমারকে ফুটে দোকান দেওয়া হবে। আমাদের এক বন্ধু বাছল তন্দুর খাবার। প্রয়াত নেতা এবং তন্দুর বিশেষজ্ঞ অনাদি সাহার [সাহাদার বিরিয়ানি খ্যাত] নেতৃত্বে গেলাম চিতপুর। তারপর তন্দুর বানানোর প্রক্রিয়া। অসামান্য অভিজ্ঞতা, পরে কোনও দিন রসিয়ে লিখব। কিন্তু সেদিন মাথায় ছিল না, যে তন্দুরটি আমার আন্দোলনের সহকর্মী বন্ধুটি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে যাচ্ছেন তার উৎস চাঘতাই-তুর্ক পরিবারের রাজত্বকাল, আজকে যাদের আমরা মুঘল নামে চিনি।

গত দুদিন পেজফোরনিউজের পাতায় কেক এবং বেকিং নিয়ে আলোচনার পাঠকের মন্তব্যে একটা বিষয় পরিষ্কার হল উপনিবেশিক ভদ্রবিত্তিয় বাঙালি মননে তন্দুরের সঙ্গে যে মুঘল রাজত্বের যোগ রয়েছে, সেই বাস্তবতাটি সযত্নে মুছে উপনিবেশিক কেক-প্যাস্ট্রি কনফেকশনারির সময়টি থানা গেড়েছে। আমরা মাথায় রাখি না কফি হাউসের জন্ম তুর্কিতে – কফি আবিষ্কার বা কাফে জনপ্রিয় করার সঙ্গে ইওরোপের দূরতম সংযোগ ছিল না। মুঘল আমলে চাঁদনি চকে বিশাল বিশাল কফিপার্লার ছিল— আজকের মতই সেখানে লেখক-গায়ক-চিন্তাবিদেরা জড়ো হতেন। ভারতে আর বাংলায় আজকে যাকে বেকিং প্রক্রিয়া বলে জানি, সেই ধারণাটা যদিও হরপ্পা আমলে গোড়াপত্তন হলেও তার জনপ্রিয়তা তৈরি হয় মুঘল আমলেই। হাওড়া আর হুগলী [পরে ঢাকা আর মুর্শিদাবাদ] হল বাংলার বেকিং জগতের সরতাজ। এই সাধারণ তথ্য আমাদের মাথায় থাকে না, বাংলার অধিকাংশ বেকারি চালান মুসলমান বেকারেরা। কেক ইত্যাদির চাপে আমরা কফির মতই বেকিংকে ইওরোপিয় দান হিসেবে ধরে নিই।

দুদিনের কেক আলোচনায় পর আজ আলোচনা করব তন্দুর নিয়ে। তন্দুরের জন্ম হরপ্পা-সরস্বতী সভ্যতায় — কিন্তু কত পুরোনো জানা যায় না তবে ন্যুনতম ৫০০০ বছরের ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়াই যায়। বিপুল এলাকাজুড়ে প্রত্নতাত্তিক খননে তন্দুরের অবশেষ পাওয়া গিয়েছে। শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, পশ্চিম এবং মধ্য এশিয়ায় এমন কী মিশরেও তার সরব অস্তিত্ব বর্তমান।
আজকে দক্ষিণ এশিয়ায় যে আকারে তন্দুর দেখি, ২০০১-এ আমার আন্দোলনের সাথীটি যে তন্দুর বসাতে চেয়েছিলেন, তার জনপ্রিয়তার গোড়াপত্তন চাঘতাই-তুর্ক বা মুঘল আমলের হিন্দুস্তানে শাহী পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায়। বাবর, আকবর পেরিয়ে ভোজন রসিক জাহাঙ্গিরের রাজত্বে, ১৬০৫-এর পরে, কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, এমন সব তন্দুর তৈরি হতে থাকে। অর্থাৎ আজকে যে মিনি তন্দুরের আকার দেখি তার বয়স ৪০০ বছর। জাহাঙ্গির শুধু মদ্য-বলাসীই ছিলেন না অসম্ভব ভোজন বিলাসীও ছিলেন। যেখানেই শাহী পরিবার বিশাল শিবির নিয়ে পরিভ্রমণে যেত, সেখানে বয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এমন তন্দুরও সঙ্গে যেত।

মুঘলদের অস্তমিত হয়ে যাওয়ার পরে শিখেরা এই প্রযুক্তিটি আপন করে নেয়। তাদের হাত ধরে এই খাদ্য হাতিয়ারটি জনগণের মধ্যে নেমে আসে। গুরু নানক তার সমাজকে তন্দুর ব্যবহারে উৎসাহিত করতে থাকেন। তিনি সাঁঝা চুলা বা জন উনুনের বা গণ রান্নাঘরের ধারণা তৈরি করলেন। শিখেদের মধ্যে যে ক’টা উপাদান সামাজিক বন্ধন তৈরি করেছে, তার মধ্যে সাঁঝা চুলা অন্যতম। এর অন্যতম হাতিয়ার ছিল তন্দুরে তৈরি রান্না এবং একসঙ্গে মিলে খাওয়া। সিপাহি যুদ্ধের সময় তন্দুরের রুটি গোপন তথ্য বাহনের হাতিয়ার ছিল।
তবে ভারত জুড়ে তন্দুরের রমরমা হয় পাঞ্জাব ভাগের পরে দেশজুড়ে পাঞ্জাবি উদ্বাস্তুদের হাত ধরে। গত সত্তর বছরে তন্দুর ভারতীয় খাবার ব্যবস্থায় ভারতজোড়া সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। বিদেশেও এর প্রভাব অনন্য।

তন্দুর কী
তন্দুর হল ফুট চারেকের পেটমোটা পোড়ামাটির ড্রামের মত দেখতে একটা বস্তু— যার নিচে একটি মাঝারিগোছের গোলাকার ফুটো থাকে, যেখান দিয়ে হাওয়া বাতা্স ঢোকে বেরোয়; এখান দিয়েই পোড়া জ্বালানিটাও বের করা হয়। তন্দুরের ভেতরের অংশে দই, মাখন, ছাতু, বিভিন্ন মশলা, গাছগাছালি পেস্ট ইত্যাদির একটা লেই করে লাগানো হয় প্রথমতম দিনে কাজ শুরু করার আগে— এটাই তন্দুরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা। এই কাজটাকে খুব যত্ন সহকারে করতে হয়। ২০০১-এর সময় রান্নাগুরুদের জ্ঞানচর্চার কাজ নিজের চোখে দেখেছি, আজও গায়ে কাঁটা দেয়— কী ডেডিকেশন। বিষয়টার/প্রক্রিয়াটার ওপর অপরিমেয় শ্রদ্ধা না থাকলে শয়ে শয়ে বছর ধরে বিদ্যুৎ নিরপেক্ষ এই প্রযুক্তি/জ্ঞান/দক্ষতা বয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। তন্দুরের ভেতরে কয়লা দিয়ে আগুণ ধরানো হয় ৪৮০ ডিগ্রি সেন্টি তাপমাত্রা ওঠে। আজকাল গ্যাস উনুনও বেরিয়ে গেছে। কিন্তু অভিজ্ঞরা জানেন কয়লার তন্দুরের সঙ্গে গ্যাসের তন্দুরের স্বাদের, স্বাস্থ্যরক্ষার ধারণার কোনও তুলনা চলে না।
রান্না
তন্দুরে চার রকম রান্না হয়— ভাপা, পোড়ানো স্যাঁকা ঝলসানো। বিশাল তাপে তন্দুরের জমিনে বসিয়ে ভাপা করা হয়। দেওয়ালে রুটি শ্যাঁকা হয় শিকে বা অন্যান্য উপায়ে মাংস বা তরকারি পোড়ানো/ঝলসানো আর তাপে রান্না করা।
জারণ-ম্যারিনেশন
তন্দুরে কিছু প্রধান উপাদান রান্না করার আগে জারিয়ে নেওয়া জরুরি। পাঞ্জাবিরা জারক হিসেবে সাধারণত টক দইএর সঙ্গে নানান মশলা ব্যবহার করেন। দই দিয়ে সাধারণত মাংসকে নরম করার কাজ করেন পাঞ্জাবিরা। মাংস নরম করার উপাদান হিসেবে বাঙ্গালিরা অতটা দই ব্যবহার করেন না।