সৌম্য সিংহ
সিনেমা-জগতের মহাতারকারা মৃত্যুর পরে যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠেন মানুষের মনে। বিশেষ করে সেই মৃত্যু যদি আসে অকালে, আচমকাই। প্রয়াত সুপারস্টারকে নিয়ে শুরু হয়ে যায় চুলচেরা বিশ্লেষণ, তাঁকে নিয়ে নানা চর্চা বাঁধ মানে না সময়ের। মৃত্যুর দিন সাতেক পরেও তাই তাপস পালকে ঘিরেও সেই প্রবণতা অব্যাহত। শিল্পী তাপস পালের থেকেও রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধি তাপস পাল কিংবা ব্যক্তি তাপস অনেক সময়ই যেন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের মতামতে। তাঁকে খুব কাছ থেকে আদৌ দেখেনই নি, কিংবা দেখলেও সেভাবে বোঝার সুযোগ পাননি, এমন অনেকেই নানা মন্তব্য করছেন। প্রশ্ন উঠছে, তাপস পাল কি পথ হারিয়েছিলেন? তাপস পাল কি বিপথগামী হয়েছিলেন? উত্তর কিন্তু একটাই— আর যাই হোক সরলতার পথ থেকে কিন্তু তিনি কোনওদিনই সরে আসেননি। কোনও পরিস্থিতিই তাঁকে সেই পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। তিনি হারিয়ে যেতে দেননি সরলতায় ভরা তাঁর সেই ভুবনভোলানো হাসি।

জীবন কাটিয়েছেন নিজের মতো করে
সেলিব্রিটিদের, বিশেষ করে ফিল্মি দুনিয়ায় যাঁরা সাফল্যের শীর্ষে উঠেছেন তাঁদের অনেকেরই জীবনের একটা ট্র্যাজেডি হলো, অনেক খুঁটিনাটি বিষয়তেই তাঁরা নেতিবাচক অতিরঞ্জনের শিকার হয়ে যেতে পারেন। একজন চিত্রতারকার যেটা ভালো কাজ, যেটা তিনি হয়তো চাইছেন কিছুটা রঞ্জিত হোক,সেটা মানুষের নজরে এলো না সেভাবে, অথচ যা ঘটেনি বা ঘটলেও ব্যাপারটা ততটা কিছু নয় কিংবা যে কাজটা আদৌ হয়ই নি,তা হয়তো মানুষের কাছে পৌঁছে গেল অতিরঞ্জিত হয়ে। এটা ভাগ্য, এখানে কিছু করার নেই। কারণ, জনে জনে সবার কাছে গিয়ে সবকিছুর ব্যাখ্যা দেওয়া মোটেই সম্ভব নয় একজন তারকার পক্ষে। দোষগুণ সকলেরই থাকতে পারে, কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে পড়ে তিনি কী বলেছেন, কী করেছেন, বা করতে বাধ্য হয়েছেন, তা বুঝিয়ে বলাও সম্ভব নয় সবসময়। তাই খুব সহজেই ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়ে পড়েন তিনি। তাপস হয়তো কিছুটা এই দুর্ভাগ্যেরই শিকার হয়েছিলেন বলে মনে করেন তাঁর সময়েরই আর এক সুপারস্টার চিরঞ্জিত। তাঁর ধারণা, সরল সাদাসিধে তাপস সম্ভবত বুঝে উঠতে পারতেন না, কোন কথাটার ঠিক কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এও আসলে এক ধরনের ছেলেমানুষি। এর কারণও ব্যাখ্যা করেছেন রোমান্টিক হি-ম্যান চিরঞ্জিত। তাঁর কথায়, তাপসকে আসলে সেভাবে কখনও স্ট্রাগলই করতে হয়নি। যে বছর উত্তমকুমার চলে গেলেন সেবছরই ‘দাদার কীর্তি’ সুপারহিট। অনায়াসে যেন ট্রান্সফার হয়ে গেল সুপার স্টারডাম। তারপরে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাপসকে। কিন্তু বুম্বাকে আর আমাকে স্ট্রাগল করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য। আমি নায়কের ভূমিকায় কেরিয়ার শুরু করলেও লড়াইও করতে হয়েছে অনেক। আর প্রসেনজিৎ প্রথমে ছোটোখাটো রোল দিয়ে শুরু করে ধাপেধাপে দখল করেছে শীর্ষস্থান। ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে বলেই আজও শীর্ষে নিজের জায়গাটা ধরে রাখতে পেরেছে সুন্দরভাবে। কিন্তু তাপস চন্দননগর থেকে এসে সাফল্য পেয়ে গেছে অত্যন্ত দ্রুত এবং প্রায় অনায়াসে। সহজ সরল জীবন কাটিয়েছে নিজের মতো করে। পরিবেশ-পরিস্থিতি কিছুই বোঝেনি। তেমনভাবে অভিজ্ঞতাও অর্জন করেনি। তাই যখনই একটু বেসামাল হয়ে পড়েছে তখন আর হালটা ধরতে পারেনি শক্ত হাতে। রেসিস্ট করতে পারেনি। সেই ট্রেনিংটাই যে ওর ছিল না। আসলে প্রবল জনপ্রিয়তার বিপদও আছে। একটা কিছু পেলেই হলো। সকলে মিলে ঝাঁপিয়ে পড়বে সেটা নিয়ে। রাজনীতিতেও তাই। সহজ সরল মানুষ। বিশাল জনসমর্থন নিয়ে দু’বার বিধায়ক, দু-বার সাংসদ হয়েছে তাপস। তবুও মনের কথাটা যে রাজনীতিতে সবসময় বলতে নেই,কিছুটা চুপ করে থাকতে হয়— এটা ও কেন জানি না বোধহয় ঠিক বুঝতে চাইতো না। স্পষ্ট কথা বলাটা মোটেই অন্যায় নয়, কিন্তু কোন কথার অর্থ কী দাঁড়াতে পারে, কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, একজন জনপ্রিয় অভিনেতা বা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সেটা তো বুঝতে হবেই। আবেগপ্রবণ তাপস বোধহয় সেসব ভাবতোই না। ভেবেচিন্তে কথা বলার মতো পরিপক্কতা বোধহয় তাপসের মধ্যে কোনওদিনই আসেনি। এও একরকমের অপরিণামদর্শিতা। ছেলেমানুষি তো বটেই। সত্যি কথা বলতে কী, সরলতা আর ভালোমানুষিতেই ওর উত্থান, আঘাত পেয়েছে, বিপদেও পড়েছে এই সরলতার জন্যই।
সেদিনের তাপস
তাপস পালের এই সরল স্বভাবটাই বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে বিশিষ্ট স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাতেও। শৈশব থেকেই শেষদিন পর্যন্ত অকৃত্রিম বন্ধুত্ব। চন্দননগরের প্রবর্তক বিদ্যার্থী ভবনে একই ক্লাসে একই সেকশনে ক্লাস ফাইভ থেকে একসঙ্গে পড়েছেন। বললেন, সহজ সরল শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিল তাপস। একই সঙ্গে ফুটবল-ক্রিকেট খেলতাম। স্পোর্টসে সে কী হুড়োহুড়ি! সবথেকে আনন্দ হতো স্কুলের সরস্বতী পুজোয়। পুজোর জোগাড়ে আমাদের সঙ্গে তাপসও হাত লাগাতো। তারপরে খাওয়া-দাওয়ার পালা। খিচুড়ি দিয়ে শুরু, শেষপাতে বোঁদে। এ সব তো আজকাল আর ভাবাই যায় না। কিন্তু যেটা না বললেই নয়, সেদিনও তাপসের হাসিতে যে সরলতা ফুটে উঠতো, বন্ধুপ্রীতি প্রতিফলিত হতো, অনেক বড় অভিনেতা এবং সাংসদ-বিধায়ক হয়েও তার ঠোঁটে লেগে থাকতো সেই সরলতামাখা হাসি। অটুট ছিল সেই বন্ধুপ্রীতিও। স্কুল জীবনের শেষে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে আমি সুযোগ পেলাম ডাক্তারি পড়ার। আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল তাপস। আবার হুগলির মহসিন কলেজে বিএসসি পড়তে পড়তেই ও পা রাখলো অভিনয় জগতে। আবির্ভাবেই বাজিমাত। গর্বে ভরে উঠলো আমার বুক। জড়িয়ে ধরলাম ওকে। এই ছিল আমাদের বন্ধুত্ব। সত্যি কথা বলতে কী, অনেক উঁচুতে উঠেও বন্ধু হিসেবে যে মর্যাদা তাপস আমাকে দিয়েছিল, তা ভাবা যায় না। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। এস এস কে এমের রোগী কল্যাণ সমিতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল তাপস। আলিপুরের বিধায়ক হিসেবে মাঝেমধ্যেই এখানে আসতো ও। কৃষ্ণনগরের সাংসদ হওয়ার পরেও এখানে যাতায়াত ছিল তাপসের। ইচ্ছে করলেই, হায়ার অথরিটির মাধ্যমে আমাকে ডেকে পাঠাতে পারতো তাপস। কিন্তু কোনওদিনই তা করেনি সে। বন্ধুত্বটাই ছিল ওর কাছে শেষ কথা। তাই বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সে আমার ঘরে নিজেই চলে আসতো। মিটিং-আড্ডা যা কিছু সব এখানেই। এই ছিল তাপস। শেষদিন পর্যন্ত বজায় ছিল সেই বন্ধুত্ব। তাই যখনই প্রয়োজন পড়তো ওর পাশে দাঁড়াতাম। পরামর্শ দিতাম। দুর্ভাগ্য, এতো তাড়াতাড়ি ও ছেড়ে চলে গেল আমাদের। কিন্তু মানুষ চিরকাল মনে রাখবে শিল্পী তাপস পালকে।ওর সরল ভুবনভোলানো হাসিকে। শান্তি কামনা করি বন্ধুর আত্মার।
গভীর নিষ্ঠা
তাপস পালের আর একটা বিশেষ গুণ ছিল, যখন যে কাজটা করতেন খুব নিষ্ঠাভরে করতেন। নতুন কিছু শিখে নিতেন খুব মন দিয়ে। নায়ক থেকে বিধায়ক হয়েও খুব আগ্রহভরে পরিষদীয় রাজনীতিটা শিখে নিয়েছিলেন তিনি। বিশিষ্ট সাংবাদিক দেবাশিস ভট্টাচার্য একদিন তাপসদার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করতে বিধানসভায় গিয়েছিলেন তাঁর ঘরে। নায়ক-বিধায়ককে দেখে তো সাংবাদিক অবাক। বাংলা ছবির সুপারস্টার ডুবে রয়েছেন বই আর একগাদা কাগজের মাঝে। মন দিয়ে পড়ছেন, আর নোট করছেন। ব্যাপারটা কী? রোমান্টিক নায়ক জনপ্রতিনিধি হওয়ার দৌলতে তখন বিধানসভার তথ্য-সংস্কৃতি বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান। সামনেই ঐ দফতরের বাজেট। বাজেট বিতর্কে অংশ নেওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছেন তিনি। মুখটা তুলে আন্তরিক হাসিতে সৌজন্য বিনিময় করে তাপসদা বললেন, ‘আপনার সঙ্গে গল্প করতে পারলে খুবই ভালো লাগতো। কিন্তু আজ একটু পড়াশোনার মধ্যে আছি। আর একদিন না হয় কথা হবে।’ এই ছিলেন তাপস পাল।
আঘাত পেতেন, তবুও অভিযোগ করতেন না
আর একটা কথা না বলে পারছি না, শিশুদের কাছাকাছি এলেই একদম যেন তাদেরই মতো হয়ে যেতেন তাপসদা। তখন আলিপুরের বিধায়ক তিনি। রাখি পূর্ণিমার আগের রাতে হঠাৎ তিনি ঠিক করলেন, বাচ্চা আর মা-বোনেদের হাতে রাখি পরাবেন তিনি। পরেরদিন সকালেই চান সেরে সেজেগুজে সদলবলে হাজির চেতলা পার্ক এলাকায়। গাড়িতে ভর্তি রসগোল্লার হাঁড়ি আর রাখি। প্রথমেই পথশিশুদের হাতে রাখি পরিয়ে দিয়ে আদর করে নিজে হাতে মিষ্টি খাইয়ে দিলেন। তারপরেই ঢুকে গেলেন পাশের বস্তিতে একেবারে ঘরের ছেলের অধিকারে। রাখি পরিয়ে মিষ্টিমুখ করিয়ে জুড়ে দিলেন আড্ডা। আসলে নায়কোচিত হাবভাব বা আরোপিত ব্যক্তিত্ব কোনওদিনই বোধহয় ধাতে সইত না তাপস পালের। তাই কথাবার্তাতেও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজনীয়তা বোধহয় অনুভব করতেন না তিনি। আবেগপ্রবণ হয়ে কথা বলে ফেললে, বা কোনও ভুল করে ফেললে, পরে তাঁর অনুতাপ বা অনুশোচনা হতো ঠিকই, দুঃখও প্রকাশ করতেন। কিন্তু সেকথা হয়তো পৌঁছতো না অনেকের কানেই। আঘাত পেতেন, কিন্তু নিজের পক্ষে সওয়ালও করতেন না, অভিযোগও করতেন না কারও বিরুদ্ধে। শুধু দুঃখ পেতেন নীরবে। তবুও সরলতার পথ থেকে কখনও সরে আসেন নি তিনি।