| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাছের মানুষ তারাশঙ্কর : নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

Reporter
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী / ৮৭৪ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২১

১৯৪৫ সালের অগস্ট মাসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসান হয়। তার ঠিক দুবছর বাদে, ১৯৪৭ সালের অগস্ট মাসে, দ্বিখণ্ডিত হয় একটি আস্ত দেশ এবং জন্মলাভ করে দুটি পৃথক স্বাধীন ভূখণ্ড : ভারত ও পাকিস্তান। এই দুটি ঘটনার ঠিক মধ্যবর্তী সময়ে, অর্থাৎ ১৯৪৬ সালের অগস্ট মাসে শুরু হয় এক মর্মঘাতী ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা। ফলে, দেশবিভাগ যে অবশ্যম্ভাবী, সেটা বুঝে গিয়ে দুই ভূখণ্ডেই যখন বাঁধভাঙা নদীর জলপ্লাবনের মতো উদ্বাস্তু জনতার ঢল নেমেছে, তখন, সেই অস্থির ও উদ্ভ্রান্ত সময়ে, মধ্য-কলকাতার ক্রিক রো থেকে একটি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্র আত্মপ্রকাশ করেছিল। কাগজখানার নাম স্বরাজ। গুটিকয় মানুষ যে এই স্বল্পায়ু কাগজখানার কথা আজো ভুলে যায়নি, তার কারণ আর কিছুই নয়, এর অন্যতম কর্মী ছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ।

যা-ই হোক, স্বরাজের উদ্বোধন উপলক্ষে যে গুণিজন-সমাবেশের আয়োজন হয়, তাতে উপস্থিত হয়েছিলেন তখনকার বাংলা সংবাদপত্র ও সাহিত্য-জগতের বহু বিশিষ্ট মানুষ। বস্তুত সেই সভাতেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মশাইকে আমি প্রথম চাক্ষুষ করি। তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠ পুত্র সনৎকুমারকে খুবই অল্পকালের জন্য স্বরাজে আমাদের সহকর্মী হিসেবে পাওয়া গিয়েছিল। তবে তারই মধ্যে তার সঙ্গে জমে উঠেছিল আমার বন্ধুত্ব। সে-ই তার বাবার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেয়। বীরভূমের রোদেপোড়া, তাম্রবর্ণ, কঠিন ধাতুতে গড়া মধ্যবয়সী পুরুষ, তারাশঙ্করকে আমি প্রণাম করি। তিনি দুই হাত বাড়িয়ে আমাকে বুকে টেনে নেন। ¯েœহভরে দুটি-চারটি কথাও বলেন। কথা আরো এগোতে পারত। কিন্তু এগোতে দেওয়া হয় না। স্বরাজের কর্তাব্যক্তিরা এসে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে ভিতরে ঢুকে যান। সম্ভবত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য সেখানে আলাদা জলযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

লেখককে চিনবার জন্য তাঁর কাছে যাবার দরকার করে না; তাঁর লেখা বইপত্তর তো রয়েছে, সেগুলি পড়লেই হলো। কিন্তু লেখার আড়ালে লুকিয়ে আছেন যে মানুষটি, তাঁকে চিনতে হলে তাঁর কাছে যাওয়া চাই, যতটা সম্ভব কাছ থেকে তাঁকে দেখা চাই। নানান অবস্থায়, নানান পরিবেশে। মানুষটিকে তা নইলে চেনা যায় না। তা লেখক তারাশঙ্করকে যে আমি একেবারেই চিনতুম না, তা নয়। স্বরাজ পত্রিকার উদ্বোধন  অনুষ্ঠানে ওই যে তাঁকে প্রথম দেখি, আমার বয়স তখন বাইশ বছর। তারই মধ্যে তাঁর খান তিন-চার ছোট-বড় উপন্যাস ও একইসঙ্গে বেশ-কিছু গল্প আমার পড়া হয়ে গিয়েছিল, এবং তা থেকে মোটামুটি একটা ধারণাও আমার মনে গড়ে উঠেছিল যে, তিনি কেমন লেখক। অন্তত এটুকু আমি ঠিকই বুঝতে পারছিলুম যে, আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের পরে একজন অতিশক্তিধর কথাসাহিত্যিক তিনি। উপরন্তু লেখক হিসাবে, যেমন ভাবনায় তেমন ভাষায়, তাঁর জাত ও ধাত একেবারেই আলাদা।

কিন্তু তিনি যে কেমন মানুষ, তার বিন্দুবিসর্গও তখন জানতুম না। জানতে হলে তাঁর যতটা কাছে যেতে হয়, তা যাবার সুযোগ তখনো পাইনি। সেটা পেতে-পেতে আরো বেশ কয়েকটা বছর কেটে যায়। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার পালটায় আমার কর্মস্থলও। সেই পরিবর্তনের কথাটা এখানে সংক্ষেপে সেরে নিই। প্রত্যহ ও মাতৃভূমি পত্রিকায় কিছুকাল কাজ করে আমি স্বরাজে এসেছিলুম। সেখান থেকে যাই ভারত পত্রিকায়। ভারত থেকে দৈনিক কিশোর। সেখান থেকে ‘ইউনাইটেড প্রেস অব ইন্ডিয়া’য়। সেখান থেকে সত্যযুগে। পাঠক ভাবতে পারেন, এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি জায়গা বদলের কারণ কী? উত্তরে বলি, হয় প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের ঝাঁপ বন্ধ করছিল, নয়তো বিগড়ে যাচ্ছিল আমার মেজাজ। যা-ই হোক, শেষবারের মতো কর্মস্থল পালটাই ১৯৫১ সালে, যখন সত্যযুগ ছেড়ে আমি আনন্দবাজার পত্রিকায় চলে আসি।

তার পরে আর প্রতিষ্ঠান পালটাই না ঠিকই, তবে কাজের ধরন পালটে যায়। সত্যযুগে ঢোকার আগে পর্যন্ত অন্য সব কাগজেই কাজ করেছি বার্তা বিভাগে। এমনকি ‘ইউনাইটেড প্রেস অব ইন্ডিয়া’ বা ‘ইউপিআই’ (এখনকার নাম ইউএনআই) প্রতিষ্ঠানেও খবর সংগ্রহ করাই ছিল আমার কাজ। সেক্ষেত্রে সত্যযুগ পত্রিকায় পেয়েছিলুম রবিবারের সাহিত্য বিভাগের দায়িত্ব। আনন্দবাজারে এসে ফের সেই বার্তা বিভাগের কাজে ঢুকি। কিন্তু সেখান থেকেও ঠিক এক বছর বাদে আমাকে রবিবাসরীয় বিভাগে বদলি করা হয়। বিভাগীয় সম্পাদক মন্মথনাথ সান্যাল মশাইয়ের স্বাস্থ্য তখন ভালো যাচ্ছিল না। ফলে বিভাগটির তাবৎ কাজকর্মের দায়িত্ব তিনি আমার হাতে সঁপে দেন। তাবৎ কাজকর্ম মানে নিয়মিতভাবে ফি রবিবারের সাহিত্যবিভাগের কাজ তো বটেই, উপরন্তু শারদীয় আনন্দবাজার ও দোল-সংখ্যা আনন্দবাজার সম্পাদনার দায়িত্ব।

এই দায়িত্বপালনের সূত্রেই তখনকার যাঁরা লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক, তাঁদের অনেকেরই কাছে যাবার ও ঘরোয়া পরিবেশে তাঁদের দেখবার সুযোগ ঘটে যায়। মন্মথনাথ প্রবীণ মানুষ। লেখকদের সঙ্গে তিনি যোগরক্ষা করেন চিঠি লিখে কিংবা টেলিফোন করে। আমি সেক্ষেত্রে না লিখি চিঠি, না-করি টেলিফোন। কাউকে কিছু বলার কিংবা তাগাদা দেবার থাকলে সরাসরি তাঁর বাড়িতে চলে যাই। যেমন একদিন সকাল ৯টা নাগাদ সরাসরি চলে গিয়েছিলুম তারাশঙ্করের বাড়িতে। তিনি তখন সপরিবার বাগবাজার এলাকার একটা ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। সদর দরজার কড়া নাড়তে তিনিই এসে দরজা খুলে দেন। তাঁকে দেখে আমি একটু হকচকিয়ে যাই। মনে হয়, ১৯৪৬ সালে মাত্র একবার দেখেই যাঁর মূর্তি আমার মনের মধ্যে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল, ইনি কি সেই একই মানুষ? না                আর-কেউ? দেখি, দুভাঁজ একখানা আড়ময়লা ধুতিকে তিনি লুঙ্গির মতন করে পরেছেন, যেমন পদযুগল তেমনি ঊর্ধ্বাঙ্গও অনাবৃত, উপবীতটিও দুভাঁজ করা, সেটি একটি মালার মতো তাঁর গলায় জড়ানো। দরজা খুলেই তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কাকে চাই?’ তারপর, আমি কিছু বলবার আগেই, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, একটু নরম গলায়, ‘তোমাকে কি আগে কোথাও দেখেছি?’

আমি বলি, ‘দেখেছেন। কিন্তু সে তো বছর ছয়েক আগের কথা। আপনার মনে আছে?’

সনৎ এই সময়ে এক প্লেট মিষ্টি নিয়ে ঘরে ঢোকে। সম্ভবত সে দোতলার জানালা থেকেই আমাকে দেখতে পেয়েছিল। আমার শেষ কথাটাও তার কানে গিয়ে থাকবে। মিষ্টির প্লেটটা সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রেখে বলে, ‘সবকিছুই বাবার মনে থাকে। কিচ্ছুটি ভোলেন না, তা সে যত আগের ঘটনাই হোক না কেন।’

আমি বলি, ‘সেদিন কিন্তু নেহাতই মিনিট খানেকের জন্য আপনি আমাকে দেখেছিলেন। বলতে গেলে তেমন কোনো কথাই হয়নি।’

‘কী করে হবে?’ তারাশঙ্কর হেসে বলেন, ‘ওরা যে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল।’

এবারে আমি সত্যি-সত্যি চমকে যাই। স্বরাজ পত্রিকার কর্তাব্যক্তিরা যে ওঁকে আমার কাছ থেকে সেদিন সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাও দেখছি উনি ভোলেননি।

যা-ই হোক, এর পরে আর ওঁর সময় নষ্ট করি না। একজন ব্যস্ত লেখকের অনেকটা সময় আমি ইতিমধ্যেই নষ্ট করেছি, কিন্তু আর নয়। বিস্তর আঘাটা ঘুরে আমি যে তখন আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে কাজ করছি, সংক্ষেপে সেটা জানিয়ে ও পুজো সংখ্যার লেখাটা যে এখনো পাইনি সে-কথা মনে করিয়ে দিয়ে উঠে পড়ি। সনৎও আমার সঙ্গে রাস্তায় নামে। খানিকটা পথ আমাকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘বাবার কথা শুনে চমকে গেছিস তো? একবার আমাদের গ্রামের বাড়িতে আয়, তখন আরো চমকে যাবি।’

গ্রামের বাড়ি মানে বীরভূম জেলার লাভপুরের বাড়ি। সেখানে নেহাত একবার কেন, বারকয়েক গিয়েছি। প্রথমবার কি সেই বছরেরই শীতকালে গিয়েছিলুম? নাকি তার দু-এক বছর বাদে? আমার স্মৃতিশক্তি তো তারাশঙ্করের মতন অত প্রখর নয়, তাই কবে যে প্রথম সেখানে গিয়েছিলুম, এতদিন বাদে তা আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। তবে সেই প্রথম যাত্রায় কাদের সঙ্গী হিসেবে পাওয়া গিয়েছিল, তা ভুলিনি। সঙ্গী ছিলেন অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সুমথনাথ ঘোষ ও শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। শেয়ালদা ইস্টিশান থেকে গয়া প্যাসেঞ্জারে উঠে শেষ-রাত্তিরের হাড়-কাঁপানো শীতে আমেদপুর ইস্টিশানে নামি। তারপর ওভারব্রিজ পেরিয়ে সাত-সকালে উঠি আমেদপুর-কাটোয়া লাইট রেলওয়ের গাড়িতে। তা এই যে যাত্রা, এর প্রথম পর্ব তো ঘুমিয়ে কেটেছিল, মনে আছে শুধু দ্বিতীয় পর্বের কথা। লালমাটির দেশ, তার ওপর দিয়ে ধীরে-ধীরে চলেছে ছোট্ট রেলগাড়ি। দুদিকে তাকালে শুধু তালগাছ ছাড়া আর কোনো বড় জাতের গাছগাছালি চোখে পড়ে না। পরেরবারের যাত্রায় মতি নন্দী আমাদের সঙ্গী হয়েছিল। মাথাছাঁটা তালগাছগুলোকে দেখে সে মন্তব্য করে, ‘গাছ তো নয়, যেন দৈত্যদের দাঁতন! দাঁত মেজে ছ্যাঁতলানো দাঁতনগুলোকে তারা এখানে-ওখানে পুঁতে রেখে গেছে!’

তা এ হলো গিয়ে ওই যে দ্বিতীয়বার লাভপুরে যাই, সেই সময়ের কথা। সেবারকার যাত্রার বিবরণ পরে কখনো বিস্তারিতভাবে দেওয়া যাবে, এখন আবার প্রথমবারের কথায় ফিরে যাই। লাভপুরে পৌঁছই ভরদুপুরে। ইস্টিশানেই জনাকয় ভদ্রলোক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রেলগাড়ির কামরা থেকে আমরা নামমাত্রই তাঁরা এগিয়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানান, তারপর পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে যান তারাশঙ্করের বাড়িতে। ইস্টিশান থেকে খানিকটা পথ হেঁটেই সেখানে পৌঁছে যাই। বাড়িটি দেখলুম পায়ে-চলা পথের ডাইনে-বাঁয়ে অনেকখানি জায়গাজমি নিয়ে বেশ-খানিকটা ছড়ানো। ডাইনে দিঘি, মরাই, কাছারিবাড়ি, চণ্ডীমণ্ডপ, দোলমঞ্চ; বাঁয়ে মস্ত বড় উঠোনের পরে অন্দরমহলের ঘরবারান্দা। আমরা যে এসে গেছি, এই খবর পেয়ে তারাশঙ্কর তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখামাত্র তাঁর চোখে স্বস্তি ফোটে, মুখ হাসিতে ভরে যায়।

কেন যে সেবারে দল বেঁধে লাভপুরে যাওয়া হয়েছিল, এত বছর বাদেও সে-কথা ভুলিনি। তারাশঙ্কর সে-বছর একটা উল্লেখযোগ্য-সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেই উপলক্ষে তাঁর স্বগ্রামের অধিবাসীরা আয়োজন করেছিলেন এক সংবর্ধনা-সভার। সেই সভায় উপস্থিত থেকে আমাদের অগ্রজপ্রতিম এই সাহিত্যস্রষ্টা সম্পর্কে আমরাও দু-চার কথা বলব, সম্ভবত এটাই ছিল আয়োজকদের প্রত্যাশা। তারাশঙ্কর চেয়েছিলেন, অনুষ্ঠানের আগের দিনই যেন আমরা লাভপুরে পৌঁছই; তাতে ট্রেন-জার্নির ধকল কাটাতে অন্তত একটা দিন আমরা একটু বিশ্রাম পাব। তা বিশ্রামের যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সনতের সে-দিকে কড়া নজর ছিল। তারই তত্ত্বাবধানে আমরা অল্প-কিছু জলযোগের পর দিঘিতে øান করে অন্দরমহলে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সারি। তারপর কাছারিবাড়িতে গিয়ে দেখি, সেখানে পাশাপাশি খানকয়েক খাট জোড়া দিয়ে ঢালাও একটা বিছানা পেতে রাখা হয়েছে। বিছানার ওপরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে লেপ, বালিশ আর তাকিয়া। আমরা আর অযথা বাক্যব্যয় না-করে বিছানায় টান হই; ঘুমিয়ে পড়তেও দেরি হয় না।

ঘুম ভাঙে তারাশঙ্করের গলার আওয়াজে। ‘ওহে, তোমরা আর কত ঘুমোবে? এবারে উঠে পড়ো।’

ধড়মড় করে উঠে পড়ি আমরা। দেখি, তারাশঙ্কর আমাদের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পিছনে সনৎকেও দেখতে পাই। তার হাতে একটা বিশাল কেটলি। সনতের পিছনে আরো দুজন লোক। দুজনের হাতেই ট্রে। একজনের ট্রের উপরে খানকয় পেয়ালা আর পিরিচ। অন্যজনের ট্রের উপরে বিস্কুট, মোয়া আর নাড়–। তারাশঙ্কর বলেন, ‘চটপট চা খেয়ে নাও। তারপর চলো, গ্রামের ভিতরে একটা চক্কর দিয়ে আসি। সবাই কত আশা করে রয়েছে।’

চোখে-মুখে জল দিয়ে চা খাই। চায়ের সঙ্গে খাই টাটকা মুড়ির মোয়া আর নারকেলের নাড়–। বিস্কুট ছুঁই না। ও-বস্তু খাবার জন্য আমরা কলকাতা ছেড়ে এখানে আসিনি। তারাশঙ্কর বলেছিলেন, চা খেয়ে আমরা গ্রাম দেখতে বেরুব। কিন্তু তার আর দরকার হয় না। ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে মনে হয়, জনা পঞ্চাশ-ষাট মানুষের একটা মিছিলই যেন এই কাছারিবাড়ির উঠোনে এসে হাজির হয়েছে। স্ত্রী, পুরুষ, বুড়ো আর বাচ্চা ছেলেমেয়ে, সবই আছে সেই মিছিলের মধ্যে। দেখে বোঝা যায়, এঁরা এখানকার সচ্ছল পরিবারের লোক নন, আর্থিক বিচারে নিুবর্গের মানুষ। কারও হয়তো যৎসামান্য জমি আছে, কারও বা তাও নেই, অন্যের জমিতে মজুর খেটে জীবিকার্জন করেন।

তারাশঙ্কর তাঁদের কারও-কারও সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। বলেন, ‘এ হচ্ছে বনোয়ারি, ও হচ্ছে নসুবালা, আর ওই যে বাহারি চুলের টেরিকাটা ছোকরাটি ওখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, ওর নাম করালী।’ তারাশঙ্কর নাম বলে যান, আর যত নাম শুনি, তত আমার চমক লাগে। সবই তো আমার চেনা নাম। হাঁসুলী বাঁকের উপকথায় এঁদের কথাই তো শুনেছি। জনতা বিদায় নেবার পর বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে তারাশঙ্করকে বলি, ‘এঁদের তো চিনি আমরা।’ তারাশঙ্কর হেসে বলেন, ‘চিনবেই তো। আমি কি একটা অবাস্তব জগতের অলীক মানুষদের নিয়ে কিছু লিখি নাকি? যাদের নিয়ে লিখি, তারা সবাই আমার চেনা মানুষ। তোমরা আমার লেখা পড়ো। তাই তাদের চিনতে তোমাদেরও অসুবিধে হয় না।’

পরের দিন বিকেলবেলায় সভা। সেখানে জগদীশ ভট্টাচার্য আর নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় মশাই তারাশঙ্করের সাহিত্য নিয়ে চমৎকার দুটি বক্তৃতা দেন। সুমথনাথ, শান্তিরঞ্জন ও আমি সামান্য দু-চার কথা বলি। তারপর, সভা শেষ হবার আগেই, চটপট রাতের খাওয়া সেরে, আমেদপুরে গিয়ে ধরি কলকাতার ট্রেন। এ যখনকার কথা, কলকাতায় তারাশঙ্কর তখনো বাগবাজার-পল্লির বাসিন্দা, আর আমি তখন থাকি বরানগরে। কিছুদিন পরে তারাশঙ্কর টালা পার্কে তাঁর নিজের বাড়িতে উঠে যান। আর, ঘটনাচক্রের এমনই যোগাযোগ যে, তারও কিছুকাল পরে, ১৯৬০ সালে, বরানগর ছেড়ে আমিও চলে আসি সেই টালা পার্কেই।

আমার এই টালা পার্কে চলে আসার ব্যাপারটাকে বলেছি ‘ঘটনাচক্রের যোগাযোগ’। খুব একটা বাড়িয়ে বলিনি। এটা ঠিকই যে, কলের জলের ব্যবস্থা না-থাকায় সেই সময়ে কিছুদিন ধরেই আমরা বরানগরের ষষ্ঠীতলার বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবার কথা ভাবছিলুম। কিন্তু সেটা তো বাইরের কাউকে জানাইনি। অথচ, কী কাণ্ড, এরই মধ্যে আনন্দবাজার পত্রিকায় আমাদের অফিসে গিয়ে একদিন শুনি যে, কানাইদা, অর্থাৎ আমাদের তৎকালীন ডেভেলপমেন্ট অফিসার কানাইলাল সরকার মশাই, কী একটা জরুরি কাজে আমার খোঁজ করছিলেন। শুনে তাঁর ঘরে যাই। তিনি বলেন, ‘বরানগরে পড়ে আছেন কেন? আর-একটু এদিকে চলে আসতে ইচ্ছে করে না?’ আমি বলি, ‘ইচ্ছে তো করে। কিন্তু এদিকে একটা আস্তানা আর পাচ্ছি কোথায়?’ কানাইদা আর কথা বাড়ান না। ফোন তুলে ডায়াল ঘোরান। তারপর ওদিক থেকে সাড়া পেয়ে বলেন, ‘আমি কানাই কথা বলছি, শৈলদা। আপনার একতলাটা নিয়ে এখনো কারও সঙ্গে কথা বলেননি তো?… বাঃ, চমৎকার। আমি আজ বিকেলেই একজনকে নিয়ে আপনার ওখানে যাচ্ছি।’

বাসা-বদলের দরকার তো আমার, অথচ কানাইদারই তর সয় না। বিকেল ৫টা না-বাজতেই আমাদের ঘরে এসে বলেন, ‘চলুন।’ হাতের কাজ মিটিয়ে তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। যাই শৈলদা অর্থাৎ সেকালের বিখ্যাত লেখক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে। তিনি যে টালার ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে থাকেন, সেটা জানতুম। কিন্তু বাড়িটি যে এত সুন্দর, তা জানা ছিল না। একতলা ও দেড়তলার মেজানিন ফ্লোর মিলিয়ে দুটি মস্ত মাপের ঘর। একতলার বেডরুমের সংলগ্ন একটি ছোট্ট ডাইনিং রুম। পিছনের উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘর। বাড়ির সামনেকার বারান্দার লাগোয়া ঘাস-জমিতে বেড়ায়-ঘেরা বাগান। তাতে দু-চার রকমের ফুল ফুটে আছে। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু মনে বড়ই ধন্ধ জাগে। ভাবি, আস্তানা তো মনোরম, কিন্তু এর ভাড়া গোনা কি আমার সাধ্যে কুলোবে? ঢোক গিলে ভাড়ার কথাটা জিজ্ঞেস করি। শৈলদা তাতে হো-হো করে হেসে ওঠেন। বলেন, ‘বাড়ি যখন তোমার পছন্দ হয়েছে, তখন তুমিই থাকবে, এর মধ্যে আবার ভাড়ার কথা উঠছে কেন? ঠিক আছে, তোমার যা দিতে ইচ্ছে হয়, তা-ই দিয়ো।’ পরের মাসের পয়লা তারিখেই আমরা বরানগর থেকে টালা পার্কে চলে আসি।

এর আগে কোথাও থিতু হয়ে বসতে পারিনি। যেখানেই যাই, কিছু-না-কিছু অসুবিধে দেখা দেয়। কোথাও বড্ড বেশি মশা, কোথাও বড্ড বেশি ধুলো; কোথাও যানবাহনের সমস্যা, কোথাও পানীয় জলের; কোথাও কাঁচা নর্দমার নোংরা জল উপচে রাস্তা ভেসে যায়, কোথাও পাড়াটে ঝগড়াঝাঁটির ঠেলায় মনে হয় যেন মেছোবাজারের মধ্যে বসে আছি। ফলে, বেশিদিন কোথাও তিষ্ঠোতে পারি না, চার-ছ মাস বাদে বাদে বাসস্থান পালটানো প্রায় একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। টালা পাড়ায় এসে এই প্রথম একটা মস্তবড় স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ি। মনে হয়, যাক বাবা, আমার জীবনে অন্তত একটা অস্থির অধ্যায়ে এবারে পূর্ণচ্ছেদ পড়ল, আর আমাকে কোনো নতুন আস্তানার খোঁজে দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। বাড়িটি ছবির মতো, গৃহকর্তা øেহশীল মানুষ, পাড়াটিও ছায়াচ্ছন্ন ও নিরিবিলি, এবং টালা ট্যাঙ্ক যেহেতু হাতের কাছে, তাই পানীয় জলের জোগানও এখানে অফুরন্ত। আমরা তো উচ্চাশী মানুষ নই, এর বেশি আর কীই বা আমরা চাইতে পারি?

এখানকার বাড়তি আকর্ষণ একটি চমৎকার পার্ক। তার দক্ষিণে শৈলদার বাড়ি আর উত্তরে তারাশঙ্করের। পরস্পরকে ওঁরা বাঁড়–জ্যে আর মুখুজ্যে বলে ডাকেন। এ-বাড়ির মেজানিন ফ্লোরে আমার পড়ার ঘর ও বৈঠকখানা। তার জানালা দিয়ে তাকালে মাঝে মাঝে চোখে পড়ে যে, তারাশঙ্কর সেই পার্কের ভিতর দিয়ে হেঁটে আসছেন। আমি জানি যে, পার্ক পেরিয়ে উনি এই বাড়ির সামনে এসে ‘ওহে মুখুজ্যে’ বলে হাঁক ছাড়বেন, আর দোতলা থেকে শৈলদাও অমনি নেমে আসবেন একতলায়। তার আগেই অবশ্য আমি একতলায় নেমে সদর-দরজা খুলে তারাশঙ্করকে আমার দেড়তলার ঘরে এনে বসাই। শৈলদাকেও খবর দিয়ে সেখানে ডেকে আনি। দুই বন্ধুতে গল্প জমে যায়।

শৈলদার খোঁজে তারাশঙ্কর এ-বাড়িতে আসেন সাধারণত রবিবার সকাল ন’টা-দশটা নাগাদ। তবে সব রবিবারই যে শৈলদাকে বাড়িতে পাওয়া যায়, তা নয়। তার কারণ রবিবার সকালেই ‘মুখুজ্যে’ মাঝে মাঝে তাঁর গাড়ি নিয়ে হাতিবাগানে বাজার করতে যান। তাতে অবশ্য ‘বাঁড়–জ্যে’র কোনো অসুবিধে হয় না। আমাকে বলেন, ‘ঠিক আছে, তা হলে শানুকে ডাক্, তার সঙ্গে এক হাত ক্যারম খেলে যাই।’ শানু আমার ছেলে। ডেকে পাঠানো মাত্র সে তার হোমটাস্কের অঙ্ক ফেলে ক্যারম বোর্ড আর ঘুঁটির কৌটো নিয়ে আমার পড়ার ঘরে চলে আসে। খেলা শুরু হয়। মাঝে মাঝে যে দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে ঝগড়া বাধে না, তাও নয়। আমি দর্শক। চুপচাপ দুই বালকের খেলা দেখি। তাদের একজনের বয়স ষাট পেরিয়েছে, অন্যজনের বয়স দশ বছর।

যেমন টালা তেমনি পাইকপাড়া, পাশা পাশি এই দুটি এলাকায় তখন প্রচুর লেখক ও শিল্পী থাকতেন। টালা পার্কে থাকতেন তারাশঙ্কর ও নাট্যকার মহেন্দ্র গুপ্ত। তার দক্ষিণে ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে শৈলজানন্দ ও সজনীকান্ত দাসের বাড়ি। তেমনি টালার ক্রিকেট-মাঠের পুবে মন্মথ দত্ত রোডে থাকতেন অসুস্থ কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শিল্পী অন্নদা মুনশি। আর পাইকপাড়ায় থাকতেন বিখ্যাত সেতার-শিল্পী মুস্তাক আলি, কথাসাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সন্তোষকুমার ঘোষ, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য, বিমল কর, গৌরকিশোর ঘোষ, প্রাবন্ধিক শিবনারায়ণ রায় ও নারায়ণ চৌধুরী এবং সাংবাদিক দক্ষিণারঞ্জন বসু। দোলের দিন পাইকপাড়া থেকে সাহিত্যিকদের যে মিছিল বেরোত, নিজেদের এলাকার সমস্ত পথ ঘুরে, সারাটা পথ গান গাইতে-গাইতে সেই মিছিল শেষ পর্যন্ত চলে আসত তারাশঙ্করের বাড়িতে। বাড়ির লোকেরা গোটা কয়েক মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে তৈরিই থাকতেন। সুতরাং অতিথি-আপ্যায়নে কোনো ত্র“টি হতো না। সেখানে সন্ধ্যায় বসত দ্বিতীয় দফার মজলিশ। আর তার শেষে থাকত ঢালাও নৈশভোজের ব্যবস্থা। বছরের আর-একটা দিনও তারাশঙ্করের বাড়িতে নৈশভোজের ডাক পড়ত। সেটা শ্রাবণ মাসে, তাঁর জন্মদিনে।

তারাশঙ্কর ছিলেন কঠিনে-কোমলে গড়া মানুষ। তাঁর ব্যক্তিত্বের যেটা কঠিন দিক, তা নিয়ে নানান জনের কাছে নানান গল্প শুনেছি। তবে আমি নিজে সেটা চাক্ষুষ করেছি মাত্রই একবার। সেবারে এক বড়মাপের সরকারি কর্তার অন্যায় আচরণের প্রমাণ পেয়ে তাঁকে তিনি তাঁর দফতরের মধ্যেই অতি কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেন। এবং কণ্ঠস্বর সপ্তমে চড়িয়ে বলেন, ‘নরম মাটি আঁচড়াবার অভ্যাসটা এবারে ছাড়–ন, নইলে বিপদে পড়বেন।’ তবে, আবার বলি, তারাশঙ্করের এই রুদ্ররূপ আমি একবারই মাত্র দেখেছি। সেক্ষেত্রে তাঁর স্বভাবগত কোমলতা ও মায়ামমতার পরিচয় পেয়েছি অসংখ্যবার।

তার মধ্যে একদিনের কথা এখানে বলি। সেদিনও আমার পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে দেখছিলুম যে, সামনের পার্কের ভিতর দিয়ে তিনি আমাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছেন। তবে অন্যান্য দিনের মতো একা আসছেন না, তাঁর সঙ্গে রয়েছেন একজন মলিন চেহারার, আড়ময়লা জামাকাপড়-পরা মধ্যবয়সী মানুষ। মানুষটিকে আমার একটু চেনা-চেনা লাগে। তৎক্ষণাৎ আমি একতলায় নেমে সদর-দরজা খুলি। কিন্তু সঙ্গের সেই মানুষটিকে আর দেখতে পাই না। একা তারাশঙ্কর এগিয়ে এসে আমাকে বলেন, ‘ওরে নীরেন, একটু অসুবিধেয় পড়ে গেছি, শতখানেক টাকা দরকার, তুই দিতে পারবি?’

আমি বলি, ‘এক্ষুনি এনে দিচ্ছি। কিন্তু আপনি এখানে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন কেন? উপরে এসে বসুন।’

‘না রে ভাই’, তারাশঙ্কর বলেন, ‘এখন আর উপরে যাবার সময় হবে না। লিখতে-লিখতে উঠে এসেছি, কাজ মিটিয়ে বাড়িতে ফিরেই আবার লিখতে বসব। তুই টাকাটা এনে দে।’

আমি ভিতরে গিয়ে টাকাটা এনে ওঁকে দিই। উনি আর দাঁড়ান না। টাকাটা নিয়েই চলে যান।

কিন্তু তক্ষুনি আমি সদর-দরজা বন্ধ করি না। মনের মধ্যে একটা খটকা লেগে ছিল। তাই দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকি। একটু বাদেই সেই মলিন চেহারার মধ্যবয়সী মানুষটিকে ফের দেখতে পাই। তিনি একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারাশঙ্কর তাঁর হাতে টাকাটা তুলে দিয়ে বাড়ি চলে যান। মলিন চেহারার মানুষটি তার উলটো দিকে বেলগাছিয়ার রাস্তা ধরেন।

আর ঠিক তক্ষুনি, প্রায় বিদ্যুচ্চমকের মতো, আমার মনে পড়ে যায় যে, মাসখানেক আগে আমাদের আপিসেই এই মানুষটিকে আমি দেখেছিলুম। সেদিনও এঁর পরনে ছিল ঠিক আজকের মতোই আড়ময়লা পোশাক। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে সেদিন ইনি যা বলেছিলেন, তাও মনে পড়ে। বলেছিলেন যে, পেশায় ইনি সাংবাদিক, বোম্বাইয়ের একটা মরাঠি কাগজে কাজ করেন, কলকাতা সম্পর্কে একটা ‘বিশেষ প্রতিবেদন’ লিখবেন বলে এখানে এসেছিলেন, কিন্তু রাতের ময়দানে একদল গুণ্ডা এঁর সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে, ফলে এখন ইনি বোম্বাইয়ে ফিরে যেতে পারছেন না, তা আমরা পাঁচজনে যদি দয়া করে এঁর রেলভাড়াটা তুলে দিই, তা হলে…। সবই আমার মনে পড়ে যায়।

বিকেলে তারাশঙ্করের বাড়িতে যাই। তিনি সনৎকে ডেকে বলেন, ‘হঠাৎ একটা দরকার হয়েছিল বলে নীরেনের কাছ থেকে একশটা টাকা নিয়েছি। সেটা ওকে দিয়ে দে।’

আমি বলি, ‘দাদা, আমি টাকার জন্য আসিনি। তবে টাকাটা আপনি কাকে দিয়েছেন, সেটা জানেন তো? লোকটি বড় সুবিধের নয়।’

তারাশঙ্কর বলেন, ‘তার মানে?’

আমি তাঁকে সব খুলে বলি। শুনে তারাশঙ্কর খুব একচোট হাসেন। তারপর হাসির দমক একটু থামলে বলেন, ‘তোকে বলেছিল ও বোম্বাইয়ের লোক, মরাঠি কাগজে কাজ করে, আর আমাকে বলেছে ও হায়দরাবাদের বাসিন্দা, উর্দু কাগজের সাংবাদিক।’

‘তার থেকেই যা বুঝবার বুঝে নিন।’ আমি বলি, ‘আসলে ও একটি পাক্কা ধড়িবাজ। ও বোম্বাইয়ের লোকও নয়, হায়দরাবাদের লোকও নয়, এমনকি সাংবাদিকও নয়। সবই ওর মিথ্যে কথা।’

তারাশঙ্কর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যান। তারপর বলেন, ‘না রে, সবটা মিথ্যে নয়। অন্তত এটা খুবই সত্যি কথা যে, লোকটা অভাবী। নইলে আর এভাবে লোক ঠকিয়ে বেড়াবে কেন? তা তুই আর এটা নিয়ে আক্ষেপ করিস না। বরং ধরে নে যে, একটা লোক অভাবে পড়ে আমার কাছে এসেছিল, আমি তাকে সাধ্যমতো কিছু সাহায্য করেছি। বাস্, মিটে গেল।’

আমার মুখে আর কোনো কথা জোগায় না। চুপ করে যাই। ভাবতে থাকি যে, যে-ব্যাপারটাকে আমি একদিক থেকে দেখছিলুম, সেটাকে তা হলে আর এক দিক থেকেও দেখা যায়। যেমন তারাশঙ্কর দেখেছিলেন।

প্রথম প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev