বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ডিসেম্বর ৬, ১৯৫৬-আগস্ট ১৩, ২০১১)। বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং গীতিকার। সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর অকাল প্রয়াণ চলচ্চিত্র জগতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন চলচ্চিত্র জগতের অপূরণীয় ক্ষতি। এ ক্ষতি পরিশীলিত বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করে দিয়েছে।
তারেক মাসুদ ১৯৫৬ সালে ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।তার পুরো নাম আবু তারেক মাদুস। তার শিক্ষা জীবন বৈচিত্রময়। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে ঢাকার লালবাগের একটি মাদ্রাসা থেকে মৌলানা পাস করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষার জগতে প্রবেশ করেন। ফরিদপুরের ভাঙ্গা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ছয় মাস পড়াশোনার পর বদলি হয়ে নটর ডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু এসময়ে তাকে বেশিরভাগ সময়ই তৎকালীন ঢাকা আর্ট কলেজে যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ কাটাতে দেখা যেত। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয জীবন থেকেই লেখক শিবির, বাম আন্দোলন এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে সক্রিয় ভাবে যুক্ত থেকেছেন। চলচ্চিত্র আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচয় হয় মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, শামীম আখতারের সঙ্গে। দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক অসংখ্য কর্মশালা এবং কোর্সে অংশ নিয়েছিলেন।
অকাল মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তারেক মাসুদ বিকল্প ধারার যে সব চলচ্চিত্র বিনির্মাণ করেছেন তার বিবরণ দিলে উপলব্ধি করা যায় তিনি কত বড়মাপের চলচ্চিত্রকার ছিলেন। তারেক মাসুদের কথা উঠলে তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ এর নাম অবশ্যই করতে হয়। তার স্ত্রীর পুরো নাম ক্যাথরিন শেপিয়ার। ক্যাথরিন শেপিয়ার ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালযের অর্থনীতি বিভাগ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। তিনি চারুকলা বিষয়ে শিকাগো আর্টস ইনিষ্টিটিউট থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করে নিউইয়র্ক থেকে চলচ্চিত্রের উপর পড়ালেখা করেন।
তিনিও চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, কাহিনীকার, সম্পাদক ও সঙ্গীত পরিচালক। ১৯৮০’র দশকে তার সাথে তারেক মাসুদের পরিচয় হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ ১৯৮৮ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তারেক মাসুদের সার্থক ও কৃতি চলচ্চিকার হবার পেছনে তার বিদেশী সহধমির্ণী ক্যাথরিন মাসুদের অবদান কোন অংশে কম নয়।
ক্যাথরিনের বাড়ি ছিল আমেরিকারর স্ট্যাটান আইল্যান্ডে। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি ঢাকায় নিয়মিত বসবাস শুরু করেন। ক্যাথরিন এবং তারেক মিলে ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড় তুলেছিলেন যার নাম অডিওভিশন।ক্যাথরিন মাসুদ, তারেক মাসুদের সাথে অনেকগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণে অংশ নেন। তিনি চলচ্চিত্র সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন তারেক মাসুদের সঙ্গে।
তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একটি ভ্রাম্যমাণ গানের দলকে নিয়ে মুক্তির গান। ১৯৭১ সালে মার্কিন নির্মাতা লেয়ার লেভিনের ক্যামেরাবন্দী ফুটেজের সাথে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংরক্ষণাগার থেকে নেয়া ফুটেজ জুডে দিয়ে এই ছবিটি নির্মাণ করা হয়। প্রামাণ্যচিত্রটির জন্য তিনি ১৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার লাভ করেন। “মুক্তির গান” তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বাংলা প্রামাণ্য চিত্র। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। তারেক মাসুদ “মুক্তির গান” নিয়ে লিখেছেন, “মানুষ লাইন ধরে একটি ছবি দেখার জন্য অপেক্ষা করছে৷ এমন দৃশ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কল্পনাতীত। তবে এমন ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯৫ সালে। আমাদের নির্মিত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ছবি ‘মুক্তির গান’ দেখার জন্য।”
“মানুষ লাইন ধরে একটি ছবি দেখার জন্য অপেক্ষা করছে৷ এমন দৃশ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কল্পনাতীত। তবে এমন ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯৫ সালে। আমাদের নির্মিত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ছবি ‘মুক্তির গান’ দেখার জন্য।” — “মুক্তির গান” নিয়ে এরকমই লিখেছেন তারেক মাসুদ। ছবিটি দক্ষিণ এশিয়া চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে এবং ২০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। মুক্তির গানের সাথে যে মানুষটির নাম খুব নিবিড়ভাবে জড়িত তিনি হলেন লিয়ার লিভিন। ১৯৭১ সালে শরণার্থী শিবিরে এসে মার্কিন চিত্রগ্রাহক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা লিয়ার লিভিন ৬ সপ্তাহে যে শুটিং করেছিলেন তা থেকে নির্মিত হয় মুক্তির গান। ২৫ বছর পর তারেক মাসুদ নতুন প্রজন্মকে শুনিয়েছিলেন মুক্তির গান।
তারেক মাসুদ লিয়ার লিভিন সম্পর্কে বলেছেন, “মুক্তির গান নির্মাণের জন্য আমি আর ক্যাথরিন তাঁর বাসায় গিয়ে দেখেছিলাম, কী মমতায় তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছেন। ২৫ বছর পর মুক্তির গান এর মাধ্যমে হয়তো লিয়ারের অসম্পূর্ণতাকে আমরা পূরণ করেছি।” একাত্তরে রণাঙ্গনে যখন তুমুল যুদ্ধ চলছে, তখন ভিন্ন রকম আরেক যুদ্ধে নেমেছিলেন একদল তরুণ সংস্কৃতিকর্মী। তাঁদের সাথে ছিলেন লিয়ার লিভিন।আমেরিকান নাগরিক হওয়ায় লিয়ারকে মুখোমুখি হতে হয় সীমাহীন প্রতিকূলতার। এর মধ্যেই তিনি কাজ করেন। অক্টোবর মাসে তিনি কলকাতায় মাত্র ৬ মাস তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন কিছু মুহূর্ত। সেই গানের দলে তাঁদের একমাত্র অস্ত্র ছিল গান। একটি ট্রাকে করে শরণার্থীশিবির থেকে শরণার্থীশিবিরে ছুটে বেরিয়ে তাঁরা শুধু গান গেয়ে লড়াই-সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছেন মানুষকে। তাদের নিয়েই “মুক্তির গান”।
১৯৯০ সালে তারেক মাসুদের ফোন পেয়ে লিয়ার চমকে উঠেছিলেন। লিয়ার বলেছিলেন, এত বছর ধরে হয়তো তিনি এই ফোনটির জন্যই অপেক্ষা করছেন। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ ঠিক করেন, লিয়ার লেভিন যেখানে থেমে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে আবার শুরু করবেন তাঁরা। স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটেজগুলো ব্যবহার করতে অনুমতি দেন লেভিন। নির্মাতারা ঠিক করেন, প্রায় ১৮ ঘণ্টার এই ফুটেজের সঙ্গে তাঁরা যোগ করবেন মুক্তিযুদ্ধের আরও ঐতিহাসিক ফুটেজ। এমন একটি চলচ্চিত্র তাঁরা নির্মাণ করতে চাইলেন, যেটি দেখে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী হবে। ছবিটি এমনভাবে সম্পাদিত হবে, যেন এটিকে তথ্যচিত্র মনে না হয়। অসম্পূর্ণ গানগুলোকে নতুন করে আবার রেকর্ড করান মাসুদ।
তারেক মাসুদ ওই গানগুলোর দশ বার ১০-১২ জন শিল্পীর সাথে যোগাযোগ করেন। গানগুলো ছিল — ‘পাক পশুদের মারতে হবে’, ‘এই না বাংলাদেশের গান’, ‘কিষান মজুর বাংলার সাথি রে’, ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’, ‘বলো রে বাঙালির জয়’, ‘যশোর খুলনা বগুড়া পাবনা’, ‘বাংলা মা-র দুর্নিবার আমরা তরুণ দল’। এ ছাড়া ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘দেশে দেশে ভ্রমি’, ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ গানগুলো।
ছিল নজরুলের গান ‘এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায়’। তারেক মাসুদ লিখেছেন — “আমরা ছবিটি গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে দেখিয়েছি। আজও ডিসেম্বর ও মার্চ মাস এলেই তা দেখানো হয়। প্রতিটি প্রজন্ম আসছে, তারা ‘মুক্তির গান’ দেখে মুক্তিযুদ্ধকে চিনছে। এজন্য আমাদের একটা তৃপ্তিবোধ রয়েছে।”
তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন যদি লিয়ার লেভিনের ফুটেজগুলো উদ্ধার না করতেন তবে আমাদের মহান মুন্তিযুদ্ধের একটা জ্বলন্ত দলিল কালের করাল গ্রাসে হারিয়ে যেত।।
মুক্তির কথা তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত ১৯৯৯ সালের বাংলাদেশী নাট্য চলচ্চিত্র।এই চলচ্চিত্রটিতে ১৯৭১ সালে বাংলদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন মানুষের সংগ্রামের কাহিনী বিবৃত হয়েছে। তারেক মাসুদ বলেছেন, “মুক্তির গান ছবিতে যা নেই, আমরা ‘মুক্তির কথা’ দিয়ে তার পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করছি।” এই চলচ্চিত্রের কিছু ফুটেজ মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন-এর থেকে নেয়া হয়েছে। ছবিটিতে সাধারণ জনগণ কিভাবে গণহত্যা, ধর্ষণ ও বর্বর তার শিকার হয়েছে তার প্রামান্য দলিল। ১৯৯৬-১৯৯৯ চার বছর ধরে একদল তরুণ প্রজেকশনিস্ট বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে ‘মুক্তির গান’ ও অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধের ছবির উন্মুক্ত প্রদর্শনী করেছিল। ছবি দেখাতে গিয়ে প্রদর্শক দল যুদ্ধের বৃহত্তর ইতিহাসের মুখোমুখি হয়। গ্রামের মানুষ গানে এবং কথায় বলতে শুরু করে একাত্তরে তাদের নির্যাতিত হবার কথা ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা। ব্রাত্যজনের এই কথ্য ইতিহাস নিয়েই নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র। মাটির ময়না তাঁর প্রথম ফিচার চলচ্চিত্র যার জন্য তিনি ২০০২-এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টর’ ফোর্টনাইট সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন এবং এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য একাডেমি পুরস্কারে মনোনীত হয়েছিল৷ ২০০২ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মাটির ময়না মুক্তি পায়। ছবিটি তার শৈশবে মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত। ছবিটি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং মাসুদ দেশে-বিদেশে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে। চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং “একটি দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের হৃদয়স্পর্শী ও স্বচ্ছ উপস্থাপনা”-র জন্য মাসুদ ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট লাভ করেন। এই ছবির জন্য তিনি ২৭তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার লাভ করেন। এছাঢ়া মারাকেচ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ক্যাথরিন মাসুদের সাথে যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরস্কার লাভ করেন ও গোল্ডেন স্টারের মনোনয়ন লাভ করেন এবং কেরালা চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন ক্রো ফিজেন্ট পুরস্কারের মনোনয়ন লাভ করেন। এছাড়া ছবিটি বাংলাদেশ থেকে সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশী নিবেদন করা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় নিবেদন করা দ্বিতীয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র এবং প্রথম বাংলাদেশী বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র।
তার পরিচালিত প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সোনার বেড়ি (১৯৮৫) এবং সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রানওয়ে মুক্তি পায় ২০১০ সালে। চলচ্চিত্রে তার অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।
প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কারে স্থান পেয়েছিল তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। জহির রায়হানের “স্টপ জেনোসাইড” এর পর তারেক মাসুদের “মুক্তির গান”-কে বিবেচনা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের সেরা প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে। তারেক মাসুদ শিল্পকে ভালোবাসতেন। তিনি প্রতিটি কাজ করতেন যত্নের সাথে৷ তিনি নতুন প্রজন্মকে দিয়েছেন অনেক কিছু। “আদম সুরত” নির্মাণের জন্য ৭ বছর সময় নেন তিনি। শিল্পীর কাছাকাছি থেকে শিল্প সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে নিজের মধ্যে ধারণা বিকশিত করেন তিনি। “মুক্তির গান” নির্মাণের জন্য সেই লিয়ার লিভিনকে খুঁজে বের করা, সেই ১০-১২ জন শিল্পীর সাথে কথা বলা, গানগুলোর পুনর্নিমান — তাঁর পরিশ্রম ছিল অতুলনীয়। তারেক মাসুদের কাজে আমরা যত্ন ও ভালোবাসা দেখতে পাই৷ তারেক মাসুদ আমাদের মাঝে মুক্তির গান ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন। নতুন প্রজন্ম “মুক্তির গান” দেখে কিছুটা হলেও যুদ্ধকে উপলব্ধি করতে পারবে। প্রতিভাময় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ জীবন অবসান ঘটে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘনায়।
‘কাগজের ফুল’ নামক চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের লোকেশন চিত্রায়ন করার জন্য তারেক মাসুদ তার সহকর্মীদের নিয়ে পাবনার ইছামতী নদীর তীরে যান। লোকেশন নির্বাচন শেষে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে তারেক মাসুদ তার গাড়িবহর নিয়ে রওনা দেন। পথে ঘিওরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তারেক মাসুদের সঙ্গে ছিলেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক, সম্প্রচার কিংবদন্তি, টেলিভিশন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও বিশিষ্ট চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর। তিনিও একই দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদের সাথে মারা যান। ঘটনাস্থলেই তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর-সহ আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়। মুক্তিগানের নির্মাতা তারেক মাসুদ আমাদের মুক্ত্যিুদ্ধের যে প্রামাণ্যচিত্র রেখে গেছেন তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে। ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আমরা তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।