রোগমুক্তি, দম্পতির সন্তান কামনা কিংবা যে কোনো সংকট থেকে মুক্তির উপায় বাবা তারকনাথের শরণাপন্ন। এমন ভক্তির আবেগে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য মানুষ। বিশ্বাস আর ভক্তি মিলেমিশে একাকার তারকেশ্বর। এক আধ দিনের নয়, সারা বছরের চিত্র। কণ্ঠে একটাই আকুল আবেদন ‘ভোলে বাবা পার করে গা’।

আসলে শিব ছিলেন মূলত অনার্যদের দেবতা। যার ফলে বেদে শিবের উল্লেখ মেলে না। আমাদের দেশে শ্রমজীবী মানুষ শিবের পুজো করত। অবশ্য বাবা তারকনাথের সৃষ্টি রহস্য অদ্ভূত। যাকে ঘিরে সারা দেশ জুড়ে মানুষের ভক্তি ও আবেগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। কথিত, বহুকাল আগে উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা শিবভক্ত বিষ্ণুদাস তারকেশ্বরের পাশে বসবাস করতেন। বিষ্ণুদাসের ভাই দেখেন কাছাকাছি জঙ্গলে একটি কালো পাথরের উপর এক গাভী দুধ দান করে আসে। এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে বিষ্ণুদাসকে জানায় ভাই। এরপর-ই বিষ্ণুদাস স্বপ্নাদেশ পান পাথরটিকে শিবজ্ঞানে পুজো করার। সেই শিব-ই আজকের বাবা তারকনাথ। তাই তারকেশ্বরের মহাদেবকে বলা হয় স্বয়ম্ভু লিঙ্গ। কারণ তারকেশ্বরের শিবলিঙ্গ কেউ কখনও স্থাপন করেননি।

প্রসঙ্গত, ১৭২৯ সালে প্রথমে একটি আটচালা মন্দির নির্মাণ করেন রাজা ভারমল্ল। মন্দিরের সামনে একটি নাটমন্দির এবং পাশে কালী ও লক্ষ্মী-নারায়ণের মন্দিরও স্থাপিত হয়। বাবা তারকনাথের উত্তর দিকে দুধপুকুর। এই পুকুরে ডুবে স্নান করলে যাবতীয় মনস্কামনা পূরণ হয়। এই মিথ ভক্তদের মনে আজও গেঁথে আছে। উল্লেখ করতেই হয় মা সারদাদেবী এই মন্দিরে একাধিকবার পুজো দিয়েছেন। তাছাড়া বাবা তারকনাথকে নিয়ে সিনেমা, যাত্রা ও নাটক মানুষের মনে দাগ কেটেছে। উল্লেখ্য, বাবা তারকনাথের সারা বছরই ভক্তের আনাগোনা থাকে। বিশেষ করে শিবের জন্মমাস শ্রাবণে লক্ষাধিক ভক্ত তারকনাথের মাথায় জল, দুধ ও ডাবের জল ঢেলে পুণ্য সঞ্চয় করতে আসেন। এরপরই ফাল্গুন মাসের শিবরাত্রি উপলক্ষে লক্ষনীয় ভিড় দেখা যায়। মেলাও চলে। তারপর যেটা নজরকাড়ে তা হল গাজন উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে সন্ন্যাসদের কঠোর সাধনা ও ব্রত পালন মানুষের মনে শিবের প্রতি আলাদা শ্রদ্ধা জাগিয়ে তুলেছে।

প্রসঙ্গত, তারকেশ্বরের গাজন উৎসব মানেই আলাদা আনন্দ। হাজার হাজার সন্ন্যাসীদের মেলবন্ধনে মুখরিত হয় বাবা তারকনাথের নাম। চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন শিব-পার্বতির বিয়ে হয়েছিল বলে নীলষষ্ঠী ব্রত পালন হয়। কথিত, মর্তে তারকাসুরকে বধ করার জন্য শিবের ভক্তরা এই সন্ন্যাসব্রত পালন করে। একমাস ধরে ভক্তরা সারাদিন উপবাস করার পর রাতে ফলাহার করেন। নীলপুজোর দিন এই ব্রত পালন শেষ হয়। সংস্কৃতির এক প্রাচীন এই গাজন উৎসবে মেতে উঠবে তারকেশ্বর। রাজা ভারমল্লের বাড়ি থেকে নীলষষ্ঠীর দিন রামনগর থেকে ধূল ও মূল সন্ন্যাসী সহ অন্যান্য সন্ন্যাসীরা শেকুলকাঁটার ঝাড় নিয়ে তারকনাথের মন্দিরে পৌঁছাবে। দুধপুকুরে স্নান সেরে এই শেকুলকাঁটার উপর ঝাঁপ দেবে। এই আচারপ্রথা আজও চলে আসছে। পরনে গেরুয়া কাপড়। ভোলানাথের জয়ধ্বনিতে ভরে যাবে তারকেশ্বরের আকাশ – বাতাস। গাজন উৎসবের ক’টা দিন মহন্ত মহারাজ হৃষীকেশ আশ্রম দণ্ডস্বামী স্বয়ং উপস্থিত থাকেন। এই গাজন উৎসবকে কেন্দ্র করে এ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও পার্শ্ববর্তী রাজ্যের এবং বাংলাদেশের বহু মানুষ এখানে জড়ো হন।
এদিকে গাজন উৎসবকে ঘিরে যাতে গোলমাল না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখে প্রশাসন। পুরোহিতদের প্রর্দশক পীযূষ মুখার্জি জানান, তারকেশ্বরের গাজন মেলা কেবলমাত্র এলাকার নয়, সমগ্ৰ রাজ্যের অখণ্ড পবিত্রতার মেলা।