একটা মাত্র দিঘি। তার জন্যই থমকে আছে তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল প্রকল্প। দশ বছর ধরে টালবাহানার পরও সমস্যার সমাধানের পথ বের হয়নি। গত ৩ মে হাওড়া ডিভিশনের রেলওয়ে ম্যানেজার মনীশ জৈন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। যদি কিছু সমাধান সূত্র বের হয়ে আসে। এজন্য তিনি স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। এমনকি স্থানীয় নেতারাও দেখা করে দ্রুত রেল প্রকল্পের কাজ শুরু করার আবেদন জানান।
প্রসঙ্গত, হুগলির গোঘাটের ভাবাদিঘি এলাকার মানুষের কাছে বাঁচার একটা জায়গা। এর উপর দিয়েই রেল যাবে। এটা মানতে পারছে না স্থানীয় বাসিন্দারা। আর তা নিয়েই যত গণ্ডগোল। গত দশ বছর আগে কাজ শুরু হয়েও তা বন্ধ হয়ে আছে।
উল্লেখ্য, ভাবাদিঘির উপর দিয়ে রেলপথ চালু হলে সহজে কামারপুকুর, জয়রামবাটি, বিষ্ণুপুর, গড়মান্দারণ, শুশুনিয়া ও অযোধ্যা যেতে পারবেন পর্যটকরা। তাছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন রেলপথ চালু হবে। এরমধ্যে রাজনীতির মাথা গলানাটাও আরও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। শেষ পযর্ন্ত বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। এখন অথৈ জলে তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল প্রকল্প।

প্রসঙ্গত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন এই রেল প্রকল্প অনুমোদন করেন। তারকেশ্বর থেকে বিষ্ণুপুর ৮২.৫ কি.মি রেলপথের জন্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা মঞ্জুরও করেন তিনি। ২০১৮ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে জানানো হয়। সেই মতো দ্রুত কাজও শুরু হয়। তারকেশ্বর থেকে আরামবাগ পযর্ন্ত রেলপথ সম্পূর্ণ হওয়ার পরই ২০১২ সালের ৪ জুন তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুকুল রায় আরামবাগ পযর্ন্ত রেল চলাচলের সূচনা করেন। তারপর আরামবাগ থেকে রেলপথের কাজ শুরু হলেও গোঘাটের ভাবাদিঘি গ্রামে একটি দিঘিকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীদের বাধায় রেলের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। গ্রামের মানুষের দাবি দিঘির ওপর দিয়ে রেললাইন পাতা যাবে না। ৫২ বিঘে দিঘির সামান্য অংশও রেল অধিগ্রহণ করতে পারবে না। কারণ এই দিঘির জল আশপাশের কয়েকশো পরিবার ব্যবহার করেন। কিন্তু রেল কতৃপক্ষ তাদের নকশা অনুযায়ী দিঘির ওপর দিয়েই রেললাইন করতে চায়। এখান থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। নেতা ও মন্ত্রী অনেকে এসেছেন। কিন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য্যায় তারকেশ্বরে প্রশাসনিক বৈঠকে বলেন আরামবাগ থেকে বিষ্ণুপুর রেল চলবেই।
এদিকে দিঘি বাঁচাও আন্দোলন কমিটি বেঁকে বসে। আন্দোলনকারীদের পক্ষে স্বপন রায়, প্রসাদ রায়, গণেশ পণ্ডিতরা বলেন, কিছু স্থানীয় নেতা আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। এমনকি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। ভাবাদিঘিতে মাছচাষ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কাজে মানুষের লাগে। তাই রেললাইন পাততে হলে দিঘি বাঁচিয়ে তা করতে হবে। এরপরই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা নড়েচড়ে বসেন। ভাবাদিঘির মানুষের সঙ্গে বৈঠকও হয়। এরই মধ্যে গত ৩মে ভাবাদিঘি পরিদর্শনে যান মণীশ জৈন। আশার আলো দেখছেন এলাকার মানুষ।

গোঘাটের প্রাক্তন বিধায়ক ও এলাকার মানুষের আস্থাভাজন মানস মজুমদার জানান, ভাবাদিঘির মানুষের সঙ্গে এখনো আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে রেলপথ তৈরি হয়। কিন্তু বিজেপি ও সিপিএমের নেতারা এই কাজে বাধা দিচ্ছে। ফলে গ্রামের লোকেরা ভাবাদিঘির জলই স্পর্শ করতে দিচ্ছে না। তবে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে বিভিন্ন ভাবে উন্নয়ন ঘটিয়ে মানুষের জীবনধারাই পাল্টে দিয়েছেন। মানুষ আস্তে আস্তে বুঝতে পারছেন এখানে রেলপথ খুবই দরকার।
এদিকে গোঘাট পযর্ন্ত রেল চলাচল শুরু হয়ে গেছে। ভাবাদিঘির পরও বিষ্ণুপুর পযর্ন্ত রেললাইনের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ। ভাবাদিঘিতে কাজ সম্পূর্ণ হলেই তারকেশ্বর-বিষ্ণপুর রেল প্রকল্পের কাজও সম্পূর্ণ হবে। সব সমস্যা কাটিয়ে কবে আবার বেঁচে উঠবে বহু কাঙ্খিত এই প্রকল্প, সেই আশায় দিন গুনছেন তারকেশ্বর, আরামবাগ ও বিষ্ণুপুরের মানুষ।