তারকেশ্বরের মহান্ত মহারাজের দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল হুগলি জেলার তারকেশ্বরে। তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। হুগলি জেলার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এই সত্যাগ্রহ তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ নামে বিখ্যাত।
বহুদিন ধরে তারকেশ্বর মন্দিরের মহন্তদের বিভিন্ন অপকীর্তির কথা লোকমুখে এমনকি ছোটখাটো পত্র-পত্রিকা আকারেও প্রচারিত হচ্ছিল সেই সময়। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করি, এলোকেশী নামে স্থানীয় এক গৃহবধূকে তার পরিবারের লোকেরা পুণ্য অর্জনের আশায় মহন্তের ঘরে পাঠিয়ে ছিলেন তার সেবাদাসী হিসাবে কাজ করার জন্য। দুশ্চরিত্র মোহন্ত মহারাজ সেই মহিলার চরিত্রহনন করেন। খবর পেয়ে সেই মহিলার স্বামী নবীন নামে এক ব্যক্তি মহন্তর ঘরে ছুটে যান এবং ক্রোধান্ধ হয়ে এলোকেশী কে খুন করেন। এই ঘটনায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয় তারকেশ্বর এলাকায়। কিন্তু মহন্ত অত্যন্ত প্রভাবশালী মানুষ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কথা বলার লোক পাওয়া যায়নি। যাত্রীদের অনর্থক হয়রানি করা, মহিলাদের শ্লীলতাহানি করা, জমিদারিতে প্রজাদের উপর নানান অত্যাচার করা মহারাজের প্রতি সরকারের আনুগত্য এবং ঈশ্বর ভীতির কারণে মুখ বুঝে সহ্য করছিল মানুষ।
এইসব অনাচারের বিরুদ্ধে প্রথম গর্জে উঠলেন স্বামী সত্যানন্দ ও বিশ্বানন্দ নামে দুই মহারাজের নেতৃত্বে মহাবীর দল। তাদের পিছনে এসে দাঁড়ালো কিছু সাধারণ মানুষ। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একসময় কংগ্রেসের প্রাদেশিক কমিটির কাছে আবেদন করা হলো, যাতে তারা আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব নেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উপর দায়িত্ব দেওয়া হলো কংগ্রেস কমিটির পক্ষ থেকে। এবারে কেঁপে উঠলো মোহন্তর আসন। এই আন্দোলন ভাবিয়ে তুলল ব্রিটিশ সরকার কেও।
কবি নজরুল ইসলাম সবে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে হুগলি বিদ্যামন্দিরে কিছুদিনের জন্য বসবাস করছেন। তারকেশ্বর সত্যাগ্রহের যোগ দিতে তিনি এসে পৌঁছলেন তারকেশ্বরে। মহন্তের অত্যাচারের বিরুদ্ধে গান লিখলেন তিনি, পথে পথে ঘুরতে লাগলেন সেই গান গেয়ে।

এই সময়ে একটি ঘটনা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। সত্যাগ্রহের প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে মন্দিরের মাঠে কংগ্রেসের একটি বিরাট সভার আয়োজন করা হয়েছে। উপস্থিত আছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিশ্বানন্দ, নজরুল ইসলাম প্রমূখ। এদের প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত মহন্তর লেঠেল বাহিনী। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক ভয়ঙ্কর লাঠিয়াল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন কবি নজরুলকে উদ্বোধনী সংগীত গাওয়ার অনুরোধ করলেন। নজরুল দৃপ্ত ভঙ্গিমায় তাঁর গান শুরু করলেন।
“জাগো আজ দন্ড হাতে চণ্ড বঙ্গবাসী
ওই ডুবালো পাপ চন্ডাল তোদের বাংলাদেশের কাশি।
জাগো বঙ্গবাসী।
মোহের যার নাইকো অন্ত
পূজারী সেই মহন্ত
মা-বোনের সর্বস্বান্ত করছে বেদীমূলে।”
একের পর এক লাইন গেয়ে যাচ্ছেন নজরুল ইসলাম। শিহরিত হয়ে উঠছে সভার লোকজন। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে মহন্তর লেঠেল বাহিনীও। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে তাদের নেতা সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। আদেশ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সত্যাগ্রহীদের উপর। সবাই ভয়ে ভয়ে আড়চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে আর মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
গান শেষ হল। সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখল, কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে আছেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর চোখ তখন ছল ছল করছে। মঞ্চে এগিয়ে এসে বললেন, “কাজীদা আরেকবার গাও।” নজরুল তাঁর গান শেষ করার পরেই সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পায়ের কাছে সেই ভয়ঙ্কর লাঠিটা রেখে ওই সভায় মহন্তের সর্বনাশ করার শপথ নিলেন। আন্দোলনের মোড় ঘুরে গেল। বেশিরভাগ লাঠিয়াল নিয়ে সত্যবাবু সত্যাগ্রহে শামিল হলেন। নজরুল ইসলাম শুধু কন্ঠ দিয়ে গান গাইতেন না, গান গাইতেন “কলজে” দিয়ে, হৃদয় দিয়ে, এই ঘটনাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।