তারকেশ্বরে আর ষাঁড়ের দেখা পাওয়া যাবে না। আস্তে আস্তে একেবারেই বিলীন হবে। ভক্তদের মুখে একটাই কথা মন্দিরে পুজো দিতে আসা মানেই বৃহৎ শিঙ ওয়ালার সামনে পড়া। তাকে আদর করে শিবের প্রসাদ খাওয়ানো ছিল চিরপ্রথা। একটু সাহস ভরে গায়ে হাত বোলানো। একটা সময় বিশ ত্রিশটা ষাঁড় দাপিয়ে বেড়াত মন্দির চত্বর ছাড়াও তারকেশ্বর শহর এমনকি স্টেশন চত্বরেও ছিল অবাধ যাতায়াত। দোকানদাররা একটু অন্যমনস্ক হলেই দোকানের খাবার উদরসাত করতে ভুল হত না ষাঁড়ের। এছাড়াও মেজাজ একটু রুক্ষ্ম হলেই ভক্তদের পিছন ধাওয়া করত। এ সবই এখন ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে, হয়ে যাবেও। এমনটা তো হবার কথা ছিল না। দেশের সব শিবস্থানেই ষাঁড়েদের দাপট লক্ষ্য করা যায়। তারকেশ্বরও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু ব্যতিক্রম চোখে পড়ল।

তারকেশ্বর স্টেটের পক্ষ থেকে ষাঁড় কমে যাওয়ার রহস্য খুঁজে পাওয়া গেল। গত দু-বছর হল মানত করা ষাঁড় এখানে আর পুজোর পর ছেড়ে দিয়ে যাওয়া যাবে না। এরকমই বিধিনিষেধ আরোপ হয়েছে। এখানকার পুরোহিত জয়ন্ত মুখোপাধ্যায় বলেন, করোনার দাপট শুরু হতেই তারকেশ্বর স্টেট কতৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় মানত করা ষাঁড়ের পুজো হবার পরেই মানতকারীর দায়িত্ব সেই ষাঁড়কে তার নিরাপদ জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই নিয়ম চালু হবার পরেই আস্তে আস্তে ষাঁড়ের সংখ্যা বাবার স্থানে কমছে। জয়ন্তবাবু আরও জানান, ষাঁড়ের ব্যাপারটা পুরোপুরি স্টেটের দায়িত্ব। একটা সময় স্টেটের নিজস্ব বিশাল গোশালা ছিল। প্রচুর গাভী ছিল। দুধ মিলত প্রচুর। এই দুধেই বাবার পায়েস হত। পাশাপাশি ষাঁড় রাখারও ব্যবস্থা ছিল। এখন সবই বন্ধ।

শিবের বাহনেরও এখানে স্থান নেই। ভক্তদের মন খারাপ। এখানকার মিষ্টি ব্যবসায়ী স্বপন ঘোষ বলেন, সকাল হলেই দোকানের সামনে একটু খাবারের জন্য প্রতিদিন আসত। এখন সংখ্যায় দু-একটির দেখা মেলে। এখানে ষাঁড় ছাড়া বন্ধ হয়েছে। একটা সময় আর এদের দেখা যাবে না। অত্যাচার ছিল ঠিকই। কিন্তু ভক্তদের এদের নিয়ে আলাদা একটা আগ্রহ ছিল। সারা শহরজুড়ে প্রতিটি দোকান ও বাড়িতে সকাল হলেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত। গৃহস্থ কল্যাণ ভেবে এদের ভগবতী সেবা করত। আগামী দিনেও সেটা বন্ধ হবে। তাই মন খারাপ শহরবাসীর।

এদিকে যে দু-একটা ষাঁড় এখনও আছে তাদের বয়স হয়েছে। বেশি চলাফেরা করতে পারে না। স্টেটও সেইভাবে আর নজর দেয় না। ফলে এই অবলা জীবের কষ্ট কিছুটা হলেও পথচলতি মানুষ খাবার দিয়ে মেটায়। তবে মানুষের একটাই প্রশ্ন সব শিবস্থানে নধর ষাঁড়ের দেখা মিলবে। অথচ শতাধিক বছর ধরে চলে আসা এই আচার-প্রথা কি বন্ধ হবে? তাহলে শিবের বাহনের অবাধ বিচরণ তারকেশ্বরেই কি প্রথম শেষ হবে? এই প্রশ্নই মাথাচাড়া দিয়েছে ভক্তদের মনে।